ইসরায়েল ফিলিস্তিন: গাযার বাসিন্দাদের এমনিতেই কঠিন জীবন সাম্প্রতিক লড়াইয়ে আরও দুর্বিষহ হয়েছে

গাযার রুটি বিক্রেতা - ১৯শে মে ২০২১

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গাযার রুটি বিক্রেতা

প্রায় বিশ লাখ মানুষ বাস করেন গাযায়। এই এলাকা দৈর্ঘ্যে ৪১ কিলোমিটার (২৫ মাইল) আর প্রস্থে ১০ কিলোমিটার। চারপাশ ঘিরে আছে ভূমধ্যসাগর, ইসরায়েল আর মিশর।

ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে গাযায় টানা এগারো দিন তীব্র লড়াই চলার পর একটা আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি হয়েছে। গত বেশ কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক এই লড়াইয়ের তীব্রতার কারণে জাতিসংঘ একটা "পুরো মাত্রার যুদ্ধ বাধার'' আশংকা প্রকাশ করেছিল।

গোড়াতে গাযা ছিল মিশর অধিকৃত। ১৯৬৭ সালের মধ্য প্রাচ্য যুদ্ধের সময় ইসরায়েল গাযার দখল নেয়। পরে ২০০৫ সালে ইসরায়েল সেখান থেকে তাদের সৈন্য এবং প্রায় ৭ হাজার বসতিস্থাপনকারীকে সরিয়ে নেয়।

গাযা এখন নিয়ন্ত্রণ করছে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস। ২০০৭ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন ফিলিস্তিনি প্রশাসনের ভেতর চরম মতভেদের পর হামাস গাযার নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়।

এরপর থেকে ইসরায়েল এবং মিশর গাযার ভেতর থেকে মালামাল ও মানুষের চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। তাদের যুক্তি, জঙ্গীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসাবে এই বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে।

হামাস এবং ইসরায়েলের মধ্যে একটা স্বল্পস্থায়ী লড়াই হয়েছিল ২০১৪ সালে। আর এই বছর মে মাসে দুই পক্ষের মধ্যে সহিংস লড়াই তীব্র মাত্রা নেয়।

ফিলিস্তিনিরা ভবনের ক্ষয়ক্ষতির জরিপ চালাচ্ছেন - মে ২০২১

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, গাযায় সাম্প্রতিক এই লড়াইয়ে বহু ভবন ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে

অধিকৃত পূর্ব জেরুসালেমে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্তেজনা বাড়ার পটভূমিতে গাযায় সর্বসাম্প্রতিক ১১দিনের রক্তক্ষয়ী এই লড়াই শুরু হয়। এর জেরে সংঘর্ষ হয়েছে শহরে মুসলিম ও ইহুদিদের পবিত্র স্থানে।

হামাস ইসরায়েলকে সেখান থেকে সরে যাবার হুঁশিয়ারি দেবার পর ১০ই মে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে রকেট নিক্ষেপ শুরু করলে ইসরায়েল পাল্টা বিমান হামলা চালায়।

দুই পক্ষের লড়াই এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে, দ্রুত সহিংসতার মাত্রা ২০১৪ সালে ইসরায়েল ও গাযার লড়াইকে ছাপিয়ে যায়।

বিদ্যুতের তীব্র সঙ্কট

গাযায় এমনি সময়ই প্রতিদিন বিদ্যুত চলে যায়।

এই লড়াই শুরু হবার আগে গাযার বাসাগুলোতে পালা করে প্রতিদিন মাত্র আট ঘন্টার জন্য বিদ্যুত দেয়া হতো।

আরও পড়তে পারেন:

ছেলেরা শীত থেকে বাঁচতে আগুন পোহাচ্ছে - গাযায় বিদ্যুতের অভাব একটা দৈনন্দিন সমস্যা

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, গাযায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত না থাকা সেখানকার জনজীবনে বিরাট একটা সমস্যা

সাম্প্রতিক লড়াইয়ে বিদ্যুতের লাইনগুলো বিধ্বস্ত হয়ে গেছে এবং দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সঙ্কট। জাতিসংঘের মানবিক ত্রাণ সমন্বয়কারী দপ্তর (ওচা) বলছে এখন বেশিরভাগ বাসাবাড়িতে বিদ্যুত আসছে দিনে মাত্র তিন চার ঘন্টা করে। কোথাও কোথাও তাও ভেঙে পড়েছে।

গাযা ভূখন্ডে বিদ্যুত সরবরাহের একটা বড় অংশ আসে ইসরায়েল থেকে। খুব নগণ্য একটা অংশ উৎপাদিত হয় গাযার একটাই মাত্র বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্র থেকে, আর সামান্য অংশ সরবরাহ করে মিশর।

গাযার বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্র এবং মানুষের বাসাবাড়িতে যে জেনারেটর আছে তার জন্য নির্ভর করতে হয় ডিজেল জ্বালানির ওপর। কিন্তু ইসরায়েল হয়ে যে জ্বালানি গাযায় আসে তা প্রায়শই বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে সাধারণ সময়েও বিদ্যুত সরবরাহ বিঘ্নিত থাকে। লড়াইয়ের ফলে তা এখন আরও তীব্র হয়েছে।

সীমান্ত পারাপারের সমস্যা

গাযা থেকে চলাচলের ক্ষেত্রে রয়েছে বড়ধরনের সমস্যা। হামাস ২০০৭ সালে গাযায় ক্ষমতা গ্রহণের পর, মিশর গাযার সাথে তাদের সীমান্ত মূলত বন্ধই করে রেখেছে।

গত বছর করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকানোর জন্য সীমান্তে আরও বাড়তি বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

মিশরে যাতায়াতের জন্য রাফা সীমান্ত চৌকি এবং ইসরায়েলে ঢোকা ও বেরনর জন্য এরেজ সীমান্ত পারাপার চৌকি দুটোই ২০২০ সালে প্রায় ২৪০দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয় এবং খোলা হয় মাত্র ১২৫ দিনের জন্য বলে জানাচ্ছে জাতিসংঘ সংস্থা ওচা।

দক্ষিণ গাযায় রাফা সীমান্ত পারাপার চৌকিতে জড়ো হয়েছেন ফিলিস্তিনিরা - এপ্রিল ২০১৮

ছবির উৎস, AFP/Getty

ছবির ক্যাপশান, মিশর ২০০৭ সাল থেকে গাযার সাথে তাদের সীমান্ত মূলত বন্ধই রেখেছে

প্রায় ৭৮ হাজার মানুষ ২০১৯ সালে দক্ষিণের রাফা সীমান্ত দিয়ে গাযা থেকে বাইরে বেরিয়েছিলেন, কিন্তু ২০২০ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৫ হাজারে।

উত্তরে এরেজ সীমান্ত দিয়ে ইসরায়েলে যাতায়াতের সংখ্যাও নাটকীয়ভাবে কমে গেছে ২০২০ সালে - যার কারণ আংশিকভাবে ছিল করোনাভাইরাস ঠেকাতে জারি করা বিধিনিষেধ।

এবছর এরেজ সীমান্ত চৌকি দিয়ে গাযা থেকে বেরতে পেরেছেন মাত্র প্রায় ৮ হাজার মানুষ। এদের বেশিরভাগই ছিলেন চিকিৎসা নিতে ইসরায়েলে যাওয়া মানুষ অথবা রোগীর সাথে যাওয়া আত্মীয়স্বজন বা তাদের নিকটজন।

সাম্প্রতিক এই লড়াই শুরু হবার আগে এই সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করেছিল। ত্রাণবাহী কিছু গাড়ির বহরকে যাতায়াতের অনুমতি দেয়া হচ্ছিল। এছাড়া সীমান্ত মূলত বন্ধই করে দেয়া হয়।

সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কে হামলা

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গাযার জনসংখ্যার প্রায় ৮০% বিদেশি ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল। প্রায় দশ লাখ মানুষ খাবার জন্য দৈনন্দিন খাদ্য সহায়তার মুখাপেক্ষী।

যাতায়াতের ওপর ইসরায়েল অবরোধ জারি করার ফলে গাযা থেকে ঢোকা ও বেরন মারাত্মক ভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে মানুষের ব্যবসা বাণিজ্য করার সুযোগ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

গাযা মিশর সীমান্তের চোরা সুড়ঙ্গে একজন ফিলিস্তিনিকে নামানো হচ্ছে - ৪ঠা জুন ২০১০

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মিশরের সাথে সীমান্তে মাটির নিচে দিয়ে এই চোরা সুড়ঙ্গ খোঁড়া হয়েছে বাইরে থেকে খাদ্যসামগ্রী এবং অস্ত্রশস্ত্র আনার জন্য

অবরোধের বেড়াজাল ডিঙাতে হামাস সুড়ঙ্গ পথের নেটওয়ার্ক তৈরি করে, যার মাধ্যমে গাযা ভূখন্ডে খাদ্যসামগ্রী নিয়ে আসা হতো।

এই সুড়ঙ্গ থেকেই হামাস তাদের গুপ্ত কমান্ড কেন্দ্রও পরিচালনা করে। ইসরায়েল বলছে জঙ্গীরা এই টানেল বা সুড়ঙ্গ পথ ব্যবহার করে চোখের আড়ালে ঘোরাফেরা করে। ফলে এই সুড়ঙ্গপথগুলো ধ্বংস করতে তারা বিমান হামলা চালিয়েছে।

ফলে খাদ্য সরবরাহের চোরা পথও বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।

করোনাভাইরাসও স্থানীয় অর্থনীতির জন্য বড়ধরনের বিপর্যয় তৈরি করেছে। বিশ্ব ব্যাংক বলছে গাযা এই অর্থনৈতিক বিপর্যয় সবে মাত্র কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছিল। ফলে এই লড়াই সেই ঘুরে দাঁড়ানোর পথে বড়ধরনের একটা ধাক্কা দিয়েছে।

বসবাসও গাযার বাসিন্দাদের জন্য কঠিন সমস্যা

গাযা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গাযায় আটটি শিবিরে গাদাগাদি করে বাস করেন প্রায় ৬ লক্ষ শরণার্থী।

সাধারণত এক বর্গ কিলোমিটার এলাকায় গড়ে বসবাস করেন ৫,৭০০র বেশি মানুষ- যে পরিসংখ্যান লন্ডনের জনঘনত্বের কাছাকাছি। কিন্তু গাযা সিটিতে এক বর্গ কিলোমিটারে বাস করেন ৯ হাজারের অধিক মানুষ।

গাযা থেকে রকেট হামলা ও জঙ্গী অনুপ্রবেশ থেকে সুরক্ষার জন্য ইসরায়েল ২০১৪ সালে একটি বাফার জোন ঘোষণা করে। ইসরায়েল ও গাযার মধ্যে বেশ বিস্তীর্ণ এই এলাকা তারা গড়ে তোলে যাতে গাযা থেকে চালানো কোনরকম হামলা থেকে তাদের দেশ নিরাপদ দূরত্বে থাকতে পারে।

কিন্তু এই বিস্তীর্ণ এলাকা বাফার জোনের অংশ করে নেওয়ায় স্থানীয় মানুষদের থাকার এবং কৃষিকাজের জন্য জমি অনেকটাই কমে গেছে।

Presentational white space

গাযার একটি ব্যস্ত রাস্তা আল-মুকতার স্ট্রিট- শহরের প্রাণকেন্দ্র। নিচের টুইটে লড়াইয়ে বিধ্বস্ত রাস্তার ছবি পোস্ট করেছেন এক টুইট ব্যবহারকারী।

Skip X post
X কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: তৃতীয়পক্ষের কন্টেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of X post

Presentational white space

জাতিসংঘের হিসাব বলছে ২০১৪ সালের যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত বা বিধ্বস্ত হয়েছিল ১ লাখ ৪০ হাজার বসতবাড়ি। প্রায় ৯০ হাজার মানুষকে তাদের বসতবাড়ি আবার নির্মাণ করার কাজে তারা সহায়তা দিয়েছিল।

ওচা বলছে এখন সাম্প্রতিক এই যুদ্ধের কারণে কয়েকশ বসতবাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। অনেক বাড়ি মাটিতে মিশিয়ে গেছে। তারা বলছে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করতে বেশ সময় লেগে যাবে।

Presentational white space

আরও পড়তে পারেন:

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চাপের মুখে

গাযার জন-স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবস্থা নানা কারণে সঙ্গিন। জাতিসংঘ সংস্থা ওচা বলছে ইসরায়েল ও মিশরের দিক থেকে অবরোধ, পশ্চিম তীর কেন্দ্রিক ফিলিস্তিনি প্রশাসনের গাযার জন্য অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্য বরাদ্দ এবং ফিলিস্তিনি প্রশাসনের মধ্যে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং হামাসের কর্মকাণ্ড সবই গাযার করুণ স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থার জন্য দায়ী।

জাতিসংঘ গাযায় ২২টি স্বাস্থ্য কেন্দ্র চালায়। ইসরায়েলের সাথে পূর্ববর্তী সংঘাতের সময়ই গাযার বেশ কিছু হাসপাতাল ও ক্লিনিক ক্ষতিগ্রস্ত বা বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।

ধ্বংসস্তুপ থেকে উদ্ধার করা একটি শিশুকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, ধ্বংসস্তুপ থেকে উদ্ধার করা একটি শিশুকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে

গাযার কোন রোগীর যদি পশ্চিম তীর বা পূর্ব জেরুসালেমের হাসপাতালে চিকিৎসা নেবার দরকার হয়, তাহলে তাকে আগে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করে তার জন্য অনুমোদন নিতে হবে। তারপর ইসরায়েল সরকারের কাছে গাযা থেকে বেরনর জন্য পাস যোগাড় করতে হবে। ২০১৯ সালে গাযা ভূখন্ড থেকে চিকিৎসা থেকে বেরন আবেদন অনুমোদনের হার ছিল ৬৫%।

গত কয়েক মাসে করোনাভাইরাসের কারণে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা রীতিমত প্রবল চাপের মুখে রয়েছে।

এপ্রিল মাসে গাযায় প্রতিদিন সংক্রমণের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০০০। মহামারি শুরু হবার পর থেকে গাযায় আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লক্ষ ৪ হাজার। ভাইরাসে মারা গেছে ৯৪৬জন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হুঁশিয়ার করেছে যে গাযা ইসরায়েল সীমান্তে বিধিনিষেধের কারণে শত্রুতার শিকার রোগীরা প্রাণ বাঁচানোর জন্য চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত তো হচ্ছেই, এই প্রাণঘাতী ভাইরাস মোকাবেলার কাজও এর কারণে ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে এর কারণে "গুরুত্বপূর্ণ" টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এই অবস্থায় মানুষজন যুদ্ধের কারণে এখন আপদকালীন বাসস্থানে গাদাগাদি করে আশ্রয় নেবার কারণে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার বড়ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

খাবার ও জীবিকার সঙ্কট

জাতিসংঘের হিসাবে গাযায় দশ লাখের ওপর মানুষ "মাঝারি থেকে গুরুতর খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে" শ্রেণিভুক্ত, যদিও সেখানে প্রচুর মানুষ কোন না কোন ধরনের খাদ্য সহায়তা পেয়ে থাকে।

ত্রাণের খাদ্যবাহী গাড়ির বহর যাবার জন্য সীমান্ত পারাপারের চৌকিগুলো খুলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু গোলাবর্ষণের কারণে খাদ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে।

গাযার মানুষের কৃষিকাজ ও মাছধরার ওপর ইসরায়েল যেসব বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে তার ফলে গাযার বাসিন্দারা নিজেদের প্রয়োজনের জন্য পর্যাপ্ত খাবার উৎপাদন করতেও অক্ষম।

পাথরের সাদামাটা শিবিরের বাইরে দাঁড়ানো একটি পরিবার

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বহু পরিবার থাকেন শরণার্থী শিবিরে

ইসরায়েলের ঘোষিত বাফার জোন এলাকায় গাযার মানুষ চাষবাস করতে পারেন না। এই এলাকা সীমান্তে গাযার দিকে প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা জুড়ে। এর কারণে গাযায় বছরে আনুমানিক ৭৫ হাজার টন কম ফসল উৎপাদিত হয়।

ইসরায়েল গাযার জন্য মাছ ধরার ক্ষেত্রেও সীমানা বেঁধে দিয়েছে। গাযার বাসিন্দাদের উপকূল থেকে মাত্র কিছু দূর পর্যন্ত মাছ ধরার অনুমতি আছে। জাতিসংঘ বলছে এই বিধিনিষেধ তুলে নেয়া হলে মাছ ধরে গাযার মানুষ জীবিকা নির্বাহ করতে পারত। এবং এলাকার মানুষ সস্তায় প্রোটিনযুক্ত খাবার খাওয়ার সুযোগ পেত।

এগারো দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ইসরায়েল গাযা ভূখন্ড থেকে কোনরকম মাছ ধরার ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। গত কয়েক বছরে ইসরায়েল বিভিন্ন সময়ে মাছ ধরার এলাকার সীমানা বিভিন্নভাবে বদলেছে। ফলে গাযার প্রায় ৫ হাজার জেলে ও মৎস্য খাতে সংশ্লিষ্টদের রুজিরোজগারে বড়ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে।

পানির নিত্য সঙ্কট

গাযার বেশিরভাগ মানুষ পানির সঙ্কটে দিন কাটান। কলের পানি লবণাক্ত এবং দূষিত এবং পানের উপযোগী নয়।

রাস্তার কল থেকে পানি সংগ্রহ করছে এক কিশোর

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, রাস্তার কল থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয় গাযা বহু বাসিন্দাকে

গাযার বাসিন্দাদের একটা বড় অংশের বাসায় পাইপ লাইনে পানির সংযোগ থাকলেও ওচা বলছে পরিবারগুলো পানি প্রায় অনিয়মিতভাবে। ২০১৭ সালে পরিবারগুলো কলের পানি পেত প্রতি চার দিন অন্তর মাত্র ৬ থেকে ৮ ঘন্টার জন্য। এর কারণ ছিল পানি পাম্প করার জন্য বিদ্যুতের অভাব।

সর্বসাম্প্রতিক এই লড়াইয়ের ফলে এই সমস্যা আরও সঙ্গিন হয়েছে। পানির সরবরাহ আরও কমে গেছে বিদ্যুতের অভাবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে তারা মাথা পিছু প্রতিদিন ১০০ লিটার পানির নূন্যতম একটা বরাদ্দ বেধে দিয়েছিল। এই বরাদ্দ ছিল খাওয়া, ধোয়া, রান্না ও গোসল করার প্রয়োজন মেটানোর জন্য নূন্যতম বরাদ্দ। গাযায় পানি ব্যবহারের প্রয়োজনীয় গড় পরিমাণ মাথা পিছু প্রায় ৮৮ লিটার।

পয়ঃনিষ্কাশনও আরেকটা বড় সমস্যা। ৭৮% বাসাবাড়ি পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত থাকলেও বর্তমান ব্যবস্থা তা সামাল দিতে অক্ষম।

ওচা বলছে প্রতিদিন ১০ কোটি লিটার অপরিশোধিত অথবা আংশিক পরিশোধিত বর্জ্য ভূমধ্যসাগরে গিয়ে পড়ছে।

সমস্যা মোকাবেলার জন্য ২০২১য়ের গোড়ায় নতুন একটি বর্জ্য পরিশোধন প্লান্ট বসানো হয়েছে।

সাম্প্রতিক লড়াইয়ে গাযার বেশিরভাগ বাসিন্দা আশ্রয় নিয়েছে স্কুলগুলোতে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে গাযার বেশিরভাগ বাসিন্দা আশ্রয় নিয়েছে স্কুলগুলোতে। ফলে লেখাপড়া ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।

শিক্ষাও বিপর্যস্ত

গাযার বহু শিশুই জাতিসংঘ পরিচালিত স্কুলে লেখাপড়া করে। সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে বেশিরভাগ স্কুলভবন এখন আশ্রয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বোমাবর্ষণ থেকে বাঁচতে পরিবারগুলো এইসব স্কুলভবনে আশ্রয় নিয়ে আছে।

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থার হিসাব বলছে পরিস্থিতি সামাল দিতে ২৭৫টি স্কুলের মধ্যে ৬৪% এখন দুই শিফটে স্কুল চালাচ্ছে। এক শিফট সকালে এক শিফট বিকেলে।

Presentational white space