ভারতে ‘মুসলিম কোটা’ নিয়ে বিতর্ক এবার তেলেঙ্গানাতেও

ভারতের হায়দ্রাবাদে মুসলিমদের ঈদের জামাত

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতের হায়দ্রাবাদে মুসলিমদের ঈদের জামাত
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি

সরকারি চাকরি ও শিক্ষাক্ষেত্রে সংখ্যালঘু মুসলিমদের জন্য ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যে যে আলাদা সংরক্ষণ বা ‘কোটা’র ব্যবস্থা আছে, তা নিয়ে ভোটের আগে রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে।

দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রবিবার হায়দ্রাবাদের কাছে এক জনসভায় মুসলিমদের জন্য এই কোটাকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে বর্ণনা করেছেন।

বিজেপি তেলেঙ্গানাতে ক্ষমতায় এলে এই কোটা বাতিল করা হবে বলেও তিনি ঘোষণা করেছেন।

অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) নেতা ও এমপি আসাদউদ্দিন ওয়াইসি থেকে শুরু করে রাজ্যে ক্ষমতাসীন ভারত রাষ্ট্রীয় সমিতির (বিআরএস) নেতারা একযোগে এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করছেন।

এর আগে দক্ষিণ ভারতের আর একটি রাজ্য কর্নাটকেও মুসলিমদের জন্য যে চার শতাংশ সংরক্ষণ ছিল তা খুব সম্প্রতি বাতিল করা হয়েছে।

কর্নাটকে আগামী মাসে বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে সেখানকার বিজেপি সরকারের নেওয়া ওই সিদ্ধান্ত অবশ্য সুপ্রিম কোর্টেও সমালোচনার মুখে পড়েছে।

হায়দ্রাবাদের একটি সভায় ভাষণ দিচ্ছেন অমিত শাহ। ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হায়দ্রাবাদের একটি সভায় ভাষণ দিচ্ছেন অমিত শাহ। ফাইল ছবি

তবে অমিত শাহর কথা থেকে স্পষ্ট- কর্নাটকের পর তেলেঙ্গানাতেও তারা একই ধরনের নীতি নিয়ে এগোতে চান।

অন্যদিকে রাজ্যে ক্ষমতাসীন বিআরএস মনে করে, রাজ্যে মুসলিমদের জন্য কোটা থাকা উচিত তাদের জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে।

মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাও এর আগে রাজ্যে মুসলিমদের জন্য ১২ শতাংশ কোটা চালু করা হবে বলেও অঙ্গীকার করেছিলেন।

অমিত শাহর বক্তব্য

ভারতের হাতে গোনা যে কয়েকটি রাজ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য আলাদা সংরক্ষণ বা কোটার ব্যবস্থা আছে তার অন্যতম হল তেলেঙ্গানা।

মুসলিমদের জন্য সরকারি চাকরি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চার শতাংশ কোটার বিধান রেখে একটি বিল রাজ্য বিধানসভায় পাস হয়েছিল ২০১৭ সালে। তখন থেকেই এই ইস্যুটি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে।

মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাও

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাও

২০১১ সালের আদমশুমারিতে তেলেঙ্গানায় মুসলিম জনসংখ্যার হার ছিল ১২.৭ শতাংশ – সেই অনুযায়ী রাজ্যের শাসক দল মুসলিমদের জন্য ১২ শতাংশ সংরক্ষণেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যদিও তারা সেটা রাখতে পারেনি।

এখন তেলেঙ্গানায় এসে বিজেপির শীর্ষস্থানীয় নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা করেছেন, এই চার শতাংশ মুসলিম কোটাও তারা ক্ষমতায় এলে তুলে নেবেন।

হায়দ্রাবাদের কাছে চেভেল্লায় রবিবার এক জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “মুসলিম বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য এভাবে আলাদা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করাটা অসাংবিধানিক।”

“এই অধিকারটা আসলে তফসিলি জাতি, তফসিলি উপজাতি এবং ওবিসি, অর্থাৎ পশ্চাৎপদ শ্রেণীভুক্ত লোকেদের,” মন্তব্য করেন তিনি।

ওই রাজ্যের কে চন্দ্রশেখর রাও সরকার আসলে আসাদউদ্দিন ওয়াইসির নেতৃত্বাধীন এআইএমআইএমের ‘এজেন্ডা’ই বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

Skip X post
X কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: বিবিসির নয় এমন ওয়েবসাইটের কনটেন্টের জন্য বিবিসি দায়ী না

End of X post

“তেলেঙ্গানায় আসলে কোনও সরকারই চলতে পারে না, যার স্টিয়ারিং মজলিসের (এআইএমআইএম) হাতে নেই!”

দেশের মুসলিম সমাজের নেতৃস্থানীয় মুখ আসাদউদ্দিন ওয়াইসিকে আক্রমণ করে তিনি আরও বলেন, “আমরা মজলিসকে ভয় পাই না। আমরা তেলেঙ্গানার মানুষের জন্য রাজ্যে সরকার চালাব – ওয়াইসির কথায় চালাব না!”

ওয়াইসির প্রতিবাদ

মুসলিম কোটা বাতিল করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে পাল্টা আক্রমণ করে আসাদউদ্দিন ওয়াইসি আবার বলেছেন, তেলেঙ্গানার জন্য বিজেপির কোনও ‘ভিশন’ নেই – আছে শুধু ‘মুসলিম-বিরোধী হেইট স্পিচ’।

তিনি একটি টুইটে বলেন, “পিছিয়ে থাকা মুসলিম গোষ্ঠীগুলোর জন্য যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা, তা করা হয়েছে দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ-নির্ভর তথ্যের ভিত্তিতে।”

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ১৯৯২ সালে তাদের এক ঐতিহাসিক রায়ে বলেছিল, দেশের কোনও রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের মোট সংরক্ষণের উর্ধ্বসীমা হবে ৫০ শতাংশ – অর্থাৎ কোনও সরকারই অর্ধেকের বেশি পদ সংরক্ষণের আওতায় আনতে পারবে না।

আসাদউদ্দিন ওয়াইসি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আসাদউদ্দিন ওয়াইসি

সেই প্রসঙ্গ টেনে এনে মি ওয়াইসি আরও বলেন, “তফসিলি জাতি, উপজাতি বা ওবিসিদের সামাজিক ন্যায়ের জন্য অমিত শাহ যদি সত্যিই আন্তরিক হন তাহলে তাঁর উচিত এই ৫০ শতাংশ কোটা সিলিং তুলে নেওয়ার জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব আনা।”

মুসলিম-বিরোধী কথাবার্তা ছেড়ে রেকর্ড-ভাঙা মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব নিয়েও অমিত শাহকে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন আসাদউদ্দিন ওয়াইসি, মনে করিয়ে দিয়েছেন “গোটা দেশের মধ্যে মাথাপিছু আয় সবচেয়ে বেশি তেলেঙ্গানাতেই”।

এদিকে কর্নাটকেও আগামী ১০ই মে বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যের বিজেপি সরকার চার শতাংশ ‘মুসলিম কোটা’ প্রত্যাহার করে নিয়ে তা রাজ্যের দুটি প্রভাবশালী হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে তা সমান ভাগে ভাগ করে দিয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে কর্নাটকের বাসবরাজ বোম্মাই সরকার বলেছে, রাজ্যের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আর্থসামাজিক অবস্থা যাচাই-বাছাই করে একটি কমিটি যে সুপারিশ করেছিল তার ভিত্তিতেই ওই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী বাসবরাজ বোম্মাই

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী বাসবরাজ বোম্মাই

সুপ্রিম কোর্ট এই বক্তব্য গ্রহণ করেনি – শীর্ষ আদালতের বিচারপতিরা বরং বলেছেন ‘খুবই দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ’ যুক্তির ভিত্তিতে কর্নাটক সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কর্নাটক সরকারের সিদ্ধান্ত ৫০ শতাংশ সংরক্ষণের ঊর্ধ্বসীমাও ছাড়িয়ে গেছে বলে সুপ্রিম কোর্ট মন্তব্য করেছে।

শীর্ষ আদালতের এই সমালোচনার পরও পার্শ্ববর্তী তেলেঙ্গানাতেও বিজেপি একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে চায় বলে এখন প্রকাশ্যেই ঘোষণা করছে।

প্রসঙ্গত, চলতি ২০২৩ সালের শেষ দিকেই তেলেঙ্গানায় বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে।