এডিটার'স মেইলবক্স: বিবিসি বাংলা রেডিও বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন

প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাহিত্যিক জর্জ অরওয়েল-এর লেখা এক কথিকা পাঠ করে বিবিসি বাংলার প্রথম রেডিও অনুষ্ঠান প্রচারিত হয় ১৯৪১ সালের ১১ই অক্টোবর। ছবিতে বিবিসির প্রধান কার্যালয়ের সামনে অরওয়েলের ভাস্কর্য।
ছবির ক্যাপশান, প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাহিত্যিক জর্জ অরওয়েল-এর লেখা এক কথিকা পাঠ করে বিবিসি বাংলার প্রথম রেডিও অনুষ্ঠান প্রচারিত হয় ১৯৪১ সালের ১১ই অক্টোবর। ছবিতে বিবিসির প্রধান কার্যালয়ের সামনে জর্জ অরওয়েলের ভাস্কর্য।
    • Author, সাবির মুস্তাফা
    • Role, সম্পাদক, বিবিসি নিউজ বাংলা

আমাদের অনেক শ্রোতা-পাঠকের জন্য গত সপ্তাহে বড় এবং অনেকাংশে বেদনাদায়ক খবর ছিল বিবিসি বাংলার রেডিও সার্ভিস বন্ধ করার ঘোষণা। প্রায় ৮২ বছর সম্প্রচারের পর বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস তাদের বাংলা রেডিও বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আজ শুরু করছি একজন প্রবীণ শ্রোতার চিঠি দিয়ে, যিনি বিগত কয়েক দশক ধরে শুধু যে আমাদের অনুষ্ঠান শুনেছেন বা প্রীতিভাজনেষুতে চিঠি লিখেছেন, তাই নয়। তিনি আমাদের উপদেশ দিয়েছেন, ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন, ভাল করার পথ দেখিয়েছেন। রাজশাহীর হাসান মীর সব সময়ই বিবিসির পাশেই ছিলেন:

''জীবনে কিছুই থাকে না স্মৃতি ছাড়া। বিবিসি বাংলা রেডিও-ও স্মৃতি হতে চলেছে, স্মৃতি হয়েই আমাদের অনেকের মনে আরও অনেক দিন বেঁচে থাকবে। অথচ বিবিসি বাংলার সঙ্গে আমার অন্তত পঞ্চান্ন বছরের অনেক স্মৃতি।

''আমরা সমবয়সীও বটে, আমারও জন্ম ১৯৪১ সালে। রোগ, শোক আর পঙ্গু জীবন নিয়ে আমি তবু এখনো টিকে আছি, নিয়মিত বিবিসি'র অনুষ্ঠান শুনি, যদিও সেই আগের দিনের বিবিসি বাংলা আর এখন নেই - এ কথাও মানি। অথচ বিবিসি বাংলার বিদায় ঘণ্টা শুনতে পাচ্ছি।

''যাকগে, কথা বাড়াবো না। বিবিসি বাংলার সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন এবং এখনো আছেন তাঁদের সবার মঙ্গল হোক। সবাই ভালো থাকুন।''

রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত বিবিসি বাংলার শ্রোতা সম্মেলনে মন্তব্য করছেন হাসান মীর।
ছবির ক্যাপশান, রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত বিবিসি বাংলার শ্রোতা সম্মেলনে মন্তব্য করছেন হাসান মীর।

আপনারা ছিলেন বলেই বিবিসি বাংলা রেডিও ৮০ বছর পার করেছে হাসান মীর। কিন্তু আমাদের এখন বিবিসি বাংলাকে আগামী প্রজন্মের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হবে। সেজন্য এই পরিবর্তন।

তবে বিবিসি বাংলার বিদায় ঘণ্টা বাজতে আরো অনেক দেরি আছে বলেই আমার বিশ্বাস। আপনিও ভাল থাকুন হাসান মীর, সুস্থ থাকুন।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

বিবিসি বাংলা রেডিও কোথায়?

