থাই রাজার রাজকীয় সঙ্গী বা কনসোর্ট সিনানাত যে কারণে পদবি খোয়ালেন

সিনেনাত ওংভাজিরাপাকদি

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, কয়েক মাস আগেই সিনিনাত ওংভাজিরাপাকদিকের এই ছবি তার রাজকীয় জীবনবৃত্তান্তে প্রকাশিত হয়েছিল

নিজের রাজকীয় সঙ্গীর পদ এবং উপাধি বাতিল করে পর্যবেক্ষকদের অবাক করে দিয়েছেন থাইল্যান্ডের রাজা মাহা ভাজিরালংকর্ন। মাত্র কয়েক মাস আগেই তাকে ওই পদ ও উপাধি দেয়া হয়েছিল।

গত জুলাই মাসে নতুন রানীর পাশাপাশি সিনিনাত ওংভাজিরাপাকদিকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজার 'সঙ্গী' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।

কিন্তু রাজপ্রাসাদ থেকে জানানো হয় যে, "নিজেকে রানীর সমকক্ষ" হিসেবে তুলনা করায় সিনিনাতকে এই সাজা দেয়া হয়েছে।

কিছু কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, তার এই পতন একদিকে যেমন থাইল্যান্ডের রাজ শাসন সম্পর্কে দিক নির্দেশনা দেয়, ঠিক তেমনি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়েও বর্ণনা করে।

নতুন সম্রাট, রাজা মাহা ভাজিরালংকর্ন ২০১৬ সালে তার বাবা মারা যাওয়ার পর ক্ষমতায় বসেন। দেশটির রাজকীয় আইন অনুসারে রাজ শাসনের বিরুদ্ধে সমালোচনা করা নিষেধ এবং এর জন্য কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

সঙ্গী কী?

সঙ্গী বলতে সাধারণত ক্ষমতায় থাকা রাজার একজন স্ত্রী, স্বামী কিংবা সহচরকে বোঝায়। কিন্তু থাইল্যান্ডে এ ক্ষেত্রে কনসোর্ট বা "রাজকবীয় সঙ্গী" বলতে রাজার স্ত্রীর পাশাপাশি আরেকজন সঙ্গিনী বা অংশীদারিকে বোঝানো হয়েছে।

প্রায় এক শতাব্দী পর, প্রথমবারের মতো কোন রাজসঙ্গী হয়েছিলেন ৩৪ বছর বয়সী সিনিনাত।

গত জুলাই মাসে যখন তাকে এই উপাধি দেয়া হয়েছিল তখন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি রাজার সঙ্গী হিসেবে গণ্য হন। তবে এই উপাধি অনুযায়ী তিনি অবশ্যই রানী নন। ওই সময়ে রাজা তার চতুর্থ স্ত্রীকে বিয়ে করেন যিনি হলেন রানী সুথিদা।

ঐতিহাসিকভাবে, থাইল্যান্ডে বহুগামিতার প্রচলন ছিল। সাধারণত রাজ্যের বড় বড় প্রদেশের প্রভাবশালী পরিবারের সাথে মিত্রতা বজায় রাখতে সেসব পরিবার স্ত্রী বা সঙ্গী গ্রহণ করতেন রাজারা।

থাই রাজারা কয়েক শতাব্দী ধরে বহু বিবাহ বা একাধিক সঙ্গী গ্রহণ করে আসছেন।

সব শেষ ১৯২০ সালে একজন থাই রাজা আনুষ্ঠানিকভাবে একজন সঙ্গী গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৩২ সালে দেশটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে পরিণত হওয়ার পর থেকে কোন রাজা আর এমন সঙ্গী গ্রহণ করেননি।

সিনিনাত সম্পর্কে কী জানা যায়?

রাজসভার মাধ্যমে প্রকাশিত কিছু বায়োলজিক্যাল তথ্য ছাড়া তার সম্পর্কে আর বিস্তারিত তেমন কিছু জানা যায় না।

"রাজ পরিবার তার অতীত সম্পর্কে আমাদেরকে যতটুকু জানাতে চেয়েছে আমরা শুধু সেটুকুই জেনেছি," বলেন কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পাভিন চাচাভালপংপান।

১৯৮৫ সালে থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে জন্মেছিলেন তিনি এবং শুরুতে নার্স হিসেবে কাজ করেছেন। তৎকালীন ক্রাউন প্রিন্স ভাজিরালংকর্নের সাথে সম্পর্কের পর তিনি রয়্যাল সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন।

তিনি একাধারে একজন দেহরক্ষী, পাইলট, প্যারাসুটিস্ট এবং রয়্যাল গার্ডের সদস্য। চলতি বছরের শুরুর দিকে তাকে মেজর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হয়।

তার সম্মান আরো বাড়ে যখন এক শতাব্দী পর গত জুলাই মাসে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজার সঙ্গীর মর্যাদা দেয়া হয়।

থাইল্যান্ডের সাবেক রাজা ভূমিবল আদুলিয়াদেজের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে অংশ নেন সিনেনাত

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, থাইল্যান্ডের সাবেক রাজা ভূমিবল আদুলিয়াদেজের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে অংশ নেন সিনেনাত

এর পর পরই, রাজ প্রাসাদ থেকে তার দাপ্তরিক জীবন বৃত্তান্ত প্রকাশ করা হয় যেখানে তার ফাইটার জেট চালানোর ছবিসহ বেশ কিছু অ্যাকশন ইমেজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তবে দাপ্তরিক ওয়েবসাইট থেকে এখন সেগুলো সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

তার সাথে এখন কী হবে?

"রাজ শাসনের প্রতি আনুগত্যহীনতা এবং অশোভন আচরণের" অভিযোগে সিনিনাতের পদ এবং উপাধি বাতিল করা হয়েছে বলে রাজ দরবারের প্রকাশিত এক ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

ওই ঘোষণাপত্রে বলা হয়, সে অনেক বেশি 'উচ্চাকাঙ্ক্ষী' এবং নিজেকে "রানীর সমতুল্য বলে তুলনা করেছে"। সেই সাথে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজার পক্ষ থেকে হুকুম দিতে শুরু করেছে।

এতে বলা হয়, রাজা জানতে পেরেছেন যে, "তাকে যে উপাধি দেয়া হয়েছিল সে তার জন্য কৃতজ্ঞ ছিল না এবং তার মর্যাদা অনুযায়ী সে যথোচিত ব্যবহার করেনি।"

করনেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস এবং থাই অধ্যাপনা বিভাগের অধ্যাপক তামারা লুস বলেন, পুরো বিষয়টি বুঝতে হলে আসলে কি ঘটেছে সে বিষয়ে স্বচ্ছতা প্রয়োজন।

রাজা আসলে একটি বার্তা দিচ্ছেন যেটি শুধু তার সঙ্গীর পতন নয় বরং আরো বেশি অর্থবহ

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, রাজা আসলে একটি বার্তা দিচ্ছেন যেটি শুধু তার সঙ্গীর পতন নয় বরং আরো বেশি অর্থবহ

"এ ধরণের যেকোন পরিস্থিতিতে ঘটনার পেছনে এক ধরণের পৃষ্ঠপোষক ব্যবস্থা থাকে। সিনিনাত হয়তো এ ধরণেরই কোন পৃষ্ঠপোষক ব্যবস্থায় পড়েছে এবং সে হয়তো এমন এক পথ অনুসরণ করেছে যা আসলে তার পক্ষে কাজ করেনি," রাজদরবারে দলবাজির প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি একথা বলেন।

তিনি বলেন, তার পতন সম্পর্কে দেয়া ঘোষণাপত্রের ভাষা এমন এক যুগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যেখানে নারীরা সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতা পেতে পারে না। আর তাই আপনি যাকে নারীর প্রভাব বলে উল্লেখ করবেন সেখানে তাকে নারীর উচ্চাকাঙ্ক্ষা বলে উল্লেখ করা হয়।"

মিস লুস এর মতে এই ঘোষণাপত্র আসলে "থাইল্যান্ডে আধুনিক রাজতন্ত্রের উদ্ভবের" চিহ্ন।

তার জন্য কী অপেক্ষা করছে?

এখন পর্যন্ত সিনিনাতের পদ এবং উপাধি বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু তার জন্য ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে সে বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়।

"আমাদের কোন ধারণা নেই যে, তার সাথে আসলে কি হতে পারে," মি. পাভিন বলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে এই প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।

তার অতীত যেহেতু রাজদরবার নিয়ন্ত্রণ করেছে তাই তার ভবিষ্যতও নির্ভর করবে রাজদরবারের উপরই।

সিনিনাতের এই পতনের পর সহজেই ধারণা করা যায় যে, রাজা ভাজিরালংকর্নের অন্য দুই স্ত্রীর সাথে কী ঘটনা ঘটেছিল।

১৯৯৬ সালে তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী সুজারিনে ভিভাচারাঅংসের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রকাশ করেন- যিনি পরে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। একইসাথে ওই স্ত্রীর সাথে তার চার ছেলেকেও ত্যাগ করেন তিনি।

২০১৪ সালে, তার তৃতীয় স্ত্রী শ্রিরাসমি সুয়াওদে- যার সম্পর্কে কোন খোঁজ জানা যায় না- তারও সব পদ এবং উপাধি বাতিল করা হয়েছিল এবং তাকে রাজদরবারে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। গ্রেফতার করা হয় তার বাবা-মাকেও। তাদের একমাত্র ছেলে যার বয়স এখন ১৪ বছর রাজা ভাজিরালংকর্নের কাছে রয়েছে।

এর আগে তার স্ত্রীরা তাদের অবস্থা সম্পর্কে কখনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।

এটা আরো কী জানান দেয়?

রাজা হওয়ার পর থেকেই নিজের বাবার তুলনা ক্ষমতাকে অনেক সরাসরিভাবেই ব্যবহার করছেন রাজা ভাজিরালংকর্ন।

চলতি বছরের শুরুতে, রাজধানী ব্যাংককের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সেনাবাহিনীকে তার অধীনে ন্যস্ত করা হয়। যা সামরিক ক্ষমতা রাজার হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়াকে নির্দেশ করে যদিও আধুনিক থাইল্যান্ডে এটা নজিরবিহীন।

"সিনিনাতের সমালোচনায় রাজদরবার যে নির্মম ও কট্টর ভাষা ব্যবহার করেছে তা থেকেই আভাস পাওয়া যায় যে, কিভাবে রাজা তার শাস্তিকে বৈধতা দিতে চান," মি. পাভিন ব্যাখ্যা করেন।

নিজের বাবার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন রাজা ভাজিরালংকর্ন

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান, নিজের বাবার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন রাজা ভাজিরালংকর্ন

মিস লুস এ কথায় একমত প্রকাশ করেছেন যে, রাজা আসলে একটি বার্তা দিচ্ছেন যেটি শুধু তার সঙ্গীর পতন নয় বরং আরো বেশি অর্থবহ।

"রাজা এক ধরণের সংকেত দিচ্ছেন যে, কেউ একবার রাজার বিপক্ষে গেলে তার ভবিষ্যতের উপর আর তার নিজের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।"

"তার যেকোন সিদ্ধান্ত তা সে অর্থনৈতিক, সামরিক কিংবা পারিবারিক যাই হোক না কেন, তার ক্ষমতার অবাধ অপব্যবহারকেই নির্দেশ করে," তিনি বলেন।

দেশটির প্রচলিত আইন অনুযায়ী, বিতর্কিত এই পদাবনতি সম্পর্কে প্রকাশ্যে আলোচনা করা যাবে না- কিন্তু পর্যবেক্ষকরা বিশ্বাস করেন যে, নাটকীয় এই ঘটনা অনেক মানুষের মনেই নাড়া দেবে।

আরো পড়ুন: