ম্যাথিউজের টাইমড আউট বিতর্কে যেভাবে রিঅ্যাক্ট করছে শ্রীলঙ্কা

আউট ঘোষিত হওয়ার পর হতাশ ম্যাথিউজ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আউট ঘোষিত হওয়ার পর হতাশ ম্যাথিউজ
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি

দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে শ্রীলঙ্কার ব্যাটার অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউজের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ দলের বিতর্কিত আপিল আর তার টাইমড আউট হওয়ার পর চব্বিশ ঘণ্টারও বেশি কেটে গেছে – কিন্তু তা নিয়ে তর্কবিতর্ক যেন কিছুতেই থামছে না।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দুনিয়ায় তো বটেই – এই ইস্যুটি নিয়ে যেমন বাংলাদেশে তুমুল চর্চা হচ্ছে, তেমনি বিতর্কে মেতেছেন শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট অনুরাগীরাও।

তবে লক্ষ্যণীয় হল, ম্যাথিউজ যেমন নিজের দেশে অনেকের সমর্থন পাচ্ছেন – তেমনি ওই দ্বীপরাষ্ট্রের বাসিন্দারা অনেকে কিন্তু তার সমালোচনা করতেও ছাড়ছেন না।

একজন পেশাদার ক্রিকেটার বিশ্বকাপে মাঠে নামার আগে নিজের হেলমেট পরীক্ষা করে নেবেন না – এটাকে একটা ক্ষমার অযোগ্য ভুল বলেই মতামত দিচ্ছেন তাদের কেউ কেউ।

তবে বিবিসি সিনহলা বিভাগের সম্পাদক ইশারা দানাশেখারা মনে করছেন, “সোশ্যাল মিডিয়াতে যদি কমেন্টের বহর দেখি, তাহলে কিন্তু বলতে হবে বেশির ভাগ শ্রীলঙ্কান বাংলাদেশ টিম আর সাকিব আল হাসানকে গালিগালাজে ধুইয়ে দিচ্ছেন!”

বিবিসি সিনহলার ফেসবুক পেজেও অনেকেই সাকিব ও বাংলাদেশকে ‘থার্ড ক্লাস’ ক্রিকেটার ও ‘থার্ড ক্লাস’ টিম বলেও অভিহিত করেছেন।

তবে এটাও ঠিক, কেউ কেউ সাকিবের ‘উপস্থিত বুদ্ধি’রও দারুণ তারিফ করেছেন।

সম্পর্কিত খবর :
সে সময় সাকিব ও আম্পায়ারের কথোপকথন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সে সময় সাকিব ও আম্পায়ারের কথোপকথন

আর একটা বিষয় হল, শ্রীলঙ্কার প্রথম সারির খবরের কাগজগুলো অনেকেই কিন্তু এই ইস্যুতে একটা ‘ব্যালান্সড’ বা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে।

‘দ্য আইল্যান্ড’ বা ‘ডেইলি এফটি’-র (ফিনান্সিয়াল টাইমস) মতো একাধিক পত্রিকা এটাও বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা এই ইস্যুতে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দলের অবস্থানকে মোটেই চোখ বন্ধ করে সমর্থন করছে না।

দিল্লির ম্যাচে হারার পর শ্রীলঙ্কা টিম যেভাবে বাংলাদেশ ক্রিকেটারদের সঙ্গে হাত না-মিলিয়েই মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে গেছে, তারও তীব্র সমালোচনা করেছে বেশ কিছু পত্রিকা।

ফেসবুকে কমেন্টের ঝড়

সোমবার দিল্লিতে সেই বিতর্কিত ডিসমিস্যালের পর গত রাতে অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউজ ও সাকিব আল হাসানের ম্যাচ-পরবর্তী প্রেস কনফারেন্স থেকে এদিন দুটি ভিডিও ক্লিপ পোস্ট করা হয়েছিল বিবিসি সিনহলার ফেসবুক পেজে।

তার একটিতে ম্যাথিউজ বলেছিলেন কেন তিনি মনে করছেন তার সঙ্গে অবিচার করা হয়েছে এবং কেন বাংলাদেশ টিমকে তারা সম্মান দেখাতে পারছেন না। অন্যটিতে সাকিব নিজেদের আপিল করার সিদ্ধান্তকে ডিফেন্ড করেছিলেন।

এই দুটি ভিডিওতেই মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে শত শত মানুষ নানা ধরনের মন্তব্য করেছেন – যা থেকে বোঝা যায় এই ইস্যুটি শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট সমর্থকদের আবেগে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে এবং এই প্রশ্নে সে দেশের জনমতও কিন্তু দ্বিধাবিভক্ত!

জনৈক থুসারা দিসানায়েকে অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউজের উদ্দেশে বলেছেন, “প্রস্তুতি কোথায় ছিল? এটা তো আপনারই দোষ!”

বিবিসি সিনহলার পেজে মতামত

ছবির উৎস, BBC SINHALA

ছবির ক্যাপশান, বিবিসি সিনহলার পেজে মতামত

“ম্যাচের আগে একজন ব্যাটার নিজের হেলমেট পরীক্ষা করে নেবেন না? আসলে আমাদের ক্রিকেটাররাই এরকম দায়িত্বজ্ঞানহীন!”

নিশান্তা এপা নামে আর একজন লিখেছেন, বিশ্বকাপের মঞ্চে হেলমেট বিগড়ে যাওয়াটা আসলে ‘জোক’ ছাড়া আর কিছুই নয়।

তার মতে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দল দেশের করদাতাদের ও আইসিসির অর্থ বরবাদ করছে, তার সঙ্গে দলের মধ্যে ‘দুর্ব্যবহারে’র অভ্যাসও ছেয়ে গেছে।

তবে শ্রীলঙ্কাতে এই মতের অনুসারীরা অবশ্যই সংখ্যালঘু, কারণ বেশির ভাগ লোকই কিন্তু এই বিতর্কে দলের পাশেই আছেন।

ফেসবুকে অজস্র ক্রিকেট ভক্ত যেমন বাংলাদেশকে ‘তৃতীয় শ্রেণীর’ ক্রিকেট দল বলে আক্রমণ করছেন, কেউ কেউ সাকিবকে বর্ণনা করেছেন ‘থার্ড ক্লাস বাঙালি লেজেন্ড’ হিসেবে।

বহু লোক আবার সাকিব ও বাংলাদেশ দলকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন ‘শেইম অন ইউ’ (ধিক)!

সুজন লাকসিনা নামে একজন ক্রিকেট ভক্ত মন্তব্য করেছেন, “অস্ট্রেলিয়ার ফিল হিউজেস ক্রিকেট মাঠে মারা যাওয়ার পর থেকে যে কোনও ‘নিয়ম’ বা ‘আইনে’র চেয়ে একজন ব্যাটারের সুরক্ষাকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার।”

ফেসবুকে বিবিসি সিনহলার পোস্ট

ছবির উৎস, BBC SINHALA

ছবির ক্যাপশান, ফেসবুকে বিবিসি সিনহলার পোস্ট

অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন, ম্যাথিউজকে আউট না-ঘোষণা করে তাকে হেলমেট ঠিক করার জন্য বাড়তি সময় দেওয়া উচিত ছিল।

পত্রিকাগুলো যা বলছে

শ্রীলঙ্কার জনপ্রিয় ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য আইল্যান্ড’ কিন্তু এই বিতর্কে মোটেই দেশের ক্রিকেট দলের পাশে দাঁড়ায়নি।

দিল্লি থেকে তাদের ক্রীড়া সাংবাদিক রেক্স ক্লেমেন্টাইন তার ম্যাচ রিপোর্টে এই বিতর্ককে মোটেই গুরুত্ব দেননি – বরং তিনি লিখেছেন ‘ঢিলেঢালা ক্রিকেট খেলে শ্রীলঙ্কা দল নিজেরাই নিজেদের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে।’

টাইমড আউট বিতর্কের জেরে ক্ষুব্ধ শ্রীলঙ্কা দল ম্যাচ হারার পর প্রতিপক্ষের সঙ্গে সৌজন্যমূলক করমর্দন পর্যন্ত করেনি।

সেই প্রসঙ্গের অবতারণা করে রেক্স ক্লেমেন্টাইন মন্তব্য করেছেন, “ক্যাপ্টেন কুশল মেন্ডিস আসলে এর মাধ্যমে নিজেকে সার্কাসের ক্লাউন বানিয়ে ছেড়েছেন।”

এই ধরনের নেতা দলের দায়িত্বে থাকলে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের জন্য সামনে আরও অনেক খারাপ দিন অপেক্ষা করছে, এই হুঁশিয়ারিও শুনিয়ে রেখেছেন তিনি।

‘ডেইলি মিররে’র ক্রিকেট সাংবাদিক চন্ডিকা ফার্নান্ডো দিল্লি ডেটলাইনে লেখা তার প্রতিবেদনে আবার লিখেছেন, “বাংলাদেশের ৩ উইকেটে জয়কে ছাপিয়ে গেছে টাইমড আউট বিতর্ক!”

