রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ: মিয়ানমারকে গণহত্যা রোধে ব্যবস্থা নেবার নির্দেশ দিলো আইসিজে

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের প্রেসিডেন্ট আবদুলকাবি আহমেদ ইউসুফ (মাঝে) অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিচ্ছেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের প্রেসিডেন্ট আবদুলকাবি আহমেদ ইউসুফ (মাঝে) অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিচ্ছেন।

রাখাইনে এখন যে রোহিঙ্গারা আছেন, তাদেরকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য মিয়ানমারকে সব ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ দিয়েছে নেদারল্যাডন্সের দ্য হেগের আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত (আইসিজে)।

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলায় কিছুক্ষণ আগে ঘোষণা করা অন্তর্বর্তীকালীন রায়ে মিয়ানমারের প্রতি চারটি নির্দেশনা দেয় আইসিজে।

  • রাখাইনে বসবাসরত সাড়ে ছয় লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের সুরক্ষা দেবার জন্য মিয়ানমার সরকারকে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর লাগাম টেনে ধরতে হবে। আদালত বলেছে, সেনাবাহিনী কিংবা অন্য যে কোন ধরণের নিরাপত্তা বাহিনী যাতে গণহত্যা না চালায় কিংবা উস্কানি না দেয় সেজন্য সব ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • রোহিঙ্গা গণহত্যা সংক্রান্ত যেসব অভিযোগ এসেছে, সে সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে
  • রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেবার জন্য মিয়ানমার কী ধরণের ব্যবস্থা নিয়েছে সে সংক্রান্ত প্রতিবেদন আগামী চারমাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের কাছে জমা দিতে হবে। এরপর প্রতি ছয়মাসে একটি করে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এসব প্রতিবেদন গাম্বিয়ার কাছে তুলে ধরা হবে।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গাম্বিয়ার বিচার মন্ত্রী আবুবাকার তাম্বাদুর দিকে তাকিয়ে রয়েছেন মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গাম্বিয়ার বিচার মন্ত্রী আবুবাকার তাম্বাদুর দিকে তাকিয়ে রয়েছেন মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি

মিয়ানমারের সর্বোচ্চ নেতা অং সান সু চি তার দেশের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করলেও জাতিসংঘের এই সবোর্চ্চ আদালত রোহিঙ্গা মুসলমানদের গণহত্যা প্রতিরোধে মিয়ানমারকে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার আইসজেতে ১৭জন বিচারকের প্যানেলে এই আদেশের পক্ষে সর্বসম্মতিক্রমে ভোট দেয়।

এরমধ্যে রয়েছে ওই জনগোষ্ঠীর হত্যা রোধ করা, তাদের যেন গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি না হয়। এবং ইতোমধ্যে সংগঠিত সম্ভাব্য গণহত্যার প্রমাণ সংরক্ষণ করা।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কিংবা অন্য যেকোন নিরাপত্তা বাহিনী যেন রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কোন গণহত্যায় না জড়ায়, উষ্কানি না দেয়, কিংবা নির্যাতনের মুসলমানদের চেষ্টা না করে সেজন্য ব্যবস্থা নিতে মিয়ানমারকে নির্দেশ দেয়া হয়।

আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতের এই আদেশ মানতে মিয়ানমার বাধ্য। তবে আদালত এজন্য তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারবে না। তবে এই রায় উপেক্ষা করা মিয়ানমারের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মুখে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

এই নৃশংসতাকে গণহত্যা আখ্যা দিয়ে গত বছরের ১১ নভেম্বর আইসিজেতে মামলা দায়ের করে আফ্রিকার মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ গাম্বিয়া।

গণহত্যার তদন্ত শুরু না হওয়া পর্যন্ত মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানায় দেশটি।

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের পিস প্যালেসে গত বছরের ১০ থেকে ১২ ডিসেম্বর মামলার শুনানি চলে।

১০ ডিসেম্বর গাম্বিয়ার প্রতিনিধি দল আদালতে গণহত্যার বিষয়ে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করে।

শুনানিতে গাম্বিয়ার পক্ষে মামলার প্রতিনিধিত্ব করেন দেশটির বিচারমন্ত্রী আবুবাকার তাম্বাদু।

পরদিন ১১ ডিসেম্বর মিয়ানমারের নেতৃত্ব দেন মিয়ানমারের সরকার প্রধান অং সান সু চি। সেখানে তিনি তার দেশের বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন।

শুনানির সময় মিসেস সু চি আইসিজের এই মামলাকে "অসম্পূর্ণ ও ভুল" হিসাবে আখ্যা দিয়ে মামলাটি বাতিল করে দেয়ার আহ্বান জানান। ১২ই ডিসেম্বর মামলার শুনানি শেষ হয়।

দ্য হেগ শহরে এই শুনানিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকের নেতৃত্বে ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। ওই দলে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের তিনজন প্রতিনিধিও ছিলেন।

রাখাইন রাজ্যের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাম

রায় ঘোষণার কিছুক্ষণ আগে ফিনান্সিয়াল টাইমসকে মিসেস সু চি বলেন, "মানবাধিকার সংগঠনগুলো অপরাধমূলক তদন্তের যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই মিয়ানমারের নিন্দা করে এসব অপ্রমাণিত বিবৃতি দিচ্ছে"।

"রাখাইনে স্থিতিশীলতা এবং অগ্রগতি আনতে মিয়ানমারের প্রচেষ্টায় এই আন্তর্জাতিক নিন্দা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে", বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার অভিযোগ প্রশ্নে মি. তাম্বাদু বিবিসিকে বলছেন, '''রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনী এবং বেসামরিক বাসিন্দারা সংগঠিত হামলা চালাচ্ছে, বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে, মায়ের কোল থেকে শিশুদের ছিনিয়ে নিয়ে জ্বলন্ত আগুনে ছুঁড়ে মারছে, পুরুষদের ধরে ধরে মেরে ফেলছে, মেয়েদের ধর্ষণ করছে এবং সবরকমের যৌন নির্যাতন করছে।''

একে ১৯৯৪ সালে রোয়ান্ডা গণহত্যার সঙ্গে তুলনা দিয়ে তিনি বলেন, 'রোয়ান্ডায় টুটসিদের ওপর যেরকম অপরাধ করা হয়েছিল, এটা সেরকমই মনে হচ্ছিল। এখানে সেই একই রকম গণহত্যার সব বৈশিষ্ট্যই রয়েছে। রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকে চিরতরে ধ্বংস করার জন্য এটা মিয়ানমারের সরকারের একটা চেষ্টা।''

অন্যদিকে মিয়ানমার শুরু থেকেই জানিয়ে আসছে যে, তারা রাখাইন রাজ্যে চরমপন্থীদের হুমকি মোকাবিলা করে আসছে।

এই স্যাটেলাইট চিত্রটিতে দেখা যাচ্ছে পুড়িয়ে দেয়া রোহিঙ্গাদের গ্রাম (ওপরে) এবং অক্ষত রোহিঙ্গাদের গ্রাম (নিচে)। ছবি সৌজন্য: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ২১শে সেপ্টেম্বর ২০১৭
ছবির ক্যাপশান, এই স্যাটেলাইট চিত্রটিতে দেখা যাচ্ছে পুড়িয়ে দেয়া রোহিঙ্গাদের গ্রাম (ওপরে) এবং অক্ষত রোহিঙ্গাদের গ্রাম (নিচে)। ছবি সৌজন্য: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ২১শে সেপ্টেম্বর ২০১৭

মিস সু চি আদালতে তার শুনানিতে এই সহিংসতাকে 'অভ্যন্তরিন সশস্ত্র সংঘাত' হিসেবে অ্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, সরকারি নিরাপত্তা চৌকিতে রোহিঙ্গাদের হামলার কারণেই এই সংঘাত বেধে যায়।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মিয়ানমার কাউকে ফেরত নেয়নি।

আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে মামলা করার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল রোহিঙ্গাদের ওপর যে নির্যাতন হচ্ছে, সে ব্যাপারে বিশ্বব্যাপীকে কিছু করার জন্য তাগিদ দেয়া।

আরো খবর: