ডোনাল্ড ট্রাম্প কি সৌদি বাদশাহকে হুমকি দিলেন?

মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃবৃন্দের সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলাপে সৌদি বাদশাহ।

ছবির উৎস, Anadolu Agency

ছবির ক্যাপশান, মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃবৃন্দের সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলাপে সৌদি বাদশাহ।

ইতিহাস বলে রাজতন্ত্র, সিংহাসন, ক্ষমতা এই সবকিছুর সাথে আর একটি বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। আর তা হল চক্রান্ত।

সৌদি রাজপরিবারও তার ব্যতিক্রম নয়।

মধ্যপ্রাচ্যের সবচাইতে ক্ষমতাশালী পরিবারগুলোর একটি সৌদি রাজপরিবারের আলিশান প্রাসাদ, বিপুল সম্পদ আর জৌলুসের আড়ালে সেখানেও রয়েছে নানা সময়ের নানা ধরনের ষড়যন্ত্রের নীল নকশার ইতিহাস।

সৌদি আরবের ক্ষেত্রে আরেকটি বাড়তি ব্যাপার হল সেখানকার জটিল আঞ্চলিক রাজনীতি। ইয়েমেনে বিদ্রোহীদের সাথে সৌদি আরব জড়িয়ে রয়েছে তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধে।

ইয়েমেনের মতো না হলেও সিরিয়াতে আসাদ সরকারের বিরুদ্ধেও রয়েছে সৌদি আরবের ভূমিকা।

রয়েছে ইরানের সাথে দীর্ঘ দিনের বিবাদ। কাছাকাছি সময়ে নতুন করে কাতারের সাথে ভালো বিবাদে জড়িয়েছে সৌদি আরব।

দেশের ভেতরেও ক্ষমতায় যাওয়া বা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য রাজপরিবারের নানা সদস্যদের মধ্যে চক্রান্ত ও লড়াই সবসময় চলছে।

আরো পড়ুন:

সৌদি আরব সফরে বাদশাহ সালমানের সাথে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মেলানিয়া ট্রাম্প।

ছবির উৎস, Anadolu Agency

ছবির ক্যাপশান, সৌদি আরব সফরে বাদশাহ সালমানের সাথে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মেলানিয়া ট্রাম্প।

এর মধ্যে সবচাইতে কাছাকাছি সময়ের ঘটনা হল উচ্চ পর্যায়ের কয়েকজন রাজপুত্রের গ্রেফতার।

এত সব জটিল সমস্যায় থাকা একটি দেশ সহযোগিতার জন্য তার বন্ধু রাষ্ট্রের দিকে হাত বাড়াবে সেটিই স্বাভাবিক।

কিন্তু সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র যখন উল্টো জানিয়ে দেয় যে মার্কিন সেনাবাহিনী ছাড়া তাদের বাদশাহ'র কোন অস্তিত্বই থাকবে না তখন তা সৌদি আরবের জন্য উদ্বেগের বৈকি।

গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ সম্পর্কে সেরকমই এক বিবৃতি দিয়েছেন।

যাতে তিনি একদম সোজাসাপ্টা বলেছেন, মার্কিন সেনাবাহিনীর সমর্থন ছাড়া সৌদি রাজপরিবার দই সপ্তাহও টিকবে না।

সৌদি রাজপরিবারের জন্য মার্কিন সেনাবাহিনীর সহায়তা কি খুব জরুরী?

তেল সমৃদ্ধ সৌদি আরবের রাষ্ট্র হিসেবে প্রথম আবির্ভাব নব্বই বছর আগে।

ঐতিহাসিকভাবেই সৌদি রাজপরিবারের সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সম্পর্ক সবসময় আন্তরিক ছিল।

সৌদি আরব জ্বালানী তেলের সার্বক্ষণিক সরবরাহ নিশ্চিত করবে আর বিনিময়ে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে যুক্তরাষ্ট্র।

সৌদি আরবে কি পরিমাণে মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে তার কোন আনুষ্ঠানিক হিসাব নেই।

তবে গণমাধ্যমে বলা হয় আটশ পঞ্চাশ থেকে চার হাজারের মতো মার্কিন সৈন্য প্রশিক্ষণ ও সামরিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে সৌদি আরবে রয়েছে।

সৌদি রাজপরিবারের এক সদস্যর সাথে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ।

ছবির উৎস, JIM WATSON

ছবির ক্যাপশান, সৌদি রাজপরিবারের এক সদস্যর সাথে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ।

ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কৌশলগত সহায়তা দিচ্ছে কিছু মার্কিন সেনা।

সৌদি আরব সম্পর্কে দীর্ঘদিন যাবত সাংবাদিকতা করছেন এমন একজন প্রতিবেদক বিবিসিকে বলেছেন, সারা বিশ্বই আসলে জানে সৌদি রাজপরিবার সম্পর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিবৃতি আসলে সঠিক।

তবে কেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হঠাৎ এমন বিবৃতি দিলেন সেটি নিয়ে ভাবছিলেন তিনি।

তিনি বলছেন, "এখনকার পরিস্থিতিতে সৌদি আরব তার জাহাজের হাল ধরতে প্রধান মিত্রদের দিকেই তাকিয়ে থাকবে। আর সেই মিত্রদের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে এক নম্বরে। সিরিয়া ও ইরাকের যুদ্ধ ছাড়াও সৌদি আরব ইয়েমেনে সংঘর্ষে জড়িয়ে রয়েছে। যে সংঘর্ষ এত দীর্ঘ হবে এবং তার পরিণতি কি হবে সেটা তারা অনুমান করতে পারে নি।"

এই সাংবাদিক নিজের নাম প্রকাশে রাজি হননি। তবে তিনি মনে করছেন, ট্রাম্প সৌদি রাজপরিবারকে তার সংকুল পরিস্থিতি সম্পর্কে মনে করিয়ে দিচ্ছে।

রাজপরিবার কি অভ্যন্তরীণ কোন হুমকির মুখে?

এই সাংবাদিক বলছেন, সৌদি সিংহাসনের উত্তরাধিকারী যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন সালমান সেখানে খুব ক্ষমতাশালী হয়ে উঠছেন।

যেভাবে সেটি ঘটছে সেটিকে অনেকেই অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন।

যুবরাজ মুহাম্মদ যেন সৌদি আরবে রাতারাতি বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন। রাজপরিবারের জন্য সেটি ঝুঁকি তৈরি করেছে।

কেননা ভয়াবহ রক্ষণশীল এবং গোত্র প্রধান সৌদি সমাজ এসব পরিবর্তন সহজে গ্রহণ করবে না।

তিনি বলছেন, "কয়েক মাস আগে যুবরাজ মুহাম্মদের আদেশে রাজপরিবারের কয়েকজন সদস্যকে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু আসলে তিনি তার প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করেছেন।"

পৃথিবীতে মার্কিন অস্ত্রের সবচাইতে বড় ক্রেতা বর্তমানে সৌদি আরব।

ছবির উৎস, Anadolu Agency

ছবির ক্যাপশান, পৃথিবীতে মার্কিন অস্ত্রের সবচাইতে বড় ক্রেতা বর্তমানে সৌদি আরব।

রাজপরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা দেয়ার সক্ষমতা হয়ত সৌদি আরবের আছে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রাজপ্রাসাদের বাইরে গুলিবর্ষণের একটি ঘটনার পর রাজপরিবারের দুজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে নিরাপত্তার জন্য মার্কিন দূতাবাসে স্থানান্তর করা হয়।

এখানে উল্লেখ্য যে এপ্রিল মাসে গুলিবর্ষণের এই ঘটনার পর যুবরাজ মোহাম্মদকে দীর্ঘদিন জনসম্মুখে দেখা যায়নি।

সেসময় তাকে নিয়ে বেশ কিছু গুজবও ছড়িয়েছিল। তা একটি হল তিনি মারা গেছেন।

মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক একজন বিশ্লেষক আহমেদ কুরেসি বিবিসিকে বলেছেন, গত দশ বছর ধরে সৌদি আরব তাদের সামরিক সক্ষমতা অনেকটাই বাড়িয়েছে।

তাদের সেনাবাহিনী দুর্বল এই ধারনা এখন আর ঠিক নয়।

সৌদি আরবের জন্য কি তাহলে মার্কিন সামরিক সহায়তা দরকার?

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক ডঃ মেহদি হাসান বিবিসিকে বলেছেন, আমেরিকা সৌদি আরবকে সহায়তা করে কারণ হল তারা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র।

তিনি বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজপরিবারগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র যদি আর সাহায্য না করে তাহলে তাদের জন্য টিকে থাকা মুশকিল হবে।

কারণ ঐ অঞ্চলের জনগণ তখন গণতন্ত্রের দিকে ঝুঁকবে। সৌদি রাজতন্ত্রকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজেদের স্বার্থেই সমর্থন দেয়।

তবে ডঃ হাসান বলছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়ত রাজপরিবারকে সমর্থন দেয়ার বিনিময়ে কিছু চাইছেন।

সৌদি সিংহাসনের উত্তরাধিকারী যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমান

ছবির উৎস, Dan Kitwood

ছবির ক্যাপশান, সৌদি সিংহাসনের উত্তরাধিকারী যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমান সেখানে খুব ক্ষমতাশালী হয়ে উঠছেন।

তবে সৌদি আরবে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত শহিদ আমিন বলছেন, মার্কিন সহায়তা ছাড়া সৌদি রাজপরিবার টিকে থাকতে পারবে না তা ভ্রান্ত একটি ধারণা।

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে যে যুক্তি দিয়েছিলেন তার একটি হল অনেক দেশ মার্কিন বদান্যতার সুযোগ নিচ্ছে। সেসব দেশে মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকলেও তার প্রতিদান দেয়া হচ্ছে না।

শহিদ আমিন আরও বলছেন, "ট্রাম্প যে বিবৃতি দিয়েছেন তা রীতিমতো হুমকি। সৌদি রাজপরিবার যদি কোন সংকটে পরে তবে তারা যুক্তরাষ্ট্র নয় বরং পাকিস্তানের সাথে যোগাযোগ করবে।"

প্রতিদান বলতে কি বোঝানো হচ্ছে?

সৌদি আরবের কাছে থেকে প্রতিদান হিসেবে তিনি কি চান সেটি পরিষ্কার করেন নি ডোনাল্ড ট্রাম্প।

পৃথিবীতে মার্কিন অস্ত্রের সবচাইতে বড় ক্রেতা বর্তমানে সৌদি আরব।

কিন্তু সম্প্রতি তারা বিকল্পও যাচাই করতে শুরু করেছে।

রাশিয়ানদের অস্ত্র কেনা যায় কিনা সে ব্যাপারে তাদের সাথে যোগাযোগ হয়েছে।

অনেকেই মনে করছেন সৌদি আরবকে মার্কিন অস্ত্র কিনতে বাধ্য করাই ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিবৃতির অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত।

আরো পড়তে পারেন: