ইতিহাসের সাক্ষী
১৯৭৭ সালের বসন্তকালে পাকিস্তানের সরকার সেদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য এ্যালকোহল বা মদ্যপান নিষিদ্ধ করেছিল।
সেই নিষেধাজ্ঞার আগের ও পরের জীবনযাত্রা নিয়ে একজন পাকিস্তানীর সাথে কথা বলেছেন বিবিসির শুমায়লা জাফরি। ১৯৭৭ সালের মার্চ মাসে তখন পাকিস্তানের বড় বড় শহরগুলোতে তখন প্রায়ই বিক্ষোভ মিছিল হচ্ছে।
পাকিস্তানের বিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক পরিস্থিতি দিনকে দিন যেন আরো খারাপ হচ্ছে। দেশটির বিরোধীদলগুলোর মধ্যে ক্ষোভ ক্রমাগত আরো বাড়ছে। প্রতিনিয়তই মিছিল হচ্ছে, হরতাল হচ্ছে, প্রায়ই এসব বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে জনতার সংঘর্ষ হচ্ছে - এবং নিরাপত্তা বাহিনী শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য গুলি চালাতে দ্বিধা করছে না।
এতে নিহত হয়েছে অনেকে, আহত হয়েছে শত শত লোক, আর গ্রেফতার হয়েছে হাজার হাজার লোক।

ছবির উৎস,
এসব বিক্ষোভ করছিল ইসলামপন্থী দলগুলো এবং তাদের মূল লক্ষ্য ছিলেন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো।
মি. ভুট্টো তার ধর্মনিরপেক্ষ এবং সমাজতন্ত্রী রাজনীতির জন্য রক্ষণশীলদের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছিলেন। তারা মি. ভুট্টোর বিরুদ্ধে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ আনে এবং তার পদত্যাগের দাবি জানায়। কিন্তু মি. ভুট্টো সব অভিযোগই অস্বীকার করেন।
মি. ভুট্টো তার সরকারকে রক্ষার মরিয়া চেষ্টার অংশ হিসেবে, এবং গোঁড়া মুসলমানদের সমর্থন পাবার আশায় - মি ভুট্টো মদ্যপানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেন।
সে সময় করাচি শহরে রাশিয়ান দূতাবাসে চাকরি করতে শাহেদ হোসেন। তিনি নিয়মিত মদ্যপান করতেন। তিনি বলছিলেন নিষেধাজ্ঞার খবর শুনে তার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। কারণ মি. ভুট্টো নিজেও প্রচুর মদ্যপান করতেন । বলা যায়, মাছ যেমন পানিতে ডুবে থাকে তিনি তেমনি মদে ডুবে থাকতেন। আর সেই তিনিই কিনা মদ নিষিদ্ধ করলেন।

ছবির উৎস, Getty
মদ্যপানের ওপর এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়লেন পাকিস্তানের ৯৭ শতাংশ মানুষ - যারা মুসলিম।
কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞার আগ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের সময় মদ্যপান ছিল খুবই সাধারণ ব্যাপার। এমনকি পাকিস্তান যখন ১৯৫৬ সালে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হলো - তখনো মদ্যপান বৈধ ছিল।
শাহেদ হোসেন বলছিলেন, করাচিতে কখনো মদ্যপান নিয়ে কোন রকম গোপনীয়তা বা নিষেধাজ্ঞা ছিল না । সে সময় করাচিতে অনেক বার বা পানশালা ছিল। মদ্যপান সেসময় সংস্কৃতিরই একটা অংশ ছিল। কেউ এটা নিয়ে কিছুই মনে করতো না। এমনকি মহিলারাও মদ্যপান করতেন। এটা নিয়ে কারো কোন সংস্কার বা ঢাকঢাক-গুড়গুড় ছিল না।
আসলে করাচি ছিল বহুমত-বহুপথের একটা শহর। এমনকি সমাজের অপেক্ষাকৃত নিম্নশ্রেণীর লোকেরাও মদ্যপান করতেন।
সমাজের উচ্চশ্রেণীর পার্টিগুলোতে ওয়াইন পরিবেশন করাটা ছিল একটা আবশ্যিক ব্যাপার।
এমন কি যারা মদ্যপান করতেন না -তারাও ঔপনিবেশিক শাসনের ঐতিহ্যের একটা অংশ হিসেবে মদ পরিবেশন করাটাকে মেনে নিয়েছিলেন।
পাকিস্তানের প্রগতিশীল বামপন্থীদের চোখে মদ্যপানের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা ছিল এক চরম আঘাত। কারণ তারাই ছিলেন মি. ভুট্টোর সবচেয়ে জোরদার সমর্থক।

ছবির উৎস, PA
শাহেদ হোসেন বিশ্বাস করেন, এ্যালকোহল নিষিদ্ধ করাটা পাকিস্তানে কখনোই জনপ্রিয় গণদাবি ছিল না। এটা ছিল ভুট্টোর একটা রাজনৈতিক চাল - যাতে কোন কাজ হয় নি। মদ নিষিদ্ধ করে তিনি রেহাই পান নি।
মদ্যপান নিষিদ্ধ করার দু'মাস পরই ভু্টোর সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করলেন সামরিক বাহিনীর প্রধান জিয়াউল হক।
মদ্যপান একটা অপরাধে পরিণত হলেও তা কখনোই সম্পূর্ণ দূর হলো না। চোরাই মদ বিক্রি ভীষণভাবে বেড়ে গেল, এবং কর্তৃপক্ষকে ঘুষ দিয়ে অনেকেই এ ব্যবসা চালিয়ে যেতে লাগলো।
পাকিস্তানের সমাজে একটা স্পষ্ট বিভক্তি দেখা গেল। যারা সামরিক কর্মকর্তাদের আবাসিক এলাকা, ক্লিফটন বা অন্যান্য অভিজাত এলাকায় থাকতেন - তারা তাদের বাড়িতেই মদ খেতে পারতেন। কিন্তু যেসব লোকেরা বস্তিতে থাকেন, তারা যে মদ কিনতে পেতেন - তা অনেক সময়ই ঠিকমত চোলাই করা হয় না, এবং এরকম মদ খেয়ে অনেকে মারা গেছেন, অনেকে অন্ধ হয়ে গেছেন।
করাচির বারগুলো এখন অলংকার বা অন্য কোন পণ্যের দোকানে পরিণত হলো।

ছবির উৎস, epa
পাকিস্তানের এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর যাদের জন্ম হয়েছে - সেই প্রজন্ম তাদের সংস্কৃতির অংশ হেসেবে মদ্যপানকে গ্রহণ করতে আগ্রহী নয়।
এমনকি শাহেদ হোসেনের নিজের পরিবারের চোখেও এখন মদ্যপান হচ্ছে এমন এক পাপ - যা ক্ষমার অযোগ্য।
"আমি আমার সবচেয়ে ছোট মেয়েকে বলেছি যে আমি আবার ঘরের মধ্যে মদ্যপান শুরু করতে চাই , কারণ আমার একা লাগে। সে বললো, সে আমাকে এটা করতে দেবে না।"
"আমার স্ত্রীও ধর্মপ্রাণ মহিলা। আমি কখনো তার সামনে মদ্যপান করি নি। কিন্তু আমার ধারণা সে জানতো যে আমি পান করি, কিন্তু এ নিয়ে কখনো কোন কথা বলে নি। কাজেই আমার স্ত্রীকে জীবনে কখনোই বলা হয় নি, যে আমি মদ্যপান করি। সে মারা গেছে। এ নিয়ে আমার পাপবোধ আছে, আমি নিজেকে অপরাধী মনে করি।"
পাকিস্তানে মদ্যপানের ওপর নিষেধাজ্ঞা এখনো অব্যাহত আছে। শাহেদ হোসেন এখনো করাচিতেই বাস করেন।
তবে তিনি এখন আর মদ্যপান করেন না।