ইসলামিক স্টেট: জেগে ওঠার আওয়াজ দিচ্ছে, লক্ষ্য আফ্রিকা

বাগদাদে বৃহস্পতিবারের হামলাটি ছিল গত বছরের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক।

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, বাগদাদে বৃহস্পতিবারের হামলাটি ছিল গত বছরের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক।
    • Author, ফ্র্যাংক গার্ডনার
    • Role, বিবিসির নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদদাতা

ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠী (আই এস) একেবারে বিলীন হয়ে যায়নি।

গত বৃহস্পতিবার বাগদাদে জোড়া আত্মঘাতী বোমা আবার মনে করিয়ে দিয়েছে যে সিরিয়া এবং ইরাকে একসময় বিপুল ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণকারী এই গোষ্ঠী এখনও বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে।

সর্ব সম্প্রতি এই হামলার লক্ষবস্তু ছিল শিয়া সম্প্রদায়। সুন্নি জিহাদিরা তাদের 'রাফিদিয়ান' বা ইসলাম অস্বীকারকারী হিসেবে খারিজ করে।

"বড় শহরে আত্মঘাতী হামলা চালানো আইএস-এর বরাবরের কৌশল,‍ বলছেন লন্ডনের কিংস কলেজের সিকিউরিটি স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক পিটার নিউম্যান, "এর মাধ্যমে একদিকে তারা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকে বাড়িয়ে দিতে চায়। অন্যদিকে তারা চায় এসব ঘটনার পর সুন্নি সম্প্রদায়ের ওপর শিয়াদের প্রতিশোধমূলক হামলা চলুক।"

"আইএস চায় সাম্প্রদায়িক সংঘাত বেড়ে যাক। তাহলে যে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে তার মধ্যে তারা দেখাতে পারবে যে তারাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।"

ভিডিওর ক্যাপশান, বাগদাদের একটি পুরোনো কাপড়ের মার্কেটে জোড়া বোমা হামলার পরবর্তী দৃশ্য।

শক্তির মহড়া

বাগাদের যে বাজারে ঐ হামলাটি হয় তা বেছে নেয়া হয়েছিল নানা ধরনের সুবিধের কারণে।

হামলাকারীদের প্রধান লক্ষ্য ছিল সবাইকে জানিয়ে দেয়া যে ২০১৯ সালে আইএস তার খেলাফত হারালেও তারা এখনও অনেক শক্তিশালী।

আক্রমণের পরিকল্পনাকারীরা আরেকটি বিষয়কে বিবেচনায় নিয়েছিল। তা হলো ইরাকী জনগণের মায়া-মমতা।

তারা জানতো, যে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে মানুষ তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে এবং তার পাশে ভিড় করে দাঁড়াবে।

বোমা হামলার শিকার ব্যক্তিদের মরদেহ জানাজার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বোমা হামলার শিকার ব্যক্তিদের মরদেহ জানাজার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

আত্মঘাতী হামলাকারী যখন দেখতে পেল যে তার পাশে অনেক মানুষ জমে গেছে তখনই সে নিজের কাছে রাখা বোমাটিতে বিস্ফোরণ ঘটায়।

এরপরও যারা বেঁচে গিয়েছিল তাদের লক্ষ্য করে দ্বিতীয় বোমাটি ফাটানো হয়।

আইরিশ রিপাবলিকান বাহিনীর গোষ্ঠী আইআরএ ১৯৭৯ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ওয়ারেনপয়েন্টে একই কৌশল ব্যবহার করে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ১৮ জন সৈন্যকে হত্যা করেছিল।

বাগদাদের এই হামলাটির মধ্য দিয়ে "আইএস তার শত্রু-মিত্র সবাইকে জানিয়ে দিতে চেয়েছে যে তারা এখনও আছে, এবং তারা এখনও বড় ধরনের হামলা চালাতে প্রস্তুত," বলছেন অধ্যাপক নিউম্যান।

খেলাফতের ভূখণ্ড হারানোর পরও মধ্যপ্রাচ্যে আইএস এখন বেশ শক্তিশালী।

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, খেলাফতের ভূখণ্ড হারানোর পরও মধ্যপ্রাচ্যে আইএস এখন বেশ শক্তিশালী।

আরও পড়তে পারেন:

গেরিলা কায়দায় হামলা

কিন্তু আইএস-এর জন্য এখনকার বাস্তবতা হচ্ছে, বিপজ্জনক হলেও তারা আগের মতো শক্তিশালী নেই।

আফ্রিকার জঙ্গী গোষ্ঠী বোকো হারাম ২০১৫ সালে আইএস-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।

নাইজেরিয়ার জঙ্গী গোষ্ঠী বোকো হারাম ২০১৫ সালে আইএস-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, নাইজেরিয়ার জঙ্গী গোষ্ঠী বোকো হারাম ২০১৫ সালে আইএস-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।

একসময় যে বিশাল ভূখণ্ড তারা নিয়ন্ত্রণ করতো সেটার আয়তন ছিল বেলজিয়ামের আয়তনের প্রায় সমান।

আইএস পাঁচ বছর ধরে স্বঘোষিত 'খিলাফতে'র অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করতো, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতো, ক্ষেতের ফসল তুলে নিত, তেল উৎপাদন করতো এবং সেই তেল কালোবাজারে বিক্রি করতো।

তার চেয়েও যেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা হলো তারা ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকা থেকে হাজার হাজার লোককে তারা তাদের লড়াইয়ে সামিল হতে প্রলুব্ধ করতে পারতো।

কিন্তু সিরিয়ার বাঘুজে মার্কিন-নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন বাহিনীর হাতে পরাজয়ের মধ্য আইএস খেলাফতের অবসান ঘটে।

সোমালিয়ার আল-শাবাব গোষ্ঠী বেশ কয়েকবার সরকারি সেনাবাহিনীর হামলা প্রতিহত করেছে।

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, সোমালিয়ার আল-শাবাব গোষ্ঠী বেশ কয়েকবার সরকারি সেনাবাহিনীর হামলা প্রতিহত করেছে।

কিন্তু লড়াই শেষ হলেও প্রায় ১০,০০০ আইএস যোদ্ধা ইরাক এবং সিরিয়ায় পালিয়ে রয়েছে।

তারা সাধারণ জনগণের সাথে মিশে আছে, সহজেই তারা অস্ত্র ও গোলাবারুদ জোগাড় করতে পারে এবং, স্থানীয় সুন্নি জনগণের মধ্যে যেকোনো ক্ষোভ-কে তারা উসকে দিতে প্রস্তুত।

আইএস-এর খিলাফতের ভৌগলিক কাঠামো এতটাই বিনষ্ট হয়েছে যে তারা আবার সেটাকে মেরামত করে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে পারবে তেমন সম্ভাবনা খুবই কম।

তারা যে নিজেরাই এখন লক্ষবস্তুতে পরিণত হয়েছে তারা সেটাও মানুষকে বুঝতে দিতে চায় না।

সেজন্যে তারা যে কৌশল বেছে নিয়েছে সেটা একসময় ইরাকের ইসলামিক গোষ্ঠী খুব দক্ষতার সাথে ব্যবহার করতো।

তা হলো: বড় লক্ষবস্তুর ওপর চোরাগোপ্তা হামলা, স্থানীয় জনসাধারণকে ভয়ভীতি দেখানো এবং মানুষের জীবনযাত্রা একটু স্বাভাবিক হয়ে আসছে দেখতে পেলেই সেটাকে বিনষ্ট করা।

লড়াইয়ের পরবর্তী ময়দান আফ্রিকায়

মালিতে বহুজাতিক বাহিনীতে যোগ দেয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে ব্রিটিশ সৈন্যরা।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মালিতে বহুজাতিক বাহিনীতে যোগ দেয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে ব্রিটিশ সৈন্যরা।

সিরিয়া এবং ইরাকের বাইরে, গত দু'বছর ধরে আইএস-পন্থী দলগুলো সাফল্য পেয়েছে।

আফগানিস্তানে বেশ কয়েকটি শোচনীয় হামলার পেছনে আইএস-এর হাত রয়েছে বলে মনে করা হয়।

এখন অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মনে করেন, এই দশকে আইএস তৎপরতার প্রধান কেন্দ্র হবে আফ্রিকা।

সেখানে আইএস-এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আল-কায়দার সমর্থক বিভিন্ন গোষ্ঠীর সাথে।

আফ্রিকায় সাহেল-এর মতো অঞ্চল যেখানে সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, যেখানে প্রচুর দুর্নীতি চলে এবং যেখানে সীমান্ত নিরাপত্তা নেই বললেই চলে, সেই সব এলাকায় আইএস এবং আল-কায়েদা উভয়েই তাদের তৎপরতা বাড়িয়ে দেবে।

করোনাভাইরাস মহামারির সময় দুটো গোষ্ঠীই ২০২০ সালে তাদের অভিযানের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে।

নানা ধরনের বিধিনিষেধের মধ্যে লোকে এখন আগের মতো বাড়ির বাইরে যায় না, বড় ধরনের জন সমাবেশ হয় না, এবং যাতায়াতের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

কিন্তু পশ্চিমা দেশসহ নানা জায়গায় হামলা চালানোর খায়েশ তাদের এখনও রয়ে গেছে এবং তাদের পক্ষ হয়ে সেসব হামলা চালাতে উৎসাহী লোকেরও অভাব নেই।

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর: