আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বিদেশি কোম্পানিতে ভুয়া আইটিকর্মী পাঠাচ্ছে উত্তর কোরিয়া, ভাগ বসাচ্ছে তাদের উপার্জনে
- Author, বেথ গডউইন, জুলি ইউনইয়ং লি
- Role, বিবিসি ট্রেন্ডিং ও বিবিসি নিউজ
অনলাইনে কাজের জন্য বিভিন্ন পশ্চিমা কোম্পানিতে শত শত আবেদন করেছেন জিন-সু (ছদ্মনাম) এবং বহু বছর ধরে পরিচয় গোপন করে এটা করে গেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। আর এটা ছিল মূলত উত্তর কোরিয়ার জন্য গোপনে অর্থ জোগাড় করার একটি বিশাল গোপন পরিকল্পনার অংশ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একসাথে একাধিক চাকরি করে মাসে কমপক্ষে পাঁচ হাজার ডলার আয় করতেন জিন-সু। তার কিছু সহকর্মী আরও বেশি টাকা আয় করতেন বলেও তিনি জানান।
পালিয়ে যাওয়ার আগে জিন-সু ছিলেন সেই হাজারো উত্তর কোরিয়ান নাগরিকের একজন, যাদের চীন, রাশিয়া, আফ্রিকা ও অন্যান্য দেশে পাঠানো হয়েছিল এই গোপন কাজের জন্য। এটা পরিচালিত হতো উত্তর কোরিয়ার গোপন গোয়েন্দা সংস্থার দ্বারা।
উত্তর কোরিয়ান আইটিকর্মীরা তাদের দেশের কঠোর নজরদারির মধ্যে থাকেন এবং তারা সাধারণত গণমাধ্যমে মুখ খোলেন না।
কিন্তু জিন-সু বিবিসিকে বিস্তারিতভাবে তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তার কথা থেকে আন্দাজ যায় এই প্রতারণামূলক কাজগুলো যারা করেন তাদের দৈনন্দিন জীবন কেমন এবং তারা কীভাবে কাজ চালাতেন।
জাতিসংঘ ও সাইবার নিরাপত্তা প্রতিবেদনে যেটা অনুমান করা হয়েছে, তার সঙ্গে জিন-সু'র বক্তব্যের মিল রয়েছে।
তিনি বলেন, তার আয়ের ৮৫ শতাংশই উত্তর কোরিয়ান সরকার নিয়ে নিতো।
অনেক বছর ধরেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে উত্তর কোরিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা খুব খারাপ।
"আমরা জানি এটা ডাকাতি, কিন্তু এটাকেই আমরা আমাদের নিয়তি হিসেবে মেনে নিই," বলেন জিন-সু।
"তবুও এটা উত্তর কোরিয়ার জীবনের চেয়ে অনেক ভালো," তিনি যুক্ত করেন।
২০২৪ সালের মার্চে প্রকাশিত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই গোপন আইটিকর্মীদের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া প্রতি বছর ২৫ কোটি থেকে ৬০ কোটি ডলার পর্যন্ত আয় করে।
কোভিড মহামারির সময়, যখন রিমোট কাজ বা ঘরে বসে কাজের চল আরও বেড়ে যায়, তখন এই পরিকল্পনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
তারপর থেকে এই ব্যবসা আরও বেড়েছে বলে সতর্ক করেছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
বেশিরভাগ কর্মীই নিয়মিত বেতন পাওয়ার উদ্দেশ্যে এই কাজ করে, তবে আয়ের একটা বড় অংশ তারা উত্তর কোরিয়ার সরকারকে দিয়ে দেয়।
তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা ডেটা চুরি করেছে বা কোম্পানি হ্যাক করে মুক্তিপণ দাবি করেছে।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্র একটি মামলায় ১৪ জন উত্তর কোরিয়ানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে, যারা ছদ্মবেশে কাজ করে ছয় বছরে আমেরিকান কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে প্রায় ৮৮ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে।
এই বছরের জুলাই মাসে আরও চারজন উত্তর কোরিয়ানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, যারা ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠানে রিমোট আইটি'র চাকরি পেয়েছিল।
চাকরি পাওয়ার পদ্ধতি
জিন-সু বেশ কয়েক বছর ধরে চীনে একজন আইটি কর্মী উত্তর কোরিয়ার গোপন প্রকল্পের অংশ হিসেবে কাজ করেছেন, পরে তিনি দেশত্যাগ করেন।
তিনি বিবিসিকে জানান, সাধারণত তিনি ও তার সহকর্মীরা বেশিরভাগ সময় ১০ জনের দল হিসেবে কাজ করতেন।
উত্তর কোরিয়ার ভেতরে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ বেশ সীমিত, কিন্তু বিদেশে এই আইটি কর্মীরা অনেক সহজে ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন।
তারা তাদের জাতীয়তা গোপন রেখে পশ্চিমা পরিচয় নিয়ে কাজ করতেন যেন বেশি বেতন পাওয়া যায়।
তেমনি উত্তর কোরিয়ার ওপর পারমাণবিক অস্ত্র এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কারণে যে কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তার কারণেও তারা পরিচয় গোপন করতেন।
এই পরিকল্পনাটি উত্তর কোরিয়ার হ্যাকিং কার্যক্রম থেকে আলাদা, যদিও সেইসব হ্যাকিং অপারেশনও সরকারের জন্য অর্থ উপার্জন করে।
এই বছরের শুরুতে ল্যাজারাস গ্রুপ নামে একটি কুখ্যাত হ্যাকিং গ্রুপ উত্তর কোরিয়ার জন্য কাজ করে বলে ধারণা করা হয়। তবে তারা কখনো তা স্বীকার করেনি।
তবে তাদের লক্ষ্য একটাই উত্তর কোরিয়ার অর্থের জোগান দেওয়া।
ল্যাজারাস গ্রুপ সম্প্রতি বাইবিট নামক ক্রিপ্টোকারেন্সি কোম্পানি থেকে দেড় বিলিয়ন ডলার চুরি করেছে বলে ধারণা করা হয়।
জিন-সু বলছেন, তিনি বেশিরভাগ সময় কাটাতেন ভুয়া পরিচয় সংগ্রহের কাজে।
প্রথমে তিনি নিজেকে চীনা পরিচয় দিয়ে হাঙ্গেরি, তুরস্কসহ নানা দেশের লোকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন, যেন তারা কিছু অর্থের বিনিময়ে তাদের পরিচয় ব্যবহার করতে দিতে রাজি হয়।
"যদি আপনি প্রোফাইলে 'এশিয়ান চেহারা' দেন, তাহলে কখনোই চাকরি পাবেন না।"
এভাবে ইউরোপীয়দের পরিচয় ব্যবহার করে তিনি আমেরিকা ও ইউরোপে চাকরির জন্য আবেদন করতেন।
জিন-সু জানান, যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের টার্গেট করে তিনি বেশ সফল হয়েছেন, সহজেই সাড়া পেয়েছেন।
"সামান্য কথাবার্তায়ই অনেক ব্রিটিশ মানুষ সহজে তাদের পরিচয় দিয়ে দিত," বলেন জিন-সু।
যেসব আইটি কর্মীর ইংরেজি ভালো, তারা মাঝে মাঝে চাকরির আবেদনের পুরো প্রক্রিয়া সামলান। তবে ফ্রিল্যান্সার সাইটে চাকরি পাওয়ার জন্য সবসময় মুখোমুখি সাক্ষাৎকার দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
