করোনা ভাইরাস টিকা: খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলাদেশে কে কখন টিকা পাবেন ?

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশে কোভিড-১৯ মোকাবেলায় জাতীয়ভাবে টিকাদানের খসড়া পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এখন এটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
পরিকল্পনায় স্বাস্থ্যকর্মী এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা বয়স্ক মানুষদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেয়ার কথা বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর জানান, এই পরিকল্পনাটি অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং এটিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
পরিকল্পনাটিতে বলা হয়েছে, টিকা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি ও জনবল নিয়োগের মতো কাজ করতে ৮ সপ্তাহ বা দুই মাসের মতো সময় লাগবে।
টিকা কোথা থেকে কেনা হচ্ছে এবং এর উৎসের উপর ভিত্তি করে আমদানির রেজিস্ট্রেশন পেতে আলাদা সময় লাগবে বলে জানানো হয়। এতে বলা হয়, কোভ্যাক্সের টিকার রেজিস্ট্রেশন পেতে ২-৩ দিন এবং অন্যান্য উৎস থেকে টিকা কিনতে বা দেশে টিকা উৎপাদন করা হলে ১২-১৫ দিন সময় লাগবে।
আরো পড়ুন:
টিকাদান কর্মসূচী পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং পর্যবেক্ষণে সহায়তা ও সমন্বয়ের জন্য বাংলাদেশের সরকারের সব পর্যায়ে পরিকল্পনা ও সমন্বয় কমিটি গঠন করা হবে।
রোহিঙ্গাদের টিকাদানের ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে একটি আলাদা কমিটি গঠন করা হবে।
কীভাবে টিকা দেয়া হবে?
সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকাদের অগ্রাধিকার দিয়ে ভ্যাকসিন বন্টন করা হবে। সেক্ষেত্রে প্রথমেই রয়েছে কোভিড-১৯ রোগীদের সেবায় সরাসরি নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মী, সম্মুখ সারিতে থাকা কর্মী এবং রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা দূর্বল যেসব রোগী তারা। দ্বিতীয় ধাপে থাকবে বয়স্ক, স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে এমন বয়স্ক মানুষ, শিক্ষাকর্মী, জনপরিবহনের কর্মীরা।
তিন পর্যায়ে মোট ৫ ধাপে ১৩ কোটি ৮২ লাখ ৪৭ হাজারের বেশি মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনা হবে।
যার মধ্যে প্রথম পর্যায়ের প্রথম ধাপে ৩ শতাংশ বা ৫১ লাখ ৮৪ হাজার ২৮২ জনকে টিকা দেয়া হবে। দ্বিতীয় ধাপে ৭ শতাংশ বা এক কোটি ২০ লাখ ৯৬ হাজার ৬৫৭ জনকে টিকা দেয়া হবে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে একটি ধাপে ১১-২০শতাংশ বা এক কোটি ৭২ লাখ ৮০ হাজারের বেশি মানুষ ভ্যাকসনি পাবেন।
তৃতীয় ও সর্বশেষ পর্যায়ে মোট দুটি ধাপে ভ্যাকসিন দেয়া হবে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ২১-৪০ শতাংশ বা ৩ কোটি ৪৫ লাখ ৬১ হাজারের বেশি এবং দ্বিতীয় ধাপে ৪১-৮০ শতাংশ বা ৬ কোটি ৯১ লাখ ২৩ হাজার মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনা হবে।

ছবির উৎস, Getty Images
দুই জন টিকাদানকর্মী ও চার জন স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে মোট ছয় জন করে একেকটি দল তৈরি করা হবে যারা এই টিকাদান কর্মসূচী মাঠপর্যায়ে পরিচালনা করবেন। প্রতিটি দল প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ জনকে টিকা দিতে পারবে বলে ধরা হয়েছে।
ছয় জনের দলগুলোতে এক জন নারী ও একজন পুরুষ টিকাদানকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে কমপক্ষে এক জন নারী থাকবেন।
কোন ধাপে কারা টিকা পাবেন?
প্রথম পর্যায়ের প্রথম ধাপে যে তিন শতাংশ মানুষ ভ্যাকসিনেশনের আওতায় আসবেন তারা হচ্ছেন সব ধরণের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং সমাজকর্মী যারা কোভিড মোকাবেলায় সরাসরি জড়িত। এদের মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসক, নার্স এবং মিডওয়াইফারি পেশায় নিয়োজিত কর্মী, মেডিকেল ও প্যাথলজি ল্যাব কর্মীরা, পেশাদার স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্ন কর্মীরা, সাইকোথেরাপির সাথে সংশ্লিষ্টরা, মেডিসিন পারসনেল, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী, অ্যাম্বুলেন্স চালক মিলে তিন লাখ ৩২ হাজার জন।
সব সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবা কর্মী যারা স্বাস্থ্য সেবার বিভিন্ন ধাপে কাজ করে কিন্তু সরাসরি কোভিড-১৯ মোকাবেলার সাথে সংশ্লিষ্ট নয় যেমন স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যবস্থাপনা কর্মী, ক্ল্যারিক, বাণিজ্য কর্মী, লন্ড্রি কর্মী, অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া অন্য গাড়ির চালক-এমন এক লাখ ২০ হাজার জনকে ভ্যাকসিন দেয়া হবে।
এছাড়া ২ লাখ ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা, ৫ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি ফ্রন্ট লাইনে কাজ করা আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য যেমন পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, আনসার, ভিডিপি সদস্য, তিন লাখ ৬০ হাজার অন্যান্য বাহিনী যেমন সেনাবাহিনী, নেভি, বিমানবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, কোস্ট গার্ড ও প্রেসিডেন্ট গার্ডের সদস্য, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ৫০ হাজার কর্মকর্তা, ফ্রন্ট লাইনে কাজ করা সাংবাদিক ও মিডিয়া কর্মী ৫০ হাজার জনকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনা হবে।
এই ধাপে আরো যারা ভ্যাকসিন পাবেন তারা হচ্ছেন, জনপ্রতিনিধি, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা কর্মী, ধর্মীয় নেতা, দাফন ও সৎকারে নিয়োজিত কর্মী, ওয়াসা, ডেসা, তিতাস ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মী, স্থল, সমুদ্র ও বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষ, প্রবাসী শ্রমিক, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মী, ব্যাংক কর্মী, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম রয়েছে এমন রোগী, রোহিঙ্গা এবং বাফার, জরুরী ও মহামারি ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মী।
প্রথম ধাপের দ্বিতীয় পর্যায়ে টিকা দেয়া হবে ৬০ বছর বা এর চেয়ে বয়স্ক নাগরিকদের।
দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রথম ধাপে ৫৫ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সী নাগরিক, বয়স্ক এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা মানুষ, শিক্ষক এবং সব ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মী, প্রথম পর্যায়ে বাদ পড়া মিডিয়া কর্মী, দুর্গম এলাকায় বসবাসরত মানুষ, আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য, গণপরিবহন কর্মী, হোটেল, রেঁস্তোরা ও ওষুধের দোকানের কর্মী, গার্মেন্টস শ্রমিক, যৌনকর্মী ও তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যরা।

ছবির উৎস, Getty Images
তৃতীয় পর্যায়ের দুটি ধাপের মধ্যে প্রথম ধাপে যাদের টিকা দেয়ায় অগ্রাধিকার দেয়া হবে তাদের মধ্যে রয়েছে শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী যারা আগের ধাপে টিকা পাননি, গর্ভবতী নারী, অন্যান্য সরকারি কর্মচারী, অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী কর্মী, অন্যান্য স্বায়ত্বশাসিত ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী, রপ্তানি ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্মী, বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বন্দর কর্মী, কয়েদি ও জেলকর্মী, শহরের বস্তিবাসী বা ভাসমান জনগোষ্ঠী, কৃষি ও খাদ্য সরবরাহের কাজে নিয়োজিত কর্মী, ডরমেটরির বাসিন্দা, গৃহহীন জনগোষ্ঠী, অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মী, বাদ পড়া গণপরিবহন কর্মী, বাদ পড়া ৫০-৫৪ বছর বয়সী নাগরিক, জরুরী ও মহামারি ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা।
তৃতীয় পর্যায়ের শেষ ধাপে যারা টিকা পাবেন তারা হচ্ছেন অন্য ধাপে বাদ পড়া যুব জনগোষ্ঠী, শিশু ও স্কুলগামী শিক্ষার্থী, এবং এর আগের সব ধাপে বাদ পড়া জনগোষ্ঠী।
সব মিলিয়ে ৮০ শতাংশ জনগনকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে ১৯২ দিন সময় লাগবে বলে পরিকল্পনায় বলা হয়েছে। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া বাকি দিনগুলোতে সকাল ৯টা থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত টিকাদান কর্মসূচী চলবে। সরকারি ছুটির দিনে বিশেষ পরিকল্পনার আওতায় নির্ধারিত কিছু টিকাদান কেন্দ্রে সন্ধ্যায় টিকা দেয়া হবে।
ভ্যাকসিনগুলোকে জাতীয় পর্যায় থেকে জেলা পর্যায় এবং সিটি কর্পোরেশন এলাকায় রেফ্রিজারেটর ট্রাকে করে পরিবহন করবে ইপিআই।
জাতীয় পর্যায় এবং অগ্রাধিকার পরিকল্পনার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের টিকার আওতায় আনতে আলাদা পরিকল্পনা প্রনয়নেরও কথা বলা হয়েছে এই পরিকল্পনায়।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে কম ঝুঁকিতে রয়েছে এমন জনগোষ্ঠীকে টিকা দেয়া হবে।








