নুসরাত ঘানি: ব্রিটিশ এমপি বললেন মুসলমান বলে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের একজন মুসলমান এমপি বলছেন, উপমন্ত্রীর পদ থেকে তাকে বরখাস্ত করার সময় সরকারি দলের একজন হুইপ তার ধর্মবিশ্বাসের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত প্রভাবশালী সংবাদপত্র সানডে টাইমস খবর দিয়েছে, নুসরাত ঘানি যখন তার অপসারণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা চান তখন তাকে জানানো হয়েছিল তিনি যে একজন "মুসলমান সেটা একটা ইস্যু হিসেবে তোলা হয়েছিল।"
এর পর শাসকদল কনজারভেটিভ পার্টির প্রধান হুইপ মার্ক স্পেনসার জানিয়েছেন নুসরাত ঘানি তার কথাই বলেছেন। তবে তার অভিযোগটি মিথ্যে এবং মানহানিকর বলে তিনি বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাদিম জাহাওয়ি বলছেন, এই অভিযোগটি তদন্ত করে দেখতে হবে।
ব্রিটেনের আইন অনুযায়ী ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে কারও বিরুদ্ধে বৈষম্য করা বেআইনি।
আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, PA Media
মিজ ঘানি ২০১৮ সালে পরিবহন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী নিযুক্ত হন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ২০২০ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে মন্ত্রিসভায় ছোটখাটো রদবদল ঘটালে তাকে বাদ দেয়া হয়।
সানডে টাইমস বলছে, মিজ ঘানি যখন তার অপসারণের বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা জানতে চান - তখন সরকারি দলের একজন হুইপ তাকে বলেন, "মন্ত্রিসভায় রদবদলের আলোচনার সময় তিনি যে "মুসলমান সেটা একটা ইস্যু হিসেবে আসে। এবং তিনি যে একজন মুসলমান নারী ... সেটা নিয়ে অনেক সহকর্মীর অস্বস্তি ছিল।"
নুসরাত ঘানিকে উদ্ধৃত করে সানডে টাইমসের খবর বল হয়, তিনি এবিষয়টি নিয়ে আর কোন কথা বলেননি। কারণ, তাকে বলা হয়, এবিষয়টি নিয়ে তিনি বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করলে, "তাকে একঘরে করা হবে, এবং তার কেরিয়ার ও সম্মান ধ্বংস হয়ে যাবে।"

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:
শনিবার রাতে মি. স্পেনসার জানান, মিজ ঘানি যার কথা উল্লেখ করেছেন সেটি তিনিই।
তবে মি. স্পেনসার বলেন, এসব অভিযোগ "সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং মানহানিকর।" মিজ ঘানির সাথে তার এধরনের কোন কথাই হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিবিসির রাজনৈতিক সংবাদদাতা ডেমিয়েন গ্রামাটিকাস বলছেন, প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের জন্য সামনের সপ্তাহটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার আগে কনজারভেটিভ পার্টির মধ্যে এধরনের খোলাখুলি অভিযোগ দলের মধ্যে তীব্র টানাপড়েনের ইঙ্গিত।
করোনাভাইরাস মহামারির লকডাউনের সময় প্রধানমন্ত্রীর দফতর ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে আইনভঙ্গ করে একাধিক পার্টি হয়েছিল বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তার তদন্ত প্রতিবেদনটি আর কিছুদিনের মধ্যে প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
কনজারভেটিভ পার্টি ও ইসলাম-বিদ্বেষ
কনজারভেটিভ পার্টির বিরুদ্ধে ইসলাম-বিদ্বেষের এই অভিযোগটি বহু বছর ধরেই রয়েছে।
এমনকি দলের এককালীন সহ সভাপতি ব্যারোনেস সাঈদা ওয়ার্সি ২০১০ সালেই ইসলাম-বিদ্বেষের বিষয়ে তার বিখ্যাত "ডিনার টেবিল" ভাষণ দিয়েছিলেন।
এতে তিনি বলেছিলেন, ব্রিটেনের মধ্যবিত্তদের মধ্যে ইসলাম-বিদ্বেষী কথাবার্তা একটা স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ, শোভন আলোচনার টেবিলেও এই বিদ্বেষকে আর অস্বাভাবিক বলে মনে করা হয় না।
বিশেষভাবে ব্রিটেনের নির্বাচনের সময় একের পর এক টোরি নেতাদের বিরুদ্ধে ইসলাম-বিদ্বেষের অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন নিজেও রয়েছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
তিনি বোরকা পরিহিত মুসলিম নারীদের 'লেটারবক্স' এবং 'ব্যাংক ডাকাতের' সাথে তুলনা করেছেন।
মূলত ২০১৯ সালে কনজারভেটিভ দলের নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে এক বিতর্কের সময় নেতৃস্থানীয় একজন টোরি সাজিদ জাভিদের চাপে মি. কনজারভেটিভ পার্টির ভেতরে ইসলাম-বিদ্বেষের অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি মি. জনসন মেনে নিতে বাধ্য হন।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রী পদে বসেই তিনি সেই তদন্তের ফোকাসটি ঘুরিয়ে দেন। শুধু ইসলাম-বিদ্বেষ সম্পর্কে তদন্ত না করে 'সবধরনের বৈষম্যে'র ঘটনা তদন্ত করার জন্য তিনি একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।
এই তদন্ত কমিটির প্রধান নিযুক্ত হন ব্রিটেনের ইকুয়ালিটি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস কমিশনের সাবেক কমিশনার অধ্যাপক শরণ সিং।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এই কমিটি ২০১৫ সাল থেকে ২০২০ সালের মধ্যে কনজারভেটিভ পার্টির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ের করা মোট ১,৪১৮টি অভিযোগ বিশ্লেষণ করে দেখতে পায় যে ৭২৭টি অভিযোগ বৈষম্য সংক্রান্ত এবং ৪৯৬টি অভিযোগ সরাসরিভাবে ইসলাম এবং মুসলমান-বিদ্বেষ সংক্রান্ত।
এই কমিটি ২০২১ সালের মে মাসে তার চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করে। ইসলাম-বিদ্বেষের নানা ঘটনা উল্লেখ করা হলেও ৪৪,০০০ শব্দের এই রিপোর্টে মূল বিষয়বস্তুকে অনেকখানি পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়।
এতে বলা হয়, কনজারভেটিভ পার্টির স্থানীয় সংগঠন এবং ব্যক্তি-বিশেষের মধ্যে ইসলাম-বিদ্বেষ রয়েছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দলে কোন ইসলাম-বিদ্বেষ নেই।
কনজারভেটিভ পার্টির মধ্যে বর্ণবাদ এবং ইসলাম-বিদ্বেষের শিকার অনেকেই এই রিপোর্টের সমালোচনা করেছেন।
তারা বলছেন, ঐ তদন্তের মূল ফোকাসটি ছিল বেশ সীমিত। এতে দলের মধ্যে অভিযোগগুলির সুরাহা কীভাবে করা হয় সেই দিকেই বেশি নজর দেয়া হয়েছে।
কিন্তু দলের মুসলমান সদস্যরা কেন এই বিদ্বেষের শিকার হন, তার কারণ সম্পর্কে রিপোর্টটিতে কোন আলোকপাত করা হয়নি।








