হায়দ্রাবাদ ধর্ষণ: সন্দেহভাজনদের গুলি করে হত্যার ঘটনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া

ছবির উৎস, Reuters
ভারতের হায়দ্রাবাদ শহরে এক তরুণী পশু চিকিৎসককে গণধর্ষণ করে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলার ঘটনায় ধৃত চার অভিযুক্ত পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন।
তেলেঙ্গানা পুলিশের অতিরিক্ত মহানির্দেশক জিতেন্দ্র বিবিসিকে বলেছেন শুক্রবার ভোর তিনটে নাগাদ এই ঘটনা ঘটে।
কয়েকদিন জেল হেফাজতে থাকার পরে গত বুধবার ওই চারজনকে পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নিয়ে।
পরে আজ শুক্রবার অভিযুক্তদের অপরাধ সংগঠন স্থলে, যেখানে ওই পশু চিকিৎসককে ধর্ষণ করে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়।
সন্দেহভাজনরা এক পুলিশ কর্মকর্তার বন্দুক চুরি করে পালানোর চেষ্টা করলে তাদের গুলি করা হয় বলে বিবিসি তেলেগুকে জানিয়েছে পুলিশ।
গত বৃহস্পতিবার ২৭ বছর বয়সী ওই নারীর লাশ উদ্ধার করা হয় - এ ঘটনার তদন্তে পুলিশের নিষ্ক্রিয় ভূমিকার অভিযোগে দেশটিতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
সন্দেহভাজনদের হত্যার খবর প্রকাশ হওয়ার পরে, ভুক্তভোগীর মা বিবিসিকে বলেছেন যে, "ন্যায়বিচার হয়েছে"।
এদিকে, এই ঘটনা মানুষ আতশবাজির পুড়িয়ে উদযাপন করছে এবং কয়েক হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে পুলিশের প্রশংসা করছে।
শুক্রবার কী হয়েছে?
সাইবারাবাদের পুলিশ কমিশনার ভিসি সাজনার বিবিসি তেলেগুকে বলেছেন, পুলিশ তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনা পুননির্মানের জন্য অভিযুক্তদের ঘটনাস্থলে নিয়ে যায়।
তারা পুলিশ সদস্যদের বন্দুক ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ গুলি করে বলে তিনি জানান।
এতে আহত হয়েছেন দুই পুলিশ কর্মকর্তা।
হায়দ্রাবাদে ওই পশু চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় পুলিশকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল - বিশেষত যখন ভুক্তভোগীর পরিবার পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয় ভূমিকার অভিযোগ আনে।
ধর্ষণ ও হত্যার ওই ঘটনার পরে কয়েক হাজার মানুষ হত্যাকারীদের মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে হায়দ্রাবাদ থানার সামনে বিক্ষোভ করে।
দেশের অন্যান্য স্থানেও বিক্ষোভ ও মিছিল হয়েছে। ভারতীয় আইনে ধর্ষণের শিকার নারীদের নাম ব্যবহার করা যায়না।

ছবির উৎস, Reuters
ভুক্তভোগীর পরিবার কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে?
বিবিসি তেলেগুর দীপ্তি বাথিনী ভুক্তভোগীর পরিবারের বাড়িতে যান, যেখানে প্রতিবেশীদের এই ঘটনায় পটকা ফাটিয়ে এবং মিষ্টি বিতরণ করে উদযাপন করতে দেখা যায়।
"আমি এই অনুভূতি ভাষায় বোঝাতে পারবো না। আমার অনেক আনন্দ হচ্ছে আবার দুঃখও লাগছে কারণ আমার মেয়ে তো আর ঘরে ফিরবে না," ভুক্তভোগীর মা বলেছিলেন।
"আমার মেয়ের আত্মা এখন শান্তিতে আছে। ন্যায়বিচার হয়েছে। আমি কখনই ভাবিনি যে আমরা ন্যায়বিচার পাব। আমার মেয়ের সাথে যা হয়েছে তা যেন অন্য কোনও মেয়ের সাথে না হয়।"
নিহত ওই পশু চিকিৎসকের মায়ের দাবি ভারতে যেন যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের আইনটিকে আরও "কঠোর" করা হয়।
"পুরুষরা যেন নারীদের দিকে তাকাতেও ভয় পায় - কারণ তাদের শাস্তি পেতে হবে।"
ভুক্তভোগীর বোন জানিয়েছেন, পুলিশের এই ভূমিকা "খুবই অপ্রত্যাশিত"।
"আমি আদালতের বিচারের প্রত্যাশা করছিলাম। এই ঘটনা আমার বোনকে ফিরিয়ে দেবে না, তবে এটি অনেক স্বস্তির। পুলিশের এমন পদক্ষেপের কারণে এখন থেকে কেউ আবার এই জাতীয় কিছু করার আগে দু'বার চিন্তা করবে," তিনি বলেন।

ব্যাপক প্রতিক্রিয়া
পুলিশের এমন পদক্ষেপের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে উদযাপন হয়েছে।
অনেকে টুইটার এবং ফেসবুকে পুলিশের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছিলেন যে তারা "ন্যায়বিচার করেছেন"।
২০১২ সালে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে একটি বাসে গণধর্ষণে যে মেডিকেল শিক্ষার্থী নিহত হয়েছিলেন, তার মাও অভিযুক্তদের এই হত্যার ঘটনার প্রশংসা করেন।
তিনি এএনআই সংবাদ সংস্থাকে বলেছেন, "এই শাস্তির খবর পেয়ে আমি অত্যন্ত খুশি। পুলিশ অনেক ভাল কাজ করেছে।"
হত্যার ঘটনাস্থল থেকে বিবিসির তেলুগু সংবাদদাতা সতীশ বল্লা বলেছেন, সেখানে প্রায় দুই হাজার মানুষ জড়ো হয়েছে, যার ফলে বিশাল যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।
যানবাহনগুলি মহাসড়কে স্থবির হয়ে আছে। সেখান থেকে মানুষ পুলিশকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে।
এর আগে সাধারণ মানুষ পুলিশের ওপর গোলাপের পাপড়ি ছেটায় এবং মিষ্টি বিতরণ করেন।
প্রাক্তন বলিউড তারকা জয়া বচ্চন, যিনি এখন ভারতের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের এমপি, এই সপ্তাহের শুরুতে বলেছিলেন যে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের "পিটিয়ে হত্যা" করা উচিত।
"আমি জানি এটি শুনতে কঠোর মনে হচ্ছে, তবে এই ধরণের মানুষদের জনসমক্ষে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা উচিত," পার্লামেন্টে দেয়া বক্তব্যে তিনি এই কথা বলেন।
কংগ্রেস, বিজেপিসহ নানা দলের নেতা নেত্রী এবং অন্যান্য রাজনীতিবিদরাও এই নির্মম গণধর্ষণ ও হত্যার নিন্দা জানিয়েছেন এবং পুলিশের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানাচ্ছেন।
ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় সাইনা নেহওয়াল টুইট করে 'সালাম' জানিয়েছেন হায়দ্রাবাদ পুলিশকে।

ছবির উৎস, Reuters
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
তবে কয়েকজন, এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা এবং পুলিশের সংস্কারের মূল স্থপতি প্রকাশ সিং বিবিসিকে বলেছন যে এই হত্যাকাণ্ড সম্পূর্ণভাবে এড়ানো যেতো।
তিনি বলেন, "হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের যখন আদালতে বা অপরাধের জায়গায় নেওয়া হয়, তখন প্রচুর সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত।"
"তাদেরকে বের করার আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। হাতকড়া পরাতে হবে এবং সঠিকভাবে তল্লাশি চালাতে হবে। কারণ পুলিশ যদি সতর্ক না হয় তাহলে যেকোন সময় যেকোন ধরণের ঘটনা ঘটতে পারে।"
তবে মিঃ সিং বলেছেন, ঘটনাটি বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিনা, সেটা এতো তাড়াতাড়ি বলা যাবেনা- ভারতে এ ধরণের হত্যাকাণ্ড "এনকাউন্টার কিলিং" নামে পরিচিত।
অন্যদিকে বিজেপি নেত্রী মানেকা গান্ধী এভাবে পুলিশ এনকাউন্টারে অভিযুক্তদের মেরে ফেলার নিন্দা করেছেন।
তিনি বলছেন, "আমি এই বন্দুক যুদ্ধের বিরোধিতা করি। এটা একটা ভয়াবহ ঘটনা। আইন কেউই নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। বিচার হলে নিঃসন্দেহে এদের ফাঁসির সাজা হত। বিচারের আগেই যদি গুলি করে অভিযুক্তকে মেরে দেওয়া হয়, তাহলে আদালত, পুলিশ বা বিচার ব্যবস্থার দরকার কি?"
প্রশ্ন তুলেছেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালও। তার কথায়, "মানুষ এই এনকাউন্টারের কারণে উৎসব পালন করছেন, কিন্তু এটা আমাদের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে একটা গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিল। গোটা দেশের ভাবা দরকার যে ফৌজদারি বিচার বিভাগ আর তদন্ত বিভাগকে কি করে শক্তিশালী করা যায়।"
ভারতের সংসদেও এ নিয়ে বিতর্ক চলছে এখন।
মানবাধিকার কর্মীরা প্রশ্ন তুলছেন পুলিশই যদি বিচার করে ফেলে, তাহলে আর আইন আদালতের প্রয়োজনটা কী!
পুলিশ বলছে নিহতদের দেহের ময়না তদন্ত যেমন করা হচ্ছে, তেমনই গোটা বন্দুক যুদ্ধের তদন্তও করা হবে।

ছবির উৎস, Getty Images
কীভাবে পশুচিকিৎসকের হত্যার ঘটনা উদঘাটন হয়েছিল?
দশ দিন আগে ভুক্তভোগী ওই নারী একজন ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্টে যাওয়ার জন্য স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে তার মোটরসাইকেলে করে বাড়ি থেকে বের হন।
পরে পরিবারকে ফোন দিয়ে তিনি জানান যে তার মোটরসাইকেলের টায়ারের হাওয়া বেরিয়ে গেছে। এবং একজন ট্রাক চালক তাকে সাহায্য করার কথা জানিয়েছেন।
তিনি জানান, তিনি একটি টোল প্লাজার কাছে অপেক্ষা করছিলেন।
এর পরে পরিবারের সদস্যরা তার সাথে যোগাযোগ করতে চাইলেও সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং বৃহস্পতিবার সকালে ফ্লাইওভারের নিচে ওই নারীর মরদেহ খুঁজে পান এক দুধ বিক্রেতা।
গত সপ্তাহে, তিন নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়।
ভিকটিমের পরিবারের অভিযোগ তারা নিখোঁজের খবর পুলিশকে দেয়ার পরও তারা কোন তাৎক্ষণিক কোন পদক্ষেপ নেননি।
সরকারী সংস্থা জাতীয় মহিলা কমিশনকে স্বজনরা জানান যে, ওই কর্মকর্তারা সঙ্গে সঙ্গে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাদেরকে বলেছেন যে, তিনি পালিয়ে যেতে পারেন।
আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Reuters
নারীরা কি ভারতে নিরাপদ?
২০১২ সালের ডিসেম্বরে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে একটি বাসে এক মেডিকেল শিক্ষার্থীকে গণধর্ষণ ও হত্যার পর থেকে দেশটিতে নারীদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার বিষয়টি কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
তবে নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ কমার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
সরকারী পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০১৭ সালে ভারতে ধর্ষণের ৩৩ হাজার ৬৫৮টি মামলা পুলিশ রেজিস্ট্রি করেছে, এর অর্থ ভারতে প্রতিদিন গড়ে ৯২টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।








