দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী যেভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন

দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০১০ সালে গ্রেপ্তারের পর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী

মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ও জামায়াতের নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১৪ই অগাস্ট সোমবার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

ঢাকায় শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয় বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

সাবেক সংসদ সদস্য দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আমৃত্যু কারাগারে দণ্ডিত ছিলেন। ২০১০ সালে গ্রেপ্তারের পর থেকেই কারাগারে ছিলেন মি. সাঈদী।

জামায়াতে ইসলামীর হয়ে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। তবে এর আগে থেকেই ধর্মীয় বক্তা হিসেবে তার বেশ পরিচিতি ছিল।

আরো পড়তে পারেন

দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর দেশজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠা নিয়ে ২০১৩ সালে বিবিসি বাংলার মোয়োজ্জেম হোসেন কথা বলেছিলেন মি. সাঈদীর গ্রাম এবং পরিবারের মানুষদের সাথে। সেখানে মি. সাঈদীর জীবন নিয়ে নানা তথ্য উঠে আসে।

সাইদখালির শিকদার থেকে সাঈদী

দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আদালতে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী

জিয়ানগরের সাঈদখালি গ্রাম আগে পরিচিত ছিল সাউদখালি নামে। এখনো অনেকে আগের নামেই চেনেন।

তবে সাউদখালির নামের রূপান্তর ঘটেছে এই গ্রামেরই এক বিখ্যাত এবং বিতর্কিত মানুষ দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ঘিরে।

২০১২ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দিলে, পুরো বাংলাদেশ অশান্ত হয়ে উঠেছিল। আপিলের পর সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করেছে।

এই গ্রামেই ১৯৪০ সালে জন্ম নেন জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় জিয়ানগরে ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

সেই সঙ্গে বিতর্ক চলছে দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীকে ঘিরে, যিনি ধর্মীয় জলসার জনপ্রিয় বক্তা থেকে এখন পরিণত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর এক গুরুত্বপূর্ণ নেতায়।

২০১৩ সালে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পর রাজশাহীতে পুলিশের সাথে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের সংঘর্ষ।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০১৩ সালে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পর রাজশাহীতে পুলিশের সাথে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের সংঘর্ষ
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় অবশ্য নিজ গ্রামেরও খুব কম মানুষই তাকে চিনতেন।

সাঈদখালির মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জন্মের পর তিনি এলাকায় পরিচিত ছিলেন দেলোয়ার শিকদার নামে।

বালিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের যে ওয়ার্ডটির অধীনে সাঈদখালি গ্রাম, সেই ওয়ার্ডের একজন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হারুণুর রশীদ বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এই তথ্য তিনি নিশ্চিত করেন।

“ওনাকে সবাই দেলোয়ার শিকদার নামে চিনতো। স্বাধীনতার সময় তো আমার বয়স খুব কম ছিল। এ বিষয়ে আমি বলতে পারবো না। তবে আমি শুনছি এইটা। ওনার বংশ শিকদার বংশ। ওনার নাম কিভাবে সাঈদী হলো সেটা বলতে পারবো না। হয়তো সাউদখালি নাম থেকেই উনি নিজের নাম করেছেন সাঈদী,” জানান তিনি।

দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পরিবারের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হচ্ছেন, শিকদার কখনো তাদের পারিবারিক উপাধি ছিল না। তাঁর ছেলে মাসুদ সাঈদী বিবিসিকে বলেন, সাঈদী তাঁদের পারিবারিক উপাধি।

স্থানীয় সাংবাদিক নাসিরউদ্দীন বলছেন, সাউদখালি গ্রামকে এখন সাঈদখালি বলা হচ্ছে, সাঈদীর নামের সঙ্গে মিলিয়ে।

বালিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মশিউর রহমান বলছেন, দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর বাবা ছিলেন গ্রামের খুব সাধারণ এক গৃহস্থ।

“ওনার বাবা একজন সাধারণ মানুষ ছিল। গ্রামে জমি-জিরাত ছিল। তাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা যদিও অনেক তত নামকরা কোন পরিবার ছিল না।”

পরিবারের কাছে থেকে পাওয়া জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী পড়াশোনা করেছেন গ্রামের মক্তবে, এরপর শর্ষিনার পীর পরিচালিত আলীয় মাদ্রাসা, বারুইপাড়া সিদ্দীকিয়া মাদ্রাসা এবং খুলনা আলীয়া মাদ্রাসায়।

স্থানীয় সাংবাদিক নাসিরউদ্দীন জানান, পড়াশোনা শেষে তিনি গ্রামের কাছে এক বাজারে কিছুদিন ব্যবসা করেছেন বলেই তারা জানেন।

“উনি মূলত এর আগে পারের হাটে ব্যবসা করতেন ভায়রা ভাইয়ের সাথে মিলে। মুদি দোকানের ব্যবসা ছিল। তখন কিন্তু তিনি এত নামকরা লোক ছিলেন না। সাধাসিদে জীবন-যাপন করতেন। কিন্তু আশির দশকে উনি ওয়াজ নসিহত করা শুরু করেন। পরে আস্তে আস্তে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। এখান থেকেই উনার নাম ছড়িয়ে পড়ে।”

তবে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী বলেন, এই তথ্য সঠিক নয়, তিনি পারের হাটে কখনো ব্যবসা করেননি, ব্যবসা করেছেন খুলনায়।

“বেসিক্যালি তিনি একজন লেখক। ছাত্র জীবনের পর থেকেই তিনি লেখালেখি শুরু করেন। তিনি ব্যবসা মূলত শুরু করেন স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বে যখন খুলনা-যশোরে বসবাস করতেন তখন। এরপর তিনি লেখালেখি করেছেন স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে। আর কোরানের দাওয়াত দেয়াটা ছিল তার মিশন।”

 সাঈদী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পার্বত্য শান্তিচুক্তি বিরোধী একটি মিছিলে তৎকালীন বিরোধী দলে থাকা মি. সাঈদী

দেশজোড়া পরিচিতি

বাংলাদেশের মানুষের কাছে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী পরিচিতি পান মূলত আশির দশকের শুরু থেকে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় তখন তিনি ‘ওয়াজ মাহফিল’ নামে পরিচিত ধর্মীয় সমাবেশ গুলোতে একজন বক্তা হিসেবে হাজির হতে শুরু করেন।

পিরোজপুরের বালিপড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মশিউর রহমান জানান, ১৯৮০ সালে তিনি প্রথম দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে দেখেন তাদের এলাকার এক ওয়াজ মাহফিলে।

“ওনারে আমি প্রথম দেখি ১৯৮০ সালে। আমাদের এলাকায় মাহফিল করছিল, তখন। আমাদের এলাকায় মাহফিল আগে করছে কিনা আমি জানিনা। তবে আমি প্রথম দেখছি ১৯৮০ সালে।”

দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী বলেন, ওয়াজ মাহফিল করেই তাঁর বাবা দেশজোড়া পরিচিতি পান।

“এটা সত্য যে তিনি তখন অত্যন্ত সাধারণ একজন মানুষ ছিলেন, এত পরিচিতি তখন তার ছিল না। তখন তিনি দেশের বিভিন্ন জায়গায় কোরানের মাহফিল করে বেড়াতেন। ১৯৭২ সালে তিনি পিরোজপুরে প্রথম মাহফিল করেন। তারপর একের পর এক দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাহফিল করতে থাকেন। চট্টগ্রামে যে তাফসীর মাহফিল হয়, সেটা তিনি শুরু করেন ৩৮ বছর আগে। গত ৩৮ বছর ধরে এটি টানা চলছে।”

আশির দশকের শুরু থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী একজন সুবক্তা হিসেবে খুব দ্রুত পরিচিতি অর্জন করেন। তার ধর্মীয় সমাবেশগুলোতে জনসমাগমও বাড়তে থাকে।

কিন্তু একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের মানুষের একটি বিরাট অংশের কাছে বিতর্কিত হয়ে পড়েন তার নানা রাজনৈতিক মন্তব্য এবং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রকাশ হয়ে যাওয়ার পর।

ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ছদ্মাবরণে জামায়াতে ইসলামী এবং এর ছাত্র সংগঠনের পক্ষে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচার করছেন বলে অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে।

জেলখানার সামনে অ্যাম্বুলেন্স

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, যুদ্ধাপরাধের বিচারে জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতার মৃত্যুদন্ড হয় (ফাইল ফটো)

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ

দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর জীবনের যে অধ্যায়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক, সেটি মূলত ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং তার পরবর্তী কয়েক বছর।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে মোট বিশটি অভিযোগ আনা হয়। এসব অভিযোগের মধ্যে ছিল ১৯৭১ এ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পিরোজপুরে হত্যা, হত্যায় সহযোগিতা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ এবং ধর্মান্তরে বাধ্য করা।

অভিযোগে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর তিনি আধা মিলিশিয়া রাজাকার বাহিনীর সদস্য হিসেবে পাকিস্তানী বাহিনীকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেন।

তবে তাঁর ছেলে মাসুদ সাঈদীর ভাষ্য ভিন্ন। বিবিসিকে তিনি জানিয়েছেন, ১৯৭১ সালে দেলাওয়ার হোসেইন সাঈদী পিরোজপুরেই ছিলেন না।

“১৯৬৯ সাল হতে তিনি যশোরের নিউমার্কেট এলাকায় এ ব্লকের একটি বাড়ীতে বসবাস করতেন", বলছেন তিনি।

যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবীতে ২০১৩ সালে শাহবাগে আন্দোলন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবীতে ২০১৩ সালে শাহবাগে আন্দোলন

রাজনীতিতে উত্থান

শুরুতে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে দৃশ্যমান না থাকলেও তিনি যে এই রাজনীতির সক্রিয় সমর্থক সেটি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী কখনো গোপন করেন নি।

এরপর অবশ্য তিনি প্রকাশ্যেই জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেন এবং ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে পর পর দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর জামায়াতের অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে তাঁকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।

তিনি ২০০৯ সালে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ২০১০ সালের ২৯শে জুন ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে একটি মামলায় তিনি গ্রেফতার হন।

পরের বছর অর্থাৎ ২০১১ সালের ডিসেম্বরে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল।

যে বিশটি অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল, তার মধ্যে আটটি অভিযোগে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। এর মধ্যে দুটো অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেয়।

তবে মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আপীল বিভাগ দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়।