'আগে চাকরী করছিলাম, কিন্তু পোষায় না'-ঢাকার একজন রিকশাচালক

রাস্তায় রিকশা চালক

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ঢাকার রাস্তায় রিকশা চালকদের লাইন
    • Author, মুন্নী আক্তার
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

দিনাজপুরের উত্তর হরিরামপুর সরকার পাড়ার বাসিন্দা আলিমুদ্দিন। জীবিকার জন্য টানা ১০ বছর ধরে রিক্সা চালান তিনি।

ঢাকার ধানমণ্ডি এলাকার এই রিকশাচালক বলেন, উপার্জন বেশি হওয়ায় চাকরী বাদ দিয়ে রিক্সা চালানোকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন তিনি।

ভবিষ্যতেও তিনি থাকতে চান এ পেশাতেই।

আলিমুদ্দিন বলেন, "২০০৩ সালে ঢাকায় আসি। আগে চাকরী করছিলাম। কিন্তু পোষায় না।"

"সংসারে খাওয়ার মানুষ ৪ জন। চাকরী করলে বেতন পাবো ৭-৮ হাজার টাকা। ওইটায় পোষায় না," বলেন তিনি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ঢাকা ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলস বলছে, আলিমুদ্দিনের মতো ঢাকার ২২ লাখ রিকশাচালকের মধ্যে ৮৫ ভাগই চান এই পেশায় থাকতে।

তবে তার মতো সবাই নন। গবেষণা বলছে, অন্তত ১৫ থেকে ২২ ভাগ রিকশাচালক এই পেশা বাদ দিয়ে অন্য পেশায় চলে যেতে চান।

কারা রিকশা চালান?

অনেকের কাছেই রিকশা চালানো মূল পেশা নয় অর্থাৎ তারা মূলত মৌসুমি রিকশাচালক।

গ্রামে কৃষিকাজের মৌসুম শেষ হলে কিংবা অন্য কাজ কমে গেলে দুই চার মাসের জন্য ঢাকায় চলে আসে এসব মানুষ।

আর তাৎক্ষণিক উপার্জনের পথ হিসেবে বেছে নেন রিক্সা চালানোকে।

এদের মধ্যে একটা বড় অংশ উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশুনা করেছেন।

রিকশাচালক রেজাউল ইসলাম বলেন, "আশা আছে ঢাকা শহরে থেকে কিছু সঞ্চয় করবো। তারপর গ্রামাঞ্চলে গিয়ে ওখানে একটা কর্মের ব্যবস্থা করে নেবো।"

ঢাকায় যন্ত্রচালিত রিক্সা না থাকায় এই পেশাটি পুরোপুরি কায়িক পরিশ্রম ভিত্তিক।

পাশাপাশি একজন রিকশাচালককে সর্বনিম্ন ৬ ঘণ্টা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৬ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়।

বিশ্রামের সুযোগ বলতে রয়েছে রাস্তার পাশের চা কিংবা মুদি দোকান, গ্যারেজ কিংবা বাসা।

আরো পড়তে পারেন:

রিকশায় এক চালক ঘুমাচ্ছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিশ্রামের জায়গার অভাবের কারণে রাস্তার পাশে রিকশা থামিয়ে বিশ্রাম করেন অনেকে

যেমন তাদের জীবনযাপন

বসবাসের জন্য জনপ্রতি বরাদ্দ মাত্র ২৮ বর্গফুট জায়গা। রান্নাঘর, গ্যাস সংযোগ কিংবা নিরাপদ খাবার পানির সরবরাহ থেকে বঞ্চিত বেশিরভাগ রিকশাচালক।

আর খাবারের জন্য নির্ভর করতে হয় অস্থায়ী খাবার দোকান ও ফুটপাতের হোটেল।

যার কারণে প্রায় ৯৪ ভাগ রিকশাচালক অসুস্থতায় ভোগেন।

যার মধ্যে রয়েছে জ্বর, কাশি ও ঠাণ্ডা, ব্যথা, দুর্বলতা, ডায়রিয়া এমনকি জন্ডিসের মতো পানি বাহিত রোগও।

গবেষকরা বলছেন, অশিক্ষা আর কুসংস্কারের কারণে প্রচলিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে যেতে চান না তারা।

সময় আর খরচ বাঁচানোর জন্য বেশিরভাগ সময়েই নির্ভর করেন হাতুড়ে চিকিৎসকের উপর।

তবে স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমিয়ে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা।

যার মধ্যে রয়েছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসা এবং পরিচয়পত্র প্রদান।

গবেষক এবং ট্রেড ইউনিয়ন ট্রেইনার ও কনসালটেন্ট খন্দকার আব্দুস সালাম বলেন, "সরকারি হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে রিকশাচালকদের স্বাস্থ্যসেবায় অগ্রাধিকার দিতে হবে।"

"তাদের যেহেতু ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই, তাই তাদের আলাদা পরিচয়পত্র দেয়া যেতে পারে যাতে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পরিচয়পত্র দেখিয়ে সেবা নেয়ার সুযোগ পায় তারা," তিনি বলেন।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

রাস্তায় কয়েকটি রিকশা

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, রাজধানীর অনেক রাস্তায় রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ

ঢাকা কি কখনো রিকশামুক্ত হবে?

যানজট থেকে মুক্তি পেতে রাজধানীতে বেশ কিছু এলাকা এবং সড়কও রয়েছে যেগুলোতে রিক্সা চলাচল নিষিদ্ধ।

ভবিষ্যতে ঢাকাকে সত্যি সত্যি রিকশামুক্ত করা হবে কিনা এমন প্রশ্নে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য শামসুন নাহার বলেন, "রিকশাচালকদের পুনর্বাসিত করার পদক্ষেপ ছাড়া এমন সিদ্ধান্তে যাবে না সরকার।"

এছাড়া রিকশাচালকদের পেশা পরিবর্তন বা পুনর্বাসন, সরকারের প্রচলিত বেশ কিছু কর্মসূচীর আওতায় সম্ভব বলে জানান বিলসের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং সাংসদ শিরিন আখতার।

তিনি বলেন, "সরকার বিভিন্ন ব্যাংক ও বিভিন্ন জায়গায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। যুবকদের প্রশিক্ষণের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। যুব কর্মসংস্থানের কর্মসূচী রয়েছে।"

"গ্রামে ফিরে যাওয়ার জন্য আমার বাড়ি আমার খামার কর্মসূচী রয়েছে। এছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় অনেক যুবক সমবায়ের মাধ্যমে কৃষিকাজে যাচ্ছে। তারা এগুলোতে যেতে পারে," তিনি বলেন।

রাজধানীতে চলাচলের জন্য গণ পরিবহন হিসেবে রিক্সার উপর নির্ভরশীল প্রায় ৬০ ভাগ মানুষ।