কাশ্মীর: এখন কি সেখানে 'ঝড়ের আগের শান্ত অবস্থা' চলছে?

পার্কে বেড়াতে আসছেন ভারতশাসিত কাশ্মীরের লোকেরা

ছবির উৎস, ABID BHAT

ছবির ক্যাপশান, পার্কে বেড়াতে আসছেন ভারতশাসিত কাশ্মীরের লোকেরা

ভারতশাসিত কাশ্মীর থেকে বড় কোন বিক্ষোভের খবর এখনো নেই। সেখানকার পরিস্থিতি কি স্বাভাবিক হয়ে আসছে? নাকি এটা ঝড়ের আগের শান্ত অবস্থা? কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরসহ নানা জায়গা ঘুরে এসে বিবিসির সৌতিক বিশ্বাসের দীর্ঘ প্রতিবেদন।

ভারতশাসিত কাশ্মীরে এখন যে দম-আটকে-আসা অবরুদ্ধ অবস্থা চলছে, তার মধ্যে মনটাকে একটু হালকা করার নানা উপায় বের করে নিয়েছেন সেখানকার লোকেরা।

প্রধান শহর শ্রীনগরের পার্কগুলোতে দেখা যাচ্ছে - লোকের ভিড় বেড়ে গেছে। ছবির মতো সুন্দর ডাল লেকের পার ধরে অনেকে বসে গেছে মাছ ধরতে।

অন্য অনেকে গাড়ি চালিয়ে শহরের নানা প্রান্তে যাচ্ছে, বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা করতে। অনেককে দেখা যায় রাস্তায় জটলা করতেও।

শ্রীনগর শহরে এখন অনেক জায়গা থেকেই নিরাপত্তা ব্যারিকেড আর কাঁটাতারের বেষ্টনী সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ব্ল্যাকআউট বা রেশনে খাবার বিক্রিও আর নেই। দিনে কয়েক ঘন্টার জন্য খুলছে ছোট বাজারগুলোও।

মনে হতে পারে যে - প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ক্ষমতাসীন বিজেপি ভারতশাসিত কাশ্মীরের স্বায়ত্বশাসন কেড়ে নেবার মাসখানেক পর মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যটি যেন ধীরে ধীরে এক ধরণের 'স্বাভাবিক অবস্থায়' ফিরে আসছে।

৩৭০ ধারা বাতিলের প্রতিবাদে কাশ্মীরে বিক্ষোভ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ৩৭০ ধারা বাতিলের প্রতিবাদে কাশ্মীরে বিক্ষোভ

কেন্দ্রীয় সরকারের ওই পদক্ষেপে কাশ্মীর ও জম্মুকে দুটি আলাদা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করে জারি করা হয় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

সরকারি চাকুরে আসমা কুরেইশি, তার পরিবারকে নিয়ে এসেছেন পার্কে বেড়াতে।

মিজ কুরেইশি স্পষ্টই বললেন, কাশ্মীরে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে বলে তিনি মনে করেন না।

'উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ'

গত সোমবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে 'জাতীয় স্বার্থ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে' কাশ্মীরে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছে।

সরকার জোর দিয়ে বলছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে। হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো কাজ করছে, ওষুধের দোকানগুলো খোলা। খাদ্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুত আছে, ক্যাশ মেশিনগুলো কাজ করছে। স্কুল খোলা, ল্যান্ডলাইন ফোন আবার কাজ করতে শুরু করেছে।

সরকার এমনকি আপেল চাষীদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ফল কিনতে রাজি হয়েছে, স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোতে দেখা যাচ্ছে বিজ্ঞাপন - যাতে সোনালী ভবিষ্যৎ, কাজ ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

তার পরেও মনে হতে পারে যে এই 'স্বাভাবিক অবস্থা' যেন একটা বিভ্রম।

ডাল লেকে মাছ ধরছেন স্থানীয় লোকেরা

ছবির উৎস, ABID BHAT

ছবির ক্যাপশান, ডাল লেকে মাছ ধরছেন স্থানীয় লোকেরা

ল্যান্ডলাইন ফোন এখন আবার চালু হচ্ছে, কিন্তু বেশির ভাগ লোকই এখনো ফোন সংযোগ পাচ্ছে না। কিছু সরকারি অফিস খোলা, কিন্তু তাতে লোকজন প্রায় নেই বললেই চলে।

সহিংসতার ভয়ে অভিভাবকরা বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন না। বেসরকারি স্কুলগুলো অভিভাবকদের বলছে, তারা যেন ফ্ল্যাশড্রাইভে করে পাঠদানের ভিডিও এবং পড়ার বইপত্র সংগ্রহ করে নেন।

ফলে এ অঞ্চলের শিশুকিশোররা এখন বাড়িতে বসে টিভি দেখছে, বাড়ির বাগানে 'পাথর ছোঁড়া' খেলছে। 'ভারত কাশ্মীরের প্রতি যে অন্যায় করেছে' তা নিয়ে চমৎকার কথা বলতেও শিখেছে তারা।

একজন স্কুল শিক্ষক বললেন, "আমাদের জীবনের পরিসর ছোট হয়ে গেছে, আমাদের মনটাই যেন অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।"

রাস্তায় বেরুলে দেখা যায়, ওষুধের দোকান ছাড়া অন্য দোকানপাট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ। কড়া নিষেধাজ্ঞার কারণে স্থানীয় পত্রিকাগুলোকে এখন যেন চেনাই যায় না।

রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী এবং অর্ধিকারকর্মী সহ প্রায় ৩ হাজার লোক এখন কারারুদ্ধ। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তারা বন্দীদের ওপর প্রহার-নির্যাতন চালাচ্ছে, তবে ভারত এসব অভিযোগকে 'ভিত্তিহীন' বলে অভিহিত করেছে।

পুরো রাজ্যই কড়া নিরাপত্তার চাদরে মোড়া, এবং তাতে এটা নিশ্চিত হয়েছে যে বড় আকারের কোনো সহিংস ঘটনা ঘটে নি। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহতের সংখ্যা নিয়ে পরস্পরবিরোধী খবর পাওয়া যাচ্ছে, 'স্বাভাবিক অবস্থার' আবরণের নিচে টগবগ করে ফুটছে হতাশা আর ক্ষোভ।

"লোকজন ক্রুদ্ধ, অপমানিত এবং বিচ্ছিন্ন, এমন কোন নেতা নেই যে তাদের কিছু করার আদেশ দেবে। আর ভারতের কথা এখন ভুলে যান, ভারতের ওপর আর কোনই আস্থাই অবশিষ্ট নেই" - বললেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা।

বড় শহরে এরকম কাঁটাতারের বেড়ার অনেকগুলোই সরিয়ে নেয়া হয়েছে

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, বড় শহরে এরকম কাঁটাতারের বেড়ার অনেকগুলোই সরিয়ে নেয়া হয়েছে

তার কথায় - "এখন যে অবস্থা দেখছেন তাকে আমার মনে হচ্ছে ঝড়ের আগের শান্ত পরিস্থিতির মতো। তবে তফাৎ হলো, পরবর্তী প্রতিরোধ আন্দোলন ঠিক কোথা থেকে সৃষ্টি হবে - তা এবার আমরা বুঝতেও পারছি না।"

এরকম ঘটনা আগেও ঘটেছে, ২০০৮, ২০১০ এবং ২০১৬ সালে কাশ্মীরী তরুণরা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল - যা অনেক সহিংসতা এবং অনেক মৃত্যু ডেকে এনেছিল। তিন বছর আগের বিক্ষোভের সময় জঙ্গী নেতা বুরহান ওয়ানি নিহত হবার পর "জনগণের ক্রোধ নতুন জঙ্গীবাদকে অনুমোদন দিয়েছিল" - বলছিলেন ডেভিড দেবাবাস, যিনি 'দি জেনারেশন অফ রেজ' নামে একটি বই লিখেছেন কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে।

তার কথায়: "২০১০ সালেল বিক্ষোভ ছিল নিরপরাধ মানুষের হত্যার বিরুদ্ধে, কিন্তু ২০১৬ সালে রাষ্ট্রের বৈধতাকে প্রত্যাখ্যান করাটাই ছিল বিক্ষোভে মূল সুর।"

তবে এবার যে বিক্ষোভের খবর গোপন করা যায় নি তা ছিল শ্রীনগরের সুরা এলাকার। সেসময় হাজার হাজার লোক রাস্তায় বিক্ষোভ করে, এবং তার ওপর পুলিশ গুলি চালায়, টিয়ার গ্যাস ছোঁড়ে। কয়েক সপ্তাহ পর আরেক দফা সহিংসতা হয় - যাতে আহত হয়েছিল কমপক্ষে দু'জন লোক।

'কারাগারের মধ্যে বসবাস'

আগে ভাবা না গেলেও সুরা এলাকাটি হয়ে উঠেছে প্রতিরোধের কেন্দ্রবিন্দু।

এখানে যুবকরা পরিখা খনন করেছে, এলাকাটিতে ঢোকার তিনটি পথই পাথর, তার, কাঠ, আবর্জনা বহনের পাত্র, ইট বা নানা ধাতব জিনিস দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

একজন বিখ্যাত মুসলিম সাধকের মাজার এখন পরিণত হয়েছে বিক্ষোভকারীদের জমায়েতের জায়গায়। এখানকার সরু সরু রাস্তা আট টালির ছাদওয়ালা বাড়িগুলোর ওপর উড়ছে নজরদারির ড্রোন।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

এখন পর্যন্ত যেসব বিক্ষোভ হয়েছে তা মূলত বিক্ষিপ্ত

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, এখন পর্যন্ত যেসব বিক্ষোভ হয়েছে তা মূলত বিক্ষিপ্ত

রাত হলেই ক্রুদ্ধ যুবকরা হাতে লাঠি বা পেরেক লাগানো মাছধরার ছিপ হাতে নিয়ে নৈশ টহল দিতে বেরোয়। উদ্দেশ্য, নিরাপত্তা বাহিনীর ঘেরাও অভিযান ঠেকানো ।

দোকানগুলো শাটারের ওপর লাগানো বুরহান ওয়ানির ছবিওয়ালা পোস্টার। দেয়ালে আঁকা বন্দুকের ছবি, বা পাকিস্তান-পন্থী নানা রকম শ্লোগান।

"আমরা বাস করছি একটা কারাগারের মধ্যে। কিন্তু আমরা এখানে নিরাপত্তা বাহিনীকে ঢুকতে দেবো না" - বললেন, এক হাইস্কুলের ছাত্র যিনি লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছেন।

অন্য জায়গাগুলোতে গেলে হয়তো এই হতাশা অতটা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। কিন্তু তিন দিন ধরে দক্ষিণ কাশ্মীরের নানা জায়গায় ঘুরে আমি এমন একজনকেও পাইনি যিনিভারতের পদক্ষেপকে সমর্থন করেন। বেশির ভাগ কাশ্মীরীই বলেছেন, তারা এতে ক্ষুব্ধ এবং অপমানিত হয়েছেন।

তবে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের কথা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি সম্প্রতি কাশ্মীরে দু সপ্তাহ কাটানোর পর সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি নিশ্চিত যে সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরীই ৩৭০ ধারা বাতিলকে পুরোপুরি সমর্থন করে।

এখানকার লোকদের সবচেয়ে বেশি ভয় বাইরের লোকেরা তাদের জমি নিয়ে যাবে এবং কাশ্মীর তার 'মুসলিম আত্মপরিচয়' হারিয়ে ফেলবে। অনেকেই বিশ্বাস করেন যে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি শেষ পর্যন্ত মাসলিংম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলটির জনসংখ্যার বিন্যাস বদলে দিতে চায়। ভারত বলছে, তাদের পদক্ষেপের উদ্দেশ্যই শুধুই এ অঞ্চলের উন্নয়ন।

'বাঁচা-মরার প্রশ্ন'

শোপিয়ানের এক দোকানদার শিরাজ আহমেদের সাথে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন, "আমাদের কিছু করতে হবে নয়তো মরতে হবে - ব্যাপারটা এখন এরকমই।"

"বিক্ষোভের সুনামি আসছে, আমাদের ভেতরে আগুন জ্বলছে। ভারত আমাদের মর্মাহত করেছে, প্রতারণা করেছে। আমরা স্বাধীনতা চাই" - বলছিলেন ব্যবসায়ী আশিক হোসেন।

'আমরা স্বাধীনতা চাই' - শহরের রাস্তায় দেয়াল লিখন

ছবির উৎস, ABID BHAT

ছবির ক্যাপশান, 'আমরা স্বাধীনতা চাই' - শহরের রাস্তায় দেয়াল লিখন

কিন্তু গবেষকরা বলছেন. কাশ্মীরে এই আজাদী বা স্বাধীনতা কথাটার অনেকরকম অর্থ হতে পারে।

কাশ্মীরের ছ'টি জেলায় যুবকদের ওপর ২০১১ সালে এক জরিপ চালিয়েছিলেন নভনিতা চাধা বেহরা - যিনি ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের একজন ভিজিটিং স্কলার। 'ডিমিস্টিফাইং কাশ্মীর' নামে একটি বইও লিখেছেন তিনি।

তিনি দেখেছেন, এখানকার ৫৪ শতাংশ লোক 'আজাদী' চান। তাদের বেশির ভাগ্ই বলেছেন, তারা চান স্ব-শাসন, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, নিজস্ব সরকার এবং স্বায়ত্বশাসন। পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হতে চান মাত্র ১ শতাংশ লোক।

কাশ্মীরে এর পর এমন কিছু হয় নি যাতে এ মনোভাব পাল্টে গেছে বলে মনে করা চলে।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

আগামীতে কাশ্মীরে কি ঘটবে তা বলা কঠিন।

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অনেকে মনে করেন, কাশ্মীরীরা সহিংসতায় ক্লান্ত হয়ে গেছে, এবং একসময় তারা মি. মোদীর কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের অঙ্গীকারকেই স্বাগত জানাবে। কিন্তু কাশ্মীরে খুব কম লোকই এ কথা সমর্থন করেন।

কাশ্মীরে ১৯৯০ সালের পর থেকে বিদ্রোহে নিহত হয়েছে ৪০ হাজার লোক। এই বিদ্রোহের কি এখন সমাপ্তির দিন শুরু হলো? নাকি এখন আবার নতুন করে আরেক দফা রক্তাক্ত বিদ্রোহ শুরু হতে যাচ্ছে?

অতীতে দেখা গেছে, কাশ্মীরে কোন একটা ঘটনা ঘটার বেশ কয়েক বছর বড় মাত্রার অভ্যুত্থান ঘটে থাকে। যেমন ১৯৬৩ সালের বিদ্রোহ ঘটেছিল ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা শেখ আবদুল্লাহর বরখাস্ত এবং গ্রেফতারের ১০ বছর পরে। তেমনি, ১৯৮৯ সালের জঙ্গী তৎপরতা শুরু হয়েছিল বিতর্কিত স্থানীয় নির্বাচনের দু বছর পরে।

লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিক্সে আন্তর্জাতিক ও তুলনামূলক রাজনীতির অধ্যাপক সুমন্ত বোস বলছিলেন, কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতির বিস্ফোরক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আগেকার ঘটনাগুলোর চাইতে বেশি।

সত্যি তাই হয় কিনা তা শুধু সময়ই বলতে পারবে।

আরো পড়তে পারেন: