করোনাভাইরাস: বাংলাদেশের অর্থনীতির কোন জায়গায় বেশি ক্ষতি হচ্ছে?

দরিদ্র

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, করোনাভাইরাসের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র মানুষ।
    • Author, আকবর হোসেন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

করোনাভাইরাস ব্যাপক বিস্তারের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি এখন বড় ধরণের বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বলে বিভিন্ন সংস্থা সতর্ক করে দিচ্ছে।

এই প্রভাব সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করবে বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশগুলোতে।

গত সপ্তাহে বিশ্বব্যাংক তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮% নেমে দুই কিংবা তিন শতাংশ হতে পারে।

ঢাকায় একটি ক্যাটারিং সার্ভিসের ব্যবসা করেন আফরোজা খান। শহরের বিভিন্ন অফিসে প্রতিদিন দুপুরের খাবার বিক্রি করে এই প্রতিষ্ঠান।

এছাড়া বিভিন্ন উৎসব এবং নানা পারিবারিক আয়োজনে চাহিদা অনুযায়ী খাবার সরবরাহ করে খান'স কিচেন।

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সরকার দেশজুড়ে যে 'লকডাউন' ঘোষণা করেছে সে কারণে গত একমাস যাবত সবকিছুই বন্ধ।

প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার আফরোজা খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, এমন অবস্থায় তিনি চরম সঙ্কটে পড়েছেন।

"আমার সব টাকা-পয়সা মার্কেটে। যাদের কাছে খাবার দিয়েছি তাদের কাছে টাকা আটকা পড়ে গেছে। এখান থেকে আমি কিভাবে সামলে উঠবো সেটা চিন্তা করতে পারছিনা," বলছিলেন আফরোজা খান।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা খাত

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রতিটি খাত গত একমাসে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে মোটা দাগে- কৃষি, সেবা এবং শিল্প খাতে ভাগ করা হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেব অনুযায়ী, দেশের অর্থনীতিতে এখন সেবা খাতের অবদান প্রায় ৫০ শতাংশ। এছাড়া শিল্পখাত ৩৫ শতাংশ এবং কৃষির অবদান এখন ১৪ শতাংশের মতো।

লকডাউন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, লকাউডনের কারণে বহু মানুষের উপার্জন বন্ধ হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অর্থনীতিবিদ নাজনীন আহমেদ বলেন, গত একমাস অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকায় সেবা খাত ও শিল্পখাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

করোনাভাইরাস বিস্তারের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি কতটা ক্ষতির মুখে পড়বে তার একটি চিত্র দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পর্কে বিশ্বব্যাংক যে ধারণা দিচ্ছে সেটি রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো।

বাংলাদেশ আশা করেছিল ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন মাস পর্যন্ত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৮.২ শতাংশ।

বিশ্ব ব্যাংক বলছে, এখন একই মেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে দুই থেকে তিন শতাংশ। অবস্থা আরো খারাপ হবে ২০২১ সালে।

ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক জাহিদ হোসেন বলেন, "মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত - অর্থবছরের এক-তৃতীয়াংশ করোনা আক্রান্ত।"

মি: হোসেন বলেন, বাংলাদেশে ভোক্তা ব্যয়ের দুটো উৎসব আছে। এটি হচ্ছে রমজান মাস ও ঈদ এবং অন্যটি হচ্ছে পহেলা বৈশাখ।

"পহেলা বৈশাখ আমরা কমপ্লিটলি মিস করে গেছি। রমজান এবং রমজানের ঈদও মিস করার একটা বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে," বলছিলেন মি: হোসেন।

উপার্জন নিয়ে দুশ্চিন্তা

গোলাপ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, লকডাউনের কারণে গোলাপের চাহিদা নেই। ফলে মাঠে নষ্ট হয়ে যাওয়া ফুল ফেলে দিচ্ছেন কৃষক।
Banner image reading 'more about coronavirus'
Banner

করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে অর্থনীতি সংকটে পড়ায় মানুষ তাদের চাকরি এবং ব্যবসা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

ঢাকার কাছে মুন্সিগঞ্জের একটি গ্রামে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন মিনারা বেগম।

হাঁস, মুরগি, গরু-ছাগল পালন করেই তার সংসার চলে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে যাওয়া ঠেকাতে সরকার যেভাবে সবকিছু বন্ধ রেখেছে তাতে মিনারা বেগমের চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

তিনি বলেন, "কোন কিছুই বিক্রি করতে পারতেছি না। এইভাবে চললে না খায়া মারা যামু।"

বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক জাহিদ হোসেন বলছেন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় খরচ করার ক্ষেত্রে এখন মানুষ বেশ সাবধান।

অতিপ্রয়োজনীয় জিনিষ ছাড়া এখন মানুষ অন্য কিছু কিনতে চাইবে না।

মি: হোসেন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় শক্তি হচ্ছে ভোক্তা ব্যয়। অর্থাৎ বিভিন্ন খাতে মানুষ যে টাকা খরচ করে সেটার উপর নির্ভর করে শিল্প প্রতিষ্ঠানও টিকে আছে।

এ জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির উপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে বলে উল্লেখ করেন মি: হোসেন।

অর্থনীতি

ছবির উৎস, NurPhoto

ছবির ক্যাপশান, অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হওয়ায় অনেকে টাকা করতে চাইবে না।

"ভোক্তা ব্যয় আমাদের জিডিপির ৬৯%। এই ব্যয় যদি করা সম্ভব না হয়, এই ব্যয়ের উপর নির্ভরশীল যারা আছেন, ছোট উৎপাদক থেকে শুরু করে শিল্পখাতে এবং সেবা খাতে সবাই বিক্রির সংকটে পড়বে।"

"একটা হোটেল রেস্তোরাঁয় গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করা, রিক্সায় চড়ে ঘুরে বেড়ানো, কাপড়-চোপড় কেনা, প্রসাধনী কেনা, কক্সবাজারে গিয়ে ছুটি কাটানো - এই বিভিন্ন ধরণের ব্যয় যে মানুষ করে, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া মানুষ কিন্তু এখন আর ব্যয় করতে সাহস পাচ্ছে না," বলছিলেন মি: হোসেন।

ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পের বেহাল দশা

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৮০ লক্ষ শিল্প উদ্যোগ আছে। এর মধ্যে ৯৮ শতাংশই হচ্ছে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্প।

বাকি দুই শতাংশ শিল্প হচ্ছে গার্মেন্টস এবং ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে।

তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, করোনাভাইরাস বিস্তারের সময় থেকে শুরু হবে এ পর্যন্ত, অর্থাৎ গত দুইমাসে তাদের তিনশ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে।

ক্ষুদ্র শিল্প

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, করোনা সংক্রমণের কারণে দিশা হারিয়েছে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র শিল্প

অর্থনীতিবিদ নাজনীন আহমেদ বলেন , ক্ষুদ্র, মাঝারি এবং বড় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হাবার কারণে জিডিপির উপর নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করবে।

"আমার জিডিপি যদি ৩২০ বিলিয়ন ডলারের হয় এবং সেখানে যদি শিল্পের অবদান হয় ৩৫ শতাংশ, এবং সেটার ৯৫ শতাংশই এখন বন্ধ, এই তিনমাসে যা উৎপাদন হতে পারতো সেটা আর হচ্ছে না," বলছিলেন নাজনীন আহমেদ।

পোশাক রপ্তানি এবং রেমিটেন্স নিয়ে অনিশ্চয়তা

যেসব দেশে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি করে সেসব দেশে করোনাভাইরাসের বিস্তার হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, রেমিটেন্স। বিশ্বব্যাংক বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে রেমিটেন্স ২২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

এর কারণ হচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলোতে অনেকে চাকরি হারাবে এবং মজুরিও কমে যাবে।

গার্মেন্টস

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের জন্য হুমকি তৈরি করেছে করোনাভাইরাস

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী গার্মেন্টস রপ্তানি এবং রেমিটেন্স - এ দুটো মিলিয়ে বাংলাদেশের জিডিপিতে অবদান প্রায় ১৮ শতাংশ।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, পশ্চিমা অর্থনীতির সাথে বাংলাদেশের ভাগ্যও জড়িয়ে আছে।

"আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য এবং রেমিটেন্স - এ দুটো জায়গায় আমরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। মূল আমদানিকারক দেশগুলোও করোনা আক্রান্ত এবং সেখানে কর্মসংস্থানে অনেক চ্যালেঞ্জ।সুতরাং এই দেশগুলো খাদ্য বহির্ভূত পণ্যের চাহিদা ফিরে আসতে সময় লাগবে। "

তিনি আশংকা করছেন, যেসব দেশে এখন অনেক বাংলাদেশি কাজ করছেন তাদের অনেকেই করোনা পরবর্তীকালে ফিরে আসতে বাধ্য হবে। কারণ সেখানে শ্রমিক ছাঁটাই হবে।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে প্রায় ৯২,০০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এসব প্রণোদনা তখনই কাজে লাগবে যখন বাজার ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবে চলবে।

এসব প্রণোদনার সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু ব্যবসায়ী হয়তো ব্যাংক থেকে টাকা বের করে নিয়ে যাবেন - এমন আশংকাও করছেন অর্থনীতিবিদরা।