আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
জেতা যায় এমন অবস্থানে থেকে যেসব কারণে পাকিস্তানের কাছে হেরে গেল বাংলাদেশ
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে হারিয়ে এশিয়া কাপ ২০২৫-এর ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে পাকিস্তান। ২৮শে সেপ্টেম্বর রাতে ভারত ও পাকিস্তান এই আসরে তৃতীয়বারের মতো মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জিতে ফাইনালের আশা জাগালেও, ভারত ও পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ জেতা যায় এমন অবস্থানে থেকে হেরে বিদায় নিলো টুর্নামেন্ট থেকে।
৪০ বছরেরও বেশি সময় পর অবশেষে দেখা যাচ্ছে ভারত-পাকিস্তান এশিয়া কাপ ফাইনাল।
দুবাইয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে মাত্র ১৩৫ রান ডিফেন্ড করে ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে পাকিস্তান।
শুরুতে ব্যাট করে পাকিস্তান ১৩৫ রান তোলে, জবাবে বাংলাদেশ তোলে ১২৪ রান।
ম্যাচটা ছিল ভিন্ন রকম, যে দল বেশি ছক্কা মেরেছে, তারাই হেরেছে।
পাকিস্তান যেখানে মেরেছিল মাত্র পাঁচটি ছক্কা, বাংলাদেশ ইনিংসের দশম ওভারেই পাঁচটি ছক্কা মারে, তবে শেষ পর্যন্ত তাদের ছক্কার সংখ্যা দাঁড়ায় সাত।
আরও বড় শট খুঁজতে গিয়ে, বারবার ক্যাচ দিয়ে আউট হয়েছে বাংলাদেশ।
দিনের শুরুতে পাকিস্তানের ব্যাটাররাও একই ধরনের ভেঙে পড়া ব্যাটিংয়ের শিকার হয়েছিলেন।
তবে মোহাম্মদ হারিস ও মোহাম্মদ নাওয়াজ কিছুটা লড়াই করে দলকে নিয়ে যান ১৩৫ রানে।
সেই সংগ্রহই দিনের শেষে যথেষ্ট প্রমাণিত হয়, ১১ রানের জয় নিশ্চিত করে পাকিস্তান।
ম্যাচ শেষে কে কী বলেন
পাকিস্তানের অধিনায়ক সালমান আগা ম্যাচ শেষে বলেছেন, এমন ম্যাচ জিততে পারলে একটি দলকে 'বিশেষ' মানতেই হবে। তিনি পুরো দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন। বিশেষ করে বোলিং ও ফিল্ডিংয়ে, যেখানে প্রত্যেকেই অবদান রেখেছেন।
তিনি স্বীকার করেছেন যে ব্যাটিংয়ে এখনও উন্নতির জায়গা রয়েছে, তবে দল সেই দিকেও কাজ করছে।
শাহীন শাহ আফ্রিদিকে তিনি বলেছেন "বিশেষ এক খেলোয়াড়", যিনি সবসময় দলের প্রয়োজন মেটান। ম্যাচের শুরুতে শাহীন যেভাবে প্রভাব ফেলেছেন, তাতে তিনি ভীষণ খুশি।
এছাড়া, নিয়মিত অবস্থানে ব্যাট না করলেও মোহাম্মদ হারিস যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন, তাও তিনি উল্লেখ করেছেন।
কম রান রক্ষা করতে গিয়ে নতুন বল কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা তুলে ধরেছেন সালমান। তিনি ক্রেডিট দিয়েছেন বোলারদের, যারা শুরুতেই চাপ তৈরি করতে পেরেছিলেন।
মাঠের পরিশ্রম নিয়েও কথা বলেছেন পাকিস্তানের অধিনায়ক।
অন্যদিকে বাংলাদেশের আপাতকালীন অধিনায়ক জাকের আলি বলেছেন, "ব্যাটিং ব্যর্থতাই তাদের হারের মূল কারণ। ভারতের বিপক্ষে আগের ম্যাচেও একই সমস্যা দেখা দিয়েছিল।"
জাকের মনে করেন, "বোলিং ইউনিট ভালো করেছে। বিশেষ করে রিশাদ হোসেন ও তাসকিন আহমেদ প্রশংসনীয় পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন। ব্যাট হাতে সাইফ হাসান আলাদা করে নজর কেড়েছেন, কিন্তু তার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিলেন না, এ কথাও বলেছেন তিনি।"
ম্যাচসেরা হয়েছেন শাহীন শাহ আফ্রিদি, দুর্দান্ত অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের জন্য।
তিনি জানিয়েছেন, ব্যাট ও বলে অবদান রাখতে পেরে আনন্দিত এবং এই পুরস্কার উৎসর্গ করেছেন স্ত্রী ও ছেলেকে।
ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল প্রসঙ্গে শাহীন শেষে শুধু বলেন, "আমরা প্রস্তুত।"
'বাজে ব্যাটিং, জঘন্য ব্যাটিং'
ঘরোয়া ক্রিকেটার ও ক্রিকেট উপস্থাপক সৈয়দ আবিদ হুসেইন সামি বলেন, "বাংলাদেশের ব্যাটিং ছিল বাজে, জঘন্য।"
তিনি বলেন, "আসলে মিডল অর্ডারের ক্রিকেট মানেই এমন ব্যাটিং, শুধু ছক্কা মারা ক্রিকেট নয়। আজ দশ ওভার পর্যন্ত পাঁচটি ছক্কা পড়েছে, কিন্তু তাতে লাভ কী? আফগানিস্তানের বিপক্ষে কুশল মেন্ডিসও ছক্কা না মেরে ইনিংস গড়েছিলেন।"
বাংলাদেশের ব্যাটাররা ম্যাচের শুরু থেকেই নড়বড়ে ব্যাটিং করেন, "যখন কোনো ব্যাটসম্যানকে দেখে বারবার মনে হয়, এখনই হয়তো আউট হয়ে যাবেন, তখন সেটি খারাপ ব্যাটিং ছাড়া আর কিছু নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নামলে শুধু কে কার জায়গায় খেলছে তা নয়, বরং এক্সিকিউশনের মানটাই বড় কথা। সেখানে যদি প্রতিটি বলেই আউট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, তবে সেটি নিঃসন্দেহে বাজে ব্যাটিং।"
বাংলাদেশের ব্যাটিং 'হতাশাজনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন' বলে আখ্যা দিয়েছেন এই বিশ্লেষক।
নতুন বলে এক প্রান্তে ছিলেন শাহীন শাহ আফ্রিদি। পাওয়ারপ্লেতে তার পরিসংখ্যান দাঁড়ায় ৩-০-১১-২, যেখানে প্রথম ওভারেই স্বভাবসুলভ সাফল্য পান তিনি।
তবে অন্য প্রান্তের বোলারদের বিরুদ্ধে আক্রমণে যায় বাংলাদেশ।
ফাহিম আশরাফ ফুল লেংথে বল করলে সাইফ হাসান তাকে মিড-অনের ওপর দিয়ে ছক্কা হাঁকান।
পরের ওভারেই হ্যারিস রউফকে এক ছক্কা ও এক চার মারেন সাইফ।
রউফও পরের ওভারেই ঘুরে দাঁড়ান; তার বাউন্সারে সাইফের ব্যাটে লেগে পয়েন্টে দাঁড়ানো আয়ুবের হাতে লুয়াচ আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরেন।
এরপর নুরুল হাসান প্রথম বলেই ছক্কা হাঁকান।
কিন্তু বাংলাদেশ এরপর বড় শট ধরে রাখতে পারেনি; বেশিরভাগ বলই গিয়েছে বাউন্ডারি লাইনে দাঁড়ানো ফিল্ডারদের হাতে। দলের হয়ে সর্বোচ্চ রান করেন শামীম হোসেন, ২৫ বলে ৩০ রান।
তিনিই একমাত্র ব্যাটার যিনি ২০-এর ঘর পেরিয়েছেন।
বাংলাদেশের ক্ষীণ আশা শেষ হয়ে যায় যখন আফ্রিদি পুরনো বলে ফিরে এসে শামীমকে আউট করেন।
বাংলাদেশের ক্রিকেটের নিয়মিত অনুসারী উদয় সিনা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে। থাকাটাও খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু মাঠে নেমে যদি ন্যূনতম মাথা খাটিয়ে খেলতে না পারেন, তাহলে হাজার সামর্থ্য থাকলেও তা কাজে আসে না। যেমনটা আসেনি এই ম্যাচে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে।"
কীভাবে, কোন পরিস্থিতিতে হারলো বাংলাদেশ
ডেথ ওভারের শুরুতে হিসেবের খাতায় খানিকটা হলেও এগিয়ে ছিল বাংলাদেশ।
কিন্তু সহজ এক ক্যাচ মিসের সুযোগ কাজে লাগিয়ে মোহাম্মদ নাওয়াজ ব্যাট হাতে মাত্র ১৫ বলে ২৫ রানের ইনিংসে ছক্কা-চারে পাকিস্তানকে এনে দেন প্রতিযোগিতামূলক সংগ্রহ।
এই উইকেটে যেখানে বড় শট খেলা ছিল কঠিন। অন্যদিকে, বাংলাদেশের ইনিংস ডেথ ওভারে পৌঁছায় বড় রান রেটের চাপ নিয়ে।
পাকিস্তানি পেসারদের বুদ্ধিদীপ্ত বোলিং সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
মাঝের ওভারে বাংলাদেশের তিনটি সহজ ক্যাচ মিস ও একটি রানআউট সুযোগ হাতছাড়া করার প্রভাব পড়ে শেষ দিকের ব্যাটিংয়েও।
টস জিতে বল করার সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরুতেই সাফল্য পায় বাংলাদেশ। রিশাদ হোসেন ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে দারুণ ক্যাচ তুলে নেন, ফেরান সাহিবজাদা ফারহানকে। কিছুক্ষণ পর সাইম আয়ুবও শূন্য রানে ফিরে যান, শেষ ছয় ইনিংসে এটি তার চতুর্থ ডাক।
মুস্তাফিজুর রহমান ও তানজিম সাকিব গতি কমিয়ে নিখুঁত লাইন-লেন্থে বোলিং করেন, রান তোলা কঠিন করে তোলেন পাকিস্তানের জন্য। যদিও ফখর জামান তিনটি বাউন্ডারি মারেন, তবে ছয় ওভারে পাকিস্তানের সংগ্রহ মাত্র ২৭/২, এই এশিয়া কাপে দুবাইয়ে সবচেয়ে কম পাওয়ারপ্লে স্কোর।
ইনিংস পুনর্গঠনের চেষ্টা করতে গিয়েও ব্যর্থ হয় পাকিস্তান।
প্রথম দুই ওভারেই দুই উইকেট তুলে নেন রিশাদ হোসেন। লং-অনে ক্যাচ দেন ফখর জামান, ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ধরা পড়েন হুসেইন তালাত। লেগ স্পিনারের বল খেলা ছিল বেশ কঠিন।
অধিনায়ক সালমান আগাও সংগ্রাম করেন, তবে শেষ পর্যন্ত মুস্তাফিজের বলে ইনসাইড এজে ধরা পড়েন কিপারের হাতে, ২৩ বলে ১৯ রানেই থামেন তিনি।
শেষ দিকে মোহাম্মদ হারিস ও শাহীন আফ্রিদি কিছু বড় শট খেলেন। সঙ্গে বাংলাদেশের ফিল্ডারদের তিনটি সহজ ক্যাচ মিস পাকিস্তানকে ডেথ ওভারে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।
অন্যদিনে বাংলাদেশের ইনিংসে ডেথ ওভারে গিয়ে চাপ পুরোপুরি বাংলাদেশের ওপর গিয়ে পড়ে। পাকিস্তানি পেসাররা স্লোয়ার ডেলিভারিতে ব্যাটারদের বিভ্রান্ত করেন।
তানজিম সাকিবকে বোল্ড করেন হ্যারিস রউফ।
এরপরও রিশাদ হোসেন ও মুস্তাফিজ ব্যাট ঘুরিয়ে লড়াই চালিয়ে যান শেষ ওভার পর্যন্ত।
নাওয়াজ একটি সহজ ক্যাচ ফেললেও সেটি আর পাকিস্তানের ক্ষতি করেনি।
শেষ তিন বলে প্রয়োজন ছিল ১৮ রান। রিশাদ প্রথম বলে রউফকে সোজা ব্যাটে ছক্কা মারলেও সেটিই ছিল শেষ বড় শট।
এই হারের সঙ্গে এশিয়া কাপে বাংলাদেশের যাত্রা শেষ হয়েছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান তৃতীয়বারের মতো মুখোমুখি হতে চলেছে ভারতের, তবে এটাই এশিয়া কাপের ইতিহাসে পাকিস্তান ও ভারতের প্রথম ফাইনালে দেখা।