কাশ্মীরে কি 'ইসরায়েলি মডেল' চাপাতে চায় ভারত?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
কাশ্মীরেও তথাকথিত 'ইসরায়েল মডেল' প্রয়োগ করার পক্ষে সওয়াল করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ভারতের একজন শীর্ষ কূটনীতিক।
নিউ ইয়র্কে ভারতের কনসাল জেনারেল সন্দীপ চক্রবর্তীকে একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানে বলতে শোনা গেছে, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে যেভাবে ইসরায়েল ইহুদি বসতি গড়ে তুলেছে, ভারতেরও উচিত হবে সেভাবেই কাশ্মীরে হিন্দু পন্ডিতদের জন্য বসতি গড়ে তোলা।
তার সেই বক্তৃতার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়ার পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান একে ভারতের 'ফ্যাসিবাদী মানসিকতা'র দৃষ্টান্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
যদিও ওই কূটনীতিবিদ দাবি করছেন তার মন্তব্য 'আউট অব কনটেক্সট' বা প্রসঙ্গ-বহির্ভূতভাবে তুলে ধরা হচ্ছে।

ছবির উৎস, সন্দীপ চক্রবর্তী / টুইটার
নিউ ইয়র্কে ভারতের শীর্ষ ডিপ্লোম্যাট সন্দীপ চক্রবর্তী ফরেন সার্ভিসের একজন পোড়খাওয়া কর্মকর্তা, আমেরিকার আগে তিনি পেরুতে ভারতের রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশেও উপরাষ্ট্রদূত পদে ছিলেন।
দিনদুয়েক আগে নিউ ইয়র্কে তিনি কাশ্মীরি পন্ডিতদের একটি ঘরোয়া বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দিচ্ছিলেন, যেখানে অন্যান্যদের সঙ্গে বলিউড অভিনেতা অনুপম খের ও পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রীও উপস্থিত ছিলেন।
পরে বিবেক অগ্নিহোত্রী নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে সেই ভাষণের প্রায় ঘন্টাখানেকের ভিডিও পোস্ট করামাত্র তা নিয়ে তুমুল হইচই শুরু হয়ে যায়।
কাশ্মীর থেকে বিতাড়িত হিন্দু পন্ডিতদের ভ্যালিতে ফেরানোর প্রসঙ্গে সেখানে মি চক্রবর্তীকে বলতে শোনা যায়, "আমি জানি না এখানে আমরা কেন ইসরায়েলি মডেল অনুসরণ করছি না, মধ্যপ্রাচ্যে তো এই মডেল সফল হয়েছে।"
আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
"প্রাণভয়ে যে পণ্ডিতরা ভ্যালিতে ফিরছেন না, তাদের জন্য ইহুদি সেটলমেন্টের ধাঁচে সেখানে নিরাপদ বসতি গড়ে তুলতে হবে।"
"ইসরায়েলিরা যদি পারে, আমরাও পারব - নিজেদের প্রতিশ্রুত ভূখণ্ডের বাইরে দুহাজার বছর থাকার পরও তারা নিজেদের সংস্কৃতি ধরে রেখেছে।"
"আমাদেরও মনে রাখতে হবে কাশ্মীরি সংস্কৃতি হল ভারতের সংস্কৃতি, হিন্দু সংস্কৃতি।"
তিনি আরো বলেছেন, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠদের শক্তিকে ভারত কাশ্মীরে কখনও ব্যবহারই করেনি।
এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of X post
মি চক্রবর্তী বলেছেন, "ভারত এতদিন যেভাবে সব ধর্মকে মর্যাদা দিয়ে এসেছে সেটাও এখন বন্ধ করার সময় এসেছে।"
এই খবর সামনে আসার কিছুক্ষণ পরেই এই সংক্রান্ত একটি খবরের লিঙ্ক দিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ওই মন্তব্যের তীব্র নিন্দা করেন।
তিনি টুইট করেন, "এই বক্তব্যে আরএসএস আদর্শে পুষ্ট ভারত সরকারের ফ্যাসিবাদী মানসিকতারই প্রতিফলন ঘটেছে - যারা কাশ্মীরকে আজ একশো দিনেরও বেশি হল অবরুদ্ধ করে রেখেছে"।
মি চক্রবর্তী নিজে বুধবার রাতে টুইট করেন, "আমার সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে কিছু মন্তব্য চোখে পড়েছে, কিন্তু আমার মন্তব্যকে এখানে ভিন্ন প্রসঙ্গে তুলে ধরা হচ্ছে।"

ছবির উৎস, Getty Images
ভারতে শাসক বিজেপির শরিক জনতা দল ইউনাইটেডের নেতা, সাবেক এমপি ও কূটনীতিবিদ পবন ভার্মা মনে করছেন, মি চক্রবর্তীর কাছ থেকে এ ধরনের মন্তব্য আদৌ কাঙ্ক্ষিত নয়।
মি ভার্মার যুক্তি, "ইসরায়েলের পটভূমিতে কাশ্মীর ও গাজার তুলনাটাই আসলে ভুল বলে আমি মনে করি - কারণ কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, কাশ্মীরের সব লোক ভারতেরই নাগরিক।"
"কাশ্মীরি পন্ডিতদের অবশ্যই ভ্যালিতে ফেরার অধিকার আছে, কিন্তু এটা তো ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ফলে কাশ্মীরের প্রসঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে তুলনা টানায় সংযম দেখানোটাই বাঞ্ছনীয়", বলছেন তিনি।
জাতিসংঘ তথা আন্তর্জাতিক বিশ্ব ফিলিস্তিনকে 'অধিকৃত এলাকা' হিসেবে মেনে নিলেও কাশ্মীর কিন্তু তাদের চোখে এখনও 'বিতর্কিত ভূখন্ড', তার বেশি কিছু নয়।

ছবির উৎস, Getty Images
কিন্তু কাশ্মীরেও 'ইসরায়েল মডেল' প্রয়োগের কথা উঠলে অবধারিতভাবে প্রশ্ন উঠবে, ভারতও কি ওই এলাকাটি জোর করে দখল করে রেখেছে?
বস্তুত ভারত সরকারেরও ঘোষিত অবস্থান হল তারা জর্দান নদীর পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনের নিন্দা করে।
এই কারণেই শীর্ষস্থানীয় বিজেপি নেতারা কেউই এখনও সন্দীপ চক্রবর্তীর বক্তব্যের সমর্থনে প্রকাশ্যে এগিয়ে আসেননি, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও তা বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক দীনেশ কে ভোহরাও বিবিসিকে বলেছেন, "এমন বিপজ্জনক আইডিয়া থেকে দূরে থাকাই ভাল। এই ধরনের ভাবনার লোকজন যদি বিদেশে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাতে আমাদের মুশকিলই বাড়বে।"
"একেই ধর্মীয় অসহিষ্ণুতাসহ নানা কারণে ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি খারাপ হচ্ছে, তার ওপর এসব কথা বললে কী লাভ হবে?"
"ভারত কখনওই ইসরায়েল নয়, হওয়াও উচিত নয় - এটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে।"
বর্তমান বিজেপি সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা অনেক বেড়েছে কোনও সন্দেহ নেই।
কিন্তু পর্যবেক্ষকদের অনেকেই বলছেন, গাজা বা পশ্চিম তীরে ইসরায়েল যা করছে কাশ্মীরেও তা করার উপায় নেই।









