‘ডেথ ভ্যালি’: পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তপ্ত জায়গায় যেভাবে থাকে মানুষ

ফার্নেস ক্রীকের ন্যাশনাল পার্কে কাজ করেন ব্রান্ডি স্টুয়ার্ট30F

ছবির উৎস, Brandi Stewart

ছবির ক্যাপশান, ফার্নেস ক্রীকের ন্যাশনাল পার্কে কাজ করেন ব্রান্ডি স্টুয়ার্ট
    • Author, সোফি উইলিয়ামস
    • Role, বিবিসি নিউজ

ব্রান্ডি স্টুয়ার্ট কাজ করেন ক্যালিফোর্নিয়ার ডেথ ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কে। গত ১৬ই আগষ্ট, রোববার ডেথ ভ্যালিতে তাপমাত্রা ছিল ৫৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিশ্বে নির্ভরযোগ্যভাবে এযাবতকালের রেকর্ড করা সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ।

"এখানে এখন যেরকম গরম পড়েছে, আমরা সবাই আমাদের ধৈর্য হারিয়ে ফেলছি। আপনি যখন বাইরে যাবেন, মনে হবে যেন আপনার মুখে অনেকগুলো হেয়ার ড্রায়ারের গরম বাতাস এসে পড়ছে", বলছিলেন তিনি।

ডেথ ভ্যালি এক বিস্তীর্ণ মরুভূমি। মাঝে মাঝে আছে বালিয়াড়ি আর গভীর খাদ। পাশ্ববর্তী রাজ্য নেভাডা পর্যন্ত বিস্তৃত।

১৬ই আগষ্ট, রোববারের তাপমাত্রা আসলেই বিশ্বে রেকর্ড করা সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কীনা, সেটি বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডাব্লিউএমও) এখন যাচাই করে দেখছে। কিন্তু ডেথ ভ্যালিতে গরম আসলে কত বেশি, সেটা বোঝার জন্য ব্রান্ডি স্টুয়ার্টের কোন বিশেষজ্ঞের মতামতে অপেক্ষায় বসে থাকার দরকার নেই।

ডেথ ভ্যালি হচ্ছে বিশ্বের উষ্ণতম জায়গা। কিন্তু এরকম একটা জায়গাতেও থাকে কয়েকশো মানুষ। ব্রান্ডি তাদের একজন।

ডেথ ভ্যালিতে মিজ স্টুয়ার্ট প্রায় পাঁচ বছর ধরে আছেন। তিনি কাজ করেন ডেথ ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের কমুনিকেশন বিভাগে।

"এখানে এত গরম যে, আপনার গায়ে যে ঘাম হচ্ছে তা আপনি টেরই পাবেন না। কারণ খুব দ্রুত এটি বাস্প হয়ে উবে যাচ্ছে। ঘামে যখন কাপড় ভিজে যায়, সেটা টের পাওয়া যায়, কিন্তু গায়ের চামড়ায় ঘাম শুকিয়ে যায় খুব দ্রুত। এই বিষয়টিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে আমার সময় লেগেছ‍ে।"

ডেথ ভ্যালিকে বলা হয় বিশ্বের উষ্ণতম জায়গা

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, ডেথ ভ্যালিকে বলা হয় বিশ্বের উষ্ণতম জায়গা

মিজ স্টুয়ার্ট বলেন, গ্রীস্মের সময় তাদের বেশিরভাগ সময় ঘরের ভেতরেই কাটে। তবে অনেকে পাহাড়ের দিকে চলে যায়, যেখানে তাপমাত্রা একটু কম।

"যখন লোকে এতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন এটা স্বাভাবিক বলেই মনে হয়। তখন তাপমাত্রা ৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের (২৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস) নীচে নামলে সেটাকেই মনে হয় খুব ঠান্ডা।"

ডেথ ভ্যালির লোকজনের বাড়িতে এয়ার কন্ডিশনিং এর ব্যবস্থা আছে। এটি তাদের ঘর ঠান্ডা রাখে। কাজেই ঘুমাতে অসুবিধা হয় না। তবে বিদ্যুৎ যদি চলে না যায়। যখন প্রচন্ড গরম পড়ে, তখন সবাই সারাক্ষণ এয়ারকন্ডিশনিং চালিয়ে ঘর ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে। তখন বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়।

ডেথ ভ্যালির বেশিরভাগ মানুষ থাকেন এবং কাজ করেন ফার্নেস ক্রীকে। এখানেই সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। এই জায়গাটা সমূদ্র সমতল থেকে প্রায় ২৮০ ফুট নীচু একটা বেসিনের মতো। চারিদিকে উঁচু এবং খাড়া পাহাড় দিয়ে ঘেরা।

জেসন হেসার এই ফার্নেস ক্রীকেই থাকেন। তার আসল বাড়ি মিনেসোটাতে। কাজ করেন এখানকার একটি গলফ কোর্সে। এটি বিশ্বে সমূদ্র সমতল থেকে সবচেয়ে নীচু কোন গলফ কোর্স।

"আমি দুবার ইরাকে ছিলাম। যদি ইরাকে থাকতে পারি, তাহলে ডেথ ভ্যালিতেও থাকা যায়", বলছিলেন সামরিক বাহিনীর এই সাবেক সদস্য।

জেসন হেসার ফার্নেস ক্রীকে আছেন ২০১৯ সাল থেকে

ছবির উৎস, Jason Heser

ছবির ক্যাপশান, জেসন হেসার ফার্নেস ক্রীকে আছেন ২০১৯ সাল থেকে
Transparent line

জেসন গলফ কোর্সে কাজ শুরু করেন ভোর পাঁচটার একটু আগে এবং দুপুর একটা পর্যন্ত কাজ করে যান।

"ওরা আমাদের জানিয়েছে, যখন গরম আরও বেশি পড়বে, তখন আমাদের আরও ভোরে কাজ শুরু করতে হবে। একেবারে ভোর চারটায়। আর সেই ভোরেও কিন্তু তাপমাত্রা প্রায় ১০০-১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৩৭ দশমিক ৭ হতে ৪০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস)।

এই গলফ কোর্সটিকে নিপাট রাখার জন্য যে পানি দরকার, তা আসে একটি ভূগর্ভস্থ ঝর্ণা থেকে। যে দলটি গলফ কোর্সটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে মিস্টার হেসার তাদের একজন।

"আমরা প্রতিদিন ঘাস কাটি। এটা-ওটা ছাঁটি। বাংকারগুলো থেকে আগাছা পরিস্কার করি। আবহাওয়া যেহেতু খুবই শুস্ক, অনেক গাছ মরে যায়। আমরা সেগুলো সরাই। এত গরম পড়ে যে এসব গাছ শুকিয়ে ফেটে যায়। আমাদের দিনের অনেক সময় যায় এগুলো পরিস্কার করতে।"

মিস্টার হেসার এখানে এসেছিলেন ২০১৯ সালে। তিনি তার কাজটা বেশ পছন্দ করে ফেলেছেন। আরও কয়েক বছর তিনি এখানে থাকার পরিকল্পনা করছেন।

ফার্নেস ক্রীকের গলফ কোর্স। এখানেই কাজ করেন জেসন হেসার

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ফার্নেস ক্রীকের গলফ কোর্স। এখানেই কাজ করেন জেসন হেসার

ডেথ ভ্যালিতে গ্রীস্মের ভয়াবহ গরমের যে কষ্ট, সেটা কিছুটা পুষিয়ে দেয় শীতকাল।

অবসরে তিনি গলফ কোর্সে গলফ খেলতে পছন্দ করেন। তবে সেজন্য উঠতে হয় বেশ সকালে এবং খেলা শুরু করতে হয় সকাল সাতটায়। কারণ এরপর গরম খুবই অসহনীয় হয়ে উঠে।

"আমি গলফ খুব ভালোবাসি", বলছেন তিনি।

আরও পড়ুন:

"আমি যখন এখানে এসেছি, তখন তাপমাত্রা বেশ ভালোই ছিল। শর্টস আর পোলো শার্ট পরে একটা কোল্ড বীয়ার বা কোল্ড সোডা। আপনার সাথে যদি ঠান্ডা পানীয় থাকে, আপনাকে আগে সেটা পান করে নিতে হবে। নইলে গলফের মাঠ থেকে ফিরে কিন্তু দেখবেন সেটা আর ঠান্ডা নেই। আর আগে পান করে নিলে গলফ খেলাটাও জমে ভালো।"

১৬ আগষ্টের তাপমাত্রাকে বলা হচ্ছে বিশ্বের এযাবতকাল নির্ভরযোগ্যভাবে যত তাপমাত্রা মাপা হয়েছে, তার মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি। রেকর্ড বইতে অবশ্য এরচেয়ে উঁচু দুটি তাপমাত্রার কথা লেখা আছে। একটা এই ফার্নেস ক্রীকেই, ১৯১৩ সালে। তখন তাপমাত্রা নাকি চড়েছিল ১৩৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটে (৫৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। দ্বিতীয়টি তিউনিসিয়ায় ১৯৩১ সালে। সেখানে রেকর্ড করা হয়েছিল ১৩১ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। কিন্তু এই রেকর্ড সম্পর্কে জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের সংশয় আছে, তারা এসব তথ্যকে যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য মনে করেন না।

বিবিসির আবহাওয়া বিভাগের সাইমন কিং বলেন, "একালের বিজ্ঞানী এবং আবহাওয়াবিদরা মনে করেন ঐ দুটি তাপমাত্রা যেভাবে মাপা হয়েছিল, তা সঠিক ছিল না।"

Death Valley landscape

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান, ডেথ ভ্যালি আসল এক মরুভূমি। তার মধ্যে আছে পাহাড়, বালিয়াড়ি আর গভীর খাদ।

সাইমন কিং বলেন, "যখন ফারনেস ক্রীকে এরকম উচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়, তখন বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা সেটি আর তদন্ত এবং যাচাই করে দেখে। তারা আরও অনেক তথ্যের সঙ্গে ব্যাপারটা মিলিয়ে দেখে।"

ক্রিসটোফার বার্ট আবহাওয়া বিষয়ক ইতিহাস নিয়ে কাজ করেন। ১৯১৩ সালে ডেথ ভ্যালিতে রেকর্ড করা তাপমাত্রা নিয়ে কেন এই সংশয়, সে সম্পর্কে তিনি বলেন, ঐ এলাকার আশে-পাশের অন্যান্য এলাকার রেকর্ডের সঙ্গে এটি মিলছিল না। ফার্নেস ক্রীকের তাপমাত্রা আশে-পাশের এলাকার চেয়ে প্রায় দু্ই বা তিন ডিগ্রি বেশি ছিল।

এ কারণেই গত সপ্তাহে ফার্নেস ক্রীকে রেকর্ড করা তাপমাত্রাকে কোন কোন বিশেষজ্ঞ এ যাবতকালের মধ্যে নির্ভরযোগ্যভাবে রেকর্ড করা সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বলে বর্ণনা করছেন।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, তারা এটি যাচাই করার চেষ্টা করছে। তবে যদি এটি যাচাই করা সম্ভবও হয়, তারপরও তারা এটিকে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বলে গণ্য করবে। কারণ ১৯১৩ সালে ফার্নেস ক্রীকে এবং ১৯৩১ সালে তিউনিসিয়া রেকর্ড করা তাপমাত্রা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সন্দেহ থাকলেও বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা এগুলোকে স্বীকৃতি দেয়।

ডেথ ভ্যালির একটি সাইনবোর্ডে লেখা তাপমাত্রা ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, ডেথ ভ্যালির একটি সাইনবোর্ডে লেখা তাপমাত্রা ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস

কেউ কেউ যুক্তি দেন যে, ডেথ ভ্যালির চেয়েও হয়তো বেশি গরম পড়ছে বিশ্বের আরও কোন কোন জায়গায়। কিন্তু আবহাওয়ার ওপর যারা নজর রাখেন, তারা এই দাবিকে গুরুত্ব দেন না। কারণ এসব জায়গায় তাপমাত্রা রেকর্ড করার জন্য নির্ভরযোগ্য কোন আবহাওয়া কেন্দ্র নেই।

সুতরাং, আপাতত ফার্নেস ক্রীককেই বিশ্বের উষ্ণতম স্থান বলে আমাদের মেনে নিতে হবে।

জেসন হেসার বলেন, অনেকেই তাকে জিজ্ঞেস করেন ফার্নেস ক্রীকের গরমের অনুভূতিটা কেমন।

"এটা সবচেয়ে ভালোভাবে বর্ণনা করা যায় যখন আপনি ওভেনে কিছু রান্না করছেন তার সঙ্গে। রান্নার সময় আপনি যখন খাবারটা পরখ করে দেখতে চান, তখন ওভেনের ঢাকনা খোলার পর গরম বাতাসের হলকা মুখে এসে লাগার পর যেরকম লাগে, এটা অনেকটা সেরকম।"