জাতীয় পার্টিতে বহিষ্কার নাটকের মধ্যেই জিএম কাদেরকে বিরোধী দলীয় নেতা করে প্রজ্ঞাপন

বাংলাদেশে জাতীয় পার্টিতে বহিষ্কার-পাল্টা বহিষ্কার নিয়ে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই রোববার দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে বিরোধী দলীয় নেতা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে জারি হওয়া প্রজ্ঞাপনে রংপুর থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া মি. কাদেরকে বিরোধী দলের নেতা এবং চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে বিরোধীদলের উপনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
এর আগে সংসদে এবার বিরোধী দল কারা হবে তা নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ছিল।
এর আগে রোববার দিনভর দলটিতে চলেছে বহিষ্কার ও পাল্টা বহিষ্কার নিয়ে উত্তেজনা। দলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ রোববার চেয়ারম্যান জিএম কাদের এবং মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন।
এর আগে দলটির দুইজন প্রেসিডিয়াম সদস্যকে অব্যাহতি দিয়েছিলো জিএম কাদেরের কমিটি।
রোববার দুপুরে গুলশানের বাসায় রওশন এরশাদ এক মতবিনিময় সভায় নিজেকে অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন।

সেই সাথে পরবর্তী জাতীয় সম্মেলন না হওয়া পর্যন্ত তিনি কাজী মো. মামুনুর রশিদকে মহাসচিবের দায়িত্ব দিয়েছেন।
এদিকে, দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, “যারা মিটিং করছেন, আমাদেরকে দল থেকে অব্যাহতির কথা বলছেন - তারা দলের কেউ না। তাদের সিদ্ধান্তের কথা আমাদের কানে নেওয়ার কিছু নাই।”
রওশন এরশাদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
রোববারদুপুরে দলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, দলের গঠনতন্ত্রের ২০(১) ধারায় চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, "দলের অন্যান্য পদ-পদবী স্ব স্ব অবস্থায় বহাল থাকবে। যাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বা বহিষ্কার করা হয়েছে তাদের আগের পদে পুনর্বহাল করা হবে।"
"দ্বাদশ নির্বাচনের আগে পার্টির চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের বক্তব্য এবং পরবর্তী সময়ে তাদের ভূমিকা পার্টিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।"
রওশন এরশাদ এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলেছেন, ২৬ টি আসন সমঝোতার পর বাকি আসনের প্রার্থীদের রাজনৈতিকভাবে জনগণের বিরূপ সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
চেয়ারম্যান ও মহাসচিব তাদের কোনও খোঁজখবর না নেয়ার ফলে ভোটের মাঠে পার্টি চরমভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছেন।
"নির্বাচনে ভরাডুবির পর নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ করায় তাদের ক্রমাগত বহিষ্কার ও অব্যাহতির মাধ্যমে দলের অস্তিত্ব নষ্ট করা হয়েছে" বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলেছেন মিজ এরশাদ।
গত ২২ জানুয়ারি দলের চেয়ারম্যান ও মহাসচিবকে সকল বহিষ্কার ও অব্যাহতির আদেশ বাতিল করে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পার্টি গঠনের আহবান করলেও তারা আমলে নেয়নি বলে বিজ্ঞপ্তিতে অভিযোগ করেন তিনি।

ছবির উৎস, JATIYA PARTY
ফলে ঢাকা মহানগর উত্তরের ৬৬৮ জন নেতা-কর্মীর পার্টি থেকে স্বেচ্ছা পদত্যাগ দলে বিরাট সংকট সৃষ্ট করেছে বলে রওশন এরশাদ এই বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেন।
এরই ধারাবাহিকতায় দলের চেয়ারম্যান ও মহাসচিবকে বর্তমান পদ থেকে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছেন মিজ এরশাদ।
একই সাথে নিজেকে দলটির চেয়ারম্যান ঘোষণা করে রওশন এরশাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, পরবর্তী জাতীয় সম্মেলন না হওয়া পর্যন্ত কাজী মো. মামুনুর রশিদ মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।
জাতীয় পার্টিতে এখন একটি 'ক্রান্তিকাল' বিরাজ করছে উল্লেখ করে শিগগিরই জাতীয় সম্মেলন আহবান করা হবে বলে জানান রওশন এরশাদ।
এর আগে দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের কমিটি দুইজন প্রেসিডিয়াম সদস্যকে বহিষ্কার করেছিল। এদের একজন সুনীল শুভ রায়।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “জি এম কাদের ও মুজিবুল হক চুন্নুকে দল থেকে বহিষ্কার নয়, পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। প্রধান পৃষ্ঠপোষক গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তার ক্ষমতাবলে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন”।
নেতা-কর্মীদের অনুরোধ ও দাবির প্রেক্ষিতেই রওশন এরশাদ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন মি. রায়।
তিনি বলেন, “সব সময় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী হয় না। প্রধান পৃষ্ঠপোষক দলে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।"
"আবার সর্ব স্তরের দলীয় নেতাকর্মীরাই তো গঠনতন্ত্র। ফলে তাদের দাবি ও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী রওশন এরশাদ নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন।"
যা বলছেন মুজিবুল হক চুন্নু
এদিকে ওই ঘোষণার পরপরই দুপুরে বনানীতে দলীয় চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে মুজিবুল হক চুন্নু এক সংবাদ সম্মেলন করেন।
সেখানে তিনি বলেন, “আমাদের গঠনতন্ত্রে এমন কোনও ক্লজ নাই যে পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক চেয়ারম্যান, মহাসচিবকে বাদ দিবেন। উনি যে বাদ দিয়েছেন এই নিয়ে তৃতীয়বার তিনি বাদ দিয়েছেন।”
মি. হক বলেন, “উনি বাদ দিয়েছেন আমরা এটা আমলে নিচ্ছি না। গঠনতন্ত্রের বাইরে মনের মাধুরী মিশিয়ে যে কোনও ব্যক্তি যে কোনও কথা বলতেই পারেন। তাদের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে আমাদের কোন প্রতিক্রিয়া নাই।”
রওশন এরশাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “বেগম রওশন এরশাদ প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের স্ত্রী। সেই শ্রদ্ধা থেকে তাকে প্রধান পৃষ্ঠপোষক করি।”
“এটা একটা আলংকারিক পদ। তার দলীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনও ক্ষমতা নাই। কাজেই অলংকারিক পদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয়ার প্রয়োজন আছে মনে করি না।"
দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় রওশন এরশাদের ঘোষিত কমিটি ব্যবহার করবে কি না এমন প্রশ্নে মি. হক বলেন, “তাদের এ ধরনের কিছু বলার বা করার রাইট নাই। দূর থেকে কেউ হুমকি দিল তা নিয়ে ভাবার কিছু নাই। যখন যা হবে, তখন সিদ্ধান্ত নেবো।"

ছবির উৎস, জাতীয় পার্টি ইউটিউব
জাতীয় পার্টিতে যা চলছে
মূলত ২০১৯ সালে জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর দলটির নেতৃত্ব নেন তার ভাই জি এম কাদের । সে সময় থেকেই রওশন এরশাদ ও তার মধ্যকার বিরোধ তীব্র সংকটে রূপ নেয়।
নির্বাচনের আগে থেকেই জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ চরম রূপ ধারণ করে।
নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে জাতীয় পার্টি ২৮৭টি আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দিলেও ২২০টি আসনেই পরে প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।
২৬টি আসনে সমঝোতা হলেও মাত্র ১১টি আসনে দলটি জিততে পেরেছে। প্রার্থীদের ৯০ শতাংশেরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
ফলে নির্বাচনে ভরাডুবির কারণ হিসেবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অযোগ্যতাকে চিহ্নিত করে সারা দেশের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ করে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পদত্যাগের আল্টিমেটাম দেওয়া হয় সে সময়।
যার ধারাবাহিকতায় দলটির দুইজন প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ ও সুনীল শুভ রায়কে বহিষ্কার করে চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের কমিটি।
এছাড়া কেন্দ্রীয় আরো কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়। বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় ঢাকা মহানগর উত্তরের কমিটি।
এরপর আবার ২৫ জানুয়ারি, দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুর কমিটি যাদের বহিষ্কার করেছেন, তারা গণ-পদত্যাগ করেন।
ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বহিষ্কৃতদের নেতৃত্বে ঢাকা মহানগর উত্তরের আটটি থানার ৬৬৮ জন নেতা-কর্মী পদত্যাগের কাগজে স্বাক্ষর করেন।
ওই সংবাদ সম্মেলনেই রওশন এরশাদের নেতৃত্বে দলটিকে আবার সংগঠিত করার ঘোষণা দেয় নেতাকর্মীরা।
জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের অবর্তমানে এবারই প্রথম দলীয় চেয়ারম্যান হিসেবে জি এম কাদেরের নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল দলটি।
এর আগে, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক দল হিসেবে ২৭টি আসনে জয় পেয়েছিল জাতীয় পার্টি।
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে জেনারেল এরশাদ প্রাথমিকভাবে অংশ গ্রহণ করতে না চাইলেও শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টিকে আওয়ামী লীগের সাথে থাকতে হয়েছিল।
এরপর সমঝোতার মাধ্যমে ২০১৪ সালে ২৯টি এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে ২২টি আসনে জয়লাভ করে দলটি।
সে সময় দলটির নেতাদের অনেকের কথায় সেই সমঝোতা নিয়ে অস্বস্তি চাপা থাকেনি। তখন দলটিকে ঘিরে নানা ধরনের তৎপরতাও দেখা গিয়েছিল রাজনৈতিক অঙ্গনে।











