আল-কাদির ট্রাস্ট মামলা কী এবং ইমরান খানকে গ্রেপ্তারের পর কী হবে?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শেহজাদ মালিক এবং আজম খান
- Role, বিবিসি উর্দু
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে দেশটির ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি ব্যুরো (এনএবি) আল-কাদির ট্রাস্ট মামলায় মঙ্গলবার ইসলামাবাদ হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে গ্রেপ্তার করেছে।
ইসলামাবাদ-ভিত্তিক আবাসন কোম্পানি বাহরিয়া টাউন, আল-কাদির বিশ্ববিদ্যালয়কে সাড়ে চারশো কানালের বেশি জমি দান করেছিল। আল-কাদির ট্রাস্ট মামলাটি সেই প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মামলা।
পাকিস্তানে জমি পরিমাপের একক হল কানাল। যেখানে এক কানাল হলো এক একরের ৮ ভাগের এক ভাগ। সে হিসেবে ৪৫০ কানাল হল সোয়া ৫৬ একর জমি।
দেশটির পিডিএম সরকার (পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট) অভিযোগ তোলে বাহরিয়া টাউন ওই জমি কোন অনুদান হিসেবে দেয়নি বরং এটি বাহরিয়া টাউনের প্রতিষ্ঠাতা মালিক রিয়াজ এবং ইমরান খানের সরকারের মধ্যে একটি গোপন চুক্তির ফলাফল ছিল।
সরকারের দাবি, আবাসন কোম্পানিটি ব্রিটেনে ১৯০ মিলিয়ন পাউন্ড বা ছয় হাজার কোটি রুপি পাচার করেছিল। পরে ব্রিটিশ সরকার ওই সম্পদ জব্দ করে পাকিস্তান সরকারকে ফেরত দেয়।
এ ঘটনায় কোম্পানির মালিক রিয়াজ মালিকের বিরুদ্ধে করাচিতে মামলা দায়ের হয়। পরে সুপ্রিম কোর্ট মামলার রায়ে ৪৬ হাজার কোটি রুপি দেয়ার চুক্তিতে মালিক রিয়াজকে দায়মুক্তি দেয়।
সরকারের দাবি, বাহরিয়া টাউন এর বিনিময়ে ২০২১ সালের মার্চে ঝিলম জেলার সোহাওয়া এলাকায় ৪৫৮ কানাল জমি আল-কাদির ইউনিভার্সিটি তহবিলে দান করে। বাহরিয়া টাউনের সাথে ইমরান খানের স্ত্রী বুশরা বিবির এই সমঝোতা হয়েছিল।
যে তহবিলে এই জমি দেওয়া হয়েছিল তার ট্রাস্টিদের মধ্যে ইমরান খান, তার স্ত্রী বুশরা বিবি, তেহরিক-ই-ইনসাফের নেতা জুলফি বুখারি এবং বাবর আওয়ান ছিলেন। কিন্তু পরে দুই নেতা তহবিল থেকে আলাদা হয়ে যান।
২০২২ সালের জুন মাসে পাকিস্তানের জোট সরকারও অভিযোগ করে, তেহরিক-ই-ইনসাফ সরকার বাহরিয়া টাউনের সাথে একটি চুক্তির বিনিময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের স্ত্রী বুশরা বিবিকে কোটি কোটি টাকার জমি হস্তান্তর করেছে।
ফেডারেল মন্ত্রিসভার বৈঠকের সময় এসব গোপন চুক্তি সংক্রান্ত কিছু তথ্যও সামনে আনা হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের স্ত্রী বুশরা বিবি আল-কাদির ইউনিভার্সিটি প্রকল্প তহবিলের পক্ষে ট্রাস্টি হিসেবে এসব নথিতে স্বাক্ষর করেছিলেন।

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে আল-কাদির ইউনিভার্সিটি ট্রাস্টের নামে কয়েকশ কানাল জমি সংক্রান্ত যাচাই বাছাইকে আনুষ্ঠানিক তদন্তে রূপ দিয়েছে ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি ব্যুরো বা এনএবি।
এনএবি-এর কর্মকর্তারা এর আগে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং যুক্তরাজ্যে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়ার তদন্ত করেছিলেন।
মামলার তদন্তকারী এক কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন যে, তাদের সামনে বিতর্কিত কিছু প্রমাণ আসে, যার ভিত্তিতে এ বিষয়ে যাচাই বাছাইকে আনুষ্ঠানিক তদন্তে রূপ দেয়া হয়।
এনএবি কর্মকর্তাদের মতে, বিষয়টি যখন তদন্তের পর্যায়ে পৌঁছাবে, তখন অভিযুক্তদের সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে এবং প্রয়োজনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের গ্রেপ্তার করা যেতে পারে।
এনএবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ঘটনায় ইমরান খান, বুশরা বিবি, ব্যারিস্টার শাহজাদ আকবর এবং আবাসন কোম্পানির বিরুদ্ধে এতদিন কেবল খোঁজখবর নেয়া হচ্ছিল। এখন এই ঘটনাকে তদন্তে রূপ দেয়া হয়েছে।
ইমরান খানের আইনজীবী ব্যারিস্টার গোহার বিবিসিকে বলেছেন, যখন তিনি জানতে পারলেন যে আল কাদির ট্রাস্টের যাচাই বাছাইকে তদন্তে রূপ দেয়া হচ্ছে, তখন তিনি মঙ্গলবার ইসলামাবাদ হাইকোর্টে গিয়ে আবেদন করেন। যেখানে এনএবি কর্তৃক ইমরান খানের গ্রেফতার ঠেকাতে অনুরোধ জানানো হয়।
এনএবি কর্মকর্তাদের মতে, এনএবি যখন তদন্ত শুরু করে, তখন ইমরান খান সরকারের মন্ত্রিসভার প্রায় সব সদস্যকে তলব করা হয়, যারা ৩রা ডিসেম্বর ২০১৯ এর বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন। তবে কিছু পিটিআই নেতা এনএবি’র সামনে এসেছিলেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ইসলামাবাদের সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে তহবিলের দলিল নিবন্ধনের কয়েক মাসের মধ্যে ঝিলামে ৪৬০ কানাল জমি কিনে ইমরান খানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু জুলফি বুখারির কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং ট্রাস্ট তৈরির পর জুলফি বুখারি এই জমিটি তহবিলের নামে হস্তান্তর করেন।
মঙ্গলবার ইমরান খানকে গ্রেপ্তারের পর এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ বলেছেন, ইমরান খান ও তার স্ত্রী আল-কাদির তহবিলের ট্রাস্টি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, ইমরান খান যখন তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মিথ্যা মামলা প্রস্তুত করছিলেন, তখন তিনি নিজেই দুর্নীতি করছিলেন।
আল-কাদির তহবিলকে জমি দেয়া আবাসন কোম্পানির মালিক তার অ্যাকাউন্ট থেকে ছয় হাজার কোটি রুপি রাষ্ট্রীয় তহবিলে জমা দেয়।
তার মতে, বানিগালায় ২৪০ কানাল জমি ফারাহ গগী নামে নিবন্ধিত রয়েছে, যার মূল্য প্রায় পাঁচ থেকে সাত কোটি টাকা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন যে, ফেডারেল মন্ত্রিসভাকে ইমরান খান এ বিষয়ে কিছু জানাননি। কেবল কাগজ ঘুরিয়ে সব অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। তার মতে, বর্তমান মন্ত্রিসভাও এজন্য দায়ী কারণ তাদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে হবে।

ছবির উৎস, Getty Images
জিজ্ঞাসাবাদ কিভাবে হবে?
ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি ব্যুরো বা এনএবি'র সাবেক বিশেষ কৌঁসুলি ইমরান শফিক বিবিসিকে বলেছেন, বর্তমান সরকার এনএবি বিধিতে যে নতুন সংশোধনী এনেছে সেগুলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করেছেন। এতে ইমরান খানের তাৎক্ষণিক এবং বড় ধরণের উপকার হবে।
তার মতে, নতুন সংশোধনীতে ৯০ দিনের রিমান্ডের পরিবর্তে রিমান্ডের মেয়াদ ১৪ দিন করা হয়েছে এবং এই সংশোধনীর পর এখন সহজেই জামিন পেতে পারেন ইমরান খান। তার মতে, এখন ট্রায়াল কোর্টেরও তাকে জামিন দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে।
তার মতে, ৯সি ধারার সংশোধনী অনুসারে, এনএবি ইমরান খানকে কল-আপ নোটিশ পাঠাতে এবং তার সাথে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে বাধ্য থাকবে। এবং ওই তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকতে হবে যে, চূড়ান্ত জিজ্ঞাসাবাদ শেষ। এর পর থেকে নিয়মিত তদন্ত হবে।
সাবেক এই প্রসিকিউটরের মতে, এনএবি ইমরান খানের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি, যা অভিযুক্ত ব্যক্তির কাজে আসবে।
বাহরিয়া টাউনের বিরুদ্ধে করাচিতে দায়ের হওয়া মামলার রায় দেয় সুপ্রিম কোর্ট। সেখানে কোম্পানির মালিক রিয়াজের সাথে ৪৬ হাজার কোটি রুপিতে মামলা নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এনএবি তাদের বিবৃতিতে বলেছে যে ইমরান খান তাদের কল-আপ নোটিশের জবাব দেননি। এজন্য তাকে এনএবি অধ্যাদেশ ও আইনের আওতায় গ্রেফতার করা হয়েছে।
ইমরান শফিকের মতে, পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর যে কোনও অভিযুক্তকে যেসব বিষয়ের মুখোমুখি হতে হয়, এনএবি'র হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর ইমরান খানকেও ঠিক সেই বিষয়ের মুখোমুখি হতে হবে। তার মতে, ইমরান খানের মেডিকেল পরীক্ষা করা হবে। তাকে রিমান্ড নেওয়া হতে পারে এবং তারপর তাকে আরও সমস্যায় পড়তে হতে পারে।








