ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধন আইন: মুখোমুখি ছাত্র ও সরকার

ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান, ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
    • Author, সৌতিক বিশ্বাস
    • Role, বিবিসি, ভারত সংবাদদাতা

ভারতের যে বিতর্কিত আইনটি প্রতিবেশী তিনটি রাষ্ট্রের অমুসলিমদের নাগরিকত্বের সুযোগ দিচ্ছে, সেই আইনটির প্রতিবাদে গত কয়েকদিন সারা ভারতজুড়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে এসেছে।

তারা প্রতিবাদ করছে, কারণ তারা অনুভব করছে যে এই 'নাগরিকত্ব সংশোধন আইন'টি পক্ষপাতমূলক এবং ভারতের কুড়ি কোটি মুসলমান সংখ্যালঘুকে কোণঠাসা করে ফেলবার একটি হিন্দু-জাতীয়তাবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার অংশ।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, নতুন আইনটি 'তাদের জন্য যারা বছরের পর বছর নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছে এবং ভারত ছাড়া আর কোথায় তাদের যাবার জায়গা নেই'।

দিল্লি এবং উত্তরাঞ্চলীয় আলীগড় শহরের দুটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভে পুলিশের হামলা হয়েছে, এমন অভিযোগের জেরে ভারত জুড়ে এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।

ক্যাম্পাসগুলোর ভেতরে পুলিশ ঢুকে পড়ে এবং অভিযোগ আছে লাইব্রেরি, পাঠকক্ষ, এমনকি টয়লেটে ঢুকে পর্যন্ত তারা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়।

ওই সহিংসতার এমন সব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে যা রীতিমত পীড়াদায়ক। দেশজুড়ে ছাত্রদের উত্তেজিত হওয়ার পেছনে এই ভিডিওগুলিও জ্বালানী হিসেবে কাজ করেছে।

ছাত্র এবং শিক্ষকেরা একেবারেই ছেড়ে কথা বলছে না।

ভারতের বৃহত্তম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির একটি, অশোকা ইউনিভার্সিটি কঠোর ভাষায় এক বিবৃতি দিয়েছে যেখানে লেখা হয়েছে 'রাষ্ট্রের স্পন্সর করা সহিংসতা'।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশী হামলার প্রতিবাদ

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশী হামলার প্রতিবাদ

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়া ভারতের সরকারকে মনে করিয়ে দিয়েছে, 'ছাত্রদের প্রতিবাদ করার অধিকার আছে'।

একটি ভিডিওতে আইনের এক ছাত্র প্রশ্ন তুলেছেন, 'আমরা কি আদৌ কোন গণতন্ত্রে বাস করছি'?

মি. মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার বরাবরই ভিন্নমত পোষণকারীদের ভালো চোখে দেখে না এবং এটা এখন স্পষ্ট যে ছাত্রদের এখন সমস্যার উৎস হিসেবেই দেখছে সরকার।

কিন্তু চলমান ছাত্র জাগরণ আমাদেরকে এমন একটি দেশের জনগণের মানসিকতা সম্পর্কে কিছু বার্তা দিচ্ছে যে দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরই বয়স পঁচিশের কম।

একটি হলো, মুসলমান ছাত্রদের সংগে প্রতিবাদে অন্য এমন সব সম্প্রদায়ের সদস্যরাও যোগ দিচ্ছে যাদের ওপর এই আনটি সরাসরি কোন প্রভাব ফেলবে না।

বিশ্লেষক আজায আশরাফ বলছেন, এই বিক্ষোভ "ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে সকল ভারতীয়র সেই লালিত আদর্শকে পুনরুত্থিত করেছে, যেখানে সকল নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবে"।

দ্বিতীয়ত, কাশ্মীরের বিশেষ সুবিধা প্রত্যাহার, নাগরিক পঞ্জি, হামলার লক্ষে পরিণত হওয়া এবং রাজনীতিতে গুরুত্ব হ্রাস পাওয়ার মতো কিছু ধারাবাহিক বিপত্তিকর ঘটনাপ্রবাহের পর নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে মুসলামনরা রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হয়েছে।

অনেকেই মনে করেন, মোদীর সরকারের অধীনে এই মুসলমানেরা নানাভাবেই প্রায় 'অস্তিত্বহীন' হয়ে পড়ছেন।

মি. আশরাফ বলছেন, "এই ছাত্র বিক্ষোভ মুসলমানদের রাজনৈতিক জীবনকে একটি সন্ধিক্ষণ এনে দিয়েছে"।

আরও যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তাহলো বিক্ষোভ ছড়িয়ে যাচ্ছে ক্যাম্পাসগুলোতে যা যেগুলো প্রথাগতভাবে প্রতিবাদ বা আন্দোলনের বাইরেই ছিলো।

হামলায় আহতদের একজন

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, হামলায় আহতদের একজন

এটা আসলে প্রমাণ করে যে আইন নিয়ে ক্ষোভ মিশে গেছে ধূসর অর্থনীতি আর চাকরীর অভাবজনিত অসন্তোষের সাথে।

তরুণ ভারতীয়রা বেড়ে উঠছে উচ্চাশা আর হতাশার সাথে।

তারা মনে করে সরকারের উচিত দেশে বিভক্তি তৈরি করে এ ধরণের বিতর্কিত আইন না করে বরং অর্থনীতির ধীরগতির সমাধানে মনোযোগী হওয়া।

মজার ব্যাপার হলো সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল অনেকের কণ্ঠেও এখন এ ধরণের একই সুর দেখা যাচ্ছে।

উপন্যাসিক চেতন ভাগাত যিনি মিস্টার মোদীর সমর্থক হিসেবে পরিচিত, তিনি এবারের পুলিশী অ্যাকশনের সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছেন।

তিনি বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। যারা ভারতকে নিয়ে হিন্দু রাজা ও তার সভাসদদের নিজে ফ্যান্টাসি দেখেন এটা মনে রাখুন, এমনকি আমি অসিহষ্ণূতার সমর্থকও (যা আমি নই) হই তাহলে আপন বিশ কোটি মুসলিমকে দুরে সরাতে পারবে ননা। চেষ্টা করে দেখুন, ভারত পুড়ে যাবে। জিডিপি ধসে পড়বে এবং আপনার সন্তানেরাই অনিরাপদ ও চাকুরিহারা হবে। এসব ফ্যান্টাসি বন্ধ করুন"।

হয়তো ইতিহাসে বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক সমর্থনের অভাবে ছাত্র আন্দোলনগুলো সফল হয়নি এবং এবারেও হয়তো তার সাথে পার্থক্য হবেনা।

ধীরে বা দ্রুতই ছাত্রদের ক্লাসে ফিরতে হবে, পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে হবে।

আর সেজন্যই অনেকে মনে করেন আন্দোলনের মোমেন্টাম এখন বিরোধী দলগুলোকে নিতে হবে।

পুলিশী হামলার প্রতিবাদ

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান, পুলিশী হামলার প্রতিবাদ

কিন্তু দলগুলো বিভক্ত।

এমনকি আঞ্চলিক রাজনৈতিক তারকারাও মনে হয় ক্লান্ত ও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

একমাত্র সর্বভারতীয় দল কংগ্রেস প্রাসঙ্গিক থাকার লড়াই করছে।

অনেকের বিশ্বাস, বিরোধী দলগুলো বর্তমান অবস্থাটাই ধরে রাখতে চান, পরিবর্তনে তারা আগ্রহী নয়।

এ মুহূর্তে মনে হচ্ছে দিল্লিতে বাসে গণধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২০১২ সালে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তরুণ বিক্ষোভকারীদের সাথে আলোচনা করাকে প্রত্যাখ্যান করে কংগ্রেস যে ভুল করেছিলো, এখন বিজেপিও তাই করছে।

মিস্টার মোদী মুসলিমদের 'পাকিস্তানি অরিজিন' ইঙ্গিত করে তাদেরকে সহিংসতার জন্য দায়ী না করে বরং দলটি সিনিয়র নেতাদের ক্যাম্পাস ও রাজপথে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য আলোচনায় পাঠাতে পারতো।

'তাদের কথা শুনুন' - একটি সংবাদপত্র লিখেছে মোদী সরকারকে লক্ষ্য করে।

"বিরুদ্ধবাদীদের সাথে আলোচনার কোনো ভাষাই সরকারের নেই আর সে কারণে শিক্ষার্থী তাদের ডাকছে গণতন্ত্র ধ্বংসকারী হিসেবে"।

এর সাথে দ্বিমত করা আসলেই কঠিন।