প্রকাশ্যে চুম্বন ভারতে কেন নৈতিক অপরাধ?

    • Author, সন্দ্বীপ রায়
    • Role, কলকাতা

দিল্লির অতি আধুনিক আরামদায়ক মেট্রোরেল নেটোওয়ার্ক এখন হয়ে উঠেছে তরুণ তরুণীদের প্রেম ভালবাসার অন্তরঙ্গ মুহূর্ত কাটানোর একটা প্রিয় জায়গা।

ভারতে ট্রেন ভ্রমণে আধুনিকতার ছোঁয়া নিয়ে আসা দিল্লির শীতাতপনিয়ন্ত্রিত মেট্রো রেলের কামরায় গত সপ্তাহে এক তরুণ দম্পতির চুম্বনের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হবার পর এই ঘটনা নিয়ে তুমুল বিতর্কের ঝড় উঠেছে।

ভিডিওতে দেখা গেছে এক পুরুষের কোলে শুয়ে এক নারী এবং তারা ওই অবস্থায় একে অপরকে চুমু খাচ্ছেন। এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন যাত্রীদের জানিয়েছে তারা কারোর “আপত্তিকর আচরণ” দেখলে যেন কর্তৃপক্ষের কাছে তা রিপোর্ট করে।

রেল কর্তৃপক্ষ এধরনের আচরণের ওপর নজরদারি চালাতে তাদের “ঝটিকা নজরদারি বাহিনীর ব্যাপক সংখ্যা বৃদ্ধিরও” প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এই ভিডিও ছড়ানোর পর রেল কর্তৃপক্ষ অনলাইনে যেভাবে তুমুল সমালোচনার শিকার হচ্ছে তাতে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে সেদেশে প্রকাশ্যে কীধরনের আচরণ অশ্লীল ও আপত্তিকর এবং ব্যক্তিগত আচরণের নৈতিক দায়দায়িত্ব কার তা নিয়ে।

আপত্তিকর বা অশ্লীল আচরণ কী?

কিন্তু “আপত্তিকর আচরণ”-এর সংজ্ঞা কী? তা নিয়েও নানা মুনির নানা মত।

যেমন, সোসাল মিডিয়ায় যারা মতামতের ঝড় তুলছেন তাদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ায় বিস্তর ফারাক আছে। কারোর কাছে মনে হয় খুবই স্বাভাবিক আচরণও আপত্তিকর – যেমন – ট্রেনের ভেতর এক তরুণ দম্পতি একসাথে বসে আছেন আর মেয়েটির মাথা তার পুরুষ সঙ্গীর কাঁধে।

গত মাসেই দিল্লির মেট্রো রেলের কামরায় এক ব্যক্তির হস্তমৈথুনের ভিডিও বাইরে ছড়ানোর পর দিল্লির মহিলা কমিশন কড়া একটা হুঁশিয়ারি জারি করে।

একথা অনস্বীকার্য যে অধিকাংশ মানুষই এক বাক্যে মেনে নেবে প্রকাশ্য কোন স্থানে হস্তমৈথুন গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু কোন কাজটা যৌন আর কোনটা শুধুই অন্তরঙ্গতার প্রকাশ তার মধ্যে সীমারেখা টানা বেশ জটিল হতে পারে, বিশেষ করে কোন প্রকাশ্য স্থানে সেটা করা হলে।

ভারতের কলকাতায় ২০১৮ সালে এক দম্পতি পরস্পরকে প্রকাশ্যে আলিঙ্গন করায় ক্রুদ্ধ সহযাত্রীরা তাদের পিটিয়েছিল। সামাজিক মাধ্যমে এ ঘটনা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ উঠেছিল। অনেকেই সাধারণ নাগরিকদের পরামর্শ দিয়েছিল তরুণ সমাজের ওপর “নৈতিক পুলিশি নজরদারি” তারা যেন বন্ধ করে।

দিল্লির মেট্রো স্টেশনে ২০১৯ সালে সিসিটিভি ভিডিওতে ওঠা এক দম্পতির “অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের” ছবি উঠে গিয়েছিল একটি পর্ন সাইটে।

আরও পড়তে পারেন:

জনসমক্ষে অন্তরঙ্গতা ট্যাবু

ভারতে প্রকাশ্যে অন্তরঙ্গতা প্রকাশের একটা চালু নাম পিডিএ (পাবলিক ডিসপ্লে অফ অ্যাফেকশান)। দেশটিতে জনসমক্ষে অন্তরঙ্গতা প্রকাশের একটা দীর্ঘ এবং দুর্বোধ্য ও জটিল ইতিহাস রয়েছে।

ভারতের অনেক মন্দিরের গায়ে কামোত্তেজক দৃশ্যের শৈল্পিক চিত্র খোদাই করা আছে। বিশ্বকে কামোদ্দীপক যৌনতার সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থগুলোর একটি 'কামসূত্র' দিয়েছে ভারত। অথচ ভারতে সিনেমার পর্দায় চুম্বন দেখলে এখনও ভুরু কুঁচকানো হয়।

ভারতে ১৯৮১ সালে একটি ফিল্ম সেট দেখতে যান সেসময় প্রিন্স চার্লস (বর্তমানে রাজা তৃতীয় চার্লস)। তখন তাকে ফুলের মালা পরিয়ে অভ্যর্থনা জানান অভিনেত্রী পদ্মিনী কোলহাপুরি, সেইসঙ্গে চার্লসের গালে অপরিকল্পিতভাবে একটা চুম্বনও দেন তিনি। ওই ঘটনার পর তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন “যে নারী প্রিন্স চার্লসকে চুমু খেয়েছেন” এই শিরোনামে, যদিও বেশ কয়েক বছর পর দেয়া এক সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী বলেছিলেন “ওটা আহামরি কোন ব্যাপার ছিল না”।

কিন্তু ঘটনাটা বড় হতে পারত। কারণ ২০০৭ সালে হলিউড সুপারস্টার রিচার্ড গিয়ার বলিউড অভিনেত্রী শিল্পা শেঠীর গালে চুমু খাওয়ার পর তা নিয়ে তুমুল সোরগোল হয়েছিল। এইডস সচেতনতামূলক এক অনুষ্ঠানে তিনি ভারতীয় অভিনেত্রীর গালে চুমু খেলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে তিনি ভারতীয় সংস্কৃতিকে অপমান করেছেন।

রিচার্ড গিয়ার দাবি করেন তিনি শুধু অনুষ্ঠানে এই বার্তাই দিতে চেয়েছিলেন যে চুম্বন নিরাপদ। কিন্তু তারপরেও মিজ শেঠীর বিরুদ্ধে আইনি অভিযোগ দায়ের করা হয় যে তিনি জনসমক্ষে “আপত্তিকর আচরণে” অংশ নিয়েছেন।

মিজ শেঠীকে ২০২২ সালে এই মামলায় যখন খালাস দেয়া হয় তখন আদালত বলে -এটা বোঝা গেছে যে গিয়ারের অশোভন কাজের যে অভিযোগ, তার শিকার হয়েছিলেন শিল্পা শেঠী।

গত কয়েক বছরে, ভারতীয় সিনেমার পর্দায় এবং ওয়েব শোগুলোতে চুম্বন এবং ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ মুহূর্তের দৃশ্য প্রায়ই দেখা যাচ্ছে।

রোমান্টিকতার জায়গা নেই

কিন্তু ভারতের মত বিশাল জনসংখ্যার দেশে, যেখানে বেশিরভাগ তরুণ তরুণী এখনও পরিবারের সঙ্গে বাস করেন, সেখানে তাদের জন্য ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য ব্যক্তিগত জায়গা বলে কিছু থাকে না।

ফলে, তরুণ যুগলরা রোমন্টিকভাবে ঘনিষ্ঠ হবার জন্য বেছে নেন উদ্যান, পার্ক এবং এমনকি প্রাচীন দালানবাড়ি বা মনুমেন্টগুলো।

যেমন কলকাতা শহরে বহুদিন ধরে প্রেমিকপ্রেমিকাদের প্রেম করার প্রিয় স্পট হল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে রানি ভিক্টোরিয়ার বিশাল মার্বেল মূর্তির নিচের মাঠ। বিশ্বকে ভিক্টোরিয় যুগের নৈতিকতা শেখানো হয়েছিল যে রানি ভিক্টোরিয়ার শাসনমালে, সেই রানির প্রস্তরমূর্তির নিচে ঝোপঝাড়ের আড়ালে বসে থাকা যুগলদের সেখান থেকে হঠাতে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর সেখানে নিয়মিতভাবে হানা দেয় পুলিশ। বাঁশি বাজিয়ে তারা প্রেমিক প্রেমিকাদের সতর্ক করে দিয়ে সেখান থেকে চলে যেতে বলে।

নানা স্থানেই জুলুম আর হয়রানি

কিন্তু যেসব প্রেমিক দম্পতি লোকচক্ষুর আড়ালে ঘনিষ্ঠ হতে চায় তাদের জন্যও রয়েছে অন্য প্রতিবন্ধকতা। ভারতে অনেক হোটেলই দম্পতিদের ঘর ভাড়া দেবার আগে তাদের বিয়ের হলফনামা দেখানোর জন্য চাপ দেয়।

অথচ, মজার ব্যাপার হল সমকামী দম্পতিদের হোটেলে ঘর ভাড়া নিতে গেলে একই ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় না। ভারতে কিন্তু দুজন পুরুষ হাত ধরাধরি বা গলা জড়াজড়ি করে হাঁটলে কেউ কখনই বাঁকা চোখে তাকায় না, যেটা হয় পশ্চিমে।

ভারতীয় সমাজে জনসমক্ষে পরস্পরকে স্পর্শ করা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু একজন পুরুষ আর একজন নারী প্রকাশ্যে অন্তরঙ্গ হলে অর্থাৎ তাদের মধ্যে পিডিএ সমাজ মেনে নিতে নারাজ।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ভারতীয় আইনে 'অশ্লীলতা' কি?

ভারতে কেউ যদি প্রকাশ্যে তার অশ্লীল আচরণের মাধ্যমে বা আপত্তিকর, অশ্লীল গান গেয়ে, ছড়া কেটে অন্যের বিরক্তি উৎপাদন করে, ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯৪ ধারা অনুসারে সেজন্য তার সাজার বিধান রয়েছে।

কিন্তু ‘আপত্তিকর’ বা ‘অশ্লীল’ বলতে কী বোঝায় সেই সংজ্ঞাই স্পষ্ট নয়।

এই ধারা ব্যবহার করে বিখ্যাত ঊর্দু কবি সাদাত হাসান মান্তোর বিরুদ্ধে আপত্তিকর কার্যকলাপের জন্য ছয় বার মামলা আনা হয়। অভিনেতা মিলিন্দ সোমান তার ৫৫ বছরের জন্মদিন উপলক্ষে সমুদ্র সৈকতে নগ্ন দেহে তার ছোটার ছবি পোস্ট করায় ২৯৪ ধারায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয় ২০১৭ সালে।

এবছরের গোড়ার দিকে কলকাতায় একটি জনপ্রিয় নাটকের বিষয়বস্তু ছিল ভারতে অশ্লীলতা। ‘পাবলিক অবসেনিটিস’ নামে এই নাটকে সাধারণ সম্পর্কের বাইরের সম্পর্ককে দেশটিতে কী চোখে দেখা হয় তা তুলে ধরা হয়।

নাট্যকার শায়ক মিশা চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে বলেন এই নাটকের ভিত্তি হল ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯২ ধারা – প্রকাশ্য অশ্লীলতা। তিনি বলেন আইনের এই ধারায় অশ্লীলতা বলতে কী বোঝায় তা দেখে তিনি বিস্মিত – “কোনগুলো আইনে নিষিদ্ধ বলে বিবেচিত আর কোনগুলো কামোত্তেজক বলে পরিগণিত” তা অস্পষ্ট। “ব্যক্তিগত জায়গায় আর জনসমক্ষে ঘনিষ্ঠতা প্রকাশ- এই দুয়ের মধ্যে ছিদ্রান্বেষণের"ও অনেক সুযোগ রয়েছে।

যখন কোন ঘটনায় তারকারা জড়িয়ে পড়েন তখন তা নিয়ে নানারকম মাতামাতি চলে। কিন্তু সাধারণ তরুণদের জন্য পিডিএ সবসময়েই একটা যুদ্ধক্ষেত্র। তাদের রোমন্টিকতার প্রকাশ, ঘনিষ্ঠ হবার স্বাধীনতা যে তাদের অধিকার, সমাজের যে অংশ এখনও সেটা মেনে নিতে নারাজ, তাদের বিরুদ্ধে তরুণদের চলছে নিরন্তর একটা সংগ্রাম।

সেই সংগ্রামের কারণেই ভ্যালেন্টাইনস দিবসে মাঠে নামে নজরদারি পুলিশ, তার বিরুদ্ধে রাস্তায় প্রতিবাদে সোচ্চার হয় তরুণ সমাজ। যেমনটা দেখা গেছে নৈতিক খবরদারির বিরুদ্ধে ভারতের চেন্নাই শহরে ইঞ্জিনিয়রিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাদ্রাজ আইআইটির শিক্ষার্থীদের “সেলিব্রেটিং লাভ” নামে প্রতিবাদ সমাবেশে।

আদালত বেশ কিছু রায়ে বলেছে প্রকাশ্য চুমু খাওয়া সেই অর্থে কোন অশ্লীলতা নয়। ২০০৮ সালে এক বিবাহিত দম্পতির পক্ষের এক আইনজীবী বলেন এটা শুধু তখনই অশ্লীল বলে গণ্য হবে যদি সেটা “অনৈতিক বা পাপকাজে উৎসাহ জোগায় বা জনসাধারণের বিরক্তির কারণ হয়।"

আর আইনের সেই সূক্ষ্ম সীমারেখাটা কোথায় টানা হবে সমস্যাটা সেখানেই। আইনজীবী সৌরভ কিরপাল তার বই ‘সেক্স অ্যান্ড দ্য সুপ্রিম কোর্ট’এ লিখেছেন: সমাজ আইনের রূপরেখার ভিত্তি- সমাজকে ঘিরেই তৈরি হয় আইন...আইন বদল করার সমস্যা হল সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেন যারা সেই ব্যক্তিরাই আইন রচনা করেন।

দিল্লি মেট্রোর সাম্প্রতিক ঘটনায় যদি ফিরে যাই, সেখানেও স্পষ্ট সমাজের এই পরস্পর বিরোধিতা- এই অন্তরঙ্গতা সমাজে এক ব্যক্তির জন্য যেখানে পিডিএ – অর্থাৎ নিছক জনসমক্ষে ঘনিষ্ঠতার প্রকাশ – আরেকজনের কাছে সেটাই জনসমক্ষে অশ্লীলতা।

সন্দ্বীপ রায় কলকাতার একজন লেখক ও পডকাস্টার।