আর প্রতিদিনের যোগাযোগ হয় স্ল্যাকের মতো প্ল্যাটফর্মে। এতে করে অন্য কারো ছদ্মবেশে কাজ করা অনেক সহজ হয়ে যায়।
জিন-সু বিবিসিকে বলেন, তিনি বেশিরভাগ সময় মার্কিন বাজারকে লক্ষ্য করতেন, "কারণ আমেরিকান কোম্পানিগুলোতে বেতন বেশি।"
তিনি দাবি করেন, এত বেশি আইটিকর্মী চাকরি পায় যে অনেক সময় কোম্পানিগুলো অজান্তেই একাধিক উত্তর কোরিয়ানকে নিয়োগ দিয়ে ফেলে।
তিনি বলেন, "এটা অনেকবার হয়।"
এই আইটি কর্মীরা তাদের আয় সংগ্রহ করে পশ্চিমা দেশ ও চীনে থাকা তাদের সহযোগী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে।
গত সপ্তাহে এক মার্কিন নারীকে আট বছরের বেশি সময়ের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, কারণ তিনি উত্তর কোরিয়ান আইটি কর্মীদের চাকরি পেতে সাহায্য করেছিলেন ও তাদের অর্থ পাঠিয়েছিলেন।
বিবিসি জিন-সু'র সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। তবে উত্তর কোরিয়ার মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা পিএসসিওআরই-এর মাধ্যমে পালিয়ে আসা আরেক আইটিকর্মীর কথা জানা যায়, যার অভিজ্ঞতার সাথে জিন-সুর অভিজ্ঞতার মিল রয়েছে।
বিবিসি কথা বলেছে হিউন-সিয়ং লি নামে আরেকজনের সঙ্গে। তিনিও পালিয়ে এসেছেন। তিনি আগে উত্তর কোরিয়ার হয়ে চীনে ব্যবসায়ী হিসেবে সফর করতেন এবং সেখানে উত্তর কোরিয়ার আইটি কর্মীদের সঙ্গে তার দেখা হয়।
তিনি নিশ্চিত করেছেন, তারাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছে।
ক্রমবর্ধমান সংকট
সাইবার সিকিউরিটি ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট খাতের একাধিক নিয়োগ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি, যারা জানিয়েছেন যে চাকরি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বহু প্রার্থীকে তাদের সন্দেহজনক মনে হয়েছে। তারা সম্ভবত উত্তর কোরিয়ার আইটি কর্মী ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যালি সিকিউরিটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা রব হেনলি সম্প্রতি তার প্রতিষ্ঠানে রিমোট চাকরির জন্য লোক নিয়োগ দিচ্ছিলেন।
তার ধারণা এ প্রক্রিয়ায় তিনি প্রায় ৩০ জন উত্তর কোরীয় আইটি কর্মীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন।
তিনি বলেন, "শুরুর দিকে মনে হচ্ছিল এটা যেন একটা খেলা, বুঝে নিতে চেষ্টা করছিলাম কে আসল আর কে নকল। কিন্তু খুব দ্রুতই সেটা বিরক্তিকর হয়ে উঠেছিল।"
শেষে তিনি প্রার্থীদের ভিডিও কলে বলতেন যেন তারা প্রমাণ করে যে তারা সত্যিই আমেরিকায় আছে, অর্থাৎ তাদের পেছনে যেন দিনের আলো দেখা যায়।
তিনি বলেন, "এই পদের জন্য আমরা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রার্থীদেরই নিয়োগ দিচ্ছিলাম। তাই তাদের আশেপাশে আলো থাকার কথা। কিন্তু আমি কখনো দিনের আলো দেখিনি।"
এ বছরের মার্চে, পোল্যান্ডের ভিডক সিকিউরিটি ল্যাব-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড মোচাদলো একটি ভিডিও শেয়ার করেন, যেটি একটি রিমোট চাকরির সাক্ষাৎকার ছিল।
যেখানে প্রার্থী সম্ভবত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সফটওয়্যার ব্যবহার করে নিজের মুখ লুকানোর চেষ্টা করছিলেন বলে মনে হচ্ছিল।
বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলার পর তার ধারণা, ওই প্রার্থী একজন উত্তর কোরীয় আইটি কর্মী হতে পারেন।
এই প্রতিবেদনের অভিযোগগুলো জানাতে আমরা লন্ডনে অবস্থিত উত্তর কোরিয়ার দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করেছি। তারা কোনো সাড়া দেয়নি।
এক বিরল পালানোর পথ
উত্তর কোরিয়া কয়েক দশক ধরে বিদেশে তাদের কর্মী পাঠাচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার জন্য। তাদের প্রায় এক লাখ মানুষ বিদেশে কারখানা বা রেস্তোরাঁর কর্মী হিসেবে কাজ করে।
বেশিরভাগই কাজ করে চীন ও রাশিয়ায়।
চীনে বেশ কয়েক বছর বসবাস করার পর জিন-সু বলেন যে সেখানকার নিপীড়নমূলক কাজের পরিবেশের কারণে তার মধ্যে এক ধরনের "বন্দিদশার অনুভূতি" তৈরি হয়েছিল।
"আমাদের বাইরে যেতে দেওয়া হত না এবং সারাক্ষণ ঘরে থাকতে হত" তিনি বলেন।
"আপনি ব্যায়াম করতে পারবেন না, আপনি যা চান তা করতে পারবেন না।"
তবে উত্তর কোরিয়ান আইটি কর্মীরা বিদেশে থাকাকালে কিছুটা বেশি স্বাধীনতা পায়, পশ্চিমা মিডিয়া দেখার স্বাধীনতা বেশি থাকে, জিন-সু বলেন।
আপনি বাস্তব জগৎ দেখতে পান। আমরা যখন বিদেশে থাকি, তখন আমরা বুঝতে পারি যে উত্তর কোরিয়ার ভেতরে কিছু একটা গলদ আছে।"
কিন্তু তা সত্ত্বেও, জিন-সু দাবি করেছেন যে খুব কম উত্তর কোরিয়ার আইটিকর্মীই তার মতো পালানোর কথা ভাবে।
"তারা কেবল টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়, খুব কম লোকই দেশত্যাগের কথা ভাবে।"
যদিও তারা যা রোজগার করে, তার সামান্য অংশই নিজেদের কাছে রাখতে পারে, তবুও সেটা উত্তর কোরিয়ার জন্য বড় অংকের টাকা।
তাছাড়া উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক ও কঠিন। চীনে নজরদারি এতটাই কড়া যে বেশিরভাগ ধরা পড়ে যায়।
যারা শেষ পর্যন্ত পালাতে পারে, তারা হয়তো আর কখনো পরিবারকে দেখতে পাবে না, আর তাদের তাদের আত্মীয়স্বজনদেরও শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে।
জিন-সু এখনো আইটি-তে কাজ করছেন, তবে এখন তিনি পালিয়ে এসে নতুন জীবনে কাটাচ্ছেন।
তিনি বলেন, উত্তর কোরিয়ার শাসকগোষ্ঠীর হয়ে কাজ করতে গিয়ে যে দক্ষতা তিনি অর্জন করেছেন, সেগুলো এখন তাকে নতুন জীবনে মানিয়ে নিতে সাহায্য করছে।
তিনি এখন আর ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে একসাথে অনেকগুলো কাজ করেন না, ফলে আগের চেয়ে আয় কমে গেছে।
কিন্তু যেহেতু এখন নিজের উপার্জন নিজের কাছে রাখতে পারেন, সব মিলিয়ে তার হাতে আগের চেয়ে বেশি টাকা থাকছে।
তিনি বলেন, "আমি আগে অবৈধ উপায়ে টাকা রোজগার করতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু এখন আমি পরিশ্রম করে ন্যায্যভাবে উপার্জন করি, যা আমার প্রাপ্য।"