সীমান্তে অপরাধ কমলেই প্রাণহানি বন্ধ হবে, যুক্তি বিএসএফের

ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের টহল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের টহল
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অপরাধ বন্ধ করা গেলে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানিও আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে, এই কৌশলগত অবস্থান নিয়েই ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফের শীর্ষ নেতৃত্ব বাংলাদেশের বিজিবি-র সঙ্গে আলোচনায় বসছে।

ভারতের গুয়াহাটিতে দুই বাহিনীর মহাপরিচালকরা মঙ্গলবার থেকে পাঁচদিনের যে বৈঠক শুরু করছেন, তার আগে বিএসএফের জারি করা এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে এই সম্মেলনের 'ফোকাস' হবে যৌথ পদক্ষেপ নিয়ে আন্ত:সীমান্ত অপরাধ বন্ধ করা।

চলতি বছরে বিএসএফের হাতে সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা অনেক বেড়ে গেছে বলে বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ - কিন্তু বিএসএফ কীভাবে এই অভিযোগের প্রতিকারের কথা ভাবছে?

দিনচারেক আগে ভারত ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে ভার্চুয়াল সামিটের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেছিলেন, সীমান্তে প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র ব্যবহার করার নির্দেশনা তিনি নিজে দেবেন বলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশকে কথা দিয়েছেন।

সেপ্টেম্বরেও ঢাকায় বৈঠকে বসেছিলেন দুদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর প্রধানরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সেপ্টেম্বরেও ঢাকায় বৈঠকে বসেছিলেন দুদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর প্রধানরা

সীমান্তে বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা যে তাদের চরম লজ্জিত করছে, মি মোমেনের কথায় সেই ইঙ্গিতও ছিল।

সেই সামিটের ঠিক পর পরই গুয়াহাটির সম্মেলনে মিলিত হচ্ছেন দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধান - আর তার আগে ভারতীয় পক্ষের বিবৃতি থেকে স্পষ্ট, তাদের স্ট্র্যাটেজি হল সীমান্তে অপরাধ ঠেকানোর মাধ্যমে প্রাণহানি বন্ধ করার চেষ্টা।

বিএসএফের সাবেক মহাপরিচালক প্রকাশ সিং বিবিসিকে বলছিলেন, "দেখুন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে গরু ও মাদক পাচার-সহ নানা ধরনের সমস্যা আছে। ভারতীয়রা গরু পাচার করতে চায়, বাংলাদেশিরা নিতেও চায়।"

"কখনও কখনও এই সশস্ত্র পাচারকারীরা বিশ-তিরিশ জনের দল বেঁধে এলে বিএসএফের গুলি চালানো ছাড়া রাস্তা থাকে না।"

আরও পড়তে পারেন:

বিএসএফের বিবৃতির অংশবিশেষ

ছবির উৎস, BSF

ছবির ক্যাপশান, বিএসএফের বিবৃতির অংশবিশেষ

"এখানে বন্ধুপ্রতিম বাংলাদেশের সংবেদনশীলতা নিয়ে ভারত সরকার পুরোমাত্রায় সচেতন, কিন্তু কোনও কোনও পরিস্থিতিতে বলপ্রয়োগ করা ছাড়া বিএসএফের সত্যিই উপায় থাকে না!"

তবে বিএসএফ বলছে, দুই বাহিনীর মধ্যে যদি রিয়েল-টাইম 'তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা' থাকে এবং 'সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা' ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা যায় - তাহলে আন্ত:সীমান্ত অপরাধে রাশ টানা সম্ভব।

পি কে সিং কিন্তু মনে করিয়ে দিচ্ছেন, "দুদেশের লোকরাই এই সব অপরাধে জড়িত এবং স্মাগলিং বা চোরাকারবারের অর্থনীতিতে মুনাফাও প্রচুর।"

"বাংলাদেশে ভারতীয় গরুর চাহিদাও কম নয়, ফলে এগুলো চট করে বন্ধ করা খুবই মুশকিল।"

সীমান্তে গবাদি পশুর পাচার খুবই লাভজনক একটি কারবার

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সীমান্তে গবাদি পশুর পাচার খুবই লাভজনক একটি কারবার

নানা সীমান্ত ইস্যু নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন পশ্চিমবঙ্গে ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অনিন্দিতা ঘোষাল।

তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, তথাকথিত এই সব সীমান্ত অপরাধ বা 'ট্রান্সবর্ডার ক্রাইমে'র সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের যোগসাজশও কিন্তু সুবিদিত।

অধ্যাপক ঘোষালের কথায়, "আসলে আমরা দেশের মূল ভূখন্ডের লোকজন বর্ডার এলাকাটা বুঝিই না। যখন আমরা ফিল্ডওয়ার্কে সীমান্ত এলাকায় যাই ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলি - তখন বুঝি, সীমান্তের ছবিটা আসলে একেবারেই অন্য রকম।"

"আমরা এখানে যেটাকে 'ক্রাইম' বলি কিংবা যাদেরকে অপরাধী বা ক্রিমিনাল বলে চিহ্নিত করি, বর্ডার এলাকায় গিয়ে কিন্তু দেখতে পাই 'নেশন স্টেট' বা রাষ্ট্রই সেই ক্রিমিনালদের তৈরি করেছে।"

বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁওয়ে বিএসএফের হাতে নিহত এক ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের বিলাপ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁওয়ে বিএসএফের হাতে নিহত এক ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের বিলাপ

"সীমান্ত পেরিয়ে যে লোকগুলো আসার চেষ্টা করছে তাদের কিন্তু দেখা যাবে সাহায্য করছে এই নেশন স্টেটের বৈধ নাগরিকরাই। টাকাপয়সার হাতবদল হচ্ছে, আধাসামরিক বাহিনীকে অর্থ দিয়ে পারাপার চলছে - গ্রাউন্ড লেভেলে বিষয়টা ওভাবেই চলে।"

"ফলে নেশন স্টেটও সীমান্তটা ওভাবেই 'পোরাস' করে রাখে, ফুটোফাটা সারায় না - কারণ তাতে তাদেরই সুবিধে", বলছিলেন অনিন্দিতা ঘোষাল।

সম্প্রতি ভারতেও বিএসএফের পদস্থ কর্তাদের নাম জড়িয়েছে মুর্শিদাবাদ সীমান্তে গরু পাচারের ঘটনায় - তাদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও হতে হয়েছে।

পর্যবেক্ষকরাও ফলে একমত, বিএসএফে যদি সর্ষের মধ্যেই ভূত থাকে তাহলে সীমান্ত অপরাধ কমানোয় বা প্রাণহানি ঠেকানোয় তাদের সদিচ্ছা কতটা সে প্রশ্ন উঠবেই।