পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা : ১৮৬২ সালে যেভাবে শুরু হয় প্রাদেশিক আইনসভা

    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
  • পড়ার সময়: ৭ মিনিট

১৮৬২ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি। কলকাতার আলিপুরে এখন যে বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণে ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার অবস্থিত, সেই বেলভেডিয়ারে বসেছিল একটা সভা।

ওই প্রাঙ্গণটিই ছিল তখন গভর্নর জেনারেলের আবাস।

বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছিলেন বাংলার তৎকালীন গভর্নর জন পিটার গ্রান্ট।

মাত্র বছর খানেক আগে, ১৮৬২ সালে পাশ হয়েছে ইন্ডিয়ান কাউন্সিলস্ অ্যাক্ট। ওই আইন অনুযায়ী গভর্নর জেনারেলের সভাপতিত্বে গঠিত হয়েছে বাংলার প্রথম 'লেজিসলেটিভ কাউন্সিল' বা আইনসভা।

বেলভেডিয়ারের ওই পয়লা ফেব্রুয়ারির বৈঠকটিই ছিল প্রাদেশিক আইনসভার প্রথম অধিবেশন।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সূচনা ও বেড়ে ওঠা সংক্রান্ত যে তথ্য রয়েছে বিধানসভার ওয়েবসাইটে, সেখানে লেখা হয়েছে যে, প্রতি শনিবার বেলা ১১টায় বসত আইনসভার অধিবেশন।

তখন অবশ্য এখনকার মতো নির্বাচন হতো না, ১২ জন সদস্যের সকলেই ছিলেন মনোনীত। প্রায় ৩০ বছর পরে, ১৮৯২ সালে আইনসভার সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে করা হয়েছিল ২০।

নির্বাচন যেভাবে শুরু হয়

বিধানসভার তথ্য থেকে জানা যায় যে, সেবছরই প্রাদেশিক আইনসভায় প্রথম নির্বাচিত সদস্যদের যুক্ত করতে আইন বদল করা হয়েছিল। সদস্যদের মধ্যে সাতজন থাকতেন নির্বাচিত সদস্য। আবার আইনসভায় যেভাবে প্রশ্ন করা হয়, আলোচনা হয় আর বার্ষিক বাজেট গৃহীত হয়, সেই ট্র্যাডিশনেরও শুরু তখন থেকেই।

আইনসভার সদস্য সংখ্যা ১৯০৯ সালে আরও বাড়িয়ে করা হয়েছিল ৫০। আগে যে আইনসভায় মূলত: ব্রিটিশ সরকারের পছন্দের মানুষদেরই রাখা হতো, ১৯০৯ সাল থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সরকারের বাইরে থেকে যুক্ত করা শুরু হয়।

লেজিসলেটিভ কাউন্সিল বা প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য সংখ্যা দশ বছর পরে, ১৯১৯ সালে এক লাফে বাড়িয়ে করা হয়েছিল ১২৫। সরকারি কর্মকর্তাদের সংখ্যাও সর্বোচ্চ ২০তে সীমাবদ্ধ থাকবে, এই আইনও হয়েছিল সেবছরই। এখন যেমন আইনসভাগুলির কাজ পরিচালনা করেন স্পিকার, সেই ধারণাও এসেছিল ওই ১৯১৯ সালের আইনেই।

তবে তখন পদটির নাম দেওয়া হয়েছিল কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট এবং ডেপুটি প্রেসিডেন্ট। গোড়ায় গভর্নর নিজেই সভার প্রেসিডেন্ট মনোনীত করতেন, তবে পরে আইনসভার সদস্যদের মধ্যে থেকেই নির্বাচিত হতে হতো প্রেসিডেন্টকে। তবে ওই নিযুক্তিতে অবশ্য গভর্নরের সম্মতি লাগত।

সেই সময় থেকেই আইনসভার পরিচালনার ভার গভর্নরের হাত থেকে প্রেসিডেন্টের ওপরে বর্তায়।

১৯১৯ সালের আইন অনুযায়ী বঙ্গীয় প্রাদেশিক বিধান পরিষদ নামে ওই আইনসভা আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে ১৯২১ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি। উদ্বোধন করেছিলেন কনটের ডিউক।

বেসরকারি সদস্য হিসাবে প্রাদেশিক আইনসভার প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিল নবাব 'স্যার' শামসুল হুদা।

আগে যে বৈঠকের সময় ছিল বেলা ১১টায়, তা পরিবর্তন করে বিকেল তিনটায় সভার অধিবেশনের সময় নির্ধারিত হয়। সভাস্থলও বদলিয়ে যায়।

বর্তমানের যে বিধানসভা ভবন, তার পিছন দিকে যে টাউন হল আছে, সেখানেই বসত প্রাদেশিক আইনসভার অধিবেশন।

নতুন ভবন হলো আইনসভার

এখন যে ভবনটিতে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা অবস্থিত, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ১৯২৮ সালের নয়ই জুলাই।

বিধানসভার তথ্য অনুযায়ী, মোটামুটি ভাবে ৩৩ বিঘা জমিতে গড়ে ওঠা এখনকার বিধানসভা ভবন নির্মাণে সময় লেগেছিল মাত্র দুই বছর সাত মাস। জে গ্রিফস নামে একজন স্থপতি ছিলেন, নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছিল মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি।

অনেকটা ইংরেজি 'H' অক্ষরের মতো দেখতে ভবনটিতে প্রথম অধিবেশন বসে ১৯৩১ সালের নয়ই ফেব্রুয়ারি।

তখনও প্রাদেশিক আইনসভায় একটিই কক্ষ ছিল। ভারত সরকার আইন, ১৯৩৫-এ লেখা হয় বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভায় এরপর থেকে লেজিসলেটিভ কাউন্সিল বা বিধান পরিষদের সঙ্গেই গঠিত হবে লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি বা বিধানসভা।

এখন যেভাবে ভারতের সংসদে দুটি পৃথক কক্ষ আছে – লোকসভা ও রাজ্যসভা, ঠিক তেমনই বিধান পরিষদ আর বিধানসভা গঠিত হয়েছিল ১৯৩৫ এর ওই আইনে।

সেখানে বলা হয়েছিল, ২৫০ সদস্য বিশিষ্ট বিধানসভার মেয়াদ থাকবে পাঁচ বছর। তবে আগে থেকেই যে বিধান পরিষদ ছিল, ৬৫ সদস্য বিশিষ্ট ওই কক্ষের মেয়াদ কখনই শেষ হবে না। প্রতি তিন বছর অন্তর ৬৫ জন সদস্যের এক তৃতীয়াংশ অবসর গ্রহণ করবেন, এমনটাই ছিল আইন।

বিধানসভার আসন ভাগ হত ধর্ম, পেশা, জাতির ভিত্তিতে

নবগঠিত বিধানসভার ২৫০ জন সদস্যের মধ্যে ৭৮টি আসন ছিল সাধারণ আসন। এর মধ্যে আবার তপশীলি জাতির জন্য ৩০টি আসন বরাদ্দ থাকত।

এছাড়া মুসলমানদের জন্য ১১৭টি, অ্যাঙলো ইণ্ডিয়ানদের জন্য তিনটি, ইউরোপীয়দের জন্য ১১, ভারতীয় খ্রিষ্টানদের জন্য দুটি আসন বরাদ্দ ছিল।

আবার নানা পেশার জন্যও বরাদ্দ থাকত আসন। শিল্প-বাণিজ্য, খনি এবং পরিকল্পনা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য ১৯টি, জমির মালিকদের জন্য পাঁচটি, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দুটি আর শ্রমিকদের আট জন প্রতিনিধি থাকবেন, এমনই ছিল আইন।

নারীদের জন্যও বরাদ্দ থাকত পাঁচটি আসন। এর মধ্যে আবার অসংরক্ষিত বা সাধারণ আসন ছিল দুটি, মুসলমান নারীদের জন্যও দুটি এবং একজন নারী অ্যাঙলো ইণ্ডিয়ান সমাজ থেকে নির্বাচিত হতেন।

বিধান পরিষদের জন্যও একইভাবে নানা শ্রেণির জন্য আসন বরাদ্দ থাকত।

নতুন রূপে, দুই কক্ষ বিশিষ্ট প্রাদেশিক আইনসভার প্রথম অধিবেশন বসেছিল ১৯৩৭ সালের সাতই এপ্রিল। সেদিনই বিধানসভার প্রথম স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিল মুহাম্মদ আজিজুল হক আর দুদিন পরে, নয়ই এপ্রিল বিধান পরিষদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন সত্যেন্দ্র চন্দ্র মিত্র।

প্রথম সরকার গড়লেন একে ফজলুল হক

দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা গঠিত হওয়ার পরে বিধানসভার প্রথম নির্বাচন হয় ১৯৩৭ সালে।

'চেম্বার্স বুক অফ ইণ্ডিয়ান ইলেকশন ফ্যাক্টস্' বইতে লেখা হয়েছে, প্রথম নির্বাচনেই ত্রিশঙ্কু বা 'হাঙ' বিধানসভা হয়েছিল – কোনো দলেরই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না।

কৃষক প্রজা পার্টির প্রধান একে ফজলুল হক মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট বেঁধে প্রথম মন্ত্রিসভা গড়েছিলেন। ওই বইয়ে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ভারতের মাত্র দুটি প্রদেশে সেবছর কংগ্রেস দল সরকার গড়তে পারেনি। তারই একটি ছিল বাংলা।

তখন সরকারের প্রধানকে মুখ্যমন্ত্রী বলা হতো না, তাকে প্রধানমন্ত্রী বলা হতো।

বিধানসভার তথ্য বলছে কংগ্রেস সেবারের নির্বাচনে মাত্র ২০ শতাংশ আসন পেয়েছিল। তারাই বিধানসভার মূল বিরোধী দল হয়েছিল সেবছর।

এরপরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে আর প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচন হয় নি অনেক বছর।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে, ১৯৪৫ সালে ২১শে অগাস্ট তৎকালীন গভর্নর জেনারেল বা বড়োলাট লর্ড ওয়্যাভেল ঘোষনা করেন যে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভাগুলির নির্বাচন হবে খুব তাড়াতাড়িই।

বাংলা প্রদেশের দ্বিতীয় নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয় ১৯৪৬ সালের পহেলা এপ্রিল।

বঙ্গীয় প্রাদেশিক বিধানসভার ২৫০টি আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ একাই পেয়েছিল ১১৪টি আসন। হুসেইন শাহিদ সুরাবর্দী ২৩শে এপ্রিল সরকার গঠন করেন।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার তথ্য অনুযায়ী, সেই নির্বাচনে কংগ্রেস পেয়েছিল ৮৬টি আসন।

ওই সরকারের মেয়াদেই ভারত স্বাধীন হয়।

স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচন কমিশনার ছিলেন এক বাঙালি

ভারতের স্বাধীনতার পরে প্রাদেশিক আইনসভার আসন সঙ্কুচিত হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে যতটা এলাকা পড়ে, সেখান থেকে নির্বাচিত ৯০ জন সদস্য ১৯৪৭ সালের ২১শে নভেম্বর প্রথম অধিবেশনে যোগ দেন।

স্বাধীনতার পরে প্রাদেশিক সরকার গড়েছিল কংগ্রেস। প্রথম অন্তবর্তীকালীন সরকার প্রধান হয়েছিলেন প্রফুল্ল ঘোষ। একবছরের মধ্যেই মি. ঘোষ পদত্যাগ করেন, সরকারের প্রধান হন বিধান চন্দ্র রায়।

ভারতের সংবিধান অনুযায়ী দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৫২ সালে।

'চেম্বার্স বুক অফ ইণ্ডিয়ান ইলেকশন ফ্যাক্টস্' বইতে লেখা হয়েছে, "১৯৪৭ সালের অগাস্টে স্বাধীনতার প্রায় আড়াই বছর পরে, ১৯৫০ সালের ২৫শে জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়। সুকুমার সেনকে ১৯৫০ সালের ২১শে মার্চ প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসাবে নিয়োগ করা হয়।

"স্বাধীন ভারতে প্রথম নির্বাচন পরিচালনা করার মতো গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সেনকে, তবে তিনি ভারতীয় গণতন্ত্রের এক অখ্যাত নায়ক হয়েই থেকে গেছেন," লেখা হয়েছে ওই বইটিতে।

ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের ওই কর্মকর্তাকে যখন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব দেওয়া হয়, সেই সময়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গে মুখ্য সচিব ছিলেন।

ওই বইটিতে লেখা হয়েছে, ভারতের সেই প্রথম নির্বাচনে প্রায় ১৮ কোটি ভোটার ছিলেন, যাদের ৪৫ শতাংশ ছিলেন নারী। আবার ৮৫ শতাংশ ভোটার ছিলেন নিরক্ষর।

সুকুমার সেনের প্রথম কাজ তো ছিল ভোটারদের চিহ্নিত করে তাদের নাম তালিকায় তোলা।

অনেক নারী, বিশেষত; উত্তর ভারতীয় রাজ্যের নারীরা নিজেদের নাম ভোটার তালিকায় তোলাতে চাইতেন না, তারা লিখতেন 'অমুকের মা' বা 'অমুকের স্ত্রী'।

নির্দিষ্ট নাম না দিলে ভোটার তালিকায় নাম তোলা হবে না, এরকম একটা কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মি. সেন। এর ফলে প্রায় আট কোটি নারী ভোটারের মধ্যে ২৮ লক্ষের নাম বাদ গিয়েছিল।

আবার বিপুল সংখ্যক মানুষ যেহেতু নিরক্ষর ছিলেন, তাই প্রার্থীর নামের সঙ্গে প্রতীক ব্যবহারও সেবারেই শুরু হয়।

নির্বাচনের পরিকাঠামো আর ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখতে মি. সেন বেশিরভাগ রাজ্যে সশরীরে গিয়েছিলেন। তিনি ১৯৫৭ সালের ভারতের দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচনও পরিচালনা করেছিলেন এবং আর আগেই, ১৯৫৩ সালে তাকে সুদানের নির্বাচন পরিচালনার জন্য উপদেষ্টা হিসাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

সেবারের নির্বাচনের পরে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার প্রথম অধিবেশন বসেছিল ১৯৫২ সালের ৩১শে মার্চ। প্রথম স্পিকার হয়েছিলেন শৈল কুমার মুখার্জি। রাজ্যের মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন কংগ্রেসের বিধান রায়। তখন বিধানসভার আসন সংখ্যা ছিল ২৪০টি।

সদস্য সংখ্যা ১২ থেকে ২৯৪

স্বাধীনতার আগে যেমনভাবে প্রাদেশিক আইনসভায় দুটি কক্ষ ছিল, ১৯৫২-র নির্বাচনের পরেও সেভাবেই চলত আইনসভা।

১৯৬৯ সালের ২১শে মার্চ পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় একটি প্রস্তাব পাশ করে বিধান পরিষদ তুলে দেওয়া হয়। ওই আইন অনুযায়ী, সে বছরের পয়লা অগাস্ট থেকে পশ্চিমবঙ্গের আইনসভায় একটিই মাত্র কক্ষ রয়েছে – বিধানসভা।

যে আইনসভার সদস্য সংখ্যা ১৮৬২ সালের ১২ থেকে বেড়ে এখন হয়েছে ২৯৪।

একটা তথ্য দিয়ে শেষ করি এই প্রতিবেদন। দীর্ঘদিন, এই ২০২১ সাল পর্যন্তও, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য সংখ্যা ছিল ২৯৫ – ২৯৪ জন নির্বাচিত হতেন আর একজন সদস্যকে অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান সমাজ থেকে মনোনীত করা হতো।

২০১৯ সালে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি আইন পাশ করে ওই সংরক্ষিত আসনের অবসান ঘটানো হয়।