চীনা প্রেসিডেন্টের কাছে উপেক্ষিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং-এর মৃত্যু

লি কেকিয়াং

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, লি কেকিয়াং

চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৬৮ বছর। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম জানিয়েছে তাকে বাঁচানোর সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শুক্রবার মধ্যরাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

লি কেকিয়াংকে এক সময় চীনের ভবিষ্যৎ নেতা মনে করা হতো। যদিও তাকে অতিক্রম করে সেই জায়গাটি নিয়ে নিয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

একজন প্রশিক্ষিত অর্থনীতিবিদ এবং চীনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদে আসীন ছিলেন তিনি। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন তিনি।

চীনের বর্তমান প্রশাসনের শীর্ষ পদের মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি মি. শি’র অনুগতদের দলে ছিলেন না।

“লি’র মৃত্যুর মানে হলো চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সিনিয়র নেতৃত্বের মধ্যে মধ্যপন্থী কণ্ঠের জন্য একটি ক্ষতি, যা অন্য কেউ নিতে সক্ষম নন বলেই মনে হয়,” চীনা থিংক ট্যাঙ্কের একজন স্কলার ইয়ান চং বলছিলেন বিবিসিকে।

“এর সম্ভবত একটি অর্থ হলো মি. শি’র (প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং) ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের চর্চায় আরও কম নাগাল টানা”।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, চলতি বছর মার্চে ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসে কথা বলছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও তখনকার প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং

লি কেকিয়াংকে চলতি বছরেই প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল। বৃহস্পতিবার সাংহাইতে হঠাৎ করেই হৃদরোগে আক্রান্ত হন তিনি এবং শুক্রবার রাতের প্রথম প্রহরে মারা যান।

তার মৃত্যুতে চীনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক শোক প্রকাশ করছে লোকজন। অনেকেই গভীর দুঃখ প্রকাশ করছেন। যদিও অনেকের পোস্টের কমেন্ট সীমাবদ্ধ দেখা যাচ্ছে।

“এটা খুবই হঠাৎ, তিনি ছিলেন খুবই তরুণ,” একজন লিখেছেন চীনা সামাজিক মাধ্যমে ওয়েবুতে। আরেকজন লিখেছেন- তার মৃত্যু ‘আমাদের কাছে ঘরের খুঁটি হারানোর মতো’।

তবে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে তার মৃত্যু নিয়ে খুব একটা কথাবার্তা দেখা যাচ্ছে না। সরকারিভাবে কোন শোকবার্তা এখনো আসেনি।

এমনকি তার ক্যারিয়ার সম্পর্কে পার্টির মূল্যায়নও তুলে ধরা হয়নি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিনহুয়ার প্রাথমিক বিবৃতিতে।

অতীতে অনেক চীনা নেতার মৃত্যুকে ঘিরে প্রতিবাদ বিক্ষোভ দেখা গেছে। গত বছর জিয়াং জেমিনের মৃত্যুর পর ব্যাপক শোক প্রকাশকে প্রেসিডেন্ট শি’র সমালোচনা হিসেবেই দেখা হয়েছে।

লি কেকিয়াং তার প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে অন্যতম স্মার্ট নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মাও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে যেতে শুরু করে তখন তিনি মর্যাদাপূর্ণ পেকিং ইউনিভার্সিটি ল স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।

তবে চীনের বাইরে তার সেরা পরিচিতি ছিলেন ‘লি কেকিয়াং ইনডেক্স’ এর জন্য। দ্যা ইকোনমিস্ট এই টার্মটি চালু করেছিলো অনানুষ্ঠানিকভাবে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বোঝানোর জন্য।

লি কেকিয়াং

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান, সাধারণ পরিবারের সন্তান হয়েও শীর্ষ স্তরে এসেছিলেন লি কেকিয়াং

যেটা যেমন তেমনই বলতেন তিনি

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

একটি বিনয়ী পরিবার থেকে এসেছিলেন লি এবং তার বাবা ছিলেন একজন স্থানীয় কর্মকর্তা। চীনের পূর্বাঞ্চলীয় আনহুই প্রদেশের দিনজুয়ান এলাকায় ১৯৫৫ সালের জুলাইতে জন্ম হয়েছিল তার।

চীনে সবচেয়ে কম বয়সে প্রাদেশিক গভর্নর হয়েছিলেন তিনি। পরে পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পলিটব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটিতে জায়গা করে নেন।

