মহাসড়কে নিরাপত্তা: 'বাচ্চাদের গলায় রাম দা ধরে বলে, যা আছে সব দিয়ে দে'

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, সানজানা চৌধুরী
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
সম্প্রতি সাতক্ষীরায় ভ্যান ছিনতাইয়ের সময় এক কিশোর চালকের ওপর হামলা চালিয়ে তার মাথা ফাটিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। গুরুতর আহত অবস্থায় শিশুটি এখন ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
এ ঘটনায় আবারও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশের মহাসড়কের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি।
যদিও মহাসড়কে এ ধরণের ঘটনা নতুন কিছু নয়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ যাবার পথে এমন দুর্বৃত্তের কবলে অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান হালিমা নাসরিন ও তার পরিবার।
মিসেস নাসরিন বিবিসি বাংলাকে জানান তার সেই রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা।
"আমি আমার স্বামী আর দুই বাচ্চা ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে যাচ্ছিলাম। রাত তখন সাড়ে ১২টা কি ১টার মতো হবে। তখন আমাদের গাড়িটা টঙ্গি আর গাজীপুরের মাঝামাঝি কোথাও জ্যামের মধ্যে পড়েছিল। ঠিক ওই সময় আমাদের সামনে থাকা একটা ট্রাক থেকে পাঁচ ছয়জন, রাম দা, চাপাতি নিয়ে আমার গাড়ি ঘিরে ধরে আর এলোপাথাড়ি কুপিয়ে কাঁচ ভেঙ্গে ফেলে।"
"এরপর আমার বাচ্চাদের গলায় রাম দা ধরে বলে যে যা আছে সব দিয়ে দে। আমি মুহূর্তেই সব দিয়ে বের করে দেই, যা কিছু ছিল। গয়না, ব্যাগ, মোবাইল সবকিছু। মাত্র তিন-চার মিনিটে সব কিছু হয়ে যায়। এতো ভয় পেয়েছিলাম যে এখনও রাতে ঘুমাতে পারিনা।"

ছবির উৎস, AFP
আরও পড়তে পারেন:
মিসেস নাসরিন এবং তার স্বামী সন্তানদের কেউ আজও সেই হামলার ভয়াবহতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন নি।
তার মতো যেকোনো সময় এমন হামলার আশঙ্কায় থাকেন চট্টগ্রামের বাসিন্দা ইসমত জাহানও।
পেশাগত কাজে তাকে প্রায়ই ঢাকায় আসতে হয়। কিন্তু মহাসড়কে একা চলাচলে তিনি প্রতিনিয়ত থাকেন আতঙ্কের মধ্যে।
ইসমত জাহান বলেন, "ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের পথে ছিনতাই/ডাকাতির ভয় তো আছেই। কিন্তু একটা মেয়ে হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় ভয় হল নিজের যে সম্মানটুকু আছে, সেটার যেন হানি না হয়।"
এজন্য মিস জাহান চেষ্টা করেন ভ্রমণের সময় নিজের সঙ্গে কাউকে সঙ্গে রাখতে।
আর একা ভ্রমণ করতে হলে তিনি কাছের মানুষদের কাছে নিজের লোকেশন শেয়ার করে রাখেন এবং মোবাইল ফোনে যুক্ত থাকেন। যেন বিপদ আপদে তার অবস্থান নিশ্চিত করা যায়।

ছবির উৎস, Getty Images
মহাসড়ক পুলিশ কী বলছে?
মহাসড়কে এই ধরনের সহিংসতার ঘটনা নিয়ে কোন জরিপ বা গবেষণা না হলেও পুলিশের দাবি এ ধরনের অপরাধ আগের চাইতে অনেকটাই কমে এসেছে।
কিন্তু আগের মতো পেশাদারি সংঘবদ্ধ দল আর নেই বলে জানান মহাসড়ক পুলিশের উপ-পরিদর্শক মোহাম্মদ আতিকুল ইসলাম।
"আগে যেটা ছিল যে পেশাদারি ডাকাতরা বড় বাসে বা মালবাহী ট্রাকগুলো আটকে লম্বা সময় নিয়ে লুটপাট করতো, মানুষের ওপর ছুরি মেরে দিতো, হত্যা করতো-এ ধরনের ঘটনা বছর দুয়েকের মধ্যে আর হয়নি।"- এমনটিই জানান মিস্টার ইসলাম।
তিনি বলেন, "পেশাদার ডাকাতি সংঘবদ্ধ গ্রুপ আর নাই। এগুলোকে ভেঙে ফেলা হয়েছে। কারণ আমরা এগুলোকে খুঁজে বের করে শাস্তি দিয়েছি।"
তবে এখনও কিছু চক্র সুযোগ বুঝে হামলা চালাচ্ছে বলে স্বীকার করেন আতিকুল ইসলাম।
"মাঝেমধ্যে যেটা হয় যে, রাস্তায় জ্যাম পড়লে হকারের বেশে এসে ছিনতাই করে। এগুলোও এখন নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করি কোথাও জ্যাম পড়লে সেখানে মোটর সাইকেল নিয়ে মুভমেন্ট করার, যেন কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে।"

ছবির উৎস, Getty Images
মহাসড়কে নিরাপত্তা কেন নিশ্চিত করা যায়নি?
সহিংসতা আগের চাইতে কমেছে বলে পুলিশের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করলেও সার্বিক নিরাপত্তা এখনও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছায়নি বলে মনে করেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
তার অভিযোগ, ঢাকার সঙ্গে সংযোগকৃত ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, নরসিংদী, জয়দেবপুর, এলেঙ্গা এমনকি সিলেট মহাসড়ক সাধারণ যাত্রীদের জন্য এখনও পুরোপুরি নিরাপদ হতে পারেনি।
বাংলাদেশের সড়ক, মহাসড়ক এবং পরিবহন ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজড সিস্টেমের মধ্যে আনা না গেলে পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হবে না বলে তিনি মনে করেন।
মিস্টার চৌধুরী বলেন, "পুলিশ শুধু অজুহাত দেয় যে তাদের জনবলের অভাব রয়েছে, তাদের হাইওয়ে পুলিশ নেই, জেলা পুলিশ নেই। কিন্তু উন্নত বিশ্বে দেখা যায়, তারা অল্প সংখ্যক জনবল দিয়ে, বিশাল সড়কের নেটওয়ার্ক তারা ডিজিটালি মনিটরিং করে আর এভাবেই তারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।"

ছবির উৎস, Getty Images
এছাড়া বাংলাদেশের যারা সড়ক নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত, বিশেষত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিআরটিএ- তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
এমন অবস্থায় সীমিত বাজেট ও সীমিত জনবল দিয়ে কিভাবে মহাসড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় সে বিষয়ে প্রশাসনকে দ্রুত উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
হাইওয়ে পুলিশের সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী , সারা দেশের সবকটি মহাসড়কে মোট ৯৯৩টি ঝুঁকিপূর্ণ স্পট রয়েছে।
এসব পয়েন্টে নিরাপত্তা বাড়াতে যে পরিমাণ প্রশিক্ষিত জনবল ও প্রযুক্তি সহায়তার প্রয়োজন তার যথেষ্ট অভাব রয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।








