মামুনুল হক: হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার

মামুনুল হককে আটক করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মামুনুল হককে আটক করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ
    • Author, সায়েদুল ইসলাম
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

ঢাকায় পুলিশ বলছে, তারা হেফাজতে ইসলামের একজন আলোচিত নেতা মামুনুল হককে গ্রেপ্তার করেছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম বিবিসিকে জানান, রোববার দুপরে মোহাম্মদপুরের জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মি. হক হেফাজতে ইসলামের যুগ্ন মহাসচিব এবং খেলাফত মজলিশ বাংলাদেশের মহাসচিব।

মামুনুল হকের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতের ঘেরাও কর্মসূচীর জেরে ঘটা সংঘর্ষ ও নাশকতার ইস্যুতে মামলাসহ বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। সম্প্রতি মোদীর সফরবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ কয়েকটি জায়গায় যেসব সহিংসতা হয়েছে, সেগুলোকে ঘিরে করা মামলাগুলোতেও আসামী হিসেবে রয়েছে মি. হকের নাম।

গত কয়েকদিনে হেফাজতে ইসলামের বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয়সহ নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া কেন্দ্রীয় নেতাদের ২০১৩ সালের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। বেশ কয়েকজনে রিমাণ্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকের কঠোর সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী
ছবির ক্যাপশান, হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকের কঠোর সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী

মামুনুল হককে যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়

পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত তেসরা এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের রিসোর্টকাণ্ডের পর থেকেই মোহাম্মদপুরের জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসায় অবস্থান করছিলেন মামুনুল হক। সেই সময় থেকেই পুলিশ তার ওপর নজর রাখছিল।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গোয়েন্দা পুলিশ ও তেজগাঁও বিভাগের শতাধিক পুলিশ ওই মাদ্রাসাটা ঘিরে ফেলে।

মাদ্রাসার দোতলার একটি কক্ষ থেকে মামুনুল হককে নিয়ে একটি মাইক্রোবাসে তোলা হয়।

এরপর প্রথমে তাকে তেজগাঁও ডিভিশনের ডিসির কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাকে মিন্টো রোডে ডিবি পুলিশের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।

হেফাজতে ইসলামের প্রতিক্রিয়া:

মামুনুল হক গ্রেপ্তার হওয়ার পর হেফাজতে ইসলামের আনুষ্ঠানিক কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংগঠনটিরএকজন কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো মোকাবেলার জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি আইনি প্যানেল তৈরি করা হয়েছে।

মামলাগুলোকে সংগঠনের পক্ষ থেকে আইনিভাবে মোকাবেলা করা হবে, বলে জানান তিনি।

হেফাজতের এই নেতা আরো বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে দলের সিনিয়ররা বসেছেন, কথা বলছেন, কথা বলে পরবর্তী পরামর্শ বা সিদ্ধান্ত তারা নেবেন।

হেফাজতে ইসলামের ডাকা গত ২৮শে মার্চে হরতালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করে হরতাল সমর্থকরা

ছবির উৎস, MASUK HRIDOY

ছবির ক্যাপশান, হেফাজতে ইসলামের ডাকা গত ২৮শে মার্চে হরতালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করে হরতাল সমর্থকরা

বিতর্কের কেন্দ্রে মামুনুল

হেফাজত ইসলামের নেতা হলেও মামুনুল হক আলোচিত হয়ে ওঠেন শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য বিরোধী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে।

"আমাদের সকলের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং ঘোষণা হল আমরা দেশে রাষ্টীয় পর্যায়ে ইসলামকে বাস্তবায়ন করতে চাই। আমাদের সেই প্রচেষ্টা সফল হলে, ইসলামি হুকুমত বাস্তবায়িত ত হলে ভাস্কর্য সরিয়ে না ফেলার কোন অবকাশ থাকবে না" সেই সময় বলছিলেন মামুনুল হক।

তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ মন্তব্য করেছিলেন 'হেফাজত নতুন রাজাকার হয়ে দাঁড়াচ্ছে', যার প্রতিবাদ করে বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিস এর মহাসচিব মামুনুল হক, একই সাথে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম-মহাসচিব এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করে বলেছেন ভাস্কর্য বিরোধিতার সাথে রাজাকার হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং মুজিব জন্ম শতবর্ষের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে হেফাজতে ইসলামের নেয়া কর্মসূচীকে কেন্দ্র করে হেফাজতের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ব্যাপক সহিংস রূপ ধারণ করে, এবং সেই সহিংসতায় কমপক্ষে ১৭ জনের মৃত্যু হয়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের সময় গত ২৬শে মার্চ থেকে তিন দিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে এবং ঢাকায় বায়তুল মোকাররম মসজিদ এলাকায় হেফাজতের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা হয়েছে।

হাটহাজারী এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের থানা আক্রমণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি অফিসে অগ্নিসংযোগসহ নাশকতার নানা ঘটনা ঘটেছে। প্রাণহানি হয়েছে কমপক্ষে ১৭জনের।

সেই সহিংসতার পর নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে একটি রিসোর্টে একজন নারীসহ হেফাজত নেতা মামুনুল হকের অবস্থান করার ঘটনা ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে।

গত তেসরা এপ্রিল সোনারগাঁও এলাকায় একটি রিসোর্টে মামুনুল হককে ঘেরাও করে রাখে স্থানীয় কিছু লোক এবং ক্ষমতাসীন দল-সম্পৃক্ত ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীরা। তাদের অভিযোগ, মামুনুল হক একজন নারীকে নিয়ে রিসোর্টে ঘুরতে গিয়েছেন। অন্যদিকে মামুনুল হক বলেন, মহিলাটি তার দ্বিতীয় স্ত্রী। কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর হেফাজতে ইসলামের সমর্থক এবং মাদ্রাসার ছাত্ররা পাল্টা হামলা চালিয়ে সেখান থেকে মি.হককে নিয়ে যায়।

ভিডিওর ক্যাপশান, হেফাজত-সরকার সম্পর্ক কি ভেঙ্গে গেলো?

এরপর সংসদে দেয়া বক্তব্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, শনিবার মামুনুল হক 'অপবিত্র কাজ করে সোনারগাঁও এর রিসোর্টে' ধরা পড়েছেন।

"এরা ধর্মের নামে এত কথা বলে, পবিত্রতার নামে এত কথা বলে, এখন অপবিত্র কাজ করে সোনারগাঁও এর রিসোর্টে ধরা পড়েছে দলটির যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক। এখন সেটা ঢাকার জন্য নানা রকম চেষ্টা করছে তারা।"

প্রধানমন্ত্রী সংসদে তার ভাষণে বলেন, "এত আগুন জ্বালাও-পোড়াও করে তিনি (মামুনুল হক) বিনোদন করতে গেলেন রিসোর্টে, একজন সুন্দরী মহিলা নিয়ে। এরা ইসলাম ধর্মের নামে কলঙ্ক। এরা ইসলাম ধর্মকে ছোট করে দিচ্ছে।"

"এরা ধর্মকে কলুষিত করে দিচ্ছে, ধর্মের নামে ব্যবসা শুরু করেছে। বিনোদনের এত অর্থ কোথা থেকে আসে?" এমন প্রশ্নও তোলেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।

জনগণের সম্পত্তি নষ্ট করা এবং ধর্মের নাম নিয়ে 'অধর্মের' কাজের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন প্রধানমন্ত্রী।

তবে মামুনুল হক পরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, 'প্রধানমন্ত্রী না জেনে অসত্য বক্তব্য দিচ্ছেন'। আর হেফাজতে ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, তারা 'বিব্রত ও হতভম্ব'।

হেফাজত ইসলাম মুলত কওমি মাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন

ছবির উৎস, BBC BANGLA

ছবির ক্যাপশান, হেফাজত ইসলাম মুলত কওমি মাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন

হেফাজত ইসলামের বিরুদ্ধে কঠোর সরকার

২০১৩ সালে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশের পর থেকেই কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক এক সংগঠনটির সঙ্গে সরকারের একধরণের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও সহাবস্থান থাকলেও, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশ সফর ঘিরে সহিংসতা আর মামুনুল হকের রিসোর্ট কাণ্ডের পর থেকেই কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করে সরকার।

সংঘাতের জন্য হেফাজত তাদের ভাষায় সরকারি দল ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর আক্রমণকে দায়ী করছে। অন্যদিকে সহিংসতার পর কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারী দিচ্ছে সরকার।

এর মধ্যেই সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর হেফাজতে ইসলামের সভাপতি মোহাম্মদ জুনায়েদ আল হাবীব এবং সহকারী মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা মহানগরীর ভারপ্রাপ্ত আমির মাওলানা জুবায়ের আহমেদসহ বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কয়েকজনকে ২০১৩ সালে হেফাজতের তাণ্ডবের ঘটনায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর: