মার্কিন দূতাবাস এখন জেরুসালেমে, বিপদ কোথায়?

জেরুজালেম

ছবির উৎস, AHMAD GHARABLI

ছবির ক্যাপশান, জেরুসালেম - যে শহরকে ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনি - দুপক্ষই তাদের রাজধানী হিসাবে বিবেচনা করে

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত বছর ডিসেম্বরে জেরুসালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেন। একইসাথে তিনি ঘোষণা করেছিলেন - আমেরিকার দূতাবাস তেল আবিব থেকে সরিয়ে জেরুসালেমে নিয়ে আসা হবে।

পাঁচ মাসের মাথায় আজ (সোমবার) সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

জেরুসালেমে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন দূতাবাস উদ্বোধন করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার মেয়ে ইভাংকা ট্রাম্প এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারকে ইসরায়েল পাঠিয়েছেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভিডিও লিংকে যোগ দেবেন মি. ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে শুধুমাত্র ফিলিস্তিনরাই আপত্তি করেনি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সিংহভাগই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

তাদের বক্তব্য - জেরুসালেমের সার্বভৌমত্ব-বিতর্কের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই শহরকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া ঠিক

এ কারণে, ইসরায়েলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে এমন সব দেশই এখনও তেল আবিবেই তাদের দূতাবাস রেখে দিয়েছে।

কিন্তু অন্যদের উপেক্ষা করে এতদিনের সেই নীতি এখন ভাঙছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। একাই তিনি তার দেশের দূতাবাস জেরুসালেমে স্থানান্তর করছেন।

স্বভাবতই ইসরায়েল এতে সন্তুষ্ট, কিন্তু ফিলিস্তিনিরা সহ পুরো আরব বিশ্বের নেতারাই সাবধান করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়াকেই নস্যাৎ করবে।

এমনকি আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব বলেছে - প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্য চরম এক উস্কানি।

আজ (সোমবার) মার্কিন দূতাবাস উদ্বোধনের দিনেই গাজা-ইসরায়েল সীমান্তে ব্যাপক বিক্ষোভ করছে ফিলিস্তিনিরা। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা বলছেন, ইসরায়েলি সৈন্যরা ৩৭ জন ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা করেছে। আহত হয়েছে আরো অনেকে।

যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে উল্লসিত ইসরায়েলিরা, কিন্তু ক্ষুব্ধ ফিলিস্তিনিরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে উল্লসিত ইসরায়েলিরা, কিন্তু ক্ষুব্ধ ফিলিস্তিনিরা

এই সিদ্ধান্তের ঝুঁকি কোথায় ?

প্রাচীন এই শহরটি ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি বিরোধের একদম কেন্দ্রে।

শুধু এই শহরটি নিয়ে দশকের পর দশক ধরে থেকে থেকেই সহিংসতা হয়েছে, প্রচুর রক্তপাত হয়েছে।

বিবিসির মধ্যপ্রাচ্য সংবাদদাতা ইয়োল্যান্ডে নেল বলছেন, জেরুসালেমের অবস্থার যে কোনো পরিবর্তনের প্রভাব নানাবিধ এবং তা যে কোনো সময় আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে পারে।

প্রথম কথা, ধর্মীয় দিক থেকে জেরুসালেম বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর একটি শহর।

ইসলাম, ইহুদি এবং খ্রিস্টান ধর্মের সবচেয়ে পবিত্র ধর্মীয় স্থাপনার অনেকগুলোই এই শহরে।

এছাড়া, এর রাজনৈতিক গুরুত্ব হয়তো এখন ধর্মীয় গুরুত্বকেও ছাপিয়ে গেছে।

ইসরায়েল বলে "অভিন্ন জেরুসালেম তাদের চিরদিনের রাজধানী।" আসলে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই ইসরায়েল জেরুসালেমের পশ্চিমাংশে দেশের সংসদ ভবন স্থাপন করে।

১৯৬৭ সালে আরবদের সাথে যুদ্ধে জিতে ইসরায়েল পূর্ব জেরুসালেমও দখল করে নেয় এবং পুরো জেরুসালেম শহরটিকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের অংশ হিসাবে ঘোষণা করে।

মি ট্রাম্পের মেয়ে ইভাংকা ট্রাম্প এবং জামতা জ্যারেড কুশনারকে (ডানে) বেই গুইরান বিমানবন্দরে স্বাগত জানাচ্ছেন ইসরায়েলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড ফ্রিডম্যান (বায়ে)

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, মি ট্রাম্পের মেয়ে ইভাংকা ট্রাম্প এবং জামতা জ্যারেড কুশনারকে (ডানে) বেই গুইরান বিমানবন্দরে স্বাগত জানাচ্ছেন ইসরায়েলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড ফ্রিডম্যান (বায়ে)

ফিলিস্তিনিরা কি বলে?

ফিলিস্তিনিরা কোনোদিনই পূর্ব জেরুসালেমের দখল মেনে নেয়নি। তারা সবসময় বলে আসছে পূর্ব জেরুজালেম হবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী।

ফিলিস্তিনি নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, জেরুসালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাকে কবর দিয়ে দেওয়া। তাদের কথা, জেরুজালেম তাদের না থাকলে, কোনো টেকসই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন কখনই সম্ভব হবেনা।

যদিও গত দশকগুলোতে পূর্ব জেরুসালেমের বহু জায়গায় ইহুদি বসতি বানিয়েছে, কিন্তু তারপরও এখানকার সিংহভাগ বাসিন্দা ফিলিস্তিনি যারা শত শত বছর ধরেই এই শহরে বসবাস করছেন।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও মেনে নিয়েছে, জেরুসালেম শহরের মর্যাদা, মালিকানা নির্ধারিত হবে ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে চূড়ান্ত শান্তি রফার অংশ হিসাবে। জাতিসংঘের প্রস্তাবে তা লিখিত আকারে রয়েছে।

ফলে এখন পর্যন্ত কোনো দেশই জেরুসালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেয়নি।

সমস্ত বিদেশি দূতাবাস তেল আবিবে, যদিও জেরুসালেমে অনেকে দেশের কনস্যুলেট রয়েছে।

এতদিনের সেই নীতি এখন ভাঙছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

মি ট্রাম্পের ছবি সম্বলিত ইহুদি টুপি বিক্রি হচ্ছে জেরুসালেমে

ছবির উৎস, RAFFI BERG

ছবির ক্যাপশান, মি ট্রাম্পের ছবি সম্বলিত ইহুদি টুপি বিক্রি হচ্ছে জেরুসালেমে

ট্রাম্প কেন এই ঝুঁকি তিনি নিচ্ছেন?

ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অকুণ্ঠ সমর্থন নতুন কোনো বিষয় নয়।

বিশেষ করে ১৯৭৩ সালে আরব ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে এই ইহুদি রাষ্ট্রকে যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক সাহায্য দিয়ে আসছে তা অন্য কোনো দেশের সাথেই তুলনীয় নয়।

তবে জেরুসালেমকে রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, 'প্রেসিডেন্ট নেহাতই একটি বাস্তবতা মেনে নিচ্ছেন'

তারা বলার চেষ্টা করছেন - জেরুসালেমের সীমানা নিয়ে ইসরায়েলের অবস্থান এখনও আমেরিকা মেনে নিচ্ছেনা, সেটা ঠিক হবে চূড়ান্ত শান্তি মীমাংসায়।

ফিলিস্তিনিরা কোনোভাবেই তাতে ভরসা পাচ্ছেনা। তাদের কথা, মি ট্রাম্প জেরুসালেমে ইসরায়েলের তৈরি ডজন ডজন অবৈধ ইহুদি বসতিগুলোতে স্বীকৃতি দিয়ে দিচ্ছেন।

ওয়াশিংটনে বিবিসির সংবাদদাতা বারবারা প্লেট-উশেরও বলছেন, নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইহুদিদের সমর্থন পেতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন - জিতলে তিনি জেরুসালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেবেন এবং মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর করবেন। তিনি সেই প্রতিশ্রুতি রাখছেন।

তবে এই স্বীকৃতি দিয়ে মি ট্রাম্প যে পরে প্রতিদান হিসাবে শান্তি চুক্তি ত্বরান্বিত করতে ইসরায়েলের ওপর চাপ দেবেন, তার কোনো ইঙ্গিতই নেই।