ভারতবর্ষ ভাগের ৭৫ বছর: ধর্মের ভিত্তিতে কেন ভাগ হয়েছিল ভারত-পাকিস্তান?

ছবির উৎস, KEYSTONE/GETTY IMAGES
- Author, কাদির কল্লোল
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা লাভের সময় ভারতবর্ষ ভাগের পটভূমি এবং ঘটনাবলী নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে।
অনেকে মনে করেন, একজাতি বা দ্বিজাতি তত্ত্বের মীমাংসা না হওয়ায় এই ভূখণ্ডটি ভারত এবং পাকিস্তান নামে বিভাজন হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে।
সেখানে স্বার্থের বিষয় ছিল ভারতবর্ষের তৎকালীন জাতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের নেতৃত্বের। সেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগও রয়েছে।
তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকরাও সাম্প্রদায়িক চিন্তার ভিত্তিতেই বিভাজন চেয়েছিল বলে বলা হয়ে থাকে।
তবে ভারত-পাকিস্তান বিভাজন কী অনিবার্য হয়ে পড়েছিল-এই প্রশ্নে বিতর্ক রয়েছে এখনও।
আরও পড়ুন:
ভারত বিভক্তি কেন অনিবার্য হয়েছিল
এই প্রশ্নে এখনও নানা আলোচনা বা বিতর্ক রয়েছে।
ভারতবর্ষে সেই ১৯৪৭ সালে জওহরলাল নেহেরু, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী এবং সরদার ভল্লভভাই প্যাটেল সহ কংগ্রেস নেতৃত্ব একজাতির দেশ দাবি করেছিলেন।
তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ তখন বলেছিলেন, "হিন্দু মুসলিমদের একই জাতীয় পরিচয়ে পরিচিত করা একটা স্বপ্নমাত্র।"
মি: জিন্নাহ তখন দ্বিজাতি তত্ত্ব দিয়েছিলেন। এর আগে ১৯৪০ সালে তিনি লাহোরে এক বক্তৃতায় ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন।
জাতি নিয়ে সমস্যার মীমাংসা না হওয়ার বিষয়টি ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের বড় কারণ বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক এবং অ্যামিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
তিনি বিবিসিকে বলেছেন, ব্রিটিশ শাসকেরা আগে থেকেই সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ভারতের বিভাজন চেয়েছিল।
"দ্বিতীয়ত, ভারতবর্ষে তখনকার প্রধান দু'টি দল কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ জাতি সমস্যার সমাধান করতে চায়নি বা তাদের দৃষ্টিতে এটা ছিল না"।
এই দু'টি বিষয়কে বিভাজনের বড় কারণ হিসাবে দেখেন অধ্যাপক চৌধুরী।
তিনি বলেন, "এক জাতির দেশ দাবি করার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল ১৯৪৭ এর ধর্মভিত্তিক বিভাজনের বীজ।"
জাতি সমস্যা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সে সময় ভারতে ভাষাভিত্তিক ১৭টি জাতি ছিল।
"কিন্তু কংগ্রেস ভারতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীকে এক জাতি বলেছে। আর মুসলিম লীগ বলেছে দুই জাতি" বলেন অধ্যাপক চৌধুরী।
তিনি মনে করেন, জাতি সমস্যার মীমাংসা করতে না পারার পেছনে বড় কারণ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে এক করে ফেলা হয়েছিল।
"হিন্দু সম্প্রদায় এবং মুসলিম সম্প্রদায়-তারা দু'টো সম্প্রদায়, তারা কিন্তু দু'টো জাতি নয়"।

ছবির উৎস, KEYSTONE/GETTY IMAGES
"কিন্তু কংগ্রেস প্রথমে জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে মনে করলো যে, ভারতবর্ষে একটাই জাতি আছে। তখন প্রশ্ন উঠলো এর ঐক্য নিয়ে।
"মুসলিমরাও বললো, আমরাও একটা বড় সম্প্রদায় এবং আমরাও একটা জাতি" বলেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
অধ্যাপক চৌধুরী মনে করেন, ধর্মের ভিত্তিতে জাতির সংজ্ঞা দেয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দিক থেকে প্রধান ভূমিকা ছিল কংগ্র্রেসের ভেতরে থাকা হিন্দু মহাসভাপন্থীদের।
"মুসলিম লীগ মুসলমানদের জন্য একটা স্বতন্ত্র আবাসভূমি চেয়েছিল। তারা তখন প্রথমে দেশভাগ চায়নি।"
অধ্যাপক চৌধুরী আরও বলেন, "বিশেষ করে বাংলা এবং পাঞ্জাবে মুসলিমদের সংখ্যা বেশি এবং এই দু'টি প্রদেশে মুসলিম লীগের সরকার গঠন করতে হবে।
"বাংলায়তো মুসলিম লীগের সরকার এসেই গিয়েছিল। এটা কংগ্রেসের ভেতরের হিন্দু মহাসভা মেনে নিতে পারে নি।
"ফলে কংগ্রেসের আগ্রহ বেশি ছিল ধর্মের ভিত্তিতে ভাগের ব্যাপারে। তখন মুসলিম লীগও দেখেছে, তাতে তাদেরও ক্ষতি নেই।"
ধর্মের ভিত্তিতে ভারত পাকিস্তানের ভাগের পেছনে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের স্বার্থ ছিল বলেও মনে করেন অধ্যাপক চৌধুরী।
তিনি বলেন, "কংগ্রেসে শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের স্বার্থ ছিল। মুসলিম লীগে উঠতি শিল্পপতি-ব্যবসায়ীরাও তাদের স্বার্থে তারাও চাচ্ছিল না যে ভারত একসাথে থাকুক।"

ছবির উৎস, Getty Images
ভিন্ন ব্যাখ্যাও রয়েছে অনেকের
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক শিক্ষক এবং অ্যামিরেটাস অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেছেন, ভারতবর্ষে হিন্দু সম্প্রদায় ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সংখ্যায় কম ছিল মুসলিমরা।
"এই সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় তখন অর্থনৈতিক দিক থেকে এগিয়ে ছিল, আর অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেকটা পিছিয়ে ছিল সংখ্যালঘুরা।"
অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিক থেকে এই ব্যবধানই সাতচল্লিশের বিভাজনের মূল কারণ ছিল বলে মনে করেন সৈয়দ আনোয়ার হোসেন।
তিনি বলেন, হিন্দু এবং মুসলিম-উভয় সম্প্রদায়ের নেতারা ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। অর্থ্যাৎ ধর্মের একটা রাজনৈতিক ব্যবহার হয়েছে।
অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন মনে করেন, রাজনৈতিক ব্যবহারের বিষয়কে ভিত্তি করে ভারত বিভাজনকে ব্যাখ্যা করা হলে তাতে ইতিহাসের ভুল পাঠ হয়ে যায়।
ব্রিটিশদের ভারত ছাড়ার চিন্তা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময়ই স্পষ্ট হয়েছিল যে, ব্রিটিশদের ভারত ছাড়তে হবে।
তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৯৪৮ সালের ৩০শে জুনের আগেই তাদেরকে ভারতবর্ষের ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
সে সময় তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি হন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি।
তিনি একেবারে ভেতর থেকে দেখেছেন ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের ঘটনাবলী। শেখ মুজিব তাঁর 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' বইয়ে বর্ননা করেছেন ঘটনাবলীর।
তিনি লেখেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময় ব্রিটেনের তখনকার প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ভারতবর্ষে একটি প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিলেন, সেটির নাম ছিল ক্রিপস মিশন। কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ক্লেমেন্ট অ্যাটলি যখন লেবার পার্টির পক্ষ থেকে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হন, তখন তিনি ১৯৪৬ সালের ১৫ই মার্চ তিনজন মন্ত্রীর সমন্বয়ে ক্যাবিনেট মিশন পাঠানোর ঘোষণা দেন।
বলা হয়েছিল, এই মিশন ভারতবর্ষে এসে বিভিন্ন দলের সাথে পরামর্শ করে ভারতবর্ষকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাধীনতা দেয়া যায়-সেই চেষ্টা করবে।

ছবির উৎস, GETTY IMAGES
জিন্নাহর কনভেনশন
ব্রিটিশ সরকার মিশন পাঠানোর ঘোষণা দিলেও তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মি: অ্যাটলির বক্তব্যে মুসলমানদের পাকিস্তান দাবির বিষয়ে উল্লেখ ছিল না।
বরং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দাবিকে তিনি কটাক্ষ করেছিলেন।
মি: অ্যাটলির বক্তব্য নিয়ে কংগ্রেসের তৎকালীন নেতৃত্ব সন্তোষ প্রকাশ করলেও মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সেই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন।
ব্রিটেনের ক্যাবিনেট মিশন ১৯৪৬ সালের ২৩শে মার্চ ভারতবর্ষে এসে একটি বিবৃতি দিয়েছিল। সেটাও মুসলামানদের বিচলিত করেছিল।
এই মিশন আসার পর দিল্লিতে ৭ই এপ্রিল থেকে তিন দিনের কনভেনশন ডাকেন মুসলিম লীগ নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
সেই কনভেশন ডাকা হয় ভারতবর্ষের মুসলিম লীগপন্থী কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সদস্যদের জন্য।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ডাকে দিল্লী যাওয়ার জন্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কোলকাতা থেকে বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেছিলেন।
সেই কনভেনশন থেকে মি: জিন্নাহ ১৯৪৬ সালের ১৬ই অগাস্ট 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে' বা 'প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস' পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
মি: জিন্নাহ এসব তৎপরতার মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার এবং ক্যাবিনেট মিশনকে দেখাতে চেয়েছিলেন যে ভারতবর্ষে তখনকার ১০ কোটি মুসলমান পাকিস্তান দাবি আদায়ে বদ্ধপরিকর।
নেহেরুর নেতৃত্বে অন্তবর্তী সরকার
ব্রিটেনের ক্যাবিনেট মিশন আসার কয়েকমাস পর ভারতবর্ষে জওহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে অন্তবর্তী সরকার গঠন করা হলেও মুসলিম লীগ প্রথমে তাতে যোগ দেয়নি।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তি এবং ভারতীয় কংগ্রেস পার্টির নেতা মৌলানা আবুল কালাম আজাদ 'ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম' নামে একটি বই লিখেছেন।
তিনি ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন।
মৌলানা আজাদ তাঁর বইয়ে লিখেছেন, অন্তবর্তী সরকারে প্রথমে অংশ না নিলেও মুসলিম লীগ অনেক আলোচনার পর ১৯৪৬ সালের অক্টোবরে সেই সরকারে যোগ দিয়েছিল।
তবে ইতোমধ্যে কলকাতা এবং নোয়াখালীসহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু- মুসলিম দাঙ্গা হয়।
এমন প্রেক্ষাপটে নতুন ভাইসরয় এবং গভর্নর লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতবর্ষে আসেন ১৯৪৭ সালের ২২শে মার্চ।

ছবির উৎস, GETTY IMAGES
