আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
যে চার ক্রিকেটারের নৈপুণ্যে ফাইনালের পথে এক পা এগুলো বাংলাদেশ
এশিয়া কাপ ২০২৫ টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের আসরের সুপার ফোর পর্ব জয় দিয়ে শুরু করলো বাংলাদেশ। দুবাইয়ে শ্রীলঙ্কাকে এক বল ও চার উইকেট হাতে রেখে হারিয়েছে লিটন কুমার দাসের দল।
শ্রীলঙ্কাকে এক বল ও চার উইকেট হাতে রেখে হারিয়েছে লিটন কুমার দাসের দল। টস জিতে শুরুতে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ।
শ্রীলঙ্কা আগে ব্যাট করে ১৬৮ রান তোলে।
জবাবে বাংলাদেশ শেষ ওভারে পা হড়কালেও তুলনামূলক সহজেই ম্যাচ জয় নিশ্চিত করে ফাইনালের পথে এক পা দিয়ে রাখলো।
নিজেদের ব্যাটিং পাওয়ারপ্লেতে শ্রীলঙ্কা ভালো শুরু করলেও সেটা ধরে রাখতে পারেনি ব্যাটাররা, বাংলাদেশের বোলাররা নিয়মিত বিরতিতে উইকেট নিয়ে চাপে রেখেছে শ্রীলংকান ব্যাটারদের।
তবে এরই মাঝে দাসুন শানাকা ৩৭ বলে ৬৭ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলে ১৬৮ রানের পুঁজি এনে দিয়েছেন দলকে।
বাংলাদেশ একদম শুরুতেই ইনফর্ম তানজিদ হাসান তামিমের উইকেট হারালেও রানের গতি কমায়নি, শেষ পর্যন্ত কিছু জায়গায় ভুলভ্রান্তি কাটিয়ে সহজ জয়ই পেয়েছে বাংলাদেশ।
ম্যাচ শেষে বাংলাদেশের অধিনায়ক লিটন দাস বলেন, "এশিয়া কাপের আগে আমরা কয়েকটি সিরিজ খেলেছিলাম এবং লক্ষ্য তাড়া করে জিতেছিলাম। তাই আমাদের ব্যাটিং নিয়ে আত্মবিশ্বাস ছিল।"
জয়ের ক্রেডিট বোলারদেরও দিয়েছেন লিটন, "আমরা জানি মুস্তাফিজ কতটা কার্যকর। উইকেটটিও ব্যাটিং সহায়ক ছিল।
তবে, শেষের দিকে মুস্তাফিজ আর তাসকিন যেভাবে ১৯তম ও ২০তম ওভার বল করল, সেটিই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। একসময় মনে হচ্ছিল প্রতিপক্ষের রান ১৯০ ছাড়িয়ে যাবে।"
৪৫ বলে ৬১ রান করে ম্যাচ সেরা সাইফ হাসানের প্রশংসা করেন লিটন দাস, "আমি জানতাম সাইফের ভেতরে ম্যাচ জেতানোর মতো সামর্থ্য আছে।
আমরা ধারণা করেছিলাম, আরব আমিরাতের কন্ডিশনে সে ভালো করবে। আমি তার মানসিকতা জানি, তার খেলা জানি এবং আজ সেটিই সে প্রমাণ করেছে।"
বুধবার ২৪শে সেপ্টেম্বর ও বৃহস্পতিবার ২৫শে সেপ্টেম্বর টানা দুইদিন যথাক্রমে ভারত ও পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ আছে বাংলাদেশের।
লিটন বলেন, "এ ধরনের ম্যাচ তাড়া করে জেতার পর স্বাভাবিকভাবেই আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায়, পরের ম্যাচের জন্য দল আরও উজ্জীবিত হয়।
তবে, প্রতিটি ম্যাচ আলাদা, নতুন প্রতিপক্ষ, নতুন চ্যালেঞ্জ। তাই আমাদের সেরা খেলাটাই আবার খেলতে হবে।"
মাহেদি হাসানের বোলিং
ম্যাচের শুরুটা খুব ভালোই করেছিল শ্রীলঙ্কা, পাথুম নিসাঙ্কা ও কুশাল মেন্ডিস দুজনকেই মনে হচ্ছিল উইকেটে বেশ সাবলীল। এ দুজন ৩০ বলে ৪৪ রানের জুটি গড়েন।
তবে, পাওয়ারপ্লের পরে দ্রুতই খেই হারিয়ে ফেলে শ্রীলঙ্কা।
শেখ মাহেদি হাসান পরপর দুই ওভারে কুশাল মেন্ডিস ও কামিল মিশারার উইকেট নিয়ে নেন।
ছয় ওভারে ৫৩ রান তোলা শ্রীলঙ্কা, পরের চার ওভারে মাত্র ১৯ রান তোলে।
মাহেদি আঁটসাঁট বোলিং দিয়ে শ্রীলঙ্কাকে চাপে রেখেছে এই সময়ে, ক্রিকেট সাংবাদিক আসিফ পিয়াল বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আসলে মাহেদির স্পেলেই ম্যাচটা বাংলাদেশের জন্য সহজ হয়ে যায়।"
শেখ মাহেদির বোলিং গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলছেন তিনি, কারণ কুশাল মেন্ডিস বাংলাদেশের স্পিনারদের বেশ ভালোই খেলছিল।
শ্রীলঙ্কার হয়ে আফগানিস্তানের বিপক্ষেও তিনি (কুশাল মেন্ডিস) ম্যাচ জেতানো পারফর্ম করেন, সেই কুশালকে আউট করেন মাহেদি।
নিজের পরের ওভারে বোল্ড করে প্যাভিলিয়ন ফেরান কামিল মিশারাকে।
নিয়ন্ত্রিত বোলিং-এ ১০টি ডট বল দিয়ে মাত্র ২৫ রান হজম করেছেন শেখ মাহেদি।
আসিফ পিয়াল বলেন, "কুশাল মেন্ডিস-এর সবচেয়ে বড় ব্যাপার তিনি ফর্মে আছেন। বাংলাদেশের স্পিনারদের বিপক্ষে কুশালের এভারেজ ছিল। তাকে ফেরানোটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মাহেদীর বোলিং দিয়ে ওই জায়গাটাতে একটা সমস্যা দূর হয়েছে এবং মাঝের ওভারের খেলায় বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে।"
'মুস্তাফিজুর রহমান ছিলেন দুর্দান্ত'
চার ওভারে ২০ রান তিন উইকেট, ইনিংস শেষে এই ছিল মুস্ত্যাফিজুর রহমানের বোলিং ফিগার।
কামিন্দু মেন্ডিস, কুশাল পেরেরা ও ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গার উইকেট নিয়েছেন তিনি। সাথে দিয়েছেন ১০টি ডট বল।
বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ওভারটি আসে মুস্তাফিজুর রহমানের হাত ধরে।
তিনি ১৯তম ওভারে মাত্র পাঁচ রান খরচায় কামিন্দু ও আসালঙ্কাকে ফেরান।
মুস্তাফিজুর রহমান এখন যৌথভাবে সাকিব আল হাসানের সঙ্গে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি উইকেট শিকারি, ১৪৯ উইকেট নিয়েছেন এই দুজন।
ম্যাচের ২০তম ওভারে বল হাতে নেন তাসকিন আহমেদ।
মারকুটে মেজাজে থাকা শানাকাকে তিনি পরপর চারটি ডট বল করেন, দারুণ কিছু স্লোয়ার বল করেন তাসকিন।
যদিও ওভারেই একটি ছক্কা ও একটি চার হজম করতে হয় তাকে, তবুও মুস্তাফিজ ও তাসকিন মিলে শেষ দুই ওভারে মাত্র ১৫ রান দেন।
এর আগে মনে হচ্ছিল শ্রীলঙ্কা খুব সহজেই ১৮০ বা তারও বেশি রান তুলবে।
সাইফ হাসানের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট উত্থান
নুয়ান তুষারার প্রথম ওভারেই যখন তানজিদ হাসান আউট হলেন, তখন মনে হচ্ছিল তার প্রথম স্পেলই হয়তো আবারো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেবেন তিনি।
আসিফ পিয়াল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচের স্মৃতিচারণ করে বলছিলেন, "আগের দেখায় বাংলাদেশের টপ অর্ডারের ব্যর্থতা হারের পেছনে বড় কারণ ছিল। এবারো তামিম আউট হন কিন্তু সাইফ হাসান দাঁড়িয়ে যান, হাল ধরেন তিনি।"
আন্তর্জাতিক স্পোর্টস কনটেন্ট ক্রিয়েটর সাইফ আহমেদ চৌধুরী বলেন, "সাইফ হাসানের জন্য ভীষণ খুশি লাগছে। বাংলাদেশে এমন ক্রিকেটার খুব বেশি নেই, যাদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুধুই টেস্ট ব্যাটার হিসেবে দেখা হয়েছে, আর পরে সফলভাবে নিজেদের টি–টোয়েন্টি ব্যাটসম্যান হিসেবে রূপান্তর করতে পেরেছেন।"
তিনি যোগ করেন, "এই বদল আর উন্নতির ফারাক সত্যিই বিশাল। জাতীয় দলে ফেরার জন্য তিনি যে পরিমাণ পরিশ্রম ও দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, সেটা আমার জানা। আশা করি, এ বার তার এই পথচলা হবে দীর্ঘস্থায়ী।"
কিছুটা নড়বড়ে শুরুর পর সাইফ হাসান তুষারার বিপক্ষে দারুণ ব্যাট চালিয়েছেন।
পাওয়ারপ্লেতে সাধারণত ফুল লেন্থ বল করতে পছন্দ করেন তুষারা, আর সেই সুযোগকেই কাজে লাগালেন সাইফ। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলেই তিনি সরাসরি বোলারের মাথার ওপর দিয়ে চার মেরে জবাব দেন।
পরের বলেই এগিয়ে গিয়ে পাঠান ছক্কায়। তুষারা দ্বিতীয় ও তৃতীয় ওভারে ১৪ করে রান হজম করেন, যার বেশিরভাগই এসেছে সাইফের ব্যাট থেকে।
তাওহীদ হৃদয়ের অর্ধশতক
হৃদয় কিছুটা সমালোচনার ভেতর দিয়েই যাচ্ছিলেন, এরই মাঝে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এই ইনিংস তাকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস যোগাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
৪৪ বলে ৫৪ রানের জুটি ছিল সাইফ ও হৃদয়ের, যেটাকে খুব একটা ভালো স্ট্রাইক রেট মনে করেননি ক্রিকেট সাংবাদিক আসিফ পিয়াল।
তিনি যোগ করেছেন, "ঠিক ঐ জায়গা থেকে রানের গতি বাড়িয়ে নিয়েছেন হৃদয়। কামিন্দুর এক ওভারে ১৬ নিয়েছেন, এরপর হাসারাঙ্গার ১০ বলে নিয়েছেন ১৫ রান, হাসারাঙ্গা ছিলেন শ্রীলঙ্কার এই ম্যাচে সেরা বোলার, সেখানে হৃদয় আত্মবিশ্বাস কুড়িয়েছেন এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করেছেন"।
শ্রীলঙ্কার নিয়মিত কৌশল হলো শানাকা আর স্পিন অলরাউন্ডারদের মধ্যে একজনকে দিয়ে চার ওভার ভাগ করে নেওয়া।
সাধারণত আসালাঙ্কা নিজেই কিছু ওভার বল করেন।
তবে এই ম্যাচে তিনি বল হাতে নেননি, বরং ১৫তম ওভারটি দেন কামিন্দু মেন্ডিসকে। আর সেখানেই ম্যাচটা ঘুরে যায় বাংলাদেশের দিকে।
ওভারের দ্বিতীয় বলেই হৃদয় কভার দিয়ে চার মারেন।
এরপর কামিন্দু স্টাম্পে কিছুটা ছোট লেন্থের বল দিলে হৃদি দারুণভাবে শট খেলে সেটাকে উড়িয়ে পাঠান ডিপ স্কয়ার লেগের বাইরে ছক্কায়। ওভারের শেষদিকে আবারও কাভার পয়েন্ট আর ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টের মাঝ দিয়ে চারের শট খেলেন।
ওভার শুরুর আগে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ৩৬ বলে ৫৫ রান। হৃদয়ের ওই এক ওভারেই ১৬ রান আসায় সমীকরণ অনেক সহজ হয়ে যায় বাংলাদেশের জন্য।