Skip X post
X কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: বিবিসির নয় এমন ওয়েবসাইটের কনটেন্টের জন্য বিবিসি দায়ী না

End of X post

চন্ডিকা ফার্নাান্ডো অবশ্য প্রতিবেদনে এটাও উল্লেখ করেছেন, “নির্ধারিত ২ মিনিটের সময়সীমার ভেতরেই” অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউজ ক্রিজে গিয়ে গার্ড নিয়েছিলেন – কিন্তু তারপর তার হেলমেটের চিন স্ট্র্যাপ লুজ হয়ে যাওয়াতেই বিপত্তির সূত্রপাত।

অর্থাৎ ডেইলি মিরর কিন্তু এখানে ম্যাথিউজের বক্তব্যকেই প্রকারান্তরে সমর্থন জানিয়েছে।

আর একটি জনপ্রিয় দৈনিক ‘ডেইলি এফটি’-র প্রতিবেদক আবার মন্তব্য করেছেন, “কেউ কেউ হয়তো যুক্তি দেবেন ক্রিকেট খেলার স্পিরিটের স্বার্থে সাকিব তার আপিল তুলে নিলেও পারতেন।”

“কিন্তু মনে রাখতে হবে তিনি যা করেছেন নিজের এক্তিয়ার ও উপস্থিত বুদ্ধির সীমার মধ্যেই করেছেন – একজন বিপজ্জনক ব্যাটারকে শূন্য রানে আউট করতে খেলার নিয়মটাকে ব্যবহার করেছেন!”

তবে এটাও ঠিক শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট বোর্ড এই মুহুর্তে যে সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে সে খবরই তাদের সংবাদপত্রগুলোতে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে – সেই তুলনায় টাইমড আউট বিতর্ক যেন এই মুহুর্তে কিছুটা আড়ালেই।

শোধ নেবে ‘কর্মা’?

শ্রীলঙ্কাতে বহু লোক মনে করছেন, এই ঘটনায় যদি কেউ অন্যায় করে থাকে তাহলে ‘কর্মা’ই ঠিক সময়ে তার শোধ নেবে।

বাংলায় যেটাকে ‘কর্মফল’ বলা হয়, মোটামুটিভাবে সেটাই ইংরেজিতে ‘কর্মা’ নামে পরিচিত।

বিবিসি সিনহলা বিভাগের সম্পাদক ইশারা দানাশেখারা বলছিলেন, “আমাদের দেশে বেশির ভাগ মানুষ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণেই হয়তো তারা ‘কর্মা’-র জীবনদর্শনে আস্থা রাখেন।”

“মানে কেউ যদি কোনও পাপ করে থাকে, তাহলে ঠিক সময়ে সে তার শাস্তি পেয়েই যাবে – এটা তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন।”

শ্রীলঙ্কার ডেইলি নিউজ পত্রিকার অনলাইন প্রচ্ছদ, মঙ্গলবার বিকেলে

ছবির উৎস, Daily News SRI LANKA

ছবির ক্যাপশান, শ্রীলঙ্কার ডেইলি নিউজ পত্রিকার অনলাইন প্রচ্ছদ, মঙ্গলবার বিকেলে
বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন :
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বস্তুত অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউজকে টাইমড আউট করার পর দিনই সাকিব নিজে যেভাবে ইনজুরির কারণে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছেন, সেটাকে অনেক শ্রীলঙ্কান এই ‘কর্মা’-র আলোকেই দেখতে চাইছেন।

শ্রীলঙ্কার ‘ডেইলি নিউজ’ পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে-র প্রচ্ছদে মঙ্গলবার বিকেলে প্রধান খবর ছিল “বিশ্বকাপে আর খেলা হচ্ছে না সাকিবের!”

কেন একটি দেশের একটি জাতীয় পর্যায়ের পত্রিকা তাদের ‘লিড’ করছে ভিন দেশের একজন ক্রিকেটার বিশ্বকাপের একটি গুরুত্বহীন ম্যাচ খেলতে পারবেন না সেই খবর দিয়ে – তার কারণটা অনুমান করা মোটেই কঠিন নয়।

চব্বিশ ঘণ্টা না পেরোতেই সাকিব তার অন্যায়ের ‘শাস্তি’ পেয়ে গেছেন – শ্রীলঙ্কার সোশ্যাল মিডিয়াতে অনেকে তা খোলাখুলিই বলছেন।

তবে এখানে কর্মফলের ভূমিকা থাক বা না-থাক, এই টাইমড আউট বিতর্ক যে বাংলাদেশের সঙ্গে আরও একটি প্রতিবেশী দেশের তিক্ত ক্রিকেট সম্পর্কের জন্ম দিল, তাতে কোনও সংশয় নেই।

ইশারা দানাশেখারার কথায়, “বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত বা পাকিস্তানের ক্রিকেট ম্যাচে এক ধরনের উত্তেজনা বা তিক্ততা দেখা গেলেও শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ ম্যাচগুলো কিন্তু একটা চমৎকার বন্ধুত্বের আবহেই এতদিন হয়ে এসেছে।”

“৬ নভেম্বর, সোমবার বিকেলের পর সেই চ্যাপ্টার চিরতরে শেষ হয়ে গেল, এটা আপনি নিশ্চিন্তে ধরে নিতে পারেন!”