শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল, বিচার প্রক্রিয়া এগোবে কীভাবে

শেখ হাসিনা

ছবির উৎস, Getty Images

    • Author, জান্নাতুল তানভী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দাখিলের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলো।

গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আট মাস পর এই প্রথম শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কোনো মামলার বিচারের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

তবে অভিযোগ গঠনের পরই আনুষ্ঠানিকভাবে এ মামলায় শেখ হাসিনার বিচার শুরু হবে।

আজ রোববার শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল করেছে প্রসিকিউশন।

পরে অভিযোগ আমলে নিয়ে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে ট্রাইব্যুনাল।

এ মামলায় আরেক অভিযুক্ত পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

আগামী ১৬ই জুন অভিযুক্তদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালীন একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার জন্য যে ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিলেন, সেই ট্রাইব্যুনালেই এখন এই বিচার হতে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ মামলার ১৩৪ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দাখিল করেন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম।

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো মামলার শুনানি সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম তার সূচনা বক্তব্যে বলেছেন, " এই বিচার কেবল অতীতের প্রতিশোধ নয়। এটি ভবিষ্যতের জন্য প্রতিজ্ঞা।"

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

ছবির উৎস, BBC/TANVEE

হত্যা, ষড়যন্ত্রের পাঁচ অভিযোগ

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

জুলাই - অগাস্টে ১৪০০ মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজার মানুষ আহত করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেছেন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম।

নিহতদের তালিকা ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেছে প্রসিকিউশন।

শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের আট হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট দাখিল করা হয়েছে।

এছাড়া অডিও, ভিডিও, গণমাধ্যমের প্রতিবেদনও দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। এ মামলায় ৮১ জন সাক্ষ্য দেবেন বলে ট্রাইব্যুনালকে জানিয়েছেন মি. ইসলাম।

এই তিনজনের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যার চেষ্টা, ষড়যন্ত্র, সহায়তা, প্ররোচনা, উস্কানি, সম্পৃক্ততার পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে।

মি. ইসলাম ট্রাইব্যুনালকে জানিয়েছেন, পাঁচ অভিযোগে সুনির্দিষ্টভাবে মোট ১৩ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

তিনি বলেন, গত বছরের ১৪ই জুলাই প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীদের রাজাকারের বাচ্চা, নাতি - পুতি বলে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন।

"এরই পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্ত আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ তৎকালীন সরকারের অন্যান্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্ররোচনা, সহায়তা ও সম্পৃক্ততায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও সশস্ত্র আওয়ামী সন্ত্রাসী কর্তৃক ব্যাপক মাত্রায় ও পদ্ধতিগতভাবে নিরীহ, নিরস্ত্র ছাত্র - জনতার উপর আক্রমনের অংশ হিসেবে হত্যা, হত্যার চেষ্টা, নির্যাতনে সহায়তা করেছে" এই বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে অভিযোগপত্রে।

এতে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে বলা হয়েছে, এটি আসামিদের জ্ঞাতসারে সংঘটিত অপরাধ।

শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাইদকে লক্ষ্য করে বিনা উস্কানিতে হত্যা, রাজধানীর চাঁনখার পুলে ছয়জনকে হত্যার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে।

এছাড়া সরকার পতনের দিন পাঁচই অগাস্ট আশুলিয়ায় পাঁচজনকে গুলি করে হত্যার পর তার মরদেহ এবং জীবিত একজনকেও আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম

' কেবল অতীতের প্রতিশোধ নয়, ভবিষ্যতের জন্য প্রতিজ্ঞা '

চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম তার সূচনা বক্তব্যে উল্লেখ করেন এই বিচার কেবল অতীতের প্রতিশোধ নয়। ভবিষ্যতের জন্য প্রতিজ্ঞা।

মানবতাবিরোধী অপরাধ সহ্য করা হবে না উল্লেখ করে মি. ইসলাম বলেন, " আমরা প্রমাণ করতে চাই একটি সভ্য সমাজ , যেখানে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন থাকবে - সেখানে গণহত্যা কিংবা মানবতা বিরোধী অপরাধ সহ্য করা হবে না।"

যে দেশে বিচার থাকবে সেখানে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না , কেউ আইনের উর্ধ্বে থাকবে না বলে জানান তিনি।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ অভ্যুত্থানকে ' মনসুন রেভুল্যুশন ' বা ' বর্ষা বিপ্লব ' নামে অভিহিত করেন মি. ইসলাম।

" দেড় দশক ধরে চলমান রাজনৈতিক নিপীড়ন,মানবাধিকার হরণ ও রাজনৈতিক উগ্রপন্থার মাধ্যমে সৃষ্ট গভীর সামাজিক বিভাজনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে " ওই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন মি. ইসলাম।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের যাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তাদের পরিবারের সদস্যদের কেউ কেউআজ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিলের শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন।

যখন চিফ প্রসিকিউটর সূচনা বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন এই ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া জামায়াতের নেতা মীর কাসেম আলীর ছেলে মীর আহমদ বিন কাসেম উপস্থিত ছিলেন।

যিনি আরমান নামে পরিচিতি, তিনি নিজেও একজন আইনজীবী। তিনি শেখ হাসিনার আমলে গুমের শিকার হয়েছিলেন। ২০১৬ সালের অগাস্টে তাকে বাড়ি থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

এছাড়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া জামায়াতের সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে আইনজীবী নাজিব মোমেনও ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিচার কার্যক্রম দেখতে ট্রাইব্যুনালে আরও অনেক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।

আদালতে উপস্থিত আইনজীবীদের বেশিরভাগই ছিলেন জামায়াত ও বিএনপি সমর্থিত আইনজীবী।

এছাড়াও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের শুনানি দেখতে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারাও এদিন উপস্থিত ছিলেন।

ট্রাইব্যুনালে শুনানিতে তাজুল ইসলাম বলেন, " আমরা বলেছি এ বিচার হবে আবেগশূন্য, তথ্যনির্ভর, প্রমাননির্ভর, নিরপেক্ষ ও ন্যায়বিচার। এটি নিশ্চিত করার জন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করি। বিচারের মাধ্যমে একটা সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়।"

প্রসঙ্গত, পাঁচই অগাস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিউশন, তদন্ত দলসহ সার্বিকভাবে পরিবর্তন আনা হয়। এই প্রসিকিউশনের অনেকে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে জামায়াত নেতাদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনাও রয়েছে।

যদিও এখনকার বিচার অতীতের প্রতিশোধ নয় বলে বলে আসছেন চিফ প্রসিউটর তাজুল ইসলাম।

আজ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিলের শুনানিতেও সেই বক্তব্য তুলে ধরেছেন তিনি।