বিরাট কোহলি? স্টিভ স্মিথ? কেন উইলিয়ামসন? এই মুহূর্তে ক্রিকেটের সেরা ব্যাটসম্যান কে?

ভারতের বিরাট কোহলি, ইংল্যান্ডের জো রুট ও অস্ট্রেলিয়ার স্টিভ স্মিথ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতের বিরাট কোহলি, ইংল্যান্ডের জো রুট ও অস্ট্রেলিয়ার স্টিভ স্মিথ

সম্প্রতি ভারতের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের টেস্ট সিরিজে বর্তমান ক্রিকেটের সবচেয়ে প্রতিভাবান দু'জন ব্যাটসম্যান খেলেছেন।

সিরিজে ৫৯৩ রান করেন ভারতের অধিনায়ক বিরাট কোহলি।

টেস্ট সিরিজে কিছুটা ম্লান থাকলেও ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে পরপর দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি করে ইংল্যান্ডের ওয়ানডে সিরিজ জয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রাখেন ইংলিশ অধিনায়ক জো রুট।

বর্তমান ক্রিকেটে সেরা ব্যাটসম্যান আসলে কারা?

সাধারণত মোট রান বা ব্যাটিং গড়ের হিসেবে বিবেচনা করলে সহজেই এই তর্কের সমাধানে আসা যায়।

কিন্তু বর্তমানে অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফরম্যাট জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর সব ফরম্যাটে ব্যাটসম্যানের সার্বিক প্রভাব আর পারফরমেন্সের হিসেব করাটাই বেশি যুক্তিসঙ্গত।

বিবিসি'র ক্রিকেট বিশ্লেষক সায়মন হিউজ তাঁর পছন্দের সেরা পাঁচ ব্যাটসম্যানদের নিয়ে আলোচনা করেন।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ভারতের রোহিত শর্মা ব্যাট করছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, তালিকায় সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত নামটি হয়তো ভারতের এই ওপেনিং ব্যাটসম্যান রোহিত শর্মার

৫. রোহিত শর্মা (ভারত)

বয়স: ৩১; টেস্ট: ২৫; রান: ১৪৭৯; গড়:৩৯.৯৭

এই তালিকায় সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত নামটি হয়তো ভারতের এই ওপেনিং ব্যাটসম্যানেরই।

ভারতের টেস্ট দলে নিয়মিত সুযোগই পান না রোহিত শর্মা।

কিন্তু সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তাঁর মত ধারাবাহিকভাবে একের পর এক ম্যাচ জেতানো ইনিংস সাম্প্রতিক সময়ে খেলতে পারেননি কোনো ব্যাটসম্যানই।

ওয়ানডে ক্রিকেটে ১৮টি সেঞ্চুরি থাকলেও টেস্টে রোহিত শর্মার নামের পাশে শতকের সংখ্যা মাত্র ৩টি।

টেস্ট ক্রিকেটে নিজের প্রথম দুই ইনিংসেই দু'টি সেঞ্চুরি হাঁকান রোহিত। আর পরের ৪১ ইনিংস খেলে আসে তৃতীয় সেঞ্চুরিটি।

ওয়ানডেতে রোহিত শর্মার ডাবল সেঞ্চুরি আছে তিনটি; আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই অর্জন আর কোনো ক্রিকেটারের নেই।

রোহিত শর্মা ভারতে যতটা স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে রান করেন, ভারতের বাইরে ঠিক ততটাও করতে পারেন না।

ভারতের ভেতরে রোহিত শর্মার টেস্ট গড় ৮৫। আর ভারতের বাইরে ২৫। ক্রিজে সেট হয়ে যাওয়ার পর অলস শট খেলে উইকেট বিলিয়ে দেয়া আসার প্রবণতা রয়েছে তাঁর।

নিউজিল্যান্ডের কেইন উইলিয়ামসন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নিউজিল্যান্ডের কেইন উইলিয়ামসন

৪. কেইন উইলিয়ামসন (নিউজিল্যান্ড)

বয়স:২৮; টেস্ট:৬৫; রান:৫৩৩৮; গড়:৫০.৩৫

বর্তমান যুগের চার ব্যাটিং 'গ্যালাক্টিকো'র মধ্যে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত বলা যায় তাঁকে।

ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে রীতিমত বৈজ্ঞানিক ধারা মেনে চলেন উইলিয়ামসন। তিনি রক্ষণে যেমন মনোযোগী, আক্রমণেও তেমনই সুশৃঙ্খল।

সাধারণত ব্যাটিংয়ের সনাতন রীতি মেনে চলেন তিনি।

উইলিয়ামসন ফিল্ডারদের গ্যাপে শট খেলতে পছন্দ করেন। স্ট্রোক নেয়ার ক্ষেত্রে তাঁকে খুব একটা আগ্রাসী ভূমিকায় কখনোই দেখা যায় না।

তাঁর ব্যাটকে বিধ্বংসী অস্ত্র হিসেবে নয়, সূক্ষ্ম কাজ সম্পাদন করতে পারা যন্ত্র হিসেবে দেখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।

তবে প্রয়োজনের সময় ঠিকই বিধ্বংসী হয় ওঠার ক্ষমতা রাখেন উইলিয়ামসন। বিশেষ করে শর্ট বলকে দারুণ ধারাবাহিকতার সাথে মিড উইকেটে পুল করার সক্ষমতা রয়েছে তাঁর।

নিউজিল্যান্ডের কিংবদন্তী মার্টিন ক্রো'র ১৭ টেস্ট সেঞ্চুরির রেকর্ড এবছর ছাড়িয়ে গিয়েছেন উইলিয়ামসন।

টেস্টের পাশাপাশি ওয়ানডে ক্রিকেটেও দারুণ কার্যকর উইলিয়ামসন।

ওয়ানডেতে ৫ হাজারের বেশী রান তিনি করেছেন প্রায় ৪৭ গড়ে।

ইংল্যান্ডের জো রুট

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইংল্যান্ডের জো রুট

৩. জো রুট (ইংল্যান্ড)

বয়স:২৭; টেস্ট:৭৪; রান:৬২৭৯; গড়:৫১.০৪

মসৃণ ভঙ্গিমা, চমৎকার ব্যাকফুট গেম এবং ধারাবাহিকতা জো রুটের ব্যাটিংয়ের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

প্রথম বল থেকেই ঝুঁকিহীনভাবে রান করা শুরু করেন তিনি। ব্যাটিংয়ের সময় শরীরের ভারসাম্য দারুণভাবে ধরে রাখা রুট ব্যাকফুটের পাশাপাশি ফ্রন্টফুটেও নান্দনিক ব্যাটিং করেন।

কোহলির মত পাওয়ার প্লেয়ার নয়, রুটের ব্যাটিংয়ের মূল অনুষঙ্গ টাইমিং।

অফ স্ট্যাম্পের ওপর খেলেন বলে অনেক সময়ই লেগ বিফোর উইকেট হয় আউট হন রুট।

তবে রুটের প্রধান সমস্যা চমৎকার ভাবে শুরু করেও শেষপর্যন্ত বড় ইনিংসে খেলতে না পারা।

ওভালে ভারতের সাথে তাঁর সেঞ্চুরিটি ১৩ মাসের মধ্যে তাঁর একমাত্র টেস্ট সেঞ্চুরি। এর মধ্যে খেলা টেস্টে ৯টি অর্ধশতক রয়েছে তাঁর।

ইনিংসকে অর্ধশতক থেকে শতকে রূপান্তরের হার খুব একটা ভাল নয় রুটের - ২৫%। ৪১টি ফিফটি ও ১৪টি সেঞ্চুরি করা রুটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা মনে করা হয় তাঁর ফিটনেস।

তাঁর শারীরিক শক্তি বা স্ট্যামিনা কোহলি বা স্টিভ স্মিথের মত নয়, যে কারণে ঐ দু'জনের চেয়ে তিনি পিছিয়ে আছেন বলে মনে করা হয়।

অস্ট্রেলিয়ার স্টিভ স্মিথ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, অস্ট্রেলিয়ার স্টিভ স্মিথ

. স্টিভ স্মিথ (অস্ট্রেলিয়া)

বয়স:২৯; টেস্ট:৬৪; রান:৬১৯৯; গড়:৬১.৩৭

স্মিথের প্রচলিত ধারার বিপরীতমুখী শাফলিং ব্যাটিং টেকনিক নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু তাঁর পদ্ধতি যে যথেষ্ট কার্যকর তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

২০১৭-১৮ সালের অ্যাশেজ সিরিজের সময় তাঁর ব্যাটিং গড় ছিল ৬৩.৭৫ , টেস্ট ইতিহাসে স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের পর যা সবচেয়ে বেশি (অন্তত ২০বার বা তার চেয়ে বেশি ইনিংস ব্যাট করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে)।

অফ স্টাম্পে গার্ড নেয়া ব্যাটসম্যানদের পথিকৃতদের মধ্যে একজন স্মিথ (সাধারণত ব্যাটসম্যানরা লেগ বা মিডল স্ট্যাম্পে গার্ড নেয়)। এর ফলে ফ্রন্টফুটে খেলে পিচ থেকে বের হয়ে এসে এলবিডব্লিউ হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমিয়ে আনেন তিনি।

মনে হতে পারে এভাবে ব্যাট করার কারণে তাঁর উইকেট অনেকটাই অরক্ষিত হয়ে যায়; তবে এই পদ্ধতি তাঁর পছন্দের লেগ সাইডে রান করার জন্য তাঁকে সবসময় সুযোগ করে দেয়।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে শেষ চার বছরে তাঁর গড় ৯৬, অস্ট্রেলিয়ার বাইরে যা ৫৭।

মাঝেমধ্যে 'গালি' পজিশনে বল স্লাইস করে আউট হওয়ার প্রবণতা বাদে স্মিথের ব্যাটিংয়ে বড় কোনো খুঁত নেই; তবে বাঁহাতি স্পিনারদের বলে বেশিবার আউট হতে দেখা গেছে তাঁকে।

কোহলির পর অর্ধশতককে শতকে পরিণত করার হার সবচেয়ে বেশি স্মিথের; ৪৯%।

এপিল মাসে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হওয়ার পর ২০১৯ বিশ্বকাপের আগে পুরো ফর্মে ফিরে আসাই স্মিথের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

ভারতের বিরাট কোহলি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতের বিরাট কোহলি

১. বিরাট কোহলি (ভারত)

বয়স:২৯; টেস্ট:৭১; রান:৬১৪৭; গড়:৫৩.৯২

দেশের মাটিতে খেলা হলে কোহলি নিশ্চিতভাবে রান করবেন। তাঁর ব্যাটিংয়ে দৃঢ়প্রত্যয় আর আত্মবিশ্বাসের ছাপটা অধিনায়কত্ব পাওয়ার পর আরো বেশি নজর কেড়েছে।

মাঠে তাঁর আচরণে তাঁকে কলহপ্রিয় - এমনকি কখনো উস্কানিমূলকও - বলে মনে করা স্বাভাবিক।

অদম্য স্পৃহা ও সর্বোচ্চ ফিটনেস লেভেলের একজন খেলোয়াড় তিনি।

ওয়ানডেতে তাঁর ব্যাটিং গড় ৫৮'র বেশি; আর টি টোয়েন্টিতে তা প্রায় ৪৯।

তাঁর প্রজন্মের সবচেয়ে কার্যকর অল-রাউন্ড ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন কোহলি। তাঁর বিরুদ্ধে বল করা যেকোনো বোলারের জন্যই ভীতিকর একটি বিষয়।

অসাধারণ ব্যাটিংয়ের মাধ্যমে নিজেকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া কোহলি এখনো তাঁর পারফরমেন্সের সর্বোচ্চ শিখর স্পর্শ করেননি বলে মনে করেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।