'ইয়েমেনে নার্সের প্রাণ বাঁচাতে ভারতেরও আর কিছু করার নেই'

নিমিশা প্রিয়া (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নিমিশা প্রিয়া (ফাইল ছবি)
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি

ইয়েমেনে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ভারতীয় নার্স নিমিশা প্রিয়ার জীবন বাঁচাতে ভারত সরকারেরও যে 'আর খুব একটা কিছু করার নেই', রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সেটা দেশের সুপ্রিম কোর্টে এদিন (সোমবার) স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। আট বছর আগে ইয়েমেনি একজন নাগরিককে হত্যার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত নিমিশা প্রিয়ার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা বুধবার (১৬ জুলাই) – অর্থাৎ মাঝে রয়েছে আর মাত্র একটা দিন।

সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে এদিন অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন, নিমিশা প্রিয়াকে বাঁচানোর চেষ্টায় সরকার সব রকম চেষ্টা চালালেও "ভারত এক্ষেত্রে আসলে কতদূর কী করতে পারে, তার একটা সীমা আছে – আর আমরা সেই সীমায় পৌঁছে গেছি!"

অ্যাটর্নি জেনারেল আর ভেঙ্কটরামানি কার্যত মেনেই নিয়েছেন, দক্ষিণ ভারতের কেরালার ওই নার্সের জীবন আদৌ বাঁচানো যাবে কি না, সেটা এখন ভারত সরকারের ওপর আর নির্ভর করছে না।

"যত রকম চ্যানেলে চেষ্টা চালানো যায় আমরা তার সবই চেষ্টা করেছি। ইয়েমেনের একজন 'প্রভাবশালী শেখে'র মাধ্যমেও চেষ্টা চালানো হয়েছে, আরও নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে – কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি", শীর্ষ আদালতকে জানিয়েছেন তিনি।

তবে তিনি এটাও জানান, ভারত সরকার শুনেছে নিমিশা প্রিয়ার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা স্থগিত হতে পারে – যদিও এ ব্যাপারে নিশ্চিত কোনও তথ্য নেই।

ইয়েমেনের রাজধানী সানা-র নিয়ন্ত্রণ এখন হুথি বিদ্রোহীদের কব্জায়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইয়েমেনের রাজধানী সানা-র নিয়ন্ত্রণ এখন হুথি বিদ্রোহীদের কব্জায়

অ্যাটর্নি জেনারেলের কথায়, "একটি অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে আমরা খবর পেয়েছি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সিদ্ধান্ত মুলতুবি হতে পারে, তবে শেষ পর্যন্ত তা হবে কি না সেটা সত্যিই আমাদের জানা নেই।"

মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত নার্সের জীবন বাঁচানোর জন্য এর আগে ভারত সরকার কূটনৈতিক পর্যায়েও বহু চেষ্টা চালিয়েছে – কিন্তু ইয়েমেনে যেহেতু ভারতের কোনও দূতাবাস বা কূটনৈতিক উপস্থিতি নেই তাই সে চেষ্টাও ব্যাহত হয়েছে।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টে শুনানি

আজ (সোমবার) ভারতীয় সময় সকাল সাড়ে দশটায় নিমিশা প্রিয়ার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা স্থগিত রাখতে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ইয়েমেনকে শেষবারের মতো আর একটি অনুরোধ পাঠানো হয়েছে বলেও মি ভেঙ্কটরামানি জানান – তবে তার এখনও কোনও জবাব আসেনি।

'সেইভ নিমিশা প্রিয়া ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকশন কাউন্সিল' নামে যে নাগরিক সংগঠনটি কেরালার ওই নার্সের প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে, তাদের দায়ের করা মামলাতেই রাষ্ট্রপক্ষ এদিন এই বক্তব্য জানিয়েছে।

ভারতীয় নাগরিক নিমিশা প্রিয়ার জীবন বাঁচানোর চেষ্টায় ভারত সরকার ঠিক কী করছে, তা জানতে চেয়েই ওই সংগঠনটি দেশের শীর্ষ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিল।

তবে এই মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টেরও যে আসলে বিশেষ কিছু করার নেই, সেটা বেঞ্চের বিচারপতিরাও এদিন প্রকারান্তরে মেনে নিয়েছেন।

দিল্লিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ভবন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দিল্লিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ভবন

বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতাকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ মন্তব্য করেন, "একটি বিদেশি রাষ্ট্রের ব্যাপারে আমরা কীই বা আদেশ দিতে পারি? আর দিলেও বা সেটা কে মানবে?"

