ইতিহাসের সাক্ষী: চীনের মহাদুর্ভিক্ষ
আজ থেকে ৫০ বছর আগে চীনের নেতা মাও জে দং ঘোষণা করেছিলেন তার দেশকে আধুনিকায়নের এক পরিকল্পনা।
এর নাম দেয়া হয়েছিল 'গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড' - অনেকে যার বাংলা করেছেন 'মহা-উল্লম্ফন' বলে।
কিন্তু এর পরিণামে চীনে দেখা দিয়েছিল এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। বিংশ শতাব্দীতে মানবিক বিপর্যয়ের ভয়াবহ যতো ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে একে অন্যতম বলে বিবেচনা করা হয়।
মাও জেদং সেসময় খুব দ্রুত চীনের কৃষি অর্থনীতিকে একটি শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
কিন্তু এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয় এবং ১৯৫৯ সাল থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে চীনে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।
এতে মারা গিয়েছিল অন্তত তিন কোটি মানুষ। সে ছিল এমনই দুর্ভিক্ষ, যার বর্ণনা শুনলে অনেকেই বিচলিত বোধ করবেন।

ছবির উৎস, Getty Images
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন সেই দুভিক্ষের কথা 'ইতিহাসের সাক্ষী'তে।
কেন হয়েছিল ওই মহাদুর্ভিক্ষ? এর কারণ নিহিত আছে মাও জে দং-এর জনগণতন্ত্রের প্রথম বছরগুলোর ইতিহাসের মধ্যে।
১৯৪৯ সালে ক্ষমতা দখলের সময় থেকেই মাও জেদং এবং তার সাথী কমিউনিস্টদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ছিল চীনকে বদলে দেবার - চীনকে একটি আধুনিক শিল্পোন্নত দেশে পরিণত করার।
বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

এজন্য শিল্পকারখানাগুলো নেয়া হলো রাষ্ট্রীয় মালিকানায়, আর কৃষকদেরকে সংগঠিত করে গড়ে তোলা হলো কমিউন।
লোহা এবং ইস্পাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার জন্য কৃষকদের লাগিয়ে দেয়া হলো স্থানীয়ভাবে ছোট ছোট ফার্নেসে ইস্পাত তৈরির কাজে।
কিন্তু শিল্প এবং কৃষিখাতে উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হলো, তা বাস্তবসম্মত ছিল না।
প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিপুল পরিমাণ খাদ্য বাস্তবে সরবরাহ করা সম্ভব হলো না, তখনই দেখা দিলো দুর্ভিক্ষ। লোকজন বেঁচে থাকার জন্য গাছের পাতা, ইঁদুর, গাছের পোকামাকড়, কুকুর - এসব খেতে শুরু করলো।
এমনকি সেসময় মানুষের মাংসও খেয়েছেন অনেকে।

ছবির উৎস, Getty Images
ইয়াং জি শেইন নামে একজন চীনা সাংবাদিক সেই দুর্ভিক্ষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি বই লিখেছেন। তার বাবাও সেই দুর্ভিক্ষের সময় মারা গিয়েছিলেন।
সেই বই লেখার জন্য ইয়াং জি শেইন সারা চীনের নানা জায়গায় ঘুরে লোকজনের সাথে কথা বলেছেন। তাদের মুখে শোনা দুর্ভিক্ষের স্মৃতি সংগ্রহ করে সেই সময়কার সত্য কাহিনী লিপিবদ্ধ করেছেন।
তিনি মনে করেন, চীনের ওই দুর্ভিক্ষে ১৯৫৯ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত ৩ কোটি ৬০ লাখ লোক মারা গিয়েছিলেন। কোন কোন এলাকায় জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ বা তার চেয়েও বেশি লোকের মৃত্যু হয়েছিল।
ইয়াং জি শেইন তার বাবার স্মৃতিতে সেই বইয়ের নাম দিয়েছিলেন 'সমাধিফলক' ।
বইটি আজও চীনে নিষিদ্ধ।
বিবিসির লুইস হিদালগোর এই প্রতিবেদন পরিবেশন করেছেন পুলক গুপ্ত।