আইন শৃঙ্খলার অবনতির মধ্যে আবারও আলোচনায় গণপিটুনি

পুলিশি কার্যক্রম জোরদার

ছবির উৎস, DMP

ছবির ক্যাপশান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে অনেক স্থানে পুলিশি কার্যক্রম জোরদার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে সরকার বা পুলিশের দিক থেকে নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও এর মধ্যে গতকালই কয়েকটি গণপিটুনির ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে উত্তরায় এক ঘটনায় ছিনতাইকারীকে গণপিটুনি দেয়ার পর ঝুলিয়ে রাখারও ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ঢাকার কাছে টঙ্গীতে ছিনতাইকারী সন্দেহে গণপিটুনিতে এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে।

উত্তরা ও টঙ্গী ছাড়াও ছিনতাইকারীদের ধরে গণপিটুনি দেয়া কিংবা চুরি ডাকাতি এড়াতে বিভিন্ন এলাকায় লোকজনকে নিজস্ব উদ্যোগে পাহারা দেয়ার কিছু ভিডিও সামাজিক মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে।

যদিও পুলিশ জানিয়েছে ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি কিংবা নগরজুড়ে যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আলোচনায় এসেছে, সেগুলো ঠেকাতে ব্যাপক অভিযান শুরু হয়েছে এবং ঢাকা মহানগরীকে ৬৫টি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।

এর মধ্যেই বেড়েছে গণপিটুনি। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয়মাসে বাংলাদেশে গণপিটুনিতে ১২১ জন নিহত হয়েছে। এর ম্যে জানুয়ারি মাসে নিহত হয়েছে ২১ জন।

মঙ্গলবার দিবাগত মধ্যরাতে ঢাকার বিজয় সরণিতে ব্রিফিং করে সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বলেছেন, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা হচ্ছে এবং খুব দ্রুতই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। তিনি দাবি করেছেন বড় ধরনের অপরাধ কমলেও ছোটখাটো অপরাধ বেড়েছে, যা নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

সেই সময় তার সাথে থাকা ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছেন, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের তালিকা করে ব্যাপক অভিযান চালানো হচ্ছে।

যদিও পুলিশের এসব ব্যবস্থা সত্ত্বেও গতকালই একাধিক গণপিটুনির ঘটনাকে 'পুলিশ ও সরকারের ব্যবস্থার' প্রতি এক ধরনের আস্থাহীনতার প্রমাণ বলেই মনে করেন সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ডঃ তৌহিদুল হক। মি. হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

"একদিকে আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে চলেছে। অন্যদিকে পুলিশের দিক থেকে আশ্বস্ত হওয়ার মতো ব্যবস্থা মানুষ দেখছে না। এটিও গণপিটুনির নামে মব আক্রমণে অনেককে উৎসাহিত করছে। অপরাধের সাথে সাথে অপরাধ প্রতিকারের নামে এভাবে আইন হাতে তুলে নেয়াও বন্ধ করতে হবে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
মঙ্গলবার উত্তরাসহ কয়েকটি জায়গায় গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মঙ্গলবার উত্তরাসহ কয়েকটি জায়গায় গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে

কী হয়েছে উত্তরা ও টঙ্গীতে

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

মঙ্গলবার রাত দশটার দিকে উত্তরা হাউজ বিল্ডিং এলাকার বিএনএস সেন্টারের সামনে ফুটওভার ব্রিজে দুই যুবককে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা তৈরি করেছে।

ভিডিওতে দেখা যায় একদল ব্যক্তি পায়ে দড়ি বাঁধা এক ব্যক্তিকে ওপরের দিকে তুলছে। সেখানে তাঁকে ফুটওভারব্রিজের লোহার পিলারের সঙ্গে উল্টো করে বাঁধছিলেন আরেকজন যুবক। এসময় সেখানে অনেক লোককে একযোগে মোবাইল হাতে ভিডিও করতে দেখা যায়।

পরে খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে বলে জানিয়েছে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ। তারা এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

পুলিশ জানিয়েছে ওই দুজনকে ছিনতাইয়ের অভিযোগে গণপিটুনি দিয়ে তারপর ফুটওভার ব্রিজে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিলো।

স্থানীয়রা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছে যে, ওই দুজন 'ছিনতাই করতে গিয়ে পথচারীদের হাতে ধরা পড়ে'। তখন লোকজন তাদের ধরে প্রধান সড়কে ফুটওভার ব্রিজের ওপর নিয়ে প্রহার করতে থাকে।

অন্যদিকে প্রায় একই সময়ে অর্থাৎ মঙ্গলবার রাত সাড়ে দশটার দিকে গাজীপুরের টঙ্গীতে ছিনতাইকারী সন্দেহে গণপিটুনিতে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে।

টঙ্গীর স্টেশন রোডের মা‌ছিমপুর এলাকার বালুর মা‌ঠের কাছে এক পথচারীর মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার সময় ওই যুবককে স্থানীয়রা ধরে ফেলে। পরে পুলিশ তাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে টঙ্গীর একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ জানিয়েছে।

এর বাইরে আরও কয়েকটি এলাকায় ছিনতাইয়ের সময় লোকজনের হাতে ছিনতাইকারী ধরা পড়া ও গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। ছিনতাই ঠেকাতে খিলগাঁও এলাকায় স্থানীয়দের পাহারা ও মাইকিংয়ের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ঘুরছে। মিরপুর ১১ তে ছিনতাই করার সময় ধরা পরেছে দুই ছিনতাইকারী, এমন ভিডিও দেখা গেছে।

গুজব বা জনমনে ক্ষোভ উদ্রেক করে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করার ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গুজব বা জনমনে ক্ষোভ উদ্রেক করে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করার ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। (ছবিটি প্রতীকি)

মাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ডঃ তৌহিদুল হক বলছেন, ঢাকাসহ সারাদেশে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই বেড়ে যাওয়ার কারণে মানুষ নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিচ্ছে, ফলে গণপিটুনির মতো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।

"গণপিটুনির মতো অবস্থা হলো কেন? আইন শৃঙ্খলা স্বাভাবিক করা যাচ্ছে না। ক্রমাগত অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় ও মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি হওয়ার কারণেই পুলিশের ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। এজন্য কাউকে ধরতে পারলে মানুষ নিজেরাই বিচার করার চেষ্টা করছে, যা মোটেও কাম্য হতে পারে না," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

প্রসঙ্গত, গত বছর পাঁচই অগাস্ট আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তীব্র আক্রমণ ও সমালোচনার মুখে পড়া পুলিশ বাহিনী এখনো কতটা কার্যকর হয়ে উঠতে পেরেছে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

যদিও মঙ্গলবার গভীর রাতে ঢাকা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চলমান বিশেষ কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে ব্রিফিংয়ে সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বলেছেন, একটা ঘটনা ভাইরাল হয়ে প্যানিক তৈরি হয়, তখন মনে হয় অনেক ঘটনা ঘটেছে।

"ছোটোখাটো অপরাধ বাড়ছে। বড় অপরাধগুলো উল্লেখযোগ্য কমেছে। পুলিশ সমস্যা এড্রেস করেছে। পরিস্থিতির উন্নতি হবে," বলেছেন আসিফ মাহমুদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডঃ তৌহিদুল হক বলছেন, দেশের বাস্তবতায় অনেক অপরাধী ধরা পড়লেও অনেক সময় ছাড়া পেয়ে যায়। আবার অপরাধী ধরে পুলিশের কাছে দিলেও কতটা বিচার হবে সেটা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরেই এদেশের সমাজ ব্যবস্থায় আস্থাহীনতা আছে।

"এসব কারণে নিজেদের হাতে আইন তুলে নেয়ার কিংবা লোকজন একত্রিত হয়ে নিজেরা বিচার করার বিষয়টিকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা হয় মূলত ক্ষোভ থেকে। সরকার বা পুলিশের উচিত হবে জনতাকে এই বার্তা দেয়া ও আশ্বস্ত করা যে অপরাধীদের পুলিশের হাতে দিলেই সত্যিকার অর্থেই তার বিচার হবে। একই সাথে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণও জরুরি," বলছিলেন তিনি।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করছেন অনেকে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করছেন অনেকে

কাউকে কেবল সন্দেহের বশে অপরাধী মনে করে তাৎক্ষণিক জনমত তৈরি করা এবং পরে গণপিটুনি দিয়ে হতাহত করা বাংলাদেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। অতীতে এরকম ঘটনায় অনেক নিরীহ ও সাধারণ মানুষের মৃত্যুর উদাহরণও রয়েছে।

দেশের প্রচলিত আইন ও তদন্ত ব্যবস্থায় গণপিটুনিতে শাস্তি নিশ্চিত করা বেশ কঠিন।

এ কারণে গণপিটুনিতে অংশ নেয়ার অপরাধে বাংলাদেশে কারো দণ্ড হওয়ার নজির বাংলাদেশের আদালতে বিরল বলে মনে করেন মানবাধিকার কর্মীরা।

গত বছর অগাস্টে সরকার পরিবর্তনের পর বেশ কিছু গণপিটুনির খবর গণমাধ্যমে এসেছিলো। এরপর সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত অন্তত একুশ জন গণপিটুনিতে নিহত হবার খবর এসেছিলো। তবে তখন পুলিশি ব্যবস্থা ছিলো কার্যত অচল ও অকার্যকর।

এরপর পুলিশি তৎপরতা বাড়ানোর চেষ্টা হলেও পুলিশ এখনো যথেষ্ট সক্রিয় নয় বলেই অনেকের কাছে মনে হচ্ছে। কেউ কেউ মনে করেন, বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশের অনেকেই গা বাঁচিয়ে চলতে চাইছে।

এসব কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক অপরাধমূলক ঘটনা নতুন করে সংকট তৈরি করেছে এবং এর সাথে আবারও গণপিটুনির মতো আইন হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

মঙ্গলবার রাতে ব্রিফিংয়ে ডিএমপি কমিশনার অবশ্য বলেছেন, পরিস্থিতি গত দু–তিন দিন খারাপ হলেও আগে ভালো ছিল। তার মতে এখন ছিনতাইয়ের ঘটনা মানুষ প্রতিহত না করে ভিডিও করছে। তিনি সবাইকে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছেন।