রামুর বৌদ্ধপল্লী: নান্দনিক স্থাপত্যে পুরনো ক্ষত ঢাকার চেষ্টা

    • Author, আকবর হোসেন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

কক্সবাজারের রামু উপজেলা সদরে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উপসনালয় কেন্দ্রীয় সীমা বিহার।

বিকেল সেখানে যখন পৌঁছাই তখন অনেক বৌদ্ধ ধর্মবলম্বী মানুষ তাদের প্রার্থনা করছিলেন।

এই কেন্দ্রীয় সীমা বিহার দেখে এখন বোঝার কোন উপায় নেই যে গত বছর ২৯শে সেপ্টেম্বর রাতে এখানে ব্যাপক ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ হয়েছিল। একসময় যেখানে ছিল টিন এবং কাঠের তৈরী বৌদ্ধবিহার, সেখানে এখন গড়ে উঠেছে দৃষ্টিনন্দন পাকা ভবন। স্থাপত্য শৈলীতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন।

গত বছর রামু এবং উখিয়ার ১৯টি বৌদ্ধ বিহারে যে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাট হয়েছিল তার সবগুলোই নতুনভাবে তৈরী হয়েছে গত একবছরে। দৃষ্টি নন্দন এসব স্থাপনা দেখতে প্রতিদিনই এখন বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী অনেক মানুষ আসছেন। নবনির্মিত এসব বিহার দেখে বোঝার কোন উপায় নেই যে পুরনো অবস্থা কেমন ছিল ।

স্থানীয় বৌদ্ধধর্মাবলম্বী একজন সুমন বড়ুয়া বলছিলেন পুরনো বৌদ্ধবিহারগুলো এখন ইতিহাসের পাতায় আর ছবিতে ঠাঁই পেয়েছে।

“ আমাদের কপালে যা ছিল তা তো হয়েই গেছে। এখন যা আছে তাই নিয়ে সবাই খুশি থাকবো আর কি।”

বদলে যাওয়া রামু

গতবছর ২৯শে সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামু এবং উখিয়ার ১৯টি বৌদ্ধবিহার এবং বৌদ্ধসম্প্রদায়ের অনেক বাড়িতে ভাঙচুর , অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাট হয়েছিল। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ২০ কোটি টাকা খরচ করে বিহারগুলো পুন:নির্মান করা হয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রামুতে গিয়ে এর উদ্বোধন করেন।

পুন:নির্মিত বৌদ্ধবিহারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন যেখানে হয়েছে, সেটি হলো রামু উপজেলার আওতাধীন উত্তর মিঠাছড়ির ‘বিমুক্তি বিদর্মন ভাবনা কেন্দ্র’।

ছোট-খাটো একটি টিলার উপর গৌতম বুদ্ধের প্রতিকৃতিটি প্রায় ১০০ ফুট লম্বা। এই মুর্তিটির পিছনে একটি মন্দির ছিল টিন ও কাঠের তৈরী। পুরনো অবস্থার সাথে তুলনা করলে এখন জাযগাটি দেখে চেনার কোন উপায় নেই। টিলাতে উঠার সিঁড়ি তৈরী হয়েছে। টিনের মন্দিরের পরিবর্তে তৈরী হয়েছে দোতলা মন্দির।

স্থাপনা শৈলীতে কেন এই ব্যাপক পরিবর্তন? বিষয়টি জিজ্ঞেস করেছিলাম সেনাবাহিনীর প্রকৌশলী মেজর এস এম আনোয়ার হোসেনকে। তিনি জানালেন বৌদ্ধসম্প্রদায়ের ধর্মীয় ঐতিহ্য বজায় রেখে বিহারগুলোর নকশা তৈরী করা হয়েছে।

মেজর আনোয়ার বলেন, “বৌদ্ধসম্প্রদায়ের একজন সুপরিচিত স্থপতি এই বিহারগুলোর নকশা তৈরী করেছেন। আমরা চেয়েছি দৃষ্টিনন্দনভাবে এটিকে উপস্থাপন করতে। ”

স্থানীয় বৌদ্ধধর্মবলম্বী যাদের সাথেই কথা বলেছি তারা সবাই একবাক্যে নবনির্মিত বিহারগুলোর স্থাপত্যের প্রশংসা করলেন। টিন-কাঠের তৈরী বৌদ্ধ বিহারের জায়গায় এখন দৃষ্টিনন্দন দালান তৈরী হয়েছে। এতেই অনেকে খুশি।

সাম্প্রদায়িক বিভেদ

কিন্তু নতুন তৈরী দৃষ্টিনন্দন দালান বৌদ্ধধর্মবলম্বীদের পুরনো ক্ষত পুরোপুরি দূর করতে পারেনি। কারণ হামলার সময় এই বৌদ্ধ বিহারগুলো থেকে হাজার বছরের পুরনো বৌদ্ধমূর্তি , ধর্মগ্রন্থ এবং আরও অনেক জিনিষ নষ্ট কিংবা লুটপাট হয়েছে। সে হতাশা তুলে ধরলেন স্থানীয় বাসিন্দা বিপুল বড়ুয়া।

মি: বড়ুয়া বলেন, “ আমাদের যে ঐতিহ্য নষ্ট হয়েছে সেটা আমাদের সবসময় কষ্ট দেবেই।যতই নান্দনিক বৌদ্ধবিহার আমরা দেখিনা কেন, অতীতের কথা মনে হলেই আমাদের মনটা মেঘাচ্ছন্ন হয়ে যায়।”

বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মগুরু সত্যপ্রিয় মহাথেরো বলছেন একই কথা।

“ রাজবাড়ির যদি উপযুক্ত রাজা না থাকে শোভা পায়না। ঠিক তদ্রুপ এই বিশাল টেম্পল তৈরী হয়েছে। তার মধ্যে যদি প্রাচীন বই-পত্র না থাকে তাহলে সেটা শোভা পাবে না।” তিনি আশা করেন আগের মতোই এখানে উন্নত এবং ঐতিহ্যবাহী গ্রন্থাগার তৈরী হবে।

পুন:নির্মিত এই বৌদ্ধ বিহারগুলো দেখেতে প্রতিদিনই বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ আসছেন। গত বছরের হামলার পর রামুতে বৌদ্ধ এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেক মানুষের মধ্যে খানিকটা মানসিক দূরত্ব তৈরী হয়েছিল। কিন্তু এখন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ সেটিকে কিভাবে দেখছেন?

স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মো: হেলাল উদ্দিন বলেন , “এটা তো খারাপ করে দেখার কিছু নাই। এখন তো শান্তিতে চলতেছে খুব। তেমন একটা বিভেদ দেখা যাচ্ছেনা।”

নতুন দৃষ্টিনন্দন বিহার তৈরী হয়েছে । স্থাপত্য শৈলীতেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। প্রার্থনার জায়গা আগের চেয়ে অনেক বেশি আরামদায়ক এবং সুবিধাজনকও হয়েছে। কিন্তু তারপরও স্থানীয় বৌদ্ধদের মাঝে একটি বড় প্রশ্ন রয়েছে। সেটি হচ্ছে – হামলার বিচার কবে হবে? সেটি ভেবেই অনেকে উদ্বিগ্ন। এদেরই একজন সাজু বড়ুয়া।

তিনি বলেন , “ যেহেতু একটা ঘটনা ঘটে গেছে, এইটা আরেকবার যে ঘটবে না এমন কোন কথা নেই। কারও তো শাস্তি হয় নাই। আপনি কিভাবে বুঝতে পারবেন যে আগামীবার আবার হবেনা ?”

নতুন নির্মিত বিহারগুলো দেখতে আসা অনেকেই সাজু বড়ুয়ার মতো একই কথা বললেন।