তারা এই মামলার শুনানি আগামী ১৮ জুলাই (শুক্রবার) পর্যন্ত স্থগিত রেখেছেন।

তবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এর মাঝে কোনও 'ডেভেলপমেন্ট' হলে বা পরিস্থিতিতে নতুন মোড় এলে তা সঙ্গে সঙ্গে শীর্ষ আদালতকে জানাতে হবে।

'ব্লাড মানি'র প্রস্তাবে কেন কাজ হচ্ছে না?

স্থানীয় একজন ইয়েমেনি ব্যক্তিকে হত্যা করার অভিযোগে সে দেশের আদালত নিমিশা প্রিয়াকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, যা বুধবার কার্যকর হওয়ার কথা।

তালাল আব্দো মাহদি নামে নিহত ওই ব্যক্তি নিমিশা প্রিয়ার ব্যবসাায়িক অংশীদার ছিলেন।

ইয়েমেনে কোনও ব্যবসা করতে হলে সে দেশের কোনও নাগরিককে সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক, তাই ওই ব্যক্তির সঙ্গে মিলে নিমিশা প্রিয়া তার ক্লিনিক চালু করেছিলেন।

২০১৭ সালে তালাল আব্দো মাহদির টুকরো টুকরো করা দেহ একটি জলের ট্যাঙ্ক থেকে উদ্ধার করা হয়। এরপরই সেই হত্যার অভিযোগে নিমিশা প্রিয়াকে গ্রেপ্তার হতে হয় এবং সে দেশের আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নিমিশাকে বাঁচানোর অনেক চেষ্টা চালিয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নিমিশার প্রাণ বাঁচানোর অনেক চেষ্টা চালিয়েছে

এখন নিমিশাকে বাঁচানোর একমাত্র রাস্তা হলো যদি ওই নিহত ব্যক্তির পরিবার 'দিয়াহ' বা 'ব্লাড মানি'-র বিনিময়ে ওই নার্সের প্রাণভিক্ষা দিতে রাজি হয়!

নিমিশা প্রিয়া-র আত্মীয়স্বজন ও সমর্থকরা ইতোমধ্যেই মাহদির পরিবারকে 'ব্লাড মানি' দিতে ১ মিলিয়ন বা ১০ লক্ষ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছেন এবং পরিবারকে সেটা 'অফার'ও করা হয়েছে।

'সেইভ নিমিশা প্রিয়া ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকশন কাউন্সিল' নামে যে সংগঠনটি ওই নার্সের প্রাণ বাঁচানোর জন্য লড়ছে তার একজন সদস্য ও কেরালার সমাজকর্মী বাবু জন গত সপ্তাহেই বিবিসিকে বলেছিলেন, "নিহতের পরিবারের কাছ থেকে আমরা এখনও প্রাণভিক্ষা পাওয়ার – কিংবা তারা অন্য কোনও নতুন দাবি জানায় কি না – তার অপেক্ষায় আছি।"

তবে এদিন ভারত সরকারের আইনজীবী জানান, নিহতের পরিবারের কাছ থেকে এখনও কোনও আশার আলো পাওয়া যায়নি।

রাজধানী সানা-সহ ইয়েমেনের বেশির ভাগ অংশের নিয়ন্ত্রণ এখন হুথি বিদ্রোহীদের হাতে – সেই বিদ্রোহীদের নেতৃত্বও এই মামলাটির ব্যাপারে জড়িয়ে পড়েছে বলে অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য থেকে জানা গেছে।

কেরালাতে নিমিশার বাড়ির ভেতরের ছবি
ছবির ক্যাপশান, কেরালাতে নিমিশার বাড়ির ভেতরের ছবি

তিনি বলেন, "এখন নিহতের পরিবার এবং হুথি বিদ্রোহীরাও কিন্তু আর 'এনগেজ' করতে রাজি হচ্ছে না।"

"তারা বলছেন এটা আমাদের সম্মান ও মর্যাদার প্রশ্ন। এখন জানি না আরও বেশি অর্থ অফার করা হলে সেই অবস্থান পাল্টাবে কি না ... কিন্তু এখনও পর্যন্ত বিষয়টা সেখানেই আটকে আছে, স্ট্যান্ডস্টিল", আদালতকে জানান তিনি।

কেরালা থেকে সানা – এক দুর্ভাগা অভিবাসীর কাহিনি

দক্ষিণ ভারতের রাজ্য কেরালার পালাক্কাড় থেকে নিমিশা প্রিয়া ২০০৮ সালে রাজধানী সানা-র একটি সরকারি হাসপাতালে নার্সের চাকরি নিয়ে ইয়েমেনে পাড়ি দিয়েছিলেন।

কিন্তু ২০১৭তে তালাল আব্দো মাহদি-র লাশ উদ্ধার হওয়ার পর তাকে গ্রেপ্তার হতে হয়। এখন ৩৮ বছর বয়সী নিমিশা প্রিয়া ইয়েমেনের রাজধানী সানা-র সেন্ট্রাল জেলে বন্দি রয়েছেন।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, সিডেটিভ বা ঘুমের ওষুধের 'ওভারডোজ' দিয়ে তিনি তালাল আব্দো মাহদিকে হত্যা করেছেন এবং পরে তার দেহটিকে টুকরো টুকরো করে জলের ট্যাঙ্কে ফেলে দিয়েছেন।

নিমিশা প্রিয়া অবশ্য এই অভিযোগগুলোর সবই অস্বীকার করেছেন।

অটোচালক স্বামী টনি থমাসের সঙ্গে নিমিশার বিয়ের ছবি
ছবির ক্যাপশান, অটোচালক স্বামী টনি থমাসের সঙ্গে নিমিশার বিয়ের ছবি

আদালতে তার আইনজীবী দাবি করেন, মাহদি প্রিয়ার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালাতেন, তার সব টাকাপয়সা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন, পাসপোর্ট পর্যন্ত আটকে রেখেছিলেন – এমনকি বন্দুক দিয়েও প্রিয়াকে ভয় দেখাতেন!

শুনানিতে তিনি আরও বলেন, নিমিশা প্রিয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল মাহদিকে অচেতন করে তার কাছ থেকে নিজের পাসপোর্ট উদ্ধার করা – কিন্তু ভুলবশত সিডেটিভের ডোজ বেশি হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু ২০২০ সালে ইয়েমেনের একটি স্থানীয় আদালত ভারতীয় ওই নার্সকে দোষী সাব্যস্ত করে তাকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেয়।

নিমিশা প্রিয়ার পরিবার এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সে দেশের সুপ্রিম কোর্টের শরণাপন্ন হয়, কিন্তু ২০২৩ সালে শীর্ষ আদালতও তাদের সেই আপিল খারিজ করে দেয়।

ইয়েমেনের রাজধানী সানা-র নিয়ন্ত্রণ এখন যে হুথি বিদ্রোহীদের কব্জায়, সেই হুথিদের সুপ্রিম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট মাহদি আল-মাশাত চলতি বছরের জানুয়ারির গোড়ার দিকে এই মৃত্যুদণ্ডের আদেশে তার অনুমোদন দেন।

মেয়েকে বাঁচানোর চেষ্টায় নিমিশার মা-ও এখন ইয়েমেনে
ছবির ক্যাপশান, মেয়েকে বাঁচানোর চেষ্টায় নিমিশার মা-ও এখন ইয়েমেনে

নিমিশার দরিদ্র মা কেরালায় গৃহপরিচারিকার কাজ করে সংসার চালাতেন, মেয়ের জীবন বাঁচানোর চেষ্টায় তিনি এখন ইয়েমেনেই মাটি কামড়ে পড়ে আছেন।

নিহত তালাল আব্দো মাহদির পরিবারের সঙ্গে কথাবার্তা বলা ও আলাপ-আলোচনার জন্য ইয়েমেনের একজন সমাজকর্মী স্যামুয়েল জেরোমকে তিনি দায়িত্ব দিয়েছেন।

স্যামুয়েল জেরোম জানিয়েছেন, তাদের পক্ষ থেকে মাহদির পরিবারকে ১০ লক্ষ ডলারের সমপরিমাণ ব্লাড মানি ইতোমধ্যেই অফার করা হয়েছে।

কিন্তু সেটা নিমিশা প্রিয়ার প্রাণ বাঁচাতে পারবে কি না, তা এখনও বোঝা যাচ্ছে না।

এদিকে নিমিশার পরিবার ও তার সমর্থক ক্যাম্পেইনারদের হাতে সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।