ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ: সুইফট কী? সুইফটের সিদ্ধান্ত কে নিয়ন্ত্রণ করে?

সুইফট লোগো

ছবির উৎস, Getty Images

আর্থিক লেনদেনের ব্যাপারে বার্তা আদানপ্রদানকারী আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক 'সুইফট' থেকে রাশিয়ার কয়েকটি ব্যাংককে বিচ্ছিন্ন করার ব্যাপারে একমত হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্র দেশগুলো।

তেল ও গ্যাস রপ্তানির মাধ্যমে রাশিয়া যে অর্থ আয় করে, সেই অর্থ আদায়ে দেশটি সুইফটের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

জার্মান সরকারের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, রাশিয়ার এসব ব্যাংকে বৈদেশিক অর্থ লেনদেন বন্ধ করাই তাদের এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

তবে রাশিয়ার সাথে ব্যবসা রয়েছে, এমন পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোও এর ফলে ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।

কিন্তু সুইফট আসলে কী? আর কিভাবে কাজ করে এই প্রতিষ্ঠান?

১৯৭৩ সালে জন্ম নেয়া এই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় বেলজিয়ামে। বিশ্বের ১১,০০০ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লেনদেনের ব্যাপারে বার্তা আদানপ্রদানের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে এই সুইফট।

সুইফট এর পূর্ণরূপ- সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল টেলিকম্যুনিকেশন। বিশ্বব্যাপী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে আর্থিক লেনদেন করতে এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়।

এটি মূলত একটি তাৎক্ষনিক মেসেজিং ব্যবস্থা যা কোন লেনদেনের ব্যাপারে গ্রাহককে তৎক্ষণাৎ জানিয়ে দেয়।

বিশ্বের অধিকাংশ ব্যাংক নিজেদের মধ্যকার বার্তা আদান প্রদানের কাজে সুইফট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে।

সুইফট নেটওয়ার্ক দিয়ে সরাসরি অর্থ প্রেরণ করা যায় না, এটা শুধু অনলাইনে পেমেন্ট অর্ডার প্রেরণ করে।

একটি ব্যাংক তাদের সুইফট নেটওয়ার্ক এ সংযুক্ত অন্য একটি ব্যাংককে অর্থ পরিশোধের অনুরোধ পাঠায় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সেই আদেশ গ্রহণ করে সে অনুযায়ী কাজ করে।

আর্থিক লেনদেনের ব্যাপারে তথ্য আদান প্রদানের জন্য সুইফটকে একটি নিরাপদ নেটওয়ার্ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

রুশ মুদ্রা রুবল

ছবির উৎস, Reuters

বিশ্বব্যাপী খুবই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ভূমিকা রাখলেও, কোন দেশের উপর অবরোধ আরোপের আইনি ক্ষমতা নেই এই প্রতিষ্ঠানটির।

ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেইন বলেছেন, রাশিয়া যাতে তার যুদ্ধকালীন অর্থ ভাণ্ডার ব্যবহার করতে না পারে, পশ্চিমা মিত্র দেশগুলো সে ব্যাপারেও কাজ করছে।

রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক যাতে কোন সম্পদ বিক্রি করতে না পারে সেজন্য এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

সুইফট নিয়ন্ত্রণ করে কে?

সুইফট সৃষ্টি হয়েছিল আমেরিকান ও ইউরোপিয়ান ব্যাংকসমূহের উদ্যোগে, যারা চাননি একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান কোন একক সিস্টেম তৈরি করে কাজ করবে এবং নিজেদের একচেটিয়া ব্যবস্থার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক লেনদেন পরিচালনা করবে।

যৌথভাবে এই নেটওয়ার্কের মালিক বিশ্বের দুই হাজার ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ডসহ বিশ্বের বড় বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে মিলে বেলজিয়ামের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংক অব বেলজিয়াম সুইফটের কাজকর্ম তদারক করে থাকে।

রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ

এই নেটওয়ার্কের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পরিচালিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিশ্চিত হয় সুইফটের মাধ্যমে, এবং কোন বিরোধের ক্ষেত্রে পক্ষ অবলম্বন করার কথা নয় প্রতিষ্ঠানটির।

কিন্তু, ২০১২ সালে পরমাণু কর্মসূচির কারণে ইরানের ওপর সুইফটের নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল।

ফল হিসেবে দেশটির তেল রপ্তানি থেকে আয় অর্ধেক কমে গিয়েছিল এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ৩০ শতাংশ হারায় দেশটি।

সুইফট বলছে, কারো ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়ার ব্যাপারে তাদের কোন প্রভাব থাকে না, বরং নিষেধাজ্ঞা দেয়ার সিদ্ধান্ত নির্ভর করে কোনো দেশের সরকারের ওপর।

Skip YouTube post
Google YouTube কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: তৃতীয়পক্ষের কন্টেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of YouTube post

নিষিদ্ধ করার কী ফল হতে পারে?

এই ঠিক মূহুর্তে রাশিয়ার কোন কোন ব্যাংককে সুইফট থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে সেটি পরিষ্কার নয়। সামনের দিনগুলোতে হয়ত সে তথ্য জানা যাবে।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং অন্যরা বলছে, এই পদক্ষেপ নিশ্চিত করবে, "এই ব্যাংকগুলো (যাদের বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে) আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে, যাতে বিশ্বব্যাপী তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনার সামর্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।"

এই নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য হচ্ছে রুশ কোম্পানিসমূহ যাতে সুইফটের মাধ্যমে স্বাভাবিক সময়ের মত নির্ঝঞ্ঝাটে এবং তাৎক্ষণিক লেনদেন পরিচালনা করতে না পারে।

সুইফট লোগো

ছবির উৎস, Reuters

এর ফলে এখন রাশিয়ার জ্বালানি এবং কৃষিপণ্য বিক্রির অর্থ আদায় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

ব্যাংকগুলোকে এখন সরাসরি একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। এতে সময়ক্ষেপণ হবে এবং বাড়তি খরচ গুনতে হবে, যা শেষ পর্যন্ত রুশ সরকারের রাজস্ব আয় কমিয়ে দেবে।

এর আগে ২০১৪ সালে রাশিয়া যখন ক্রাইমিয়া দখল করে নেয়, সেসময় সুইফট থেকে রাশিয়াকে বের করে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছিল।

রাশিয়া তখন বলেছিল, সেটা করা হলে তা হবে যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য। সেসময় পশ্চিমা দেশগুলো আর সামনে এগোয়নি।

কিন্তু ওই হুমকির ফল হিসেবেই রাশিয়া দ্রুত তার প্রতিবেশী দেশ, যাদের মুদ্রা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রায় একইরকম, তাদের সাথে আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের নিজস্ব একটি ব্যবস্থা চালু করে।

এ ধরনের একটি নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলায় রুশ সরকার ন্যাশনাল পেমেন্ট কার্ড, যা মির নামে পরিচিত, তৈরি করে। যদিও অল্প কয়েকটি রাষ্ট্র বর্তমানে সেটি ব্যবহার করছে।

পশ্চিমা দেশসমূহ বিভক্ত কেন?

রাশিয়ার সুইফট ব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনিচ্ছুক ছিল জার্মানি, ফ্রান্স এবং ইতালির মত কয়েকটি দেশ।

পালাচ্ছেন হাজারো মানুষ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, যুদ্ধের কারণে ইউক্রেন থেকে পালাচ্ছেন হাজারো মানুষ

এর কারণ হছে রাশিয়া ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রধান জ্বালানি তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস সরবারহকারী দেশ, এবং এর বিকল্প বের করা সহজ হবে না।

আর যেভাবে ইতিমধ্যেই জ্বালানির দাম বাড়ছে, তাতে জ্বালানি সরবারহে ব্যাঘাত ঘটবে এমন কিছু করতে রাজি হবে না অনেক দেশ।

রাশিয়ার কাছে টাকা পায় এমন কোম্পানিগুলোকে এখন পাওনা বুঝে পাওয়ার জন্য বিকল্প পথ খুঁজে বের করতে হবে।

আলেক্সি কারদিন, রাশিয়ার সাবেক অর্থমন্ত্রী বলেছেন, সুইফট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ফলে দেশটির অর্থনীতি পাঁচ শতাংশের মত সংকুচিত হয়ে পড়বে।

কিন্তু রাশিয়ার অর্থনীতিতে এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

রাশিয়ার ব্যাংকসমূহ হয়ত যেসব দেশ নিষেধাজ্ঞা দেয়নি এবং যাদের নিজেদের নিজস্ব পেমেন্ট সিস্টেম, যেমন চীন, তাদের মাধ্যমে লেনদেন করবে।