মৌলানা আজাদ লিখেছেন, লর্ড মাউন্টব্যাটেন নতুন ভাইসরয় ও গভর্নর হওয়ার পর ইংরেজদের মাথায় ভিন্ন চিন্তা আসে এবং তখন থেকে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিতে থাকে।
যদিও ব্রিটিশ সরকারের ক্যাবিনেট মিশনের লক্ষ্য ছিল পুরো ভারতবর্ষকে অখণ্ড রেখে বিভিন্ন অঞ্চলের অধিকতর স্বায়ত্তশাসন দেয়ার মাধ্যমে ভারতকে স্বাধীনতা দেয়া।
লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সাথে বেশ কয়েকটি বৈঠক করেছিলেন ভারতীয় কংগ্রেস পার্টির তখনকার প্রেসিডেন্ট মৌলানা আবুল কালাম আজাদ।
লর্ড মাউন্টব্যাটেন মৌলানা আজাদকে বলেছিলেন, ব্রিটিশরা ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু তার আগে ভারতবর্ষে চলমান হিন্দু-মুসলমান সংঘাত বন্ধের জন্য একটা পদক্ষেপ নিতে হবে।
মৌলানা আজাদ মি: মাউন্টব্যাটেনকে জানিয়েছিলেন, কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যকার মতপার্থক্য অনেক কমে এসেছে।
তখন ব্রিটিশ মিশন ভারত ভাগের ক্ষেত্রে বাংলা এবং আসামকে একত্রে রেখেছিল।
কিন্তু কংগ্রেস এই পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করে। আসাম এবং বাংলা একসাথে থাকবে কীনা- এ নিয়ে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য শুরু হয়।
দুই পক্ষের মতপার্থক্য এমন একটি জায়গায় পৌঁছায় যে তখন তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার প্রয়োজন দেখা দেয়।
মৌলানা আজাদ প্রস্তাব করেছিলেন এ বিষয়টি লর্ড মাউন্টব্যাটেনের উপর ছেড়ে দিতে।
কিন্তু তখনকার কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা জওহরলাল নেহেরু এবং সরদার প্যাটেল তাতে রাজী হননি।
এরই মধ্যে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক খারাপের দিকে যাচ্ছিল। কলকাতা দাঙ্গার পর হিন্দু-মুসলমান সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে নোয়াখালী ও বিহারে।
ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ব্রিটিশদের গঠন করা অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু দপ্তর ভাগ করে দেয়া হয়েছিল কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যে।
সেই সরকারের কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রেও দুই দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল।

ছবির উৎস, Getty Images
সরদার প্যাটেল-লিয়াকত আলী খান দ্বন্দ্ব
স্বরাষ্ট্র দপ্তরের দায়িত্বে থাকা কংগ্রেস নেতা সরদার প্যাটেল এবং অর্থ দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মুসলিম লীগ নেতা লিয়াকত আলী খানের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছিল।
কারণ লিয়াকত আলী খানের অনুমোদন ছাড়া সরদার প্যাটেল দাপ্তরিক কোন কর্মকাণ্ড চালাতে পারছিলেন না।
যদিও সরদার প্যাটেল নিজেই নিজের হাতে স্বরাষ্ট্র দপ্তর রেখে লিয়াকত আলী খানকে অর্থ দপ্তরের দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতাদের এই দ্বন্দ্বের পুরো সুযোগ নিয়েছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। তিনি ধীরে ধীরে পূর্ণ ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে ভারতের বিভক্তিকেই একমাত্র সমাধান হিসাবে সামনে আনেন।
মৌলানা আজাদের বর্ণনা অনুযায়ী, লর্ড মাউন্টব্যাটেন উভয়পক্ষকে খুশি করতে চেয়েছিলেন এবং তিনি কংগ্রেসের সিনিয়র নেতাদের মনে পাকিস্তান সৃষ্টির বীজ বপন করেছিলেন।
তখন কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে সরদার প্যাটেলই সবার আগে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ধারণা গ্রহণ করেছিলেন।
একপর্যায়ে সরদার প্যাটেল জনসম্মুখেই বলেছিলেন, মুসলিম লীগের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তিনি ভারতবর্ষ ভাগ করতেও রাজি আছেন।
মৌলানা আজাদের বর্ননায়, জওহরলাল নেহেরু প্রথমে এই বিভক্তির পক্ষে ছিলেন না এবং তিনি এ ধরনের ফর্মুলার কথা শুনে প্রথমে ক্ষেপে গিয়েছিলেন।
কিন্তু সরদার প্যাটেল যখন ভারত বিভক্তির ফর্মুলায় রাজি হন, এরপর লর্ড মাউন্টব্যাটেন ক্রমাগত বোঝাতে থাকেন জওহরলাল নেহেরুকে।
শেষপর্যন্ত নেহেরু রাজি হন
মৌলানা আজাদ তাঁর বইতে দু'টি বিষয় উল্লেখ করেছেন।
প্রথমত, লর্ড মাউন্টব্যাটেনের স্ত্রীর একটা বড় প্রভাব ছিল জওহরলাল নেহেরুকে ভারত ভাগে রাজি করানোর ক্ষেত্রে।
এছাড়া কৃষ্ণ মেনন নামের আরেকজন ব্যক্তি প্রভাব খাটিয়েছিলেন নেহেরুর ওপর।
ভারতীয় এই ব্যক্তি ছিলেন জওহরলাল নেহেরুর খুবই পছন্দের ব্যক্তি। কৃষ্ণ মেনন ১৯২০ সাল থেকে লন্ডনে বসবাস করতেন।
তিনি ১৯৪৬ সালে যখন ভারতে আসেন, তখন তার মাধ্যমে জওহরলাল নেহেরুর ওপর প্রভাব খাটান লর্ড মাউন্টব্যাটেন।
ভারতবর্ষে অন্তবর্তী সরকার পরিচালনায় জওহরলাল নেহেরুর সাথেও মুসলিম লীগ নেতাদের সম্পর্কে অবনতি হচ্ছিল।
সরকারের থাকা কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতাদের মধ্যে ঝগড়া প্রতিদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এই দ্বন্দ্বও প্রভাবিত করেছিল জওহরলাল নেহেরুকে।

ছবির উৎস, Getty Images
শেষপর্যন্ত যখন সরদার প্যাটেলের সাথে জওহরলাল নেহেরু ভারত ভাগে রাজি হন, তখন হতাশ হয়েছিলেন মৌলানা আজাদ।
শেষ ভরসা ছিল গান্ধী
মৌলানা আজাদ লিখেছেন, সরদার প্যাটেল এবং জওহরলাল নেহেরুকে বোঝাতে ব্যর্থ হবার পর তিনি শেষ ভরসা করেছিলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর ওপর।
মৌলানা আজাদ দেখা করেছিলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সাথে। সেই সাক্ষাতে তিনি ভারত ভাগের পক্ষে অবস্থান না নেয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
তবে কয়েকদিন পর মি: গান্ধী লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সাথে দেখা করেছিলেন। এরপর সরদার প্যাটেল মি: গান্ধীর সাথে দেখা করে প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠক করেছিলেন।
এসব বৈঠকের পর মৌলানা আজাদ আবার যখন মি: গান্ধীর সাথে দেখা করেন, তখন তাঁর মনে হয়েছে, মি: গান্ধীর অবস্থান বদলে গেছে।
তবে পরে মি: গান্ধী মৌলানা আজাদকে জানিয়েছিলেন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে তাঁর পছন্দের ব্যক্তিদের দিয়ে সরকার গঠনের ব্যাপারে মি: গান্ধী প্রস্তাব করেছেন। লর্ড মাউন্টব্যাটেনও তাতে রাজি আছেন।
শেষপর্যন্ত সরদার প্যাটেল এবং জওহরলাল নেহেরু এর বিরোধীতা করে মি: গান্ধীকে সেই প্রস্তাব প্রত্যাহারে বাধ্য করেন।
তখন মি: গান্ধী মৌলানা আজাদকে বলেছিলেন, ভারতবর্ষের বিভক্তি অনিবার্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সেটি কীভাবে ভাগ হবে।
মৌলানা আজাদ রাজি না থাকলেও কংগ্রেসের বাকি নেতৃত্ব ভারত ভাগের ফর্মূলা গ্রহণ করেছে।
কংগ্রেস নেতৃত্বের অবস্থান পক্ষে পাওয়ার পর লর্ড মাউন্টব্যাটেন লন্ডন গিয়েছিলেন।

ছবির উৎস, Getty Images
মৌলানা আজাদ লিখেছেন, লর্ড মাউন্টব্যাটেন তার পরিকল্পনা ব্রিটিশ সরকারকে বোঝাতে গিয়েছিলেন বলে তার ধারণা।
লর্ড মাউন্টব্যাটেন ১৯৪৭ সালের ৩০শে মে ভারতবর্ষে ফিরে আসেন এবং ২রা জুন তিনি কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতাদের সাথে বৈঠক করেন।
এরপর ১৯৪৭ সালের ৩রা জুন মি: মাউন্টব্যাটেন ব্রিটিশ সরকারের পরিকল্পনার 'হোয়াইট পেপার বা শ্বেতপত্র' প্রকাশ করেন। সেই শ্বেতপত্রে ছিল ভারত বিভক্তির রুপরেখা।
ব্রিটিশ সরকারের সেই ঘোষণার মাধ্যমে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান নামে ভারতবর্ষের বিভক্তি চূড়ান্ত রুপ নেয়।
মৌলানা আজাদের বিশ্লেষন হচ্ছে, ব্রিটিশ সরকার ভেবেছিল ভারতবর্ষকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করা হলে অর্থনৈতিকভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব হবে ।
ফলে ভারতবর্ষ ভাগের পেছনে ভারতীয়দের চেয়ে ব্রিটিশ সরকারের স্বার্থ বেশি প্রধান্য পেয়েছে।
ম্যাপে লাইন টেনে সীমান্ত ভাগ
ব্রিটিশ সরকার তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভারত ভাগের সীমানা ঠিক করার জন্য সিরিল র্যাডক্লিফ নামের একজন ব্রিটিশ আইনজীবীকে দায়িত্ব দিয়েছিল।
ব্রিটিশ শাসিত ভারতকে দু'টি স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের সীমানা নির্ধারণ করার জন্য ঐ আইনজীবীকে কাগজে কলমে পাঁচ সপ্তাহের সময় দেয়া হয়েছিলো।
আইনজীবী সিরিল র্যাডক্লিফ ম্যাপের ওপর লাইন টেনে যে সীমানা ভাগ করেছিলেন বা যে সীমানা তিনি এঁকেছিলেন, সেটিকে এখনও এই উপমহাদেশে উত্তেজনার মূল কারণ হিসাবে দেখা হয়।
সীমানা লাইনটি র্যাডক্লিফ লাইন নামেই পরিচিতি পায়।
হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারত এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তান, এভাবে ভারতবর্ষ ভাগ হয়।
ভারতবর্ষে তখন ৪০ কোটি মানুষের বসবাস ছিল বলে ধারণা করা হয়।
তবে পূর্বদিকে বাংলা এবং পশ্চিম দিকে পাঞ্জাব- ব্রিটিশ শাসিত ভারতে এই দু'টি বড় প্রদেশে মুসলিম এবং অমুসলিমদের সংখ্যা প্রায় কাছাকাছি ছিল।
এই দু'টি প্রদেশের মধ্যে লাইন টেনে সীমানা ভাগ করার দায়িত্ব ছিল র্যাডক্লিফের।
তাঁকে এই জটিল কাজের জন্য নির্ভর করতে হয়েছে একটি পুরোনো ম্যাপ, জনসংখ্যার ভুল চিত্র সম্বলিত তথ্যের ওপর।
একইসাথে আইনজীবী নির্ভর করেছিলেন কিছু অনড় উপদেষ্টার ওপর।

শত বছর ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে, এমন কোন সম্প্রদায়কে সোজা লাইন টেনে বিভক্ত করা কতটা ঝুঁকির কাজ ছিল-সেটা র্যাডক্লিফ নিজেও জানতেন। তখন এনিয়ে উত্তেজনাও ছিল চরমে।
সেজন্য ভারত পাকিস্তানের স্বাধীনতার কয়েকদিন পর লাইন টেনে সীমান্ত ভাগ করার র্যাডক্লিফের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়েছিলো।
ফলে মানুষ যখন ব্রিটিশ থেকে স্বাধীন হওয়ার আনন্দ উদযাপন শুরু করেছিল, তখন তারা জানতেন না যে তারা ঠিক কোন দেশের অধিবাসী হতে যাচ্ছেন।
প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষকে র্যাডক্লিফ লাইন নামে পরিচিতি পাওয়া সেই সীমান্ত লাইন অতিক্রম করে এপার-ওপার করতে হয় নিজের বসবাসের জন্য।
তখন শুরু হয় ধর্মীয় সহিংসতা এবং সেই সহিংসতায় প্রাণ হারায় ৫লাখ থেকে ১০ লাখ মানুষ।
সেটি ছিলো ভয়াবহ রক্তাক্ত এক ট্রাজেডি। এখনও সেই সীমান্ত লাইন রক্তাক্ত করে চলেছে ভারত পাকিস্তান সম্পর্ককে।








