কর ফাঁকি কেলেঙ্কারি নিয়ে বিশ্ব জুড়ে তোলপাড়

পানামা পেপার্স নথিতে নাম উঠে আসছে বিশ্বের নানা দেশের ক্ষমতাবান রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও নামী-দামী ব্যক্তির।
ছবির ক্যাপশান, পানামা পেপার্স নথিতে নাম উঠে আসছে বিশ্বের নানা দেশের ক্ষমতাবান রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও নামী-দামী ব্যক্তির।

পানাম পেপার্স নামে কর ফাঁকির কেলেঙ্কারি নিয়ে বিশ্বের ব্রিটেন, রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান সহ বহুদেশে তোলপাড় চলছে।

পানামা-ভিত্তিক একটি আইনজীবী প্রতিষ্ঠান থেকে ফাঁস হওয়া নথিপত্রে দেখা যাচ্ছে, অনেক সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান, তাদের আত্মীয় স্বজন, নামী-দামী ব্যাক্তিত্ব, ব্যবসায়ী নিজের দেশে কর ফাঁকি দিতে নামে-বেনামে কয়েকটি দেশে টাকা রেখেছেন।

এই কেলেঙ্কারির সাথে নাম ওঠায় আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী গতকাল মঙ্গলবার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। আর বিদেশে পারিবারিক বিনিয়োগের সাথে তার নিজের সংশ্লিষ্টতা নেই -- সেটা প্রমাণে গলদঘর্ম ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন দফায় দফায় এর ব্যাখ্যা দিচ্ছেন।

পানামা পেপার্সকে কেন এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় গোপন দলিল ফাঁসের ঘটনা বলে বর্ণনা করা হচ্ছে, তা এখন মোটামুটি স্পষ্ট।

বিশ্বের এতগুলো দেশে একসঙ্গে এত বেশি ক্ষমতাবান রাজনীতিক, ব্যবসায়ী বা সেলিব্রেটিকে এতটা বিব্রতকার অবস্থায় ফেলার ঘটনা আর নেই।

অভিযোগ উঠেছে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংসহ বর্তমান এবং সাবেক অনেক শীর্ষ নেতার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও।

ছবির উৎস, AP

ছবির ক্যাপশান, অভিযোগ উঠেছে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংসহ বর্তমান এবং সাবেক অনেক শীর্ষ নেতার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও।

অফশোর অ্যাকাউন্ট খুলে সম্পদ গোপন করা এবং কর ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ ওঠার পর ইতোমধ্যে সরে দাঁড়িয়েছেন আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী। আরও অন্তত এক ডজন দেশের বর্তমান বা সাবেক প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীকে মারাত্মক চাপে ফেলে দিয়েছে এই গোপন দলিল ফাঁসের ঘটনা।

এ ঘটনায় চাপের মুখে আছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনও। তাঁর প্রয়াত পিতা ইয়ান ক্যামেরন একটি অফশোর কোম্পানি খুলেছিলেন বলে ফাঁস হওয়ার পর, এর সঙ্গে তার ও তার পরিবারের সম্পর্ক নিয়ে বহু প্রশ্ন উঠেছে।

মিঃ ক্যামরেন প্রথমে এসবকে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় বলে উড়িয়ে দেন, কিন্তু পরে গতকাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, আর্থিক বিষয়ে তার গোপন করার মত কিছু নেই। ''আর্থিক বিষয়ের কথা যদি বলেন, আমার কোন শেয়ার নেই, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি একটা বেতন পাই, আমার কিছু সঞ্চয় আছে, যা থেকে কিছু সুদ পাই। আমার একটি বাড়ি আছে, যেটা আমরা ভাড়া দিয়েছি, যেহেতু আমরা এখন ডাউনিং স্ট্রিটে থাকি। আমার আর কিছু নেই, আমার কোন শেয়ার নেই, কোন অফশোর একাউন্ট নেই।''

মঙ্গলবারই পদত্যাগ করেছেন আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান, মঙ্গলবারই পদত্যাগ করেছেন আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী

কিন্তু মিস্টার ক্যামেরনের এই বিবৃতি সন্তুষ্ট করতে পারেনি অনেককে। এরপর তাই ডাউনিং স্ট্রীট থেকে আরও এক দফা বিবৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতেও কোন অফশোর বিনিয়োগ থেকে তিনি বা তার পরিবার লাভবান হবেন না।

কিন্তু ব্রিটেনের বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন বলছেন, প্রধানমন্ত্রী যতই এটাকে ব্যক্তিগত বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন, কর ফাঁকি দেয়া হয়েছে কিনা, তা জানার অধিকার জনগণের আছে। ''এটা ব্যক্তিগত বিষয় হতো, যদি এখানে কেবল ব্যক্তিগত বিষয় জড়িত থাকতো। কিন্তু যদি কারও কাছে কর পাওনা থাকে, সেটা কোনভাবেই ব্যক্তিগত বিষয় হতে পারে না। কাজেই একটা তদন্ত অবশ্যই হতে হবে, এবং এটা হতে হবে স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ তদন্ত, যাতে এটা জানা যায় যে আসলেই সরকারের কাছে কোন কর পাওনা আছে কিনা।''

বলা হচ্ছে, তারা বেশ কিছু অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গোপন করেছেন। এসব ঘটনা তদন্ত করা হবে কিনা সাংবাদিকরা এই প্রশ্নও রাখছেন সরকারি মুখপাত্রের কাছে। বেইজিং এর সরকারি মুখপাত্র এসব অভিযোগকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলছেন, এসবের কোন সত্যতা নেই।

রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজন ব্যক্তি শত কোটি ডলার পাচারের এক চক্রে জড়িত বলে দাবি করা হচ্ছে ফাঁস দলিলপত্রের ভিত্তিতে।

কিন্তু প্রেসিডেন্ট পুতিনের একজন মুখপাত্র একে পশ্চিমা গণমাধ্যমের অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

এদিকে কিভাবে ক্ষমতাবান ও বিত্তশালীদের কর ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা বন্ধ করা যায় তার নানা উপায় নিয়েও জোর বিতর্ক চলছে।

ব্রিটেনের অধীন যেসব ক্ষুদ্র অঞ্চল, এই কর ফাঁকি দেওয়ার স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে, সেগুলোতে প্রত্যক্ষ শাসন জারির দাবি উঠেছে।

ফ্রান্স জানিয়েছে, কর ফাঁকির এই অভিযোগের পর তারা পানামাকে কালো তালিকাভুক্ত করতে যাচ্ছে।