আমেরিকার সাথে পরমাণু যুদ্ধ ঠেকিয়েছিলেন এক সোভিয়েত কর্মকর্তা

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শনী মস্কোর রেড স্কোয়ারে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মস্কোর রেড স্কোয়ারে সামরিক কুচকাওয়াজে নিয়মিত প্রদর্শিত হতো সোভিয়েত ইউনিয়নের পরমাণু অস্ত্রসম্ভার

শীতল যুদ্ধের এক বিপজ্জনক মুহূর্তে ১৯৮৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেপণাস্ত্র নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে এক রাতে হঠাৎ করে হুঁশিয়ারি সঙ্কেত আসে যে আমেরিকা রাশিয়াকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে।

এই সঙ্কেতকে আমলে নিয়ে তখনকার সমর কৌশল অনুসরণ করে রাশিয়ার অবধারিত স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হবার কথা ছিল পাল্টা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি ছিল একটা পূর্ণ মাত্রার পারমাণবিক যুদ্ধ।

কিন্তু সেসময় মাত্র একজন সোভিয়েত ব্যক্তি একটা ভয়াবহ পারমাণবিক যুদ্ধ ঠেকাতে সক্ষম হন টান টান এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে।

নজরদারি শিফটের গোপন কাজ

“দিনটা ছিল অন্য আর পাঁচটা দিনের মতই। আমার ডিউটিতে থাকার কথা ছিল না। আমি কাজ করছিলাম আমার এক সহকর্মীর জায়গায়,” বিবিসিকে কয়েক বছর আগে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন লেফটনান্ট কর্নেল স্তানিসলাফ পেত্রফ। সেদিন, ২৬শে সেপ্টেম্বর ১৯৮৩, মস্কোর উপকণ্ঠে সার্পুকফ-১৫ সেনা ঘাঁটির একটি উপগ্রহ কেন্দ্রে মি. পেত্রফ তার দিনের ডিউটি সবে শুরু করেছেন।

এই সেনা কমান্ড সেন্টারটি আমেরিকার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির গতিবিধির ওপর নজরদারি করত উপগ্রহের মাধ্যমে।

আরও পড়তে পারেন:
মার্চ ২০০৪ সালে নিজের বাড়িতে স্তানিসলাফ পেত্রফ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০০৪ সালে নিজের বাড়িতে সাবেক সোভিয়েত কর্নেল স্তানিসলাফ পেত্রফ, যিনি ১৯৮৩ সালে সোভিয়েত পারমাণবিক সতর্কীকরণ কেন্দ্রে মার্কিন হামলার হুঁশিয়ারি সঙ্কেত অগ্রাহ্য করেন। পরে ওই সঙ্কেত ভুল প্রমাণিত হয়

মি. পেত্রফ ছিলেন কমব্যাট অ্যালগরিদিম ডিপার্টমেন্টের উপপ্রধান- তার কাজ ছিল তথ্যউপাত্ত বিশ্লেষণ করে আমেরিকার যুদ্ধ পরিকল্পনা ও মার্কিন পরমাণু অস্ত্রের গতিবিধির ওপর গোপনে নজর রাখা।

“সেদিন আমি ছিলাম অপারেশনের দায়িত্বে। আমার অধীনে কাজ করতেন একশজন অফিসার এবং ৩০জন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত সৈন্যর একটি দল। আমি এই বিশেষ দায়িত্বে কাজ করাকে খুবই সম্মানের সাথে নিয়েছিলাম। খুব বেশি লোককে এই দায়িত্ব দেয়া হতো না।”

তবে বিবিসিকে তিনি বলেন, তার কাজটা ছিল খুবই একঘেঁয়ে ধরনের। তার দায়িত্ব ছিল খুঁটিনাটি সব কিছু বিস্তারিতভাবে খুঁটিয়ে দেখা।

“অত্যন্ত মনোযোগী ও সজাগ থাকা জরুরি ছিল। সামান্য একটা ভুল করলেও তার জন্য কোন ক্ষমা ছিল না,” বলছিলেন তিনি। তার টিমের মূল দায়িত্ব ছিল আমেরিকা পারমাণবিক আক্রমণ করতে যাচ্ছে এমন আগাম ইঙ্গিত পেলে সে বিষয়ে সোভিয়েত প্রশাসনকে হুঁশিয়ার করে দেয়া।

“আমি রাতের শিফটে কাজ করছিলাম। কাজ শুরু করেছিলাম রাত আটটায়। আমরা ছিলাম সাউন্ডপ্রুফ একটা ঘরে, যেখানে বাইরের আওয়াজ ঢোকে না। ঘরের জানলাগুলো কালো কাঁচে ঢাকা -বাইরে থেকে কিছুই দেখা যায় না। দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে বিশাল একটা ম্যাপ, যাতে আমেরিকান এলাকায় আটটি সেনাঘাঁটির সবগুলোর অবস্থান চিহ্ণিত করা আছে।”

এই ঘাঁটিগুলোতেই আমেরিকার এক হাজার আন্ত:মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বসানো রয়েছে।

স্তানিসলাফ পেত্রফ
ছবির ক্যাপশান, বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মি. পেত্রফ বলেন তিনি জানতেন সেদিন প্রতিটা মুহূর্ত কতটা জরুরি ছিল

শীতল যুদ্ধের উত্তেজনা তুঙ্গে

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

শীতল যুদ্ধের সবচেয়ে সংঘাতপূর্ণ সময় তখন। দু পক্ষই তখন এই আশঙ্কায় যে প্রতিপক্ষ যেকোন সময় উস্কানিমূলক পারমাণবিক হামলা চালাতে পারে।

উত্তেজনা তখন আরও চরমে উঠেছে কারণ সোভিয়েতরা তাদের আকাশসীমায় দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বিমান গুলি করে ভূপাতিত করেছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের দৃষ্টিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান একজন 'কট্টরপন্থী'। আর রোনাল্ড রেগানের বর্ণনায় সোভিয়েত ইউনিয়ন একটা ‘অশুভ শক্তি’।

সোভিয়েত ইউনিয়ন তার পরমাণু অস্ত্রসম্ভার বাড়ানোর পর আমেরিকা ইউরোপে তাদের নতুন পারশিং-টু পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে রেখেছে, যা প্রয়োজনে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সোভিয়েত ইউনিয়নে আঘাত হানতে পারবে।

এর ওপর মি. রেগান ঘোষণা করেছেন আমেরিকা মহাকাশে মিসাইল প্রতিরোধ বর্ম গড়ে তুলবে। যে প্রকল্পের নাম দেয়া হয়েছে স্টার ওয়ারস্।

“কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আমাদের বা আমাদের মিত্র দেশের ভূখণ্ডে এসে পড়ার আগেই আমরা সেগুলো শনাক্ত করে ধ্বংস করে ফেলার ক্ষমতা গড়ে তুলব,” হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মি. রেগান।

তার কথায়: “আমি জানি এটা প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন কাজ- হয়ত এ শতাব্দী শেষ হবার আগে আমরা এই প্রযুক্তি অর্জন করতে পারব না। কিন্তু বর্তমানে প্রযুক্তির যে বিশাল অগ্রগতি হয়েছে, তাতে এই প্রকল্প শুরু করার এখনই যথার্থ সময়।”

রোনাল্ড রেগান

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সোভিয়েত ইউনিয়নকে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান বর্ণনা করেন 'অশুভ শক্তি' বলে
আরও পড়তে পারেন:

রোনাল্ড রেগানের এই ঘোষণার পর সোভিয়েত নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন যে এই স্টার ওয়ারস প্রকল্প সেসময়কার সামরিক কৌশলকে বদলে দেবে।

তখনকার সমর নীতি ছিল মিউচুয়াল অ্যাশিওরড ডেসট্রাকশানের ভিত্তিতে। অর্থাৎ পরমাণু শক্তিধর একটি দেশ, একইভাবে আক্রমণের সক্ষমতা আছে, পরমাণু শক্তিসম্পন্ন এমন আরেকটি দেশের ওপর আঘাত হানলে দুপক্ষই ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারবে সমানে সমানে।

কিন্তু সোভিয়েত নেতারা বুঝতে পারছিলেন আমেরিকা যদি মিসাইল প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে, যেটা আমেরিকা তাদের স্টার ওয়ারস প্রকল্পের মাধ্যমে অর্জন করতে পারবে বলে দাবি করেছে, তাহলে আমেরিকা প্রথম আঘাত হানলে পারমাণবিক যুদ্ধে আমেরিকাকে ধরাশায়ী করা তাদের জন্য কঠিন হবে।

তাই তড়িঘড়ি সোভিয়েত প্রশাসনও তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল যার মূল কেন্দ্র ছিল সার্পুকফ-১৫ সেনা ঘাঁটিতে।

মি. পেত্রফ বলেছেন তখন এমন একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছিল যেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন।

আমেরিকার স্টার ওয়ারস্ প্রকল্পের অধীন একটি প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মডেল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আমেরিকার স্টার ওয়ারস্ প্রকল্পের অধীন একটি প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মডেল

‘মিসাইল হামলা চালাও’

স্তানিসলাফ পেত্রফ বর্ণনা করছিলেন, সেদিন রাত ১২টার পর সার্পুকফ-১৫ উপগ্রহ কেন্দ্রে ওই সঙ্কেত বাজার পর কীধরনের চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।

“সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে সাইরেন বেজে উঠল। একটানা সাইরেন বাজছে আর দেয়ালের উপরে সাদা পর্দার ওপর ফুটে উঠেছে একটা মাত্র শব্দ – বড় বড় লাল অক্ষরে- 'স্টার্ট' – ‘শুরু করো’। উপগ্রহ শনাক্ত করেছে যে একটা ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়েছে এবং আরও ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

“প্রথম দশ সেকেন্ড আমি পুরো স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আমি উঠে দাঁড়ালাম। নিচের তলায় সহকর্মীদের দিকে তাকালাম। সকলে উঠে দাঁড়িয়েছে- সবাই মুখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।”

তিনি বলছিলেন কীভাবে নির্দেশাবলী মেনে তিনি তখন হট লাইন টেলিফোন তুলে বিষয়টা জানালেন নজরদারি বিভাগের প্রধান পরিচালক এবং মহাকাশ বাহিনীর মূল পরিচালককে।

“আমি যখন ফোনে কথা বলছি তার মধ্যেই আবার সতর্কসঙ্কেত বেজে উঠল । আমি জানালাম – দ্বিতীয়বার সাইরেন বেজেছে- বিরতিহীন- এরপর তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চমবার সাইরেনধ্বনি – পাঁচ মিনিটের বিরতিতে। আর পঞ্চমবার সাইরেন বাজার পর হামলা শুরুর নির্দেশ বদলে গেছে – পর্দায় নির্দেশ আসছে মিসাইল হামলা চালাও,” বলছিলেন স্তানিসলাফ পেত্রফ।

আমেরিকার দিক থেকে পারমাণবিক হামলার জবাবে সোভিয়েত পক্ষ থেকেও পাল্টা হামলা হওয়ার কথা।

মি. পেত্রফের দায়িত্ব ছিল তিনি কী দেখছেন তা তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো। ঘটনা যদি সত্যি হয়, তাহলে আমেরিকা থেকে ছোঁড়া মিসাইল সোভিয়েত ভূখণ্ডে এসে পৌঁছতে সময় লাগবে আট মিনিট। তখন ভূখণ্ডের রেডার ব্যবস্থায় ওই মিসাইল ধরা পড়বে এবং হামলা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

কিন্তু সমস্যা হল ঘটনা যদি সত্যি হয় তাহলে সোভিয়েত ভূখণ্ডে ঢোকার পরপরই ওই মিসাইলগুলো আঘাত হানবে। তখন কি পূর্ণ শক্তিতে পাল্টা হামলা চালানোর সুযোগ থাকবে?

পারশিং-টু ক্ষেপণাস্ত্র

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আমেরিকা ১৯৮৩ সালের গোড়ার দিকে জার্মানিতে মোতায়েন করে পারশিং-টু ক্ষেপণাস্ত্র যার টার্গেট ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন

দ্রুত পদক্ষেপ

“আমার মনে হয়েছিল আমাকে খুবই দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। ওই আট মিনিট অপেক্ষা করা আমার জন্য ঠিক হবে না। আমাকে অতি দ্রুত ভাবতে হবে। এমনকী ভাবার জন্য দুমিনিট সময় নিলেও দেরি হয়ে যেতে পারে!”

স্তানিসলাফ পেত্রফের টিমের সদস্যরা আবার দ্রুত তথ্য পরীক্ষা করে দেখলেন কোথায় কোন ভুল হয়নি।

কিন্তু মি. পেত্রফ যা দেখছিলেন তা নিয়ে তার মনে কেন যেন সন্দেহ উঁকি দিচ্ছিল। নতুন সোভিয়েত উপগ্রহ এবং কম্পিউটার প্রযুক্তি যা তাদের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার কেন্দ্রে, তার ওপর তিনি পুরোপুরি ভরসা করতে পারছিলেন না। ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার প্রথম সেই সতর্ক সঙ্কেত পাবার পর তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত নিলেন- ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তিনি বললেন – তার বিশ্বাস এটা একটা ‘ভুল সঙ্কেত’।

তিনি কারণ ব্যাখ্যা করলেন: “সেসময় সমর কৌশলটা ছিল এরকম যে, যে কোন পক্ষ তাদের হাতে যত ক্ষেপণাস্ত্র আছে সব নিয়ে বিশাল পরিসরে হামলা চালাবে। মাত্র পাঁচটা ক্ষেপণাস্ত্র সেখানে যথেষ্ট ছিল না। অবশ্য পরিস্থিতি সেভাবে বিশ্লেষণ করে দেখার জন্য আমার হাতে যথেষ্ট সময় ছিল না। আমার শুধু মনে হয়েছিল এটা আসল হামলা হতে পারে না।”

সেটাই তিনি তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বলেছিলেন। এবং তারা তাকে চ্যালেঞ্জও করেননি।

রুশ আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মস্কোর উপকণ্ঠে সার্পুকফ-১৫ সামরিক ঘাঁটির বাইরে মোতায়েন রুশ আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র

টান টান উত্তেজনা

“ঘরের মধ্যে তখন টান টান উত্তেজনা- উত্তেজনার পারদ এতই চড়া যে আমি এমনকী দাঁড়াতেও পারছিলাম না। চেয়ারে আঠার মত আটকে বসেছিলাম। আমার দুই পা শুধু কাঁপছিল,” বলছিলেন মি. পেত্রফ।

সঙ্কেত সঠিক হলে হামলা চালানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হতো তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইউরি অ্যান্দ্রোপফকে, যিনি তখন বেশ অসুস্থ।

তবে পদমর্যাদায় উপরের সারির সোভিয়েত নেতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকত। এসব তথ্য থেকে তারা ধারণা পেতেন আমেরিকার সামরিক বাহিনী বা রাজনৈতিক নেতারা তখনই পারমাণবিক হামলা চালানোর কোনরকম প্রস্তুতি নিচ্ছেন কিনা।

সেসব তথ্য বিবেচনায় সোভিয়েত নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করারই সিদ্ধান্ত নেন।

“বলা যায় তারা একরকম বাজিই ধরেছিলেন,” বলেন মি. পেত্রফ।

“আমি অবশ্যই শতভাগ নিশ্চিত ছিলাম না। সবচেয়ে স্পর্শকাতর সময় ছিল ওই আটটা মিনিট। ওই উত্তেজনাপূর্ণ আট মিনিট যখন পার হয়ে গেল – আমি মানে- আমরা স্থির নিশ্চিত হলাম – হুঁশিয়ারিটা সত্যি ছিল না।”

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রর গতিবিধি নজরদারি ব্যবস্থার মডেল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, যে ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের গতিবিধির ওপর নজরদারি করা হতো তার মডেল

ভুল সঙ্কেত বাজল কেন?

জানা যায় ওই কেন্দ্রের একটি উপগ্রহের ত্রুটি ছিল এর কারণ।

উপগ্রহটি বায়ুমণ্ডলের কোন কার্যকলাপকে ক্ষেপণাস্ত্রের ধেয়ে আসা ভেবে ভুল করেছিল।

তবে সেসময় ওই ভুল সতর্ক সঙ্কেতের খবর চেপে যাওয়া হয়। এর কয়েক বছর পর সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর শুধুমাত্র এই খবর প্রকাশ করা হয়।

তবে যেটা উদ্বেগজনক সেটা হল ওটাই এধরনের একমাত্র ঘটনা ছিল না।

সোভিয়েত ইউনিয়ন, এমনকী আমেরিকাতেও এধরনের ভুল সতর্কসঙ্কেত বেজে ওঠার ঘটনা বহু বার ঘটেছে।

ফলে দ্রুত এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে এই প্রযুক্তি যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য নয়। বিশেষ করে এমন ‌একটি ক্ষেত্রে যেখানে এধরনের ভুলের মাশুল চরম হয়ে ওঠার ঝুঁকি রয়েছে।

মি. পেত্রফ জানান সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল খুবই চাপের মুখে। কারণ “আমেরিকানদের সঙ্গে আমাদের পাল্লা দেবার একটা ব্যাপার ছিল। ফলে আমাদের ডিজাইনররা ত্রুটিগুলো দেখেও দেখেননি।”

তবে স্তানিসলাফ পেত্রফ বলছিলেন শুধু যে সোভিয়েত সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় গলদ ছিল তাই নয়, আমেরিকানরাও সময়ে সময়ে ভুল সতর্কবার্তা পেয়েছে এমন খবর তারা জেনেছিলেন।

স্তানিসলাফ পেত্রফের সেদিনের ওই ঘটনার খবর জানাজানি হবার পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তাকে অনেকেই চিঠি লিখেছিল।

তিনি মারা যান ২০১৭ সালে।

সেদিন তিনি যদিও বিশ্বকে একটা পারমাণবিক যুদ্ধের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি সবসময় বলেছেন তার কখনই মনে হয়নি তিনি “কোন বীরের কাজ” করেছিলেন। তিনি বলেন: “আমি শুধু আমার প্রতি দিনের দায়িত্ব পালন করেছি মাত্র।”