দুর্গাপূজার আগে প্রতিমা ভাঙচুর: পালা করে প্রতিমা পাহারা দেওয়া হচ্ছে

ভাওয়ালগড়ে গ্রামবাসীরা বলছেন, সেখানে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি।

ছবির উৎস, Bangladesh Puja Udjapan Parishad

ছবির ক্যাপশান, ভাওয়ালগড়ে গ্রামবাসীরা বলছেন, সেখানে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি।
    • Author, কাদির কল্লোল
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে দুর্গাপূজার প্রস্তুতিতে ১১টি জেলায় ১৩টি মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পূজা উদযাপন পরিষদ।

এই সংগঠনের নেতারা বলেছেন, এসব হামলার ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুবই কম। আর সেকারণে প্রতিবছরই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে বলে তারা মনে করেন।

এবছর যে এলাকাগুলোতে প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে, তার মধ্যে গাজীপুরের মির্জাপুর ইউনিয়নের সাথে ভাওয়ালগড় এলাকা একটি। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, হামলার পর পরই হিন্দুদের মধ্যে ভয় তৈরি হলেও তারা নতুন করে প্রতিমা বানিয়ে পূজার প্রস্তুতি নিয়েছেন।

গাজীপুর শহর থেকে প্রায় ২১ কিলোমিটার দূরে ভাওয়ালগড় ইউনিয়নে মনিপুরী উত্তরপাড়া গ্রামে একটি মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে সপ্তাহ তিনেক আগে।

গ্রামটিতে ১০ শতক জমির ওপর স্থায়ীভাবে মন্দিরের একটি ঘর নির্মাণ করে সেখানে পূজা করা হচ্ছে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে।

গ্রামবাসীরা বলছেন, সেখানে এই প্রথমবারের মতো রাতের অন্ধকারে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

পিংকী দেবনাথ বলেছেন,এই ঘটনা তাদের মাঝে আতংক সৃষ্টি করেছিল। তবে সেই ভয় কাটিয়ে তারা আবার প্রতিমা তৈরি করেছেন।

পূজা মণ্ডপে নতুন করে প্রতিমা বানানো হয়েছে।
ছবির ক্যাপশান, পূজা মণ্ডপে নতুন করে প্রতিমা বানানো হয়েছে।

আরো পড়তে পারেন:

তিনি আরও জানিয়েছেন, দুর্গাপূজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা পালা করে প্রতিমা পাহারা দিচ্ছেন যা তারা আগে কখনও করেননি।

এই মন্দিরের কমিটির একজন সদস্য সুজন চন্দ্র শীল বলছেন, প্রতিমাগুলোর মাথা ভেঙে ফেলা হয়েছিল এবং কয়েকটি ভেঙে মাটিতে ফেলে রাখা হয়েছিল। কেন এরকম হামলা করা হলো এর কারণ তাদের জানা নেই।

"গ্রামে আমাদের কারও মধ্যে কখনও দ্বন্দ্ব ছিল না। মন্দিরের জমি নিয়েও কোন বিরোধ নেই। এখানে পূজায় আমরা হিন্দু মুসলিম সবাই একসাথে আনন্দ করি। মুসলিমরা আমাদের পূজার করার জন্য সহযোগিতা করে। এমন পরিবেশে এই হামলার কারণ আমাদের জানা নেই।"

গ্রামটিতে মসজিদ এবং মন্দিরের মাঝেও দূরত্ব বেশি নয়। সেখানে বসবাসকারী প্রায় দেড়শ হিন্দু পরিবার এবং চারশ'র মতো মুসলিম পরিবারের মধ্যে কখনও দ্বন্দ্ব হয়নি বলে স্থানীয় লোকজন বলেছেন।

মন্দিরটির পাশেই বসবাসকারী একজন মুসলিম আব্দুল আউয়াল বলছেন, কেন এবং কারা এই হামলা করেছে গ্রামের সবাই এখন এই প্রশ্নের জবাব খুঁজছে।

"এখানে হিন্দু মুসলিমদের মধ্যে যে একটা সম্প্রীতি আছে, এই একতা যাতে না থাকে, সেজন্য কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য এই ঘটনা ঘটাতে পারে। এটা উদ্দেশ্যমূলক হতে পারে। গ্রামের কেউ এটা করে নাই।"

তবে স্থানীয় পুলিশ বলেছে, মন্দিরের জমি নিয়ে বিরোধ থেকে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনাটি ঘটতে পারে বলে তারা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন।

তবে পুলিশের এই বক্তব্যের সাথে গ্রামটির মন্দির কমিটি একমত নয়।

হিন্দু পূজারি
ছবির ক্যাপশান, স্থানীয় হিন্দুরা বলছেন, শুরুতে বয় পেয়ে গেলেও সেই ভয় তারা কাটিয়ে উঠেছেন।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের নির্মল কুমার চ্যাটার্জি বলেছেন, গত বছর ১৮টি প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে এবং এবছর ১৩টি ভাঙচুর হয়েছে।

তিনি বলছেন, সারা দেশে প্রায় ৩২ হাজার পূজা মণ্ডপের কাছে এই সংখ্যা বেশি বলা যাবে না। কিন্তু ভাঙচুর যে থামছে না, সেটাই তাদের উদ্বেগের বিষয়।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলেছেন, আইনগত এবং রাজনৈতিক সব দিক থেকেই তারা এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

"আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক এবং আইনগত- সব দিক থেকেই আন্তরিকভাবে এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। এরপরও দু'একটি ঘটনা যা ঘটছে, সেগুলোর ব্যাপারেও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।"

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সারাদেশে পুজা মণ্ডপের নিরাপত্তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

তিনি জানান, হাতেগোনা যে কয়েকটি অভিযোগ তারা পেয়েছেন সেগুলো পুলিশ তদন্ত করে দেখছে।

আরো পড়তে পারেন:

ভিডিওর ক্যাপশান, মনিপুরী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজার প্রস্তুতি চলছে সিলেটে