সুরমা বা কাজলের হাজার বছর পুরোনো বিস্ময়কর ইতিহাস

ছবিতে দেখা যাচ্ছে চোখে গাড় কাজল দেওয়া একজন বেদুইন নারী জমকালো পোশাক পরেছেন। তার কপালে ও মাথার দুইপাশে অলংকার। স্বচ্ছ কাপড়ে মুখ ও নাক ঢেকে রেখেছেন। পোশাকটি একটি প্রাণবন্ত লাল কাপড়ের তৈরি, যার মধ্যে রয়েছে জটিল সোনালী নকশা।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আরবের কাজলের তাৎপর্যকে স্বীকৃতি দিয়ে এটিকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত করেছে ইউনেস্কো
    • Author, কর্নি শার্প ও লারা ওয়েন
    • Role, বিবিসি গ্লোবাল উইমেন

চোখে কালো কাজলের কদর কেবল কবিরাই দিয়েছেন, এমন নয়। বিশ্বের নানা প্রান্তে, এশিয়া থেকে ইউরোপে, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে আছে কাজল। কাজলের ঐতিহ্যকে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কোও।

গত ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কো আরবের কাজলের তাৎপর্যকে স্বীকৃতি দিয়ে এটিকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত করে।

"আমি যখন আমার ব্রুকলিনের (আমেরিকা) ফ্ল্যাটে, বাড়ি থেকে অনেক দূরে বসে আইলাইনার পরি, তখন মনে হয় আমি আমার মা, আমার দাদী এবং মধ্যপ্রাচ্যের অসংখ্য নারীর সঙ্গে এক ধরনের সংযোগ তৈরি করছি," বিবিসি গ্লোবাল উইমেনকে বলেন সাংবাদিক জাহরা হানকির।

ঐতিহ্যগতভাবে নারী-পুরুষ উভয়েই চোখে কাজল বা সুরমা ব্যবহার করে আসছে। এর ইতিহাস হাজার হাজার বছর পুরোনো, সভ্যতার প্রাচীন যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত।

রমজান মাসে নামাজ পড়ার আগে নেপালের এক মুসলিম পুরুষ তার চোখে ভেষজ 'সুরমা' লাগিয়ে নিচ্ছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, রমজান মাসে মসজিদে নামাজ পড়ার আগে নেপালের এক মুসলিম পুরুষ তার চোখে ভেষজ 'সুরমা' লাগিয়ে নিচ্ছেন, ছবি - ২০১৮

আরব বিশ্বে একে বলা হয় কুহল, কিন্তু অন্য অঞ্চলে এর নাম ভিন্ন। দক্ষিণ এশিয়ায় কাজল বা ক্ষেত্রবিশেষে সুরমা, ইরানে সোরমে, নাইজেরিয়ায় তিরো, ইংরেজিতে কোল বা আইলাইনার।

ঐতিহ্যগতভাবে এটি সাধারণত অ্যান্টিমনি, সীসা বা অন্যান্য খনিজ পদার্থ দিয়ে তৈরি হতো। আধুনিক কাজলজাতীয় পণ্যে আরও নানা ধরনের উপাদান ব্যবহার হয়।

ব্রিটিশ-লেবানিজ লেখক হানকিরের কাছে এই প্রসাধন সামগ্রীটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তার পরিবার ১৯৭৫ সালের গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে লেবানন ছেড়ে ইংল্যান্ডে চলে গিয়েছিল।

"আমরা যখন বিদেশে থাকতাম, তখন আমি মাকে মেকআপ করতে দেখতাম। আমার মনে হতো, তিনি যেন খুব গভীর কোনো কিছুর সঙ্গে সংযুক্ত হচ্ছেন" বলেন তিনি।

চোখে আইলাইনার দেওয়ার সময় এখনো তিনি সেই একই সংযোগের অনুভূতি পান বলে জানান।

কাজল রাখার পাত্রকে সাধারণত মাখালা বলা হয়, আর চোখে কাজল লাগানোর যে কাঠি ব্যবহার হয় তার নাম মেরওয়াদ।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কাজল বা সুরমা রাখার পাত্রকে সাধারণত মাখালা বলা হয়, আর চোখে কাজল লাগানোর যে কাঠি ব্যবহার হয় তার নাম মেরওয়াদ

'আইলাইনার: আ কালচারাল হিস্ট্রি' বইয়ের লেখক হানকির বলেন, ইউনেস্কোর স্বীকৃতি কাজলকে "কোনো ফ্যাশন ট্রেন্ড বা পণ্য হিসেবে নয়, বরং একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক চর্চা হিসেবে তুলে ধরেছে, যা সংরক্ষণ করার উপযোগী।"

তিনি ব্যাখ্যা করেন, "এই ধরনের স্বীকৃতি কাজল তৈরির ও ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত জ্ঞান, রীতিনীতি ও কারুশিল্পকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। এতে করে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক রূপচর্চার সংস্কৃতির চাপে হারিয়ে যাওয়ার বদলে ঐতিহ্য নথিভুক্ত হয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিশেষ মূল্য বহন করে।"

এক সন্ধ্যায় ইরানি এক বন্ধুর সঙ্গে রাতের খাবারের সময় হানকির যখন কাজলের একটি পাত্র বের করেন, তখন এর ইতিহাস ও প্রতীকি অর্থ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

সেই কথোপকথনই তাকে কাজল এবং সামগ্রিকভাবে আইলাইনারের ইতিহাস নিয়ে গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে অনুপ্রাণিত করে।

"সেই সময় আমি বুঝতে পারি, কাজল নারী, সংখ্যালঘু নারী এবং প্রবাসে বসবাসকারী নারীদের কাছে কতটা গভীর অর্থ বহন করে," তিনি বলেন।

সৌন্দর্যের ধারণা ছাড়িয়ে কাজল

A head sculpture of Egyptian Queen Nefertiti on a black background. Showing her wearing black eyeliner.

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ১৯০০ শতকের গোড়ার দিকে মিশরীয় রানী নেফারতিতির আবক্ষ মূর্তি বিশ্বের সামনে উন্মোচিত হয়েছিল

প্রাচীন মিশর, মেসোপটেমিয়া ও পারস্য সভ্যতায় কাজলের শেকড় খুঁজে পাওয়া যায়। হানকিরের মতে, প্রাচীন মিশরে লিঙ্গ বা শ্রেণি নির্বিশেষে সবাই কাজল ব্যবহার করত।

"শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, আরও অনেক উদ্দেশ্যে তারা এটি ব্যবহার করত," ব্যাখ্যা করেন তিনি। কাজলের মাধ্যমে তারা আধ্যাত্মিক অনুভূতি প্রকাশ করত এবং এটি চোখকে রোগ থেকে রক্ষা করত বলেও বিশ্বাস করা হতো।

"প্রাচীন মিশরীয়রা তাদের কবরে কাজলের পাত্র দিত, যাতে পরকালে সেটি নিয়ে যেতে পারে, এতেই বোঝা যায় এটি তাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।"

আইলাইনার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সম্ভবত মিশরীয় রানী নেফারতিতিই ছিলেন মূল 'ইনফ্লুয়েন্সার' বা প্রভাবশালী ব্যক্তি, বলেন হানকির।

সাংবাদিক জাহরা হানকির হাসিমুখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছেন। তার মাথায় কোঁকড়ানো কালো চুল, কালো হাতাকাটা জামা পরা, দুই কানে সোনালী মোটা রিং

ছবির উৎস, Zahra Hankir

ছবির ক্যাপশান, সাংবাদিক জাহরা হানকির কাজলের ইতিহাস খুঁজে বের করতে বিশ্ব ভ্রমণ করেছেন

১৯১২ সালে নেফারতিতির বিখ্যাত আবক্ষ মূর্তি যখন জার্মান প্রত্নতাত্ত্বিক লুডভিগ বোরচার্ডের নেতৃত্বে একটি দল আবিষ্কার করে, তখন তাতে স্পষ্টভাবে কাজলের ব্যবহার দেখা যায়।

হানকির তার বইয়ে লেখেন, "তার ভ্রু সুন্দরভাবে খিলান করে বাঁকানো, নিখুঁত আকৃতির এবং ধোঁয়াটে কালো রঙে ভরাট করা, সম্ভবত কাজল দিয়েই। রঙের তারতম্যের ধরন স্পষ্ট, কিন্তু রানীর সামগ্রিক সৌন্দর্য একদম সাবলীল।"

হানকির বলেন, জার্মানির নারীরা নেফারতিতির এই 'এক্সোটিক' বা ভিন্নধারার চেহারা অনুকরণ করতে কাজল ব্যবহার করতে শুরু করেন এবং এটিকে সৌন্দর্য, কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখেন।

নেফারতিতির মেকআপ আজও জনপ্রিয় ও কোলোত্তীর্ণ।

"ইউটিউব, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে শত শত টিউটোরিয়াল রয়েছে, যেখানে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে রানির মুখভঙ্গি অনুকরণ করা হয়," হানকির তার বইয়ে লেখেন।

কাজল থেকে আইলাইনার

জাপানি একজন নারীর মুখের ওপরের অংশ দেখা যাচ্ছে। তার মুখে সাদা মেকআপ, চোখের ওপরের পাতায় কালো ও নিচের পাতায় লাল আইলাইনার। মাথায় লাল ফিতা, সোনালী একটি অলঙ্কার এবং গোলাপী ও বেগুনি রংয়ের ফুলের মালা ঝুলছে। ফুলের মালার মাঝখানে সবুজ পাতার মতো পেঁচানো ফিতা। মালায় একটি সোনালী রংয়ের প্রজাপতি লাগানো আছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জাপানের গেইশার শিল্পী গোষ্ঠী লাল আইলাইনার ব্যবহার করেন, এটি মন্দ আত্মাকে তাড়াতে সাহায্য করে বলে বিশ্বাস করা হয়
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

আইলাইনার নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে হানকির পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘুরেছেন, কেরালা থেকে সাড, মেক্সিকো, জর্ডান ও জাপান পর্যন্ত। তার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে আইলাইনারের ব্যবহার ও অর্থ ভিন্ন হলেও সুরক্ষার একটি রূপ হিসেবে এর ভূমিকা প্রায় সর্বত্রই একই ধরনের।

সূর্যের তাপ ও 'নজর লাগা' থেকে রক্ষা থেকে শুরু করে ধর্মীয় আচার থেক ঔষধি উদ্দেশ্য পর্যন্ত এর ব্যবহার হয়।

শিশুদের চোখেও প্রায়ই কাজল লাগানো হয়, অনেকে মনে করেন, এটি সুরক্ষা দেয়।

যেমন ধরুন বাংলাদেশে একটা সময় যেভাবে একদম ছোট্ট শিশুদের কপালে কাজল দিয়ে টিপ বা চোখ সাজানো হতো, এখনো সেটার চল অনেকের মধ্যে আছে।

জাপানে হানাকির ঐতিহ্যবাহী বিনোদন শিল্পী গেইশা নারীদের সঙ্গে কথা বলেন, যারা সংগীত, নৃত্য ও কথোপকথনে দক্ষ। তারা লাল আইলাইনার ব্যবহার করেন, যা সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে আজও টিকে আছে।

অন্যদিকে, মেক্সিকান-আমেরিকান চোলা সংস্কৃতিতে আইলাইনার পরিচয়, প্রতিরোধ ও সাংস্কৃতিক গর্বের শক্তিশালী প্রতীক বলে জানান হানকির।

আর প্রাচীন মিশরের মতোই, বিশ্বের কিছু অঞ্চলে আইলাইনার শুধু নারীরাই ব্যবহার করেন না।

চাদে হানকির সময় কাটান ওয়াদাবি নামের এক যাযাবর ফুলানি গোষ্ঠীর সঙ্গে, যারা তাদের বার্ষিক সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার জন্য পরিচিত, যেখানে নারীরা পুরুষদের সৌন্দর্য বিচার করেন।

তিনি হেসে বলেন, "জর্ডানের পেত্রায় বেদুইন পুরুষরা শুধু সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা বা ধর্মীয় অনুভূতি প্রকাশের জন্যই নয়, তারা একারণেও আইলাইনার পরেন যে তারা জানেন যে এতে তাদের দেখতে সুন্দর লাগে।"

"এটি পুরুষত্বে প্রবেশের একটি রীতি এবং সিঙ্গেল বা অবিবাহিত থাকারও একটি চিহ্ন।"

অনেক বেদুইন পুরুষ ব্যবহারিক কারণেই ঐতিহ্যবাহী কাজল ব্যবহার করেন

ছবির উৎস, Getty Image

ছবির ক্যাপশান, অনেক বেদুইন পুরুষ ব্যবহারিক কারণেই ঐতিহ্যবাহী কাজল ব্যবহার করেন

আরবি ভাষাভাষী দেশগুলোতে 'কাজল' বা 'কাহিলাইন' নামেও এটি প্রচলিত, যা কাজলের সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে তুলে ধরে।

হানকির বলেন, কাজলকে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি "অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল।"

এটি "বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলের, বিশেষ করে আরব বিশ্বের সেইসব জনগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেয়, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। বাস্তুচ্যুতি, ঔপনিবেশিকতা ও সাংস্কৃতিকভাবে বিলোপ হয়ে যাওয়ার চাপের মাঝেও।"

তবে লেখকের কাছে কাজল লাগানোর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি তার নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগের কারণে। যেটি কাজলের একটি ঐতিহাসিক মাহাত্ম্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মাঝে নিয়ে যায়।

তার মতে "এটা প্রায় এক ধরনের আধ্যাত্মিক চর্চা। কাজল লাগানোটা যেন এক ধরনের আচার-অনুষ্ঠান। আপনি তখন শুধু চোখের নিচের রেখা বা ওপরের পাতায় একটি দাগ টানছেন না, বরং এর চেয়েও অনেক বেশি কিছুর সঙ্গে আপনি সংযুক্ত হচ্ছেন।"