এক পর্যায়ে অনেকের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছিলো যে তাকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর পূর্বসূরি হু জিনতাওয়ের উত্তরসূরি হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে।

তাকে মি. হু’র অনুসারী হিসেবেই মনে করতো অনেকে এবং তিনিই ছিলেন মি. হু’র প্রশাসনে থাকা শেষ ব্যক্তি যিনি পলিটব্যুরোতে ছিলেন চলতি বছরের মার্চে পদত্যাগের আগ পর্যন্ত।

হু’র সময়কালকে মনে করা হতো বহির্বিশ্বের জন্য দরজা খুলে দেয়া এবং নতুন ধারণার প্রতি সহনশীলতা বৃদ্ধির সময় হিসেবে।

অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে প্রায়োগিক ভাবনা, সম্পদের ব্যবধান কমিয়ে আনা এবং সাশ্রয়ী আবাসনের জন্য লি কেকিয়াং ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেছিলেন।

“তিনি ছিলেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে খোলা মনের মানুষ যিনি সত্যিই চীনকে এগিয়ে নিয়েছিলেন এবং সমাজের সব স্তরের মধ্যেই উন্মুক্ত আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছিলেন,” বিবিসি নিউজডে প্রোগ্রামকে বলছিলেন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুরের প্রফেসর বার্ট হফম্যান।

ড. চং বলছেন লি’কে মানুষ মনে রাখতে তার উন্মুক্ত অর্থনৈতিক নীতি ও সংস্কারের জন্য। “আদর্শিক বা অনুগত হওয়ার চেয়েও তিনি ছিলেন কৌশলগত দিক থেকে দক্ষ”।

তিনি উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তির উদ্ভাবনকে তার নীতিতে উৎসাহিত করেছিলেন, বিশেষত তরুণদের মধ্যে।

চলতি বছরে এসে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর প্রশাসনে উপেক্ষিত হয়ে পড়েন লি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, চলতি বছরে এসে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর প্রশাসনে উপেক্ষিত হয়ে পড়েন লি

মূলত ‘প্রকৌশলী’দের নিয়ন্ত্রণে থাকা দলের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন অর্থনীতিবিদ এবং ‘যেটা যেমন সেটাতে তেমন’ বলার জন্যই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেছিলেন। সমাধান খুঁজতে গিয়ে তিনি প্রকাশ্যেই চীনা অর্থনীতির সমস্যাগুলো স্বীকার করেছেন।

ঋণ কমিয়ে আনা এবং কাঠামোগত সংস্কারে তার অর্থনৈতিক নীতি ‘লিকোনমিকস’ এর লক্ষ্য ছিলো ঋণভিত্তিক প্রবৃদ্ধির ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে আনা এবং একটি টেকসই ও স্থিতিশীল অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাওয়া।

তবে ২০১৬ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র পিপলস ডেইলিতে প্রকাশিত এক আর্টিক্যালে ‘লিকোনমিকস’ বাদ দেয়া হয় এবং শি জিনপিং এর চিন্তাভাবনা তুলে আনা হয়।

হফম্যান বলছেন প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় তিনি বায়ু দূষণের বিরুদ্ধে বড় ক্যাম্পেইনে অংশ নিয়েছেন এবং ২০১৪ সালে দূষণের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ করেছিলেন। ওই সময় সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে স্বীকার করা হয় যে এটি দেশের একটি সংকট, যা স্বাস্থ্য ঝুঁকির সাথে সম্পর্কিত।

কোভিড সংকটের সময়ে তিনি অর্থনীতির ওপর চাপ পড়ার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন এবং কর্মকর্তাদের অতিমাত্রায় বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়ে সুচিন্তিত হতে বলেছিলেন। এমনকি তিনি চীন করোনা সম্পর্কিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের আগেই মাস্ক ছাড়া প্রকাশ্যে এসেছিলেন।

কিন্তু কর্মকর্তাদের আসলে মি. লি’র অর্থনীতি সুরক্ষার আদেশ এবং মি. শি’র জিরো-কোভিড নীতির আওতায় বিধিনিষেধ দ্বিগুণ করা – এই দুটোর মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হয়েছিলো।

জিরো-কোভিড নীতি ইকোনমিক হাব হিসেবে পরিচিত সাংহাই থেকে শুরু করে গ্রামীণ শহরগুলো পর্যন্ত চীনের অর্থনীতিকে দারুণভাবে আঘাত করেন, সরবরাহ চেইনকে গলাটিপে ধরে এবং ব্যবসাকে চাপে ফেলে দেয়।