কক্সবাজারে মাছ ধরা ট্রলারে রহস্যময় বিস্ফোরণ সম্পর্কে কী জানা যাচ্ছে

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলে এভাবেই মাছ ধরে জেলেরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলে এভাবেই মাছ ধরে জেলেরা
    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের কক্সবাজার উপকূলে মাছ ধরার সময় ট্রলারে বিস্ফোরণে শুক্রবার রাত পর্যন্ত সাত জনের মৃত্যু হয়েছে আর ঢাকায় শেখ হাসিনা বার্ণ ইন্সটিটিউটে চিকিৎসাধীন আছেন আরও চার জন কিন্তু এ ঘটনাটি নিয়ে কৌতুহল ছড়িয়ে পড়েছে জেলে ও ট্রলার মালিকদের মধ্যে।

নিহত ও আহত জেলেদের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে । সেখানকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল মোমিন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, নিহতদের পরিবারকে ইতোমধ্যেই জেলা প্রশাসন থেকে বিশ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে।

কিন্তু এই বিস্ফোরণের কারণ জানা গেছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন জেলেদের যারা সুস্থ হয়ে এসেছে তাদের সাথে কথা বলেছেন কিন্তু তারা কারণ কিছু বলতে পারেনি। বিষয়টি নিয়ে কক্সবাজারে গিয়ে মামলা করার জন্যও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মি. মোমিন।

"মামলা ও তদন্ত হলে জানা যাবে আসলে কি ঘটেছে সেখানে," বলছিলেন তিনি।

তবে কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেছেন এখনো কোন মামলা দায়ের করেনি কেউ। কোস্ট গার্ডের চট্টগ্রাম জোনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন ঘটনাটিও তাদেরকেও জানানো হয়নি।

তবে কোস্ট গার্ড কক্সবাজার ইউনিটে যোগাযোগ করা হলে সেখানকার একজন কর্মকর্তা প্রসঙ্গটি উত্থাপনের সাথে সাথে ফোন কেটে দেন এবং পরে কয়েক দফা যোগাযোগ করা হলে পরে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

তবে দুর্ঘটনা কবলিত ট্রলারটির মালিক শহিদুল হক সোহেল বলছেন, "এটি একটি রহস্যময় ঘটনা। কারণ জাহাজের ইঞ্জিন, ব্যাটারি, গ্যাস সিলিন্ডার সব অক্ষত। হঠাৎ করে কিছু একটা এসে উপরিভাগের কেবিনে বিধ্বস্ত হয়ে বিস্ফোরণ ঘটায় যাতে সেখানে থাকা ১২ জন জেলে আহত হয়। শুক্রবার রাত পর্যন্ত তাদের মধ্যে সাত জন মারা গেছে"।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

মেঘনায় মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় কক্সবাজার উপকূলে মাছ ধরতে গিয়েছিলো জেলেরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মেঘনায় মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় কক্সবাজার উপকূলে মাছ ধরতে গিয়েছিলো জেলেরা

যা ঘটেছিলো

একুশ জন জেলে ট্রলারটি নিয়ে কক্সবাজার উপকূল থেকে রওনা দিয়েছিলো ২৭শে ফেব্রুয়ারি। বাকখালী নদী পেরিয়ে আরও অন্তত ১০/১২ ঘণ্টা ট্রলার চালানোর পর রাত তিনটা থেকে সাগরে জাল ফেলার কাজ করে ২৮শে ফেব্রুয়ারি সকাল দশটা নাগাদ সকালের খাবার খান তারা।

জেলেদের একজন মোঃ শরীফ বিবিসিকে বলেন, মেঘনায় মাছ ধরা নিষেধ এখন তাই তারা কক্সবাজার উপকূলে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন সেদিন।

তিনি জানান জেলেদের প্রায় সবাই উপরের অংশের কেবিনে ভেতরে ও বাইরে বসে খাবার খাওয়া মাত্র শেষ করেছিলেন আর একজন নীচে বসে জাল পাহারা দিচ্ছিলেন।

"সকাল সাড়ে এগারটার মতো বাজে। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ। কেবিন তছনছ হয়ে গেলো। সবাই লাফিয়ে পড়লো পানিতে। পরে যে একজন উপরে ছিলো যে রশি ফেললে আমরা একে একে উঠে আসি। কম বেশি সবাই আহত হল। বেশ কিছুক্ষণ পর কাছাকাছি এলাকা দিয়ে আরেকটি ফিশিং বোট যাচ্ছিলো। তখন আমরা অনুরোধ করলাম মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে এমন এলাকায় এগিয়ে দিয়ে আসতে," বলছিলেন তিনি।

পরে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়ার পর ট্রলারের মালিককে ঘটনা জানান আহত জেলেরা এবং তাদের দ্রুত উদ্ধারের অনুরোধ করেন।

মালিক শহিদুল হক সোহেল বলেন, খবর পেয়েই আরেকটা বোট ও দুইটা স্পীড বোট ভাড়া করে তখনি রওনা দিয়ে তাদের উদ্ধার করে নিয়ে এসে হাসপাতালে ভর্তি করান তিনি।

"তারপর থেকে শুক্রবার রাত পর্যন্ত একে একে কয়েকজন মারা গেলো। আরও কয়েকজন চিকিৎসাধীন আছে। কিন্তু ঘটনাটি কেন ঘটলো সেটি বুঝলাম না। কারণ ট্রলারে ইঞ্জিন, গ্যাস সিলিন্ডার বা ব্যাটারি সব ঠিক আছে। মাঝি বা জেলেরাও কিছু বুঝতে পারেননি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মিস্টার হক।

তিনি জানান আহতদের দ্রুত প্রথমে চট্টগ্রাম ও পরে কয়েকজন ঢাকায় পাঠানো হয়েছে এবং পুরো ঘটনা সেখানকার ফিশিং বোট মালিক সমিতিকে জানানো হয়েছে।

ট্রলার বা এ ধরণের নৌকা নিয়ে সাগরে যায় জেলেরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ট্রলার বা এ ধরণের নৌকা নিয়ে সাগরে যায় জেলেরা

মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বিবিসিকে বলছেন, "এটা একটা মিরাকল। ট্রলারটি উত্তর থেকে দক্ষিণমুখী ছিলো। এবং বিস্ফোরক কিছু এসে পাশ থেকে কেবিনে আছড়ে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। রহস্য উদঘাটনে ঘটনাটি তদন্ত হওয়া দরকার"।

মি. হোসেন বলেন, সাধারণ একজন মাঝির নেতৃত্বে জেলেরা ফিশিং বোট মালিকের সাথে চুক্তি অনুযায়ী সাগরে যায় মাছ ধরতে।

"ধরুন আমি বোট আর দুই লাখ টাকা অগ্রিম দিলাম। তারা সাগরে যাবে মাছ ধরবে। যা পাবে খরচ বাদ দিয়ে লাভের বাকী অংশ সমান ভাগ হবে। তাই বোট নিয়ে যাওয়ার পর মালিকের এখানে আর করণীয় কিছু থাকে না। কিন্তু এখানে মাঝি ও জেলেরাই হতবাক যে কি হয়ে গেলো"।

যারা মারা গেছেন

রামগতি উপজেলা প্রশাসন ও জেলেদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী যারা মারা গেছেন তারা হলেন: মোঃ বেলাল উদ্দিন, মোঃ মেহেরাজ উদ্দিন, মোঃ রিপন মাঝি, আবুল কাশেম, মোঃ মিলন, মিরাজ উদ্দিন (পিতা সিরাজ উদ্দিন) ও মিরাজ (পিতা: দেলোয়ার হোসেন)।