ইতিহাসের সাক্ষী

পাঁচ বছর আগে ২০১১ সালে মধ্যপ্রাচ্যর বিভিন্ন দেশে শুরু হয়েছিল আরব বসন্ত নামে গণতান্ত্রিক আন্দোলন। আজকের যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার সংকটের মূলও নিহিত ওই আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই।

প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদের বিরুদ্ধে যে গণবিক্ষোভ শুরু হয়েছিল ২০১১র মার্চ মাসে - তাই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় সশস্ত্র ও রক্তাক্ত বিদ্রোহ এবং গৃহযুদ্ধে ।

দামেস্কের প্রথম বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন রামি জারা। তিনি তখন তার স্ত্রী ও কন্যা নিয়ে থাকতেন দামেস্কে। কাজ করতেন একটি কোম্পানির ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট কনসালট্যান্ট হিসেবে।

তিনি বলছিলেন, "সিরিয়ায় যে কোন পরিবর্তন আসবে বা কেউ কোনদিন সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বলবে - এটা ছিল একটা আকাশকুসুম কল্পনা। এখানে সরকার - আক্ষরিক অর্থেই যে কোন কিছু করতে পারে। কাউকে অপহরণ করতে পারে, অত্যাচার করতে পারে, মেরে ফেলতে পারে। কেউ এর কোন প্রতিবাদ করতে পারবে না। এটা অসম্ভব, এটা হতেই পারে না।"

এমনই ছিল তখন সিরিয়ায় বাশার আসাদের শাসনকাল।

"সিরিয়ায় জীবন ছিল খুবই আবদ্ধ। বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো সবকিছুই ভালোভাবে চলছে। কিন্তু তার আড়ালে যা চলছিলো তা খুবই বিপজ্জনক এবং ভয়ঙ্কর। সারা দেশের ওপর গোয়েন্দাদের ছিল কঠোর নিয়ন্ত্রণ। লোকে এমন কি প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্ট আসাদের বা তার পিতার নাম উচ্চারণ করতেও ভয় পেতো। ভয় পেতো সরকারের সাথে তাদের কোন সমস্যার কথা বলতেও। সিরিয়ায় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রই ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত।"

syria_protest_in_derra_2011

ছবির উৎস, bbc

ছবির ক্যাপশান, সিরিয়ার দেরা শহরে বিক্ষোভকারীরা, মার্চ ২০১১

কিন্তু যখন মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ শুরু হলো, তখন বিভিন্ন দেশে স্বৈরশাসক এবং তাদের একনায়কতান্ত্রিক শাসনের পতন হতে লাগলো। রামির মনে হলো হয়তো সিরিয়াতেও পরিবর্তন আসতে পারে।

"আমরা এমন একটা কিছু আশা করতে শুরু করেছিলাম। বিক্ষোভ যখন ছড়িয়ে পড়তে লাগলো, তখন এখানেও কেউ কেউ লিফলেট ছড়াতে থাকলো। তারা রাস্তায় লিফলেট ছড়িয়ে দিয়েই পালিয়ে যেতো। কেউ কেউ এসে দরজায় টোকা দিতো। দরজার ফুটো দিয়ে কাগজের টুকরো ফেলে দিয়ে যেতো। তাতে লেখা থাকতো , 'আমরা জনগণের অধিকার দাবি করছি। আপনার 'না' বলার অধিকার আছে।"

"আমি প্রথম যে বিক্ষোভটিতে অংশ নিয়েছিলাম, তা হয়েছিল মার্চের ১৮ তারিখে। দামেস্ক শহরের পুরোনো এলাকায় প্রাচীন উমাইয়াদ মসজিদে ওই বিক্ষোভ হয়েছিল। কারণটা ছিল - মসজিদ হচ্ছে একমাত্র জায়গা - যেখানে বিপুল সংখ্যায় লোক জমায়েত হবার সুযোগ ছিল - যা নিয়ে সরকার প্রশ্ন তুলতো না।"

শহরের কোন খোলা জায়গায় জনসমাবেশ করা সিরিয়াতে একেবারেই সম্ভব ছিল না। সে কারণেই মসজিদে ওই বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়েছিল। তবে মসজিদে যাবার পথে অনেকগুলো চেকপয়েন্ট বসানো হয়েছিল। কারণ সরকারের কাছে খবর ছিল যে সেদিন প্রতিবাদ বিক্ষোভের ডাক দেয়া হয়েছে।

রামিকে মসজিদে যাবার পথে অন্তত ছ'টি চেক পয়েন্ট-এ থামানো হয়েছিল।

"মসজিদে ঢোকার পর , শুনলাম ইমাম বলছেন - বিক্ষোভের যে ডাক দেয়া হয়েছে সেটা একটা ষড়যন্ত্র - এবং এতে কেউ যেন সাড়া না দেয়। আমি আমার চারদিকে তাকালাম। মসজিদের ভেতরে যারা কার্পেটে বসে ছিল, তারা এসব কথার সময় হাই তুলছিল। আমার মনে হলো হয়তো কিছুই ঘটবে না। আমি সেই মুহুর্তেই সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি উঠে দাঁড়াবো না এবং কিছুই বলবো না। তাতে আমি সবার কাছে ধরা পড়ে যাবো। এমনও তো হতে পারে যে, এখানে যারা উপস্থিত - তারা সবাই আসাদের সমর্থক।"

syria protest

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, সিরিয়ার নানা শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল সে সময়

"কিন্তু ইমামের বক্তৃতা যখন প্রায় শেষের দিকে, তখন একজন বৃদ্ধ লোক সিঁড়ি দিয়ে উঠে দৌড়ে গেলেন ইমামের দিকে। তার পর জনতার দিকে ফিরে চিৎকার করে বলতে লাগলেন , আমার সন্তানরা এখন কারাবন্দী, আমি তাদের মুক্তি চাই। তিনি আবার বললেন 'আমি তাদের মুক্তি চাই। আমি দেখলাম, আমার চার পাশে হঠাত যেন একটা নিরবতা নেমে এলো। আর তার পর - মসজিদের একেবারে পেছন দিকে থাকা কয়েকজন লোক উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে শুরু করলো।"

"মসজিদের ভেতরে ছিল প্রায় এক হাজার লোক। তারা সবাই 'স্বাধীনতা, মুক্তি' বলে চিৎকার করতে শুরু করলো।"

রামি সেদিন তার মোবাইল ফোনে সেই মসজিদের ভেতরে দেয়া জনতার শ্লোগান খানিকটা রেকর্ড করে রেখেছিলেন।

"আমরা জানতাম - এটা ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক এক পরিস্থিতি। জানতাম যে এর শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদন্ড। কিন্তু ওই কয়েকটা মুহুর্ত - যখন আমরা সেই বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করতে পেরেছিলাম - সেটা ছিল এমন একটা অনুভূতি, যেন আমার সত্ত্বা আমার এই দেহ ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। আমি শেষ পর্যন্ত এটা বলতে পারলাম যে - 'যা হচ্ছে আমি তা মানি না'। আমি দেখলাম যে আমার চারপাশের লোকেরাও সবাই বলছে 'মানি না', 'মানি না'।"

"সেটা এক অন্যরকম অনুভুতি। বাঁধ ভেঙে যাবার মুহুর্ত । একজন লোক বলছিল, আমি যখন 'মুক্তি চাই' বলে চিৎকার করলাম - তখনই আমি প্রথম অনুভব করলাম যে আমার মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ জেগে উঠেছে। এর কারণ কি? কারণ হলো - অনেক বছর ধরেই সিরিয়ানরা মাথা