ছাঁটাই, টার্মিনেশন, গোল্ডেন হ্যান্ডশেক কিংবা পদত্যাগে বাধ্য করা- এগুলোর মানে কী

বাংলাদেশে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের খবর প্রায়ই শোনা যায়

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের খবর প্রায়ই শোনা যায়
    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

ঢাকার একটি কারখানায় প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে কাজ করছিলেন সিরাজগঞ্জের লুৎফা বেগম।

চলতি বছর মার্চে বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর যে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিলো তখন বাড়ি গিয়েছিলেন কিন্তু পরে ঢাকায় ফিরে আর চাকরিটি ফিরে পাননি তিনি।

"আসার পর জানলাম আমিসহ অনেককে ছাঁটাই করছে। অথচ কারখানা বন্ধ করে দেয়াতেই বাড়ি গিয়েছিলাম। কিন্তু তারা কারখানা খুলে অনেকরে জানায় নাই। যাদের জানায় নাই তাদের পরে সময়মত আসে নাই বলে ছাঁটাই করছে," বলছিলেন তিনি।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর থেকে নানা খাতের কারখানা কিংবা নানা ধরণের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মী ছাঁটাই, বেতন কমিয়ে দেয়া, টার্মিনেশন, পদত্যাগে বাধ্য করা কিংবা গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের খবর শিরোনাম হয়েছে গত কয়েক মাসে।

বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের প্রায় পঁচিশ হাজার শ্রমিককে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বিদায় করে সেগুলো বন্ধ করে দিয়েছে সরকার।

আবার বেশ কিছু ব্যাংক ঘোষণা দিয়েই কর্মীদের বেতন কমিয়েছে। শুধু বেতনই নয় ব্যাংক মালিকেরা ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রমোশন, ইনক্রিমেন্ট, ইনসেনটিভ বোনাস আগামী দেড় বছর বন্ধ রাখারও পরামর্শ দিয়েছেন যা কিছু ব্যাংক বাস্তবায়নেরও উদ্যোগ নিয়েছে।

আবার করোনা কালের সংকট মোকাবেলা করতে গিয়ে কিছু করপোরেট ধারার ব্যবস্থাপনায় চলে এমন কিছু গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানও কর্মী ছাঁটাই, বেতন কমিয়ে দেয়া কিংবা বোনাস কম দেয়া এমনকি কর্মীদের পদত্যাগে চাপ দিচ্ছে- এমন খবরও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হচ্ছে জোরে শোরে।

কিন্তু ছাঁটাই, পদত্যাগে বাধ্য করা কিংবা গোল্ডেন হ্যান্ডশেক- এসবের মানে কী? একটির সাথে আরেকটির পার্থক্যই বা কী?

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশী চাকরিজীবি কাজ করে ব্যক্তিমালাকানাধীন প্রতিষ্ঠানে (২০১৮ সালে প্রকাশিত পরিসংখ্যান)
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশী চাকরিজীবি কাজ করে ব্যক্তিমালাকানাধীন প্রতিষ্ঠানে (২০১৮ সালে প্রকাশিত পরিসংখ্যান)

'গোল্ডেন হ্যান্ডশেক সরকারি পরিভাষা'

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অফ লেবার স্টাডিজ বা বিলসের সাবেক নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মেদ বিবিসিকে বলেছেন, বাংলাদেশের আইনে গোল্ডেন হ্যান্ডশেক বলতে কিছু নেই। এটি সরকারি একটি 'টার্ম' যা তারা বিদেশি সংস্থাগুলো থেকে আমদানি করেছে।

তবে বিলসেরই নির্বাহী পরিষদের জয়েন্ট সেক্রেটারি জেনারেল ড: ওয়াজেদুল ইসলাম খান বলছেন এখানে কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা যোগ করা হয়।

"স্বাভাবিক চাকরি থেকে অব্যাহতির ক্ষেত্রে শ্রমিকরা যেমন তাদের পাওনাদি পায় গোল্ডেন হ্যান্ডশেক তাই। তবে সরকার সাধারণত কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা অফার করে থাকে বা দিয়ে থাকে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের ক্ষেত্রে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

ছাঁটাই মানে কি? কাদের ছাঁটাই করা যায়?

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মেদ বলছেন শ্রম আইন অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মীর সংখ্যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয়ে গেলে ছাঁটাই করা যাবে।

"এক্ষেত্রে সবার পড়ে যারা কাজে যোগ দিয়েছেন তারা আগে যাবে। তাদের একটা তালিকা থাকতে হবে যাতে করে পরে ওই প্রতিষ্ঠান আবার শ্রমিক নিলে তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। আর এ কারণে ছাটাইয়ের ক্ষেত্রে কর্মীদের সুবিধা কম"।

তবে ছাঁটাই হলে কর্মী এক মাসের বেতন পাবে। প্রতি বছরের জন্য এক মাসের পাওনা সেটা দিতে হবে।

মিস্টার আহম্মেদ বলছেন ভারতে ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে লেবার কমিশনের অনুমতি লাগলেও বাংলাদেশে সে ধরণের বিধান নেই।

তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের সংগঠকদের একজন নাজমা আক্তারের দাবি পোশাক খাতে ছাঁটাইয়ের ঘটনাই বেশি ঘটে, ফলে চাকরি হারিয়ে শ্রমিকরা গভীর সংকটে পড়েন।

বেতন কমানোর নির্দেশনা দিয়েছিলো ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি

ছবির উৎস, সংগৃহীত

ছবির ক্যাপশান, বেতন কমানোর নির্দেশনা দিয়েছিলো ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি

টার্মিনেশন কী? ছাঁটাই আর টার্মিনেশন কী একই বিষয়?

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মেদ বলছেন ছাঁটাই ও টার্মিনেশনের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য আছে।

"টার্মিনেশন হওয়া কর্মীকে আবার নতুন করে কর্মী নিয়োগ করলে তখন নিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এটাকে মালিকরা তাদের অধিকার হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। চার মাসের বেতন ও অন্য পাওনা ছুটি দিয়ে বিদায় দিতে পারে। তবে আমরা সবসময় বিরোধিতা করি। কারণ এ ক্ষেত্রে বিদায় করতে কোনো কারণ লাগেনা", বলছিলেন মিস্টার আহম্মেদ।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড: উত্তম কুমার দাস লিখেছেন, "টার্মিনেশন নিয়োগকর্তা তার সুবিধায় করেন, কর্মীর দোষে নয়। টার্মিনেশন করতে হলে ১২০ দিনের নোটিশ বা তার বদলে মজুরি (মূল বেতনের সমপরিমাণ) দিতে হবে। গ্রাচুইটি দিতে হবে। বকেয়া মজুরি, ছুটি বন্ধ বা ওভারটাইমের জন্য পাওনা, অর্জিত ছুটি থাকলে তার পাওনা নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী বোনাস বা অন্য পাওনা, ভবিষ্য তহবিলের পাওনা ও লভ্যাংশ থেকে পাওনা এবং চাকুরী সংক্রান্ত সনদপত্র দিতে হবে"।

আর আইন অনুযায়ী চাকরি অবসানের পরের ত্রিশ দিনের মধ্যে নিয়োগকর্তাকে এগুলো পরিশোধ করতে হবে।

পদত্যাগে চাপ দেয়া বা বাধ্য করা হয় কেন

বাংলাদেশে প্রায়শই শোনা যায় নানা প্রতিষ্ঠান কর্মীদের পদত্যাগে বাধ্য করেছে বা চাপ দিচ্ছে।

যদিও সুলতান উদ্দিন আহম্মেদ বলছেন এটা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আইন অনুযায়ী মালিকরা কখনো পদত্যাগের জন্য চাপ দিতে পারেনা।

"বরং আইন অনুযায়ী শ্রমিকরাও হুট করে পদত্যাগ করতে পারবেনা। কেউ করলে তাকে মালিককে দুই মাসের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে যদি তার চাকরির বয়স ৫ বছরের বেশি হয়। কম হলে এক মাসের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে"।

ওয়াজেদুল ইসলাম খান বলছেন কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান এই সংস্কৃতির চর্চা করছে মূলত শ্রমিকদের ঠকানোর জন্য বা তাদের প্রাপ্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করার জন্য।

"পদত্যাগ না করলে পাওনা থেকে বঞ্চিত করার হুমকি দেয় মালিকরা এমন অভিযোগ প্রায়ই শুনি। এভাবে বাধ্য করা হয় না হলে অসদাচরণসহ নানা কারণ দেখিয়ে চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হয়"।

গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের প্রতিবাদ করেছিলো পাটকল শ্রমিকরা
ছবির ক্যাপশান, গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের প্রতিবাদ করেছিলো পাটকল শ্রমিকরা

বেতন কমানোর সুযোগ আছে?

করোনা সংকটের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে কর্মীদের বেতন কমিয়েছে বেশ কিছু ব্যাংকসহ অনেক প্রতিষ্ঠান।

তবে এটিকে সম্পূর্ণ বেআইনি বলছেন সুলতান উদ্দিন আহম্মেদ।

"অনুপস্থিতি, সম্পদ নষ্ট বা এমন সুনির্দিষ্ট কিছু কারণে বেতন কমানো যায় কারও কারও। কিন্তু ব্যবসায় ক্ষতি হচ্ছে-এমন কারণ দেখিয়ে কারও বেতন কমানোর কোনো সুযোগ আইনে নেই। এটি সম্পূর্ণ আইন বহির্ভূত কাজ," বলছেন তিনি।

ওয়াজেদুল ইসলাম খান বলছেন এটি নতুন একটি কৌশল কারণ যাদের বেতন কমিয়ে দেয়া হচ্ছে তারা আইনের দ্বারস্থ হয়না এবং অনেক ক্ষেত্রে সেটি চাকরি হারানোর ভয়ে।

তিনি বলেন বেনিফিট কম বেশি দেয়ার জন্য এগুলোকে নানা ভাবে ব্যবহার করা হয়।

"অন্যায় করলে টার্মিনেশন করে বেতন সহ সব সুবিধা দেয়া হোক। কিন্তু পদত্যাগে বাধ্য করা বা বেতন কমিয়ে দেয়া-এগুলো আইনত অন্যায়"।

চাকরি হারানো শ্রমিকের যেসব সুবিধা প্রাপ্য

আইন অনুযায়ী ছাঁটাই হলে শ্রমিককে এক মাস আগে জানাতে হবে এবং ঐ প্রতিষ্ঠানে প্রতি এক বছর চাকরির জন্য এক মাসের বেসিক বেতন পাবেন শ্রমিক।

যেমন দশ বছর চাকরি করলে সে দশ মাসের বেসিক বেতন পাবে। ক্ষেত্র বিশেষে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিক ক্ষতিপূরণও পেতে পারেন।

তবে বরখাস্ত হওয়া শ্রমিক কোন ধরনের বেতন ভাতা ছাড়াই চাকরি হারাবেন।

কিন্তু তাকে বরখাস্তের আগে কারণ দর্শাও নোটিস করতে হবে, অন্যায়ের অভিযোগ তদন্ত করতে হবে, তদন্তে শুধু মালিকের পছন্দের ব্যক্তি নয় শ্রমিক পক্ষের ব্যক্তিও থাকতে হবে।

সেই সাথে শ্রমিককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। এরপর যদি সে দোষী সাব্যস্ত হয় তবেই তাকে বরখাস্ত করা যাবে।

চাকরির অবসান বা টার্মিনেশান হলে শ্রমিককে অন্তত চার মাস আগে জানাতে হবে।

অথবা মালিক কোন নোটিশ ছাড়াই যদি তাকে চলে যেতে বলেন তাহলে তাকে চার মাসের বেতন দিতে হবে।

ওয়াজেদুল ইসলাম খান বিবিসি বাংলাকে বলছেন এসব অধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্যই পদত্যাগে বাধ্য করার মতো ঘটনা ঘটানো হচ্ছে নানা খাতের প্রতিষ্ঠানে।