পরের চিঠি লিখেছেন চাঁপাই নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থেকে সামিরা সুলতানা লিজা:

''এই তো গত সপ্তাহে আমি বিবিসি বাংলায় মেইল করা শুরু করলাম, পড়া হলো আমার প্রথম মেইল আর প্রকাশ হলো ওয়েবসাইটেও। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় তারপরই শুনলাম বিবিসি বাংলা চিরদিনের মতো রেডিওতে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

''আসলে দুঃখটা ওই খানেই, কেননা আমি সংসারের কাজ করতে করতে এফএম রেডিওতে শুনে নিতাম সন্ধ্যা আর রাতের অনুষ্ঠানগুলো। তাহলে কী হবে আধা ঘণ্টার সংবাদ,বিশেষ প্রতিবেদন তথা নানা অনুষ্ঠানে ভরপুর এই বিবিসি বাংলার? রেডিওতে শুনার সুবিধা কি ওয়েবসাইটে পড়ে পাওয়া যাবে?

''আর ভিডিও তো পাবো না টাটকা টাটকা। কখন ভিডিও আপলোড হবে, আর কখনই বা দেখবো। যাই হোক, রেডিও অনুষ্ঠানগুলোর কি হবে তা সম্পর্কে বিস্তারিত বলবেন কি?''

রেখা আলী, বিবিসি বাংলায় ১৯৪০ এর দশকে অনুষ্ঠান উপস্থাপন করতেন।
ছবির ক্যাপশান, রেখা আলী, বিবিসি বাংলায় ১৯৪০ এর দশকে অনুষ্ঠান উপস্থাপন করতেন।

রেডিও সম্প্রচার বন্ধ হওয়ার মানেই হল, আমাদের সকল রেডিও অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে মিস সুলতানা।

এত দিন আমরা যা করেছি, বিশ্ব সংবাদ থেকে শুরু করে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এই প্রীতিভাজনেষু পর্যন্ত, সবই তখন ইতিহাস হয়ে যাবে। সেগুলো শুধু আমার আপনার স্মৃতিতেই রয়ে যাবে।

সঠিক ও নিরপেক্ষ সংবাদ

পরের চিঠি লিখেছেন খুলনার ডুমুরিয়া থেকে নাজমুল হোসেন জোয়ার্দ্দার:

''আমি ১৯৮০ সাল থেকে বিবিসির একজন নিয়মিত শ্রোতা। যত প্রচার মাধ্যম থাকুক না কেন, বিবিসির মত এমন সঠিক ও নিরপেক্ষ সংবাদ ও বিশেষ প্রতিবেদন অন্য কোনো প্রচার মাধ্যম করতে পারে কিনা, আমার জানা নেই।

''কিন্তু যখন জানতে পারলাম যে, ৮০ বছরের ঊর্ধ্বে প্রচারিত বিবিসি বাংলা অনুষ্ঠান আগামীতে আর্থিক সংকটের কারণে রেডিওতে আর প্রচারিত হবেনা, তখন আমার হৃদয়টা ভেঙ্গে গেলো।

''তাই বিবিসি কর্তৃপক্ষের নিকট আমার আকুল আবেদন যে, বিবিসির এই বাংলা বিভাগটা রেডিওতে চালু রাখা যায় কিনা?''

বুশ হাউসে বাংলা বিভাগ, ১৯৯৯: (বাঁ থেকে সামনের সারি) বিশাখা ঘোষ, মাসুদ খান, সাবির মুস্তাফা, মানসী বড়ুয়া, শাকিল আনোয়ার আর তীর্থঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। (বাঁ থেকে পেছনের সারি) ঈশানী দত্ত রায়, জুনায়েদ আহমেদ, আতিকুস সামাদ আর কৌশিক শঙ্কর দাস।
ছবির ক্যাপশান, বুশ হাউসে বাংলা বিভাগ, ১৯৯৯: (বাঁ থেকে সামনের সারি) বিশাখা ঘোষ, মাসুদ খান, সাবির মুস্তাফা, মানসী বড়ুয়া, শাকিল আনোয়ার আর তীর্থঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। (বাঁ থেকে পেছনের সারি) ঈশানী দত্ত রায়, জুনায়েদ আহমেদ, আতিকুস সামাদ আর কৌশিক শঙ্কর দাস।

বিষয়টি শুধু আর্থিক সঙ্কট না মি. জোয়ার্দ্দার। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মত বাংলাদেশেও রেডিও শ্রোতা সংখ্যা ক্রমশ কমছে।

যারা খবর ফলো করেন, তাদের আর বিবিসির জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। সারা দিন তারা টেলিভিশন, অনলাইন আর সামাজিক মাধ্যম থেকে খবর সংগ্রহ করে তাদের চাহিদা মেটান।

আমরা এখন ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে সবাই যে কোন সময়, যে কোন স্থানে হাতের ডিভাইস দিয়ে তার খবর, বিশ্লেষণ এমনকি বিনোদনের চাহিদা মেটাতে পারেন।

এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই বিবিসি পুরোপুরি ডিজিটাল সম্প্রচারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাসহ দশটি ভাষায় রেডিও বন্ধ করার প্রস্তাব সেই কৌশলেরই অংশ।

আরো পড়ুন:

বুশ হাউস রেডিও স্টুডিও, ২০০৭ সাল: বাংলাদেশের তৎকালীন বিরোধী নেত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন বিবিসি বাংলার সম্পাদক সাবির মুস্তাফা
ছবির ক্যাপশান, বুশ হাউস রেডিও স্টুডিও, ২০০৭ সাল: বাংলাদেশের তৎকালীন বিরোধী নেত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন বিবিসি বাংলার সম্পাদক সাবির মুস্তাফা

লক্ষ শ্রোতার হৃদয় ব্যথিত

গাইবান্ধার দাড়িয়াপুর থেকে মাহবুবুর রহমান মামুন বলছেন, তাদের আশঙ্কা ছিল শর্টওয়েভ বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু রেডিও একেবারেই চলে যাবে তা তারা ভাবেন নি:

''এতদিন আমরা সবাই ভাবছিলাম যে, শর্টওয়েভ বন্ধ হয়ে গেলেও এফ.এম এবং ইন্টারনেটে আপনাদের অনুষ্ঠান শুনতে পাবো।

''কিন্তু সকল শ্রোতার ভাবনাকে ত্বরান্বিত করে বিবিসি বাংলার বাকি দুটি অধিবেশনও একেবারেই বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। এই খবরে লক্ষ লক্ষ শ্রোতার হৃদয় আজ ব্যথিত।

''হয়ত, প্রিয় উপস্থাপকগুলোর অনেকেই বিবিসি থেকে বিদায় নেবেন। যে যেখানে থাকবেন ভাল থাকবেন। সবার জন্য দোয়া ও ভালবাসা রইলো।''

আপনাকে ধন্যবাদ মি. রহমান। বিবিসি বাংলা রেডিও থেকে সরে গেলেও, বাংলা ভাষা-ভাষীদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে না। টেলিভিশন, অনলাইন, সামাজিক মাধ্যম, অন্যান্য সব জায়গাতেই আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

অক্টোবর, ২০০২ সাল: ঢাকায় বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন কাদের কল্লোল।
ছবির ক্যাপশান, অক্টোবর, ২০০২ সাল: ঢাকায় বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন কাদের কল্লোল।

ব্রিটেনের অর্থনীতি সচল রাখার উপায়?

পরের চিঠি লিখেছেন রংপুরের লালবাগের হাট থেকে মহসীন আলী:

''বিবিসি কর্তৃপক্ষ বাংলা সহ দশটি ভাষায় রেডিও সম্প্রচার বন্ধের কারণ হিসেবে, ব্রিটেনের চলমান মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কিছু কর্মকর্তা কর্মচারীর বেতন বাঁচিয়ে তাদের অর্থনীতি সচল রাখার কথা বলছে।

''এখন প্রশ্ন হলো, এভাবে কি তা অর্জন করা সম্ভব? আর এসব বিভাগে কর্মরত ব্যক্তিরাই বা যাবে কোথায়? এ'কাজটি কি বিবিসির সম্পাদকীয় নীতিমালায় ছিল বা বিবিসির মুল্যবোধকে কি সমর্থন করে?

''বিবিসি কর্তৃপক্ষ হয়তবা তাদের দেশ ও জাতির বৃহৎ স্বার্থের কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্তটি নিয়েছে। তাতে আমাদের আপত্তি নেই। যদিও এখন সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে তথ্য প্রাপ্তি সহজ হয়েছে, তারপরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া এবং তা যাচাই করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েই গেছে।''

চিঠি-পত্রের আসর প্রীতিভাজনেষুর জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন সেরাজুর রহমান আর কমল বোস।
ছবির ক্যাপশান, চিঠি-পত্রের আসর প্রীতিভাজনেষুর জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন সেরাজুর রহমান আর কমল বোস।

আপনার চিঠি পড়ে আমার মনে হয়েছে আপনি কোন জায়গায় কিছু বিভ্রান্তিমূলক তথ্য পেয়েছেন মি. আলী। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস যে পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে, তার সাথে কোন দেশ বা জাতির বৃহৎ স্বার্থ জড়িত নেই।

এই প্রস্তাবমালা ব্রিটেনের চলমান মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সাথে বা দেশের অর্থনীতি সচল রাখার সাথেও কোন ভাবে সম্পৃক্ত না। ব্যাপার হল, বিবিসির নিজস্ব বাজেটে বিশাল ঘাটতি হয়েছে, যার জন্য দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা আংশিক দায়ী।

নিজের বাজেট ঠিক করতে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে প্রায় তিন কোটি পাউন্ড সাশ্রয় করতে হবে। সেজন্য অনেক কিছু বন্ধ করে প্রায় ৪০০টি পদ বন্ধ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

ছোটদের জন্য অনুষ্ঠান কাকলী পরিবেশন করছেন নুরুল ইসলাম ও মানসী বড়ুয়া
ছবির ক্যাপশান, ছোটদের জন্য অনুষ্ঠান কাকলী পরিবেশন করছেন নুরুল ইসলাম ও মানসী বড়ুয়া

কোন জরীপের তথ্য?

পরের চিঠি লিখেছেন খুলনার দাকোপ থেকে মুকুল সরদার: 

''সারা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সব খবর তুলে এনে দর্শক শ্রোতা এবং পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যার নিয়মিত কাজ সেই বিবিসি নিজেই এখন সংবাদ শিরোনাম

''বিবিসি বাংলার রেডিও সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাবে এমন খবর প্রচারের পর অনেক প্রশ্ন সকলের মনে। ডিজিটাল প্লাটফর্মে বিবিসি বাংলাকে ঠিক কেমন করে পাওয়া যাবে অর্থাৎ কি কি থাকবে ডিজিটাল মাধ্যমে, নতুন কিছু কি সংযোজিত হবে?

''টেলিভিশনে বিবিসি বাংলাকে সপ্তাহে কয় দিন পাওয়া যাবে? আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে বিবিসি বাংলার রেডিও শ্রোতা কমেছে এমন তথ্য বিবিসি কোন জরিপের মাধ্যমে পেয়েছে?''

খুলনার এক শ্রোতা সম্মেলনে বিভিন্ন রেডিও ক্লাব সদস্যদের সাথে মুকুল সরদার (সর্ব বাঁয়ে)
ছবির ক্যাপশান, খুলনার এক শ্রোতা সম্মেলনে বিভিন্ন রেডিও ক্লাব সদস্যদের সাথে মুকুল সরদার (সর্ব বাঁয়ে)

ডিজিটাল মাধ্যমে এখন যা পাচ্ছেন সেগুলো থাকবে মি. সরদার, আর নতুন সংযোজনের বিস্তারিত এখনো ঠিক করা হয়নি। কিন্তু সেখানেও পরিবর্তন আসবে, তা নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই।

টেলিভিশনে প্রযুক্তিমূলক অনুষ্ঠান ক্লিক বন্ধ হয়ে যাবে, কিন্তু বিবিসি প্রবাহ আর বাংলাদেশ ট্রেন্ডিং যথা সময়ে, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার আর সোমবার রাতে চ্যানেল আইতে প্রচারিত হবে।

আর জরিপের ব্যাপারে বলবো, এখানে কোন একটি জরিপ দেখা হয় নি। গত পনেরো বছরে বাংলাদেশে কয়েকটি জরিপ হয়েছে এবং সেখান থেকে চিত্রটি পরিষ্কার হয়ে গেছে। ছোট একটি উদাহরণ দেই - ২০০৭ সালের জরিপে বিবিসি বাংলার রেডিও শ্রোতা ছিল এক কোটি ৮০ লক্ষ, আর ১১ বছর পর ২০১৮ সালে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ২৬ লক্ষে।

ভারতের কিংবদন্তী ক্রিকেটার সুনীল গাভাস্কারের সাক্ষাতকার নিচ্ছেন দীপঙ্কর ঘোষ।
ছবির ক্যাপশান, ভারতের কিংবদন্তী ক্রিকেটার সুনীল গাভাস্কারের সাক্ষাতকার নিচ্ছেন দীপঙ্কর ঘোষ।

রেডিও অনুষ্ঠান কি স্থানান্তরিত হবে?

ভিন্ন একটি প্রশ্ন করে লিখেছেন চাঁপাই নবাবগঞ্জের ভোলাহাট থেকে মোহাম্মদ আব্দুল হাকিম মিঞা:

''বিবিসি বলছে যে, কোন ভাষার অনুষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ হবে না। কোন কোন ভাষার অনুষ্ঠান লন্ডন থেকে স্থানান্তরিত করা হবে। যেমন, বাংলা অনুষ্ঠান লন্ডন থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত করা হবে।

''আমার জানার বিষয় হলো, বিবিসি কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত ১০টি ভাষার রেডিও সম্প্রচার বন্ধ হলে সে অনুষ্ঠানগুলো কোন কোন মাধ্যমে সম্প্রচার করা হবে এবং শ্রোতারা তা কিভাবে শুনতে পাবে?''

আপনি ঠিকই বলেছেন মি. মিঞা যে, বিবিসির প্রস্তাব অনুযায়ী, কোন ভাষা বিভাগ পুরোপুরি বন্ধ হবে না। কয়েকটি ভাষা বিভাগের ক্ষেত্রে, লন্ডনে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়ে সেগুলো নিজস্ব অঞ্চলের ব্যুরোতে স্থানান্তরিত করা হবে।

কিন্তু তার মানে এই না, যে রেডিও অনুষ্ঠান স্থানান্তরিত করা হচ্ছে। সেটা হবে না। বাংলাসহ ১০টি ভাষার রেডিও অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে, অর্থাৎ সেগুলো আর কোন মাধ্যমেই শোনা যাবে না।

মার্চ, ২০১১ সাল। ঢাকার স্টুডিও থেকে প্রথমেবারের মত ভোরের অনুষ্ঠান প্রভাতী পত্রিকা পর্যালোচনা করছেন শাহনাজ পারভীন এবং আকবর হোসেন।
ছবির ক্যাপশান, মার্চ, ২০১১ সাল। ঢাকার স্টুডিও থেকে প্রথমেবারের মত ভোরের অনুষ্ঠান প্রভাতীতে পত্রিকা পর্যালোচনা করছেন শাহনাজ পারভীন এবং আকবর হোসেন।

এটাও কি আরেক চালাকি?

আরো লিখেছেন রাজশাহীর কাশিয়াডাংগা থেকে মোহাম্মদ ফাতিউর রহমান রাকিব:

''যখন শুনলাম বিবিসি বাংলার বাংলা সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যাবে তখন মনে হলো বিবিসি বাংলার সংবাদ শুনতেই রেডিও শুনি, আর বিবিসি বাংলা থাকবেনা, রেডিও শোনা আর হবে না।

''আপনারা কিসের জরিপ করেছেন জানিনা, বলছেন রেডিওর শ্রোতা কমে যাচ্ছে। আমি মনে করি পুরনো শ্রোতা এখনো আছে এবং নতুনও অনেক হচ্ছে ।

''এক দোকানের চাচা বিবিসি বাংলা সংবাদ রেকর্ড করে রেখে সবাইকে নিয়ে শুনে। আমি চাচাকে বললাম বিবিসি বাংলা বন্ধ হবে চাচা, তিনি জবাবে বললেন এইটাও একটা চালাকি বাবা।''

না মি. রহমান এখানে কোন চালাকি নেই। একটু আগেই আমি উদাহরণ দিয়ে দেখালাম রেডিওর শ্রোতা কীভাবে কমে গেছে। একই সাথে ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহারকারীদের সংখ্যা হুহু করে বাড়ছে।

বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম এখন তাদের মোবাইল ডিভাইস ব্যবহার করে বিভিন্ন ওয়েবসাইট বা সামাজিক মাধ্যম থেকে নিউজ সংগ্রহ করে। আমাদেরকেও ডিজিটালের মাধ্যমেই চলতে হবে।

সামনের সারিতে (বাঁ থেকে): মনজুর আহমেদ, শবনম মুশতারী, ফেরদৌসী রহমান, মোর্শিদা করিম, ফরিদা পারভীন, রথীন্দ্রনাথ রায় ও আব্দুর রহমান। দাঁড়ানো: সিরাজুর রহমান, দীপংকর ঘোষ, ঝর্ণা গোর্লে, শ্যামল লোধ, তালেয়া রেহমান ও শাহাদাৎ হোসেন খান।
ছবির ক্যাপশান, বুশ হাউস রেডিও স্টুডিওতে, ১৯৭৯ সাল: সামনের সারিতে (বাঁ থেকে): মনজুর আহমেদ, শবনম মুশতারী, ফেরদৌসী রহমান, মোর্শিদা করিম, ফরিদা পারভীন, রথীন্দ্রনাথ রায় ও আব্দুর রহমান। দাঁড়ানো: সিরাজুর রহমান, দীপংকর ঘোষ, ঝর্ণা গোর্লে, শ্যামল লোধ, তালেয়া রেহমান ও শাহাদাৎ হোসেন খান।

খেটে খাওয়া মানুষের চাহিদা

ঢাকার ধানমন্ডি থেকে শামীম উদ্দিন শ্যামল বলছেন, বিবিসি বাংলার রেডিও বন্ধের ঘোষণা যদিও তার হৃদয়ে বজ্রপাতের মত শুনিয়েছে, তিনি বুঝতে পারছিলেন বিবিসি ডিজিটাল মাধ্যমের দিকেই যাবে। কিন্তু তিনি জানতে চেয়েছেন, যারা ডিজিটাল মাধ্যমে অভ্যস্ত না, তাদের কী হবে:

''আমরা যারা দু'কলম লেখাপড়া শিখেছি কিংবা ডিজিটাল ডিভাইস চালাতে জানি, তারা হয়তো বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ যাচাইয়ের জন্য বিবিসি বাংলাকে মানদণ্ড হিসাবে ব্যবহার করতে পারবো।

''কিন্তু খেটে খাওয়া কৃষক, মাছ বিক্রেতা, সবজি বিক্রেতা, বাদাম ওয়ালা আর শহরের রিক্সা ওয়ালাসহ অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন মানুষজন কিভাবে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য বিবিসি বাংলাকে পাবে?

''আমি চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী আর বর্তমানে ঢাকায় থাকছি, এরকম বহু মানুষ দেখেছি যারা নিরক্ষর, একদম খেটে খাওয়া মানুষ যারা সন্ধ্যা হলে বাটন মোবাইলে লাউডস্পিকার দিয়ে জটলা হয়ে বিবিসি বাংলা শুনে।

''এদের সঠিক বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পাবার ব্যাপারে কী হবে বলতে পারেন? শুধু তারা না, বাংলাদেশের মানুষ নিজ দেশের গণমাধ্যমকে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য কখনো বিশ্বাস করে না।''

এখানে দুটো বাস্তবতা সাংঘর্ষিক অবস্থানে চলে এসেছে মি. শামিম উদ্দিন। আমি ইতোমধ্যেই বলেছি, বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে রেডিওর পতন এবং ডিজিটালের উত্থান। অন্যদিকে, আপনি যে কথা বলছেন সেটাও বাংলাদেশের বাস্তবতার অংশ।

রেডিও বাদ দিয়ে শুধু ডিজিটালের দিকে ঝুঁকলে অনেক মানুষই বাদ পড়ে যাবেন, তারা আমাদের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারবেন না। কিন্তু এখানে বিবিসি সিদ্ধান্ত নিয়েছে সবার চাহিদা মেটানো আর সম্ভব না। সেটা আমাদের বাস্তবতা।

সেজন্য বিবিসি ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে ডিজিটালের দিকেই পা বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশে ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনের সময় ঢাকায় বিবিসি বাংলার অস্থায়ী স্টুডিওতে অনুষ্ঠান পরিবেশন করছেন ফারহানা পারভীন আর মিজান খান।
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনের সময় ঢাকায় বিবিসি বাংলার অস্থায়ী স্টুডিওতে অনুষ্ঠান পরিবেশন করছেন ফারহানা পারভীন আর মিজান খান।

শ্রোতারা হতাশ ও বঞ্চিত

কিন্তু রেডিওর সময় শেষ, বিবিসির এই যুক্তির সাথে মোটেই একমত হতে পারছেন না মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন, যিনি রংপুরের খটখটিয়া থেকে লিখেছেন:

''বিগত কয়েক বছরের পর্যবেক্ষণ, অনুসন্ধান , যাচাই-বাছাই ও অভিজ্ঞতার আলোকে আমি দেখছি সন্ধ্যার পর গ্রাম ও শহরের এমন কিছু শ্রোতা রয়েছে যারা চলতি পথে, চায়ের দোকানে, হোটেল রেস্তোরায়, যানবাহন, শপিং মল থেকে এফ এম অন করে বিবিসির সংবাদ ও প্রতিবেদনগুলো গভীর আগ্রহের সহিত শুনে থাকেন।

''বিবিসির কাছে তাই অনুরোধ যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা জনপ্রিয় এই সংবাদ মাধ্যমটি বন্ধ করে শ্রোতাদের হতাশ ও বঞ্চিত করবেন না।''

আপনার মতামত এবং সেন্টিমেন্টের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আছে মি. হোসেন, কিন্তু আপনার পর্যবেক্ষণের সাথে আমাদের গবেষণার ফলাফলের অনেক ব্যবধান আছে।

বিবিসিতে যারা সিদ্ধান্ত নেন, তারাও বোঝেন বিবিসি বাংলা শ্রোতাদের কাছে কত প্রিয়, তারা জানেন বাংলাদেশে বিবিসি বাংলা রেডিওর প্রতি মানুষের আস্থার কথা। কিন্তু আমি দু:খিত, তাদেরকে গবেষণার নিরিখে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

বুশ হাউস স্টুডিওতে শামসুর রহমানের সাক্ষাতকার নিচ্ছেন সেরাজুর রহমান।
ছবির ক্যাপশান, বুশ হাউস স্টুডিওতে শামসুর রহমানের সাক্ষাতকার নিচ্ছেন সেরাজুর রহমান।

হতাশা ছাড়া কিছু নেই

পরের চিঠি লিখেছেন দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে মেনহাজুল ইসলাম তারেক:

''গত ৩শে সেপ্টেম্বর বিবিসি'র ওয়েবসাইটে খবরটি দেখে যেন নিজের চোখকেও আর বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। বাংলাদেশের নিজস্ব গণমাধ্যম যখন মোটামুটি শেষ, এমন একটা সময় আপনারা রেডিও সংবাদ পরিবেশন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

''আমাদের হতাশ হওয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই। হয়তো সবকিছুর সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, আমাদের জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তারকারী এ সংবাদমাধ্যমটি।

''কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে চিরকালের জন্য জড়িয়ে থাকবে বিবিসি বাংলা'র নাম।''

আমি আপনার সাথে একমত মি. ইসলাম যে, বিবিসি বাংলার রেডিও বন্ধ করার সময়টা হয়তো একটু জটিল হয়ে গেছে, বিশেষ করে বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ নির্বাচনের ১৪-১৫ মাস আগে।

কিন্তু এই সিদ্ধান্ত গোটা ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের ব্যাপক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে নেয়া হয়েছে। আর সত্য কথা বলতে কী, আপনি যখনই এ'ধরনের কোন পরিবর্তন আনতে চাইবেন, তখনই মনে হবে সময়টা ঠিক না। সেজন্য যা করার প্রয়োজন, সেটা তখনই করতে হয়।

ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাতকার নিচ্ছেন শ্যামল লোধ। লন্ডন, ১৯৭৩ সাল।
ছবির ক্যাপশান, ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাতকার নিচ্ছেন শ্যামল লোধ। লন্ডন, ১৯৭৩ সাল।

পত্রের জবাব কীভাবে আসবে?

এবার প্রীতিভাজনেষু নিয়ে প্রশ্ন করেছেন খুলনার কপিলমুনি থেকে মোহাম্মদ শিমুল বিল্লাল বাপ্পী:

''বিবিসি বাংলার রেডিও অনুষ্ঠান কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দেওয়ার খবর গণ মাধ্যমে দেখে দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের মতন আমারও খারাপ লেগেছে।

''বিবিসি বাংলার খবর মানে বাংলা ভাষাভাষী সকল মানুষের একটি বিশ্বস্ত গণ মাধ্যম। আমরা যে সকল শ্রোতা-পাঠক পত্রের মাধ্যমে বিবিসি বাংলাতে লিখি, আমাদের পত্রের জবাব কি অন লাইনে দেওয়া হবে?''

রেডিও বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের চিঠি-পত্রের জবাব এই প্রীতিভাজনেষুতেই দেয়া হবে মি. বিল্লাল। কিন্তু তারপর কী হবে, সেটা আমি এই মুহূর্তে বলতে পারবো না। বিবিসি বাংলার নতুন কাঠামোতে যারা থাকবেন তারাই সিদ্ধান্ত নেবেন।

'আজীবন মনে থাকবে'

সব শেষে লিখেছেন সাতক্ষীরার টেকাকাশিপুর থেকে মুঈন হুসাইন:

''মনটা অত্যন্ত খারাপ হয়ে গেছে খবরটি শুনে। বন্ধ হয় যাবে বহু বছরের সত্য আর আস্থার প্রতীক বিবিসি বাংলা। আমি শ্রোতা ও লেখক হিসাবে বিবিসি বাংলা-র এমন সিদ্ধান্তের কথা জেনে খুবই হতাশ হলাম।

''মহান স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এই নিরপেক্ষ গণমাধ্যমের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। আজও সমান জনপ্রিয় বিবিসি এবং এদের সাংবাদিকরাও অন্য মানের।

''আজীবন মনে থাকবে ও ভীষণ মিস করবো প্রাণের গণমাধ্যম বিবিসি বাংলা রেডিও।''

আপনাকে নিজের মনের কথা বলার জন্য ধন্যবাদ মি. হুসাইন। আমরা বহু বছর বিবিসি রেডিওতে কাজ করেছি, এই মাধ্যম যে কত প্রাণবন্ত একটি মাধ্যম তা আমরা সব সময় উপলব্ধি করেছি।

রেডিওতে সংবাদ শোনার মজা আছে, উত্তেজনাও থাকে। অনলাইনে, এমনকি ভিডিওতেও সেরকম আমেজ সৃষ্টি হয় না, সেরকম উত্তেজনা অনুভব করা যায় না।

কিন্তু সব ভাল জিনিসেরই একটা শেষ থাকে, এবং বিবিসি বাংলা রেডিও তার যাত্রার শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। বাকি রইলো ভাল মত বিদায় দেবার কাজ।