গুম: মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করার জন্য এই কৌশল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে

- Author, ফারহানা পারভীন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশের একটি মানবাধিকার সংগঠন বলছে, গত ১১ বছরে মোট ৫৮৭ ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন।
দেশটিতে রাজনৈতিক নেতাদের নিখোঁজ হওয়ার পর পর কয়েকটি ঘটনা তুমুল আলোড়ন তুলেছিল।
কিন্তু এখন সাধারণ ব্যক্তিরাও গুম হচ্ছেন বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকার-বিরোধী মনোভাব নির্মূল করা এবং তাদের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করার লক্ষ্য নিয়ে গুমকে এখন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তারা বলছে।
২০১৯ সালের জুন মাসে নিজের কর্মস্থল থেকে নিখোঁজ হন ইসমাইল হোসেন বাতেন।
কাঠের ব্যবসায়ী মি. বাতেন মিরপুরে তার কাজের জায়গা থেকে দুপুরের পর থেকে নিখোঁজ হন।
মি. বাতেনের স্ত্রী নাসরিন জাহান বলছেন যে সময়ে তিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন সেই সময় কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য তিনি ছিলেন না, তবে তিনি বলেন তার স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত নানা ভাবে চেষ্টা করেছেন তার খোঁজ বের করতে কিন্তু তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।
"মিরপুর ১-এ আমাদের একটা কাঠের দোকান আছে। যেদিন নিখোঁজ হয় সেদিন সকালে বাসা থেকে বের হয়। দুপুরে দোকান থেকে তার বাড়িতে খেতে আসার কথা কিন্তু তিনি আর ফিরে আসেন নি।"
তিনি বলেন এই ঘটনা নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা-রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে গেছেন, মানবাধিকার সংগঠন, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কাছেও লিখিতভাবে জানিয়েছেন।
বাংলাদেশে একটা সময় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়া একটি আলোচিত ঘটনা।
বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমন নিখোঁজ হন ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর। পরিবার বলছে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
বিএনপির তৎকালীন ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের (বর্তমানে ২৫ নম্বর ওয়ার্ড) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সাজেদুল ইসলাম সুমন।
এরপর থেকে তার আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।

কিন্তু এর পরে বিভিন্ন পেশার মানুষ নিখোঁজ হওয়ার তথ্য দিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
২০১৯ সালে প্রায় ১৫ মাস নিখোঁজ থাকার পর নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। ২০১৭ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর তিনি নিজ বাড়ি থেকে বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন।
তবে ফিরে আসার পর তিনি কোথায় ছিলেন বা কী হয়েছিল সে সম্পর্কে কিছু বলেন নি। ২০১৭ সালে নিখোঁজ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান এবং সাংবাদিক উৎপলকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে রাতের আঁধারে।
মানবাধিকার কর্মী নুর খান লিটন বলছেন ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করার জন্য গুমকে একটা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
"মানুষ আগে যেমন হোটেল, রেস্টুরেন্টে ,বাসে,ট্রেনে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতো,তাদের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল রাজনৈতিক পরিমণ্ডল নিয়ে ,রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা এমন কোন আলোচনা হতে দেখি না। তার একটা বড় কারণ হচ্ছে গুমের মত ঘটনা এমন একটা অবস্থায় মানুষকে নিয়ে গিয়েছে মানুষ আর এখন নিজেকে নিরাপদ ভাবছে না।"
"গুমকে ভয়ের পরিবেশ তৈরিতে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং গুমের ঘটনার মধ্যে দিয়ে পুরো সমাজকে একটা ভয়ের চাদরে ঢেকে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।"
এ মাসের ২৪ থেকে ৩১তারিখ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সপ্তাহ পালিত হচ্ছে।
আরো পড়ুন:
এদিকে বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তথ্য অনুযায়ী ২০০৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৫৮৭জন নিখোঁজ হয়েছে।
এর মধ্যে ১৪৯জন এখনো নিখোঁজ। ৩৫৭জন দীর্ঘ সময় ধরে নিখোজ থেকে ফিরে এসেছে।

আর ৮১জনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করছে মায়ের ডাক নামে একটা সংগঠন। সংগঠনটির প্রধান আফরোজা ইসলাম বলছেন বিরোধী মতকে দমন করার জন্য "গুম হয়ে যাওয়ার ভয়" ভীষণ ভাবে কাজ করেছে সরকারের জন্য।
"গুমটা সরকারের জন্য অনেক ভালো কাজে দিয়েছে। যারা সঠিক কথা বলতে চান তারা এখন অনেক কাট-ছাট করে কথা বলছে। মানুষের মধ্যে এখন এই ভয়টা কাজ করে যে পাশের বাড়ীর ছেলেটা গুম হয়েছে, আমার ছেলেটা যেন গুম না হয়-এই ভয়টা ঢুকে গেছে।"
নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এমন কয়েকজনের পরিবার আজ ঢাকায় এক মানববন্ধন করে গুম বন্ধ করা এবং গুম হওয়া ব্যক্তিদের ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন।








