উড়ন্ত গাড়ি বাজারে আসছে- যানজটের শহরগুলোর জন্য স্বস্তির বার্তা?

সিঙ্গাপুরে অক্টোবর ২০১৯য়ে ভলোসিটি মডেলের উড়ন্ত ট্যাক্সির পরীক্ষামূলক উড়ান

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জার্মানির ভলোকপ্টার কোম্পানি তাদের ভলোসিটি মডেলের বিদ্যুতশক্তি চালিত উড়ন্ত ট্যাক্সিকে প্রথম বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য লাইসেন্স দিয়েছে
    • Author, এড্রিয়েন বার্নহার্ড
    • Role, বিবিসি ফিউচার

ভবিষ্যতে বিজ্ঞান আমাদের জীবন কীভাবে বদলে দিতে পারে তা নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে হলিউডে। যেমন ১৯৮২ সালের ছবি ব্লেড রানারে দেখানো হয়েছিল ভবিষ্যতের লস এঞ্জেলস শহরে আকাশের মহাসড়ক দিয়ে ছুটে চলেছে উড়ন্ত যানবাহন।

আসলেই তার পর থেকে প্রযুক্তি যেভাবে দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে হয়ত হলিউডের ছবি নির্মাতারা তা তখন কল্পনাও করতে পারেননি। আকাশে উড়তে পারে তাদের কল্পনার এমন অনেক যানবাহন এখনও রূপালি পর্দায় দেখা কল্পলোকের জিনিস হয়ে থাকলেও উড়ন্ত ট্যাক্সি কিন্তু এখন বাস্তবতায় রূপ পেয়েছে।

উড়ন্ত ট্যাক্সি এখন আগামী দশকগুলোতে আমাদের যাতায়াত, কর্মজীবন এবং জীবনযাত্রায় একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চলেছে।

ব্যাটারি প্রযুক্তি, কম্পিউটার এবং বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে এতটাই অগ্রগতি হয়েছে যে উদ্ভাবকরা এখন ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ধরনের উড়ন্ত গাড়ি তৈরি করছেন - সেইসঙ্গে এসব গাড়ি আকাশে কোন পথ ধরে চলবে তার পথ নির্দেশনা পদ্ধতিও তারা উদ্ভাবন করেছেন।

কিন্তু এর চ্যালেঞ্জ বিশাল।

কেমন দেখতে হবে এসব উড়ন্ত যান?

সিনেমায় দেখা বৈজ্ঞানিক কল্প কাহিনির উড়ন্ত যানের মত না হলেও তার কাছাকাছি কিছু তো বটেই।

বাণিজ্যিক বিমানের চেয়ে আকারে অনেক ছোট। বেশিরভাগই ডিজাইন করা হয়েছে ডানার বদলে হেলিকপ্টারের মত ঘূর্ণায়মান পাখা বা রোটার দিয়ে, যাতে গাড়িগুলো খাড়াভাবে আকাশে উঠতে বা নামতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা হল এই উড়ন্ত গাড়িগুলোর নক্সা তৈরি করা হয়েছে এমনভাবে যাতে তারা দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে, বিশেষ করে যানজটের শহরগুলোতে মানুষ যাতে দ্রুত তার গন্তব্যে পৌঁছতে পারে।

ব্লেড রানার ছবি (১৯৮২) থেকে উড়ন্ত গাড়ি চলাচলের দৃশ্য|

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ১৯৮২ সালের হলিউড ছায়াছবি ব্লেড রানার আকাশ পথে উড়ন্ত গাড়ির যে ধারণা নিয়ে এসেছিল তা বাস্তবে রূপ নিতে বেশি দেরি নেই

তবে এই মুহূর্তে আকাশ যানের বাজার কতটা আশাব্যঞ্জক তা বলা মুশকিল। যদিও বেশ কয়েকটি নতুন গজানো প্রতিষ্ঠান পাল্লা দিয়ে বাণিজ্যিক আকাশ-যান, উড়ন্ত মোটরবাইক এবং ব্যক্তিগত উড়ন্ত ট্যাক্সি তৈরির কাজে নেমে পড়েছে।

উদ্যোক্তাদের অর্থ সহায়তা দানকারী বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান, পাশাপাশি গাড়ি ও বিমান সংস্থাগুলো এই সম্ভাবনাময় শিল্পে লগ্নি করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের ধারণা ২০৪০ সাল নাগাদ এটা ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের শিল্প হয়ে উঠতে পারে।

এমনকি উবার কোম্পানিও এই উড়ন্ত ট্যাক্সি সেবায় তাদের ভূমিকা কী হবে তা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করে দিয়েছে। আকাশ পথে 'উবার এলিভেট' নাম দিয়ে তারা ব্যবসা করার ছক কাটছে।

ইতোমধ্যে, বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ আকাশ পথে পরিবহন ব্যবস্থার নতুন নিয়মনীতি ও নিরাপত্তার মান কী হবে তার রূপরেখা তৈরির কাজও শুরু করেছে।

জার্মান ভিত্তিক কোম্পানি ভলোকপ্টার তাদের ভলোসিটি মডেলের বিদ্যুতশক্তি চালিত উড়ন্ত ট্যাক্সিকে প্রথম বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য লাইসেন্স দিয়েছে। সংস্থাটির পরিকল্পনা অনুযায়ী এই যান আগামীতে পাইলট বিহীন উড়তে পারবে।

শুরুর দিকে ভলোসিটির পাইলট চালিত উড়ন্ত ট্যাক্সিতে বসতে পারবেন মাত্র একজন যাত্রী। ফলে এই রাইডের জন্য ভাড়া পড়বে একটু বেশি।

কিন্তু তারা আশা করছে যাত্রীদের মধ্যে আস্থা তৈরি হলে তারা স্বয়ং-চালিত মডেল বের করবে, যেখানে চালকের প্রয়োজন হবে না। এই যান চলবে বিদ্যুতশক্তিতে, গাড়ির কোন ডানা থাকবে না। নয়টি ব্যাটারি থেকে সরবরাহ করা বিদ্যুতশক্তি দিয়ে গাড়ি চলবে।

বিমান ওঠানামার জন্য যেমন বিমানবন্দর বা এয়ারপোর্ট থাকে, এইসব উড়ন্ত ট্যাক্সি ওঠানামার জন্য বড় বড় শহরের বিভিন্ন জায়গায় বসানো হবে ভার্টিপোর্ট। এই ট্যাক্সি যেহেতু খাড়াভাবে (ভার্টিকালি) আকাশে উঠবে, তাই এই ওঠানামার বন্দরগুলোর নাম তারা দিতে চাইছেন ভার্টিপোর্ট।

ভলোসিটি বাণিজ্যিকভাবে তাদের উড়ান শুরু করবে ২০২২ সালে।

অক্টোবর ২০১৯য়ে সিঙ্গাপুরে ভলোসিটি মডেলের উড়ন্ত ট্যাক্সির পরীক্ষামূলক উড়ান

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ''এটা ধনীদের জন্য একটা শখের খেলনা হোক সেটা আমরা চাই না। আমরা চাই এটা বড় শহরের সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থার অংশ হবে," বলছেন ভলোকপ্টার কোম্পানির ফেবিয়েন নেস্টমান

শখের খেলনা নয়

প্রাথমিক পর্যায়ে একটা উড়ানে একটা টিকেটের দাম পড়বে ৩৫০ ডলার (২৭০ পাউন্ড)। কিন্তু ভলোকপ্টার কোম্পানির ফেবিয়ান নেস্টমান বলছেন তাদের লক্ষ্য হল ক্রমশ এই খরচ প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা। উবার কোম্পানিতে যেমন উবার ব্ল্যাক নামে বেশি অর্থের বিনিময়ে উন্নত সেবার ব্যবস্থা আছে, তারা সেই মডেলের পরিষেবার কথা ভাবছেন।

"তবে এটা ধনীদের জন্য একটা শখের খেলনা হোক সেটা আমরা চাই না। আমরা চাই এটা হবে বড় শহরে বাস করা যে কোন মানুষের জন্য সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থার অংশ," বলছেন মি. নেস্টমান। "প্রত্যেকের যেমন হেঁটে, গাড়ি করে বা সাইকেলে চড়ে যাতায়াতের সুযোগ আছে, তেমনি আকাশপথে যাতায়াতেরও সুযোগ তাদের থাকবে।"

অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও তাদের আকাশ যান তৈরির জন্য বর্তমান গাড়ি নির্মাতাদের সাথে অংশীদার হিসাবে কাজ শুরু করেছে।

যেমন জাপানে স্কাই-ড্রাইভ নামে নতুন একটি স্টার্টআপ কোম্পানি তাদের পূর্ণ বিদ্যুত-চালিত উড়ন্ত ট্যাক্সির পরীক্ষামূলক উড়ানের জন্য টয়োটা কোম্পানির সাথে একজোটে কাজ করছে। বলা হচ্ছে তাদের উড়ন্ত ট্যাক্সি বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্র বিদ্যুত-চালিত যান যা সোজাসুজি খাড়াভাবে আকাশে উঠতে ও নামতে পারবে।

সংস্থাটি এই গ্রীষ্ম মৌসুমে বিমান চলাচল ক্ষেত্রের আশেপাশে তাদের একটি যান সফলভাবে কয়েক মিনিটের জন্য উড়িয়েছে। সেটিতে চালক ছিল।

"ভোক্তাদের দিক থেকে চাহিদা আছে। কিন্তু যানজট মুক্ত বিকল্প পরিবহন এখনও মানুষকে দেয়া হয়নি," বলছেন স্কাই-ড্রাইভের মুখপাত্র তাকাকো ওয়াদা।

"স্কাই-ড্রাইভ ভোক্তাদের চাহিদা এবং প্রযুক্তির অগ্রগতি দুটোই বিবেচনায় নিয়ে তাদের উড়ন্ত যান তৈরি করছে।"

আরও পড়তে পারেন:

জাপানের স্কাই ড্রাইভ কোম্পানির তৈরি এসডি-০৩ উড়ন্ত গাড়ি এবছর অগাস্টে জাপানে পরীক্ষামূলকভাবে উড়েছে।

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, বড় বড় গাড়ি নির্মাতা এবং বিমান চলাচল শিল্প ইতোমধ্যেই উড়ন্ত গাড়ির বাজারে চাহিদার বিষয়টি খতিয়ে দেখেছে। জাপানের স্কাই ড্রাইভ কোম্পানির তৈরি এসডি-০৩ উড়ন্ত গাড়ি এবছর অগাস্টে জাপানের আকাশে পরীক্ষামূলকভাবে ওড়ানো হয়েছে।

বিমান ডিজাইন করে এমন অনেক প্রতিষ্ঠানও এটাকে বিরাট একটা সম্ভাবনা হিসাবে দেখছে। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যাটারিতে সঞ্চিত বিদ্যুতশক্তি দিয়ে চালিত গাড়ি পরিবেশ ও শব্দ দূষণ সমস্যারও সমাধান করতে পারবে বলে এর সম্ভাবনা আরও ব্যাপক বলে মনে করছে অনেক প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে তারা তাদের গবেষণা ও উদ্ভাবনার কাজ করছে।

ভার্টিকালি বা সোজাসুজি কোন যানের আকাশে ওঠানামার প্রযুক্তি এখনও খুবই নতুন। এ ক্ষেত্রেও নানাধরনের নক্সা তৈরির কাজ এগোচ্ছে।

আকাশ পথে সাহায্য

ব্রিটেন ভিত্তিক এয়ারোনটিকাল কোম্পানি গ্র্যাভিটি ইন্ডাস্ট্রিস বলছে আকাশে ওড়ার অনেক প্রযুক্তি আছে যেগুলোর ব্যবহার এখনও সীমিত। যেমন তাদের তৈরি উচ্চ হর্সপাওয়ারের 'জেটপ্যাক'। যেটি গায়ে পরে মানুষ আকাশে উড়তে পারে।

প্রতিষ্ঠানটি বলছে এটা অনেকটা রেসিং কারের মত। এই যন্ত্র গায়ে বেঁধে নিয়ে এতে সঞ্চিত গ্যাস বা জ্বালানি শক্তি দিয়ে বাতাস কেটে মানুষ দ্রুত উড়ে যেতে পারবে গন্তব্যে।

তবে প্রতিষ্ঠানের প্রধান পাইলট ও প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্রাউনিং বলছেন, "এই প্রযুক্তির ব্যবহারের জন্য দক্ষতা এখনও শুধু পেশাদার বা সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।"

"তবে সেদিন হয়ত খুব বেশি দূরে নয়, যখন সুপার-হিরো চিকিৎসা কর্মীরা সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন কোন রোগীর কাছে দ্রুত জরুরি সেবা পৌঁছতে এধরনের যন্ত্র গায়ে পরে তিনি আকাশে উড়ে যাবেন কিনা।" অনেকটা ব্যাটম্যানের মত।

মি. ব্রাউনিং বলেছেন সম্প্রতি অ্যাম্বুলেন্স বিভাগের সাথে মিলে তিনি এই জেটপ্যাক পরে একটি পরীক্ষামূলক সন্ধান ও উদ্ধার তৎপরতার কাজ করেছেন ইংল্যান্ডের এক দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়।

গ্র্যাভিটি ইন্ডাস্ট্রিসের রিচার্ড ব্রাউনিং ইংল্যান্ডের লেক ডিস্ট্রিক্ট পাহাড়ে এই পরীক্ষা চালিয়েছেন ২০২০র সেপ্টেম্বর মাসে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ব্রিটেনের কোম্পানি গ্র্যাভিটি ইন্ডাস্ট্রিস একটি জেটপ্যাক তৈরি করেছে যা গায়ে বেঁধে আকাশে ওড়া যায়। প্রতিষ্ঠানটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সন্ধান ও উদ্ধারের কাজে এই প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার করেছে

পায়ে হেঁটে ঐ পাহাড়ের ওপর ওঠার পথ খুবই দুর্গম এবং উঠতে সেখানে সময় লাগে অন্তত ২৫ মিনিট। আর জেটপ্যাক পরে মি. ব্রাউনিং সেখানে পৌঁছে যান ৯০ সেকেন্ডে।

এই পরীক্ষা প্রমাণ করেছে জরুরি উদ্ধারকাজে যেখানে সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে অল্প সময়ের ব্যবধান জীবন বাঁচাতে পারে সেখানে এধরনের প্রযুক্তির গুরুত্ব কতটা।

"আকাশপথে পরিবহনের স্বপ্ন অনেকদিনের," বলছেন ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালিতে নাসার এয়ারোনটিক গবেষণা ইন্সটিটিউটের পরিচালক পরিমল কোপারদেকার।

"এখন নতুন প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে এমন সব আকাশ যান তৈরি করার সত্যিকার সুযোগ এসেছে যা সেই সব জায়গায় পণ্য ও সেবা পৌঁছে দেবে যেখানে বিমান যেতে পারে না।"

মি. কোপারদেকার নাসার এই গবেষণা কেন্দ্রে কাজ করছেন স্বয়ংচালিত বিমান প্রযুক্তি নিয়ে যার মাধ্যমে আকাশপথে চলাচলের ব্যবস্থা আরও উন্নত ও আরও বিস্তৃত করা যাবে।

আকাশের সড়ক পথে যান চলাচল ব্যবস্থাকে ব্যাপক পরিসরে ব্যবহারের উপযোগী করতে হলে এমন অনেক খুঁটিনাটি সমস্যার সমাধান করতে হবে, যেগুলো আপতদৃষ্টিতে সমস্যা বলে মনে নাও হতে পারে।

এধরনের আকাশ যানে যখন মানুষ চলাচল করবে তখন সেক্ষেত্রে আকাশের সড়কে তা নিরাপদ কিনা সেটা নিশ্চিত করতে হবে। ওই যানের আকাশ পথে চলাচল ও ওঠানামার জন্য বৈধ লাইসেন্স আছে কিনা, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের আস্থা থাকতে হবে এই নতুন পরিবহন ব্যবস্থার ওপর।

"খুবই কঠোর পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু না করে এ ধরনের যান চলাচল বাণিজ্যিকভাবে শুরু করা যাবে না," বলছেন জার্মানির ভলোকপ্টার কোম্পানির মি. নেস্টমান, যিনি এ ব্যাপারে তাদের কোম্পানির পক্ষে জন সচেতনতা গড়ে তোলার দায়িত্বে আছেন।

"এধরনের গাড়ি চলাচলের জন্য আকাশে উপযুক্ত অবকাঠামোও তৈরি করতে হবে।"

চীনা ব্যবসায়ী ঝাও ডেলি নিজের জন্য তৈরি করেছেন উড়ন্ত মোটরবাইক। গত বছর চীনে তিনি এর পরীক্ষামূলক উড়ান দিয়েছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, চীনা ব্যবসায়ী ঝাও ডেলি নিজের জন্য তৈরি করেছেন উড়ন্ত মোটরবাইক। গত বছর চীনে তিনি এর পরীক্ষামূলক উড়ান দিয়েছেন

আকাশে যখন মেলা গাড়ি চলাচল শুরু হবে তখন ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থারও প্রয়োজন হবে। বিমান ওঠানামার জন্য বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মত।

আকাশে গাড়ির ওঠানামা ও চলাচল নিয়ন্ত্র্রণের জন্যও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দরকার হবে। উদ্ভাবকরা বলছেন আকাশে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা হতে হবে স্বয়ংক্রিয়- ইউটিএম বা আনম্যান্ড ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট।

'আকাশপথের নিয়মবিধি'

বিশেষজ্ঞরা বলছেন এর জন্য পুরো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার বিকল্প নেই। নতুন চ্যালেঞ্জ থাকবে অনেক। শুধু তো আকাশে চলা গাড়ি বা অন্য ধরনের যানবাহন নয়, আকাশে আরও অনেক ধরনের ঝুঁকি থাকবে যেমন উড়ন্ত মহাজাগতিক বস্তু, পাখি, ড্রোন, আর বিমান! এদের কেউ চলার পথে এসে পড়ছে কিনা তা নিয়ন্ত্রণ জরুরি হবে।

ফলে তৈরি করতে হবে নিরাপদে চলাচলের পথ, ওঠানামার জন্য আকাশে নিরাপদ করিডোর, এমনকি প্রয়োজনে আকাশে যান পার্কিং করে রাখার ব্যবস্থা।

আর সেজন্যই আকাশের মহাসড়ক নিরাপদ ঝুঁকিমুক্ত করতে আকাশপথে চলাচলের নিয়মবিধি ও নতুন আইন তৈরি আবশ্যক হবে।

পশ্চিম লন্ডনের আকাশে ওড়া ড্রোন পেছনেই যাত্রীবাহী বিমান

ছবির উৎস, PA Media

ছবির ক্যাপশান, পশ্চিম লন্ডনের আকাশে ওড়া এধরনের ড্রোন সহ আকাশে আরও নানা ঝুঁকি এড়াতে নিরাপত্তা বিধিমালা তৈরি খুবই জরুরি হবে

গাড়ি নির্মাতা এবং আকাশ পরিবহনের পরিচালকদের আশ্বাস দিতে হবে যে এই নতুন যান চলাচল ব্যবস্থা আকাশ যাত্রী এবং নিচে মাটিতে যারা চলাচল করছেন তাদের জন্যও সমানভাবে নিরাপদ।

নাসার মি. কোপারদেকার ও তার টিমের সদস্যরা শহরে এধরনের যান চলাচল ব্যবস্থার ঝুঁকির দিকগুলো নিয়ে গবেষণা করছেন।

বিভিন্ন শহরের আকাশ চলাচলে বিভিন্ন ধরনের ইস্যু থাকবে - জটিলতা ও শহরের ঘনত্বের বিবেচনায় তারা এসব সমস্যাকে ছয়টি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন এবং তার ভিত্তিতে তারা কোথায় যান চলাচল কতটা স্বয়ংক্রিয় করা উচিত এবং কতটা মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন রাখা উচিত তার মডেল তৈরি করছেন।

খারাপ বা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, পাখির সাথে ধাক্কার ঝুঁকি, হঠাৎ চলার পথে জেটপ্যাক বেঁধে উড়ে যাওয়া মানুষ এসে পড়া এসব নানাধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে তারা তৈরি করছেন নির্দেশাবলী।

আকাশে ওড়া মানুষের সাথে ধাক্কা লাগার প্রকৃত ঝুঁকির অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমেরিকান একটি বিমানের এবছরই অক্টোবর মাসে ।

বেইজিংএ যানজট

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নিউ ইয়র্ক, হংকং এবং বেইজিংএর মত শহরগুলোর রাস্তা ধারণক্ষমতায় সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ব্যবসা সচল রাখতে আকাশের দিকে তাকানো ছাড়া এখন আর কোন বিকল্প বিশেষজ্ঞরা দেখছেন না।

ইউরোপীয় বিমান চলাচল নিরাপত্তা সংস্থা উড়ন্ত গাড়ি বা অন্য ধরনের আকাশ যানকে ওড়ার উপযোগী হতে হলে কী কী করতে হবে তারও তালিকা তৈরি করছে যেমন গাড়ির জরুরিকালীন নিগর্মন দরজা এবং নিগর্মন ব্যবস্থা, বজ্র বিদ্যুতের সময় সুরক্ষা ব্যবস্থা, আকাশে গাড়ির ভেতর নি:শ্বাস নেবার জন্য কেবিনের যথাযথ চাপ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি অনেক খুঁটিনাটি বিষয়ে নজর রাখা খুবই জরুরি।

কিন্তু একটা বিষয়ে সব বিশেষজ্ঞই একমত যে নিউ ইয়র্ক, বেইজিং, হংকংএর মত বড় শহরগুলোয় গাড়ির সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, এবং তার ফলে যে ধরনের যানজট তৈরি হচ্ছে তাতে এসব দেশের জন্য তাদের ব্যবসা ও অর্থনীতি সচল রাখতে আকাশেও সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোন বিকল্প আগামীতে নেই।

শহরের পুনর্বিন্যাস

যানজট এখন পৃথিবীর ছোট বড় অনেক শহরের জন্য রীতিমত বিরাট সমস্যা হয়ে উঠেছে। এসব দেশের সড়কগুলোর ধারণক্ষমতা সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

শুধু তাই নয়, এসব সড়কে চলা গাড়িগুলো থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি করছে।

বিদ্যুতশক্তি চালিত উড়ন্ত গাড়ি ও তার খাড়াভাবে আকাশে ওঠার প্রযুক্তি এধরনের বিষাক্ত নি:সরণ থেকে দূষণের মাত্রা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেবে।

উড়ন্ত ট্যাক্সির ছবি শিল্পীর আঁকা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আকাশ জুড়ে গাড়ি ও যান চলাচল শুরু হলে আমাদের শহরগুলোর বর্তমান বিন্যাসের বদল ঘটানো আবশ্যক হয়ে দাঁড়াবে

তবে আকাশে যান চলাচল ব্যবস্থা তৈরি করতে হলে শহরের কাঠামোও পুনর্বিন্যাস করতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। এখন শহরে অনেক উঁচু উঁচু বাড়ি তৈরি হচ্ছে। শহরের উঁচু ভবনগুলো ভবিষ্যতে এমনভাবে তৈরির কথা নগর স্থপতিদের ভাবতে হবে যেখানে উড়ন্ত গাড়ি বা আকাশ যান ওঠানামার জন্য ল্যান্ডিং প্যাড তৈরির সুযোগ থাকবে। মাটিতে চাপ কমানোর জন্য উঁচু বাড়িগুলোকে যুক্ত করার জন্য আকাশ পথ তৈরির কথাও ভবিষ্যতে নগর পরিকল্পনাবিদদের বিবেচনায় নিতে হবে।

তারা বলছেন মাটিতে গাড়ি ও রাস্তার চাপ কমানো গেলে আরও সবুজ জায়গা, পার্ক, মাঠ তৈরি করে শহরকে আরও পরিবেশ বান্ধব করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

হয়ত ২০৪০ পরবর্তী বিশ্বে মাটিতে চলাফেরার পাশাপাশি, আকাশে চলাফেরার নতুন একটি দুনিয়া তৈরি হবে।

অনেকের জীবন হয়ত মাটির অনেক ওপরেই থেকে যাবে। মাটিতে চলাফেরা করা হয়ত কোন এক সময় অনেকের জন্য একটা নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়াবে।