দুর্গাপূজা: এবার বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজায় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব

একটি পূজা মণ্ডপ (ফাইল ফটো)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে গত বারের তুলনায় এবছর পূজামণ্ডপের সংখ্যা প্রায় এক হাজার বেড়েছে। (ফাইল ফটো)
    • Author, কাদির কল্লোল
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজায় এবার নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শেষ পর্যায়ের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা বলেছেন, গতবারের পূজায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতার কারণে এবছর নিরাপত্তার নানা শর্তের বেড়াজালে থেকে তাদের উৎসবের আয়োজন করতে হচ্ছে।

দেশটিতে আগামী পহেলা অক্টোবর থেকে ৫ই অক্টোবর পর্যন্ত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজা উদযাপিত হবে। তবে পূজার ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে ২৫শে সেপ্টেম্বর থেকেই।

গত বছরের দুর্গাপূজায় কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে কোরআন পাওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সেখানে এবং নোয়াখালী, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতায় কমপক্ষে দশজন নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।

তবে নিরাপত্তা নিয়ে যেসব পদক্ষেপের কথা বলা হচ্ছে তা নিয়েও অস্বস্তি রয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকের মাঝে।

আরও পড়ুন:

সেই নানুয়াদীঘির পাড়ে এবার পূজায় কড়া নিরাপত্তা

কুমিল্লা শহরের যে পূজামণ্ডপে কোরআন পাওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতা হয়েছিল গত বছর, এবার নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে সেই নানুয়াদীঘির পাড়ে পূজার শেষমুহুর্তের আয়োজন চলছে।

সেখানকার পূজার আয়োজক কমিটি এবং স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিচ্ছে।

২০২১ সালে কুমিল্লায় নানুয়াদীঘির পাড়ের পূজা মণ্ডপে ভাঙচুরের পরের দৃশ্য

ছবির উৎস, পূজার আয়োজক কমিটি

ছবির ক্যাপশান, ২০২১ সালে কুমিল্লায় নানুয়াদীঘির পাড়ের পূজা মণ্ডপে ভাঙচুরের পরের দৃশ্য।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই কুমিল্লায় নানুয়াদীঘির পাড়ে অস্থায়ী মণ্ডপ তৈরি করে দুর্গাপূজা করে আসছেন সেখানকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ।

ঐ এলাকার বাসিন্দা নিতি রানী দাশ বলেছেন, গত বছর তাদের পূজামণ্ডপকে কেন্দ্র করে যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়ানো হয়েছিল, সেই পটভূমিতে তাদের মাঝে এখনও শঙ্কা রয়েছে।

তবে একইসাথে নিতি রানী দাশ উল্লেখ করেছেন, এবার পূজামণ্ডপে কঠোর নিরাপত্তা নেয়া হচ্ছে এবং এরমধ্যেই গত বছরের ঘটনার প্রতিবাদ হিসাবে আগের তুলনায় পূজা আরও উৎসবমুখর করার আয়োজন তারা করছেন।

"গত বছর আমাদের পূজায় যে ঝামেলা করা হয়েছিল, এবছর আমরা আরও উৎসবমুখরভাবে পূজার আয়োজন করছি।"

"আমাদের পূজার আয়োজকরা এবার বেশি সতর্ক থাকবে। প্রশাসনও আগের বারের চেয়ে বেশি নিরাপত্তা নিচ্ছে" বলেন নিতি রানী দাশ।

নোয়াখালীর চৌমুহনীতে চলছে দুর্গাপূজার শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতি।

ছবির উৎস, Tapan Chandra Majumder

ছবির ক্যাপশান, নোয়াখালীর চৌমুহনীতে চলছে দুর্গাপূজার শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতি।

'নিরাপত্তা ছাড়া পূজা করা যায় না'

দেশের বিভিন্ন জেলায় গত বছর হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির-পূজামণ্ডপ এবং বাড়িঘর, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হামলা ও সহিংসতা যে হয়েছিল, তারমধ্যে বেশি সহিংসতা হয়েছিল নোয়াখালী জেলার চৌমুহনীতে।

সেখানে ইসকন মন্দির সহ ছয়টি মন্দির ও সাতটি পূজামণ্ডপে হামলা, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল। সেখানে নিহত হয়েছিল দু'জন।

চৌমুহনীসহ পুরো নোয়াখালী জেলায় এবার পূজায় নিরাপত্তা নিয়ে আয়োজকদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করে চলেছেন জনপ্রতিনিধিরা এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

চৌমুহনী থেকে পূজার আয়োজক কমিটির প্রধান তপন চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, গতবারের ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় এবার চৌমুহনীতে তারা পূজার আঙ্গিক বা উৎসবের মাত্রা সীমিত পর্যায়ে রাখছেন।

"আমরা এবার পূজা না করার সিদ্ধান্ত প্রথমে নিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি অনুরোধ করেছে। সেজন্য আমরা পূজা করছি। তবে উৎসব এবং আঙ্গিক কম রাখছি।"

নিরাপত্তা ইস্যুতে চৌমুহনী থেকে তপন চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, "বিশ বছর আগেও আমরা কোন নিরাপত্তা ছাড়াই পূজা করেছি। এখন নিরাপত্তা ছাড়া পূজা করা যায় না"।

"এটা আমাদের মনে কষ্ট দেয়। তবে নিরাপত্তা নেয়া ছাড়া উপায়ও নেই। এটাই বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে" বলেন মি: মজুমদার।

হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদেরও অনেকে বলেছেন, নানা শঙ্কা থেকে প্রতি বছরই আগের বছরের তুলনায় নিরাপত্তা বাড়াতে হচ্ছে, এনিয়ে তাদের মাঝে ভিন্ন অনুভূতি হয়।

তবে এটাকেই বাস্তবতা হিসাবে তারা মেনে নেন।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় মহাসচিব চন্দ্র নাথ পোদ্দার বলেছেন, গতবারের মতো ঘটনা যাতে বাংলাদেশে আর না ঘটে, সেজন্য আগের যে কোন সময়ের তুলনায় এবার নিরাপত্তা বৃদ্ধি করে তাদের পূজার আয়োজন করতে হচ্ছে।

এবছর সারাদেশে ৩২ হাজার ১৬৮টি মণ্ডপে পূজা হবে এবং আগের বছরের তুলনায় প্রায় এক হাজার পূজামণ্ডপ বেশি হচ্ছে বলে পূজা উদযাপন পরিষদের হিসাবে বলা হচ্ছে।

গত বছর নোয়াখালীর চৌমুহনীতে ইসকন মন্দিরে হামলা-ভাঙচুরের পরের চিত্র ছিল এটি। (ফাইল ফটো)
ছবির ক্যাপশান, গত বছর নোয়াখালীর চৌমুহনীতে ইসকন মন্দিরে হামলা-ভাঙচুরের পরের চিত্র ছিল এটি। (ফাইল ফটো)

এবার সরকার থেকে নিরাপত্তার নানা শর্ত দেয়া হয়েছে

  • দেশের প্রতিটি পূজামণ্ডপে সিসি ক্যামেরা লাগানো সহ নিরাপত্তার বিভিন্ন শর্ত বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
  • প্রতিটি পূজামণ্ডপের জন্য আয়োজকদের সার্বক্ষণিক স্বেচ্ছাসেবক দল রাখতে হবে এবং তাদের সতর্ক থাকতে হবে যে কোন ধরনের গুজবের ব্যাপারে।
  • পূজামণ্ডপের স্বেচ্ছাসেবকদের বাধ্যতামূলকভাবে হাতে আর্মব্যান্ড পড়তে হবে।
  • গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত পূজার আয়োজকদের বিভিন্ন শ্রেনির মানুষের প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি করতে হবে।
  • আজানের সময় পূজামণ্ডপে বাদ্যযন্ত্রের শব্দ সহনীয় রাখতে হবে।

সরকার যে সব ব্যবস্থা নেবে

  • প্রতিটি পূজামণ্ডপে ২৪ ঘণ্টায় পালাক্রমে দু'জন করে আনসার মোতায়েন থাকবে।
  • সেজন্য সারাদেশে ৩২ হাজারের বেশি পূজামণ্ডপের জন্য এক লাখ ৯২ হাজার আনসার মোতায়েন করা হচ্ছে।
  • পুলিশ এবং র‍্যাব অব্যাহত টহলে থাকবে।
  • সব পূজামণ্ডপে গোয়েন্দা নজরদারি রাখা হবে এবং মনিটর করা হবে ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যম।
  • পুলিশের সদর দপ্তর এবং জেলা পর্যায়ে কন্ট্রোল রুম খোলা হবে এবং ২৪ ঘণ্টা সেখানে যোগাযোগ করা যাবে।
  • এছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত রাখা হচ্ছে।
২৫শে সেপ্টেম্বর মহালয়ার মাধ্যমে শুরু হবে পূজার আনুষ্ঠানিকতা
ছবির ক্যাপশান, ২৫শে সেপ্টেম্বর মহালয়ার মাধ্যমে শুরু হবে পূজার ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, সব মিলিয়ে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হবে, তাতে হিন্দু সম্প্রদায় নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপন করতে পারবে বলে তারা মনে করছেন।

"আমরা পূজা উদযাপন পরিষদের নেতাদের সাথে কয়েকদফা বৈঠক করে নিরাপত্তার যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছি"।

তিনি উল্লেখ করেন, নিরাপত্তার ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় লোকজনকেও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।

তবে প্রতিটি পূজামণ্ডপে সিসি ক্যামেরা এবং স্বেচ্ছাসেবক দল বাধ্যতামূলক সহ যে সব শর্ত সরকার দিয়েছে, গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত এসব শর্ত পূরণ করা কতটা সম্ভব হবে-এই প্রশ্নে পূজা উদযাপন পরিষদের নেতাদেরই সন্দেহ রয়েছে।

তারা বলেছেন, অল্প সময়ের মধ্যে অর্থ যোগাড় করে প্রতিটি মণ্ডপে সিসি ক্যামেরা তারা নিশ্চিত করতে পারছেন না।