স্কটল্যান্ডের 'না' ভোটে বহির্বিশ্বে স্বস্তি ও উদ্বেগ

গণভোটের ফলাফল ঘোষণার পর 'না' সমর্থকের উল্লাস আর 'হ্যাঁ' সমর্থকের হতাশা।

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, গণভোটের ফলাফল ঘোষণার পর 'না' সমর্থকের উল্লাস আর 'হ্যাঁ' সমর্থকের হতাশা।

স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট বহির্বিশ্বে শ্বাসরুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল।

সারা বিশ্বে স্কটল্যান্ডের নিজস্ব সাংস্কৃতিক এবং জাতীয় পরিচিতির জন্য গভীর ভালবাসা রয়েছে। কিন্তু তারপরও, স্কটিশরা যুক্তরাজ্যের সাথে থাকার পক্ষে রায় দিয়েছে জেনে অনেক দেশের সরকার হাফ ছেড়ে বেঁচেছে।

কোন কোন দেশ আশংকা করেছিল, যে স্কটল্যান্ডের গণভোট স্বাধীনতার পক্ষে গেলে, সেটা অন্যান্য দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে উৎসাহ দেবে।

আবার, স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা যুক্তরাজ্যর বাকি অংশকে দুর্বল এবং অন্যমনস্ক করে দেবে ভেবে ব্রিটেনের সহযোগী দেশগুলো বেশ উদ্বিগ্ন ছিল।

কিন্তু এর ফলে কি বিশ্বে ব্রিটেনের ভাবমূর্তি এবং মর্যাদার উপর কোন প্রভাব পরবে?

পৃথিবীতে ব্রিটেনসহ গোটা পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাব কমছে বলে একটি ধারনা প্রচলিত আছে।

বলা হচ্ছে যে, চীন, রাশিয়া, ভারত এবং ব্রাজিলের মত নতুন শক্তির উত্থান পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাবকে ক্রমাগত খর্ব করছে।

স্কটল্যান্ডে যে স্বাধীনতার প্রশ্নে আদৌ গণভোট হয়েছে, সেটাই প্রমাণ করে যে ব্রিটেনের দাপট ক্রমশ: কমছে, এবং সহযোগী হিসেবে তার নির্ভরশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আলেক্স সামোন্ড

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, পরাজয় মেনে নিলেন স্বাধীনতাকামী দল এস এন পি-র নেতা আলেক্স সামোন্ড
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন: সামনে অনেক জটিল সাংবিধানিক সংস্কারের কাজ।

ছবির উৎস, GETTY IMAGES

ছবির ক্যাপশান, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন: সামনে অনেক জটিল সাংবিধানিক সংস্কারের কাজ।

উদ্বেগের আরেকটি কারণ হচ্ছে, স্কটল্যান্ডকে আরো বেশি স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার প্রশ্নে এবং গোটা ব্রিটেনে সাংবিধানিক সংস্কার করতে লন্ডনে সরকার এত ব্যস্ত হয়ে যাবে যে, তার পক্ষে বহির্বিশ্বে কার্যকর ভূমিকা পালন করা সম্ভব নাও হতে পারে।

“আমার মনে হয়, এমনকি না ভোটও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে”, বলেন প্রাক্তন ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত লর্ড ডেভিড হ্যানে।

তিনি বলেন, এই গণভোটের ফলে এমন কিছু বিষয় উঠে এসেছে, যেগুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে নির্বাচনের আগে এবং পরে ব্রিটিশ সরকার ব্যস্ত থাকবে।

“সাংবিধানিক পরিবর্তন, ব্রিটেনের অন্যান্য অঞ্চলের জন্য আরো ক্ষমতা প্রদান ইত্যাদি বিষয় পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরকারের মনোযোগ কেড়ে নেবে”, তিনি বলেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে ব্রিটেনকে আরো একটি উদ্বেগ আছে।

ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন টোরি পার্টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে তারা জয়লাভ করলে তার দু’বছরের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ব্রিটেন সদস্য থাকবে কি থাকবে না, সে প্রশ্নে গণভোট দেবে।

তাহলে, নির্বাচনে টোরি পার্টি যদি জয়লাভ করে ২০১৭ সালে ই ইউ-তে ব্রিটেনের সদস্যপদ প্রশ্নে গণভোট দেয়?

স্কটল্যান্ডের গণভোট যে ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে, তার ফলে কি তিন বছর পর ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করেছে, নাকি কমিয়েছে?

কিন্তু হয়তো এখানে ব্রিটেনের জন্য সুসংবাদও আছে।

স্পেনের কাটালোনিয়া অঞ্চল স্বাধীনতা প্রশ্নে গণভোট চায়।

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, স্পেনের কাটালোনিয়া অঞ্চল স্বাধীনতা প্রশ্নে গণভোট চায়।

অনেক দেশ ভাবতেও পারেনি যে ব্রিটেন স্কটল্যান্ডকে স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট দেবে। প্রাক্তন ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত স্যার স্টিফেন ওয়াল বলছেন, এটা প্রমাণ করে ব্রিটিশ গণতন্ত্র কার্যকর আছে।

তিনি বলেন, এটা খুবই আশ্চর্যজনক যে কোন দেশ, তার একটি অংশকে তার সাথে থাকতে বাধ্য করবেনা, সেই অংশ যদি চায়, তাদের স্বাধীন হয়ে যাবার সুযোগ দেবে।

“এটা করার জন্য আপনাকে এমন একটি দেশ হতে হবে, যার নিজস্ব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর অগাধ আস্থা রয়েছে”, স্যার স্টিফেন বলেন।

কিন্তু সামনের দিনগুলো বেশ উত্তেজনায় ভরপুর থাকবে বলে মনে হচ্ছে।

রাজনৈতিক তিক্ততার পরে প্রয়োজন আপোষ। প্রয়োজন সংস্কার আর অস্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য।

ব্রিটেন গণতন্ত্রের এই পরীক্ষায় পাস করতে থাকবে কি না, সেটা দেখার জন্য গোটা পৃথিবী এখন তাকিয়ে থাকবে।

যে গণতন্ত্র শান্তিপূর্ণ এবং সভ্য ভাবে একটি বিচ্ছেদের আয়োজন করতে পারে, কোন ধরনের সামরিক অভ্যুত্থান দিয়ে নয়, বা বন্দুকের নলের ডগায়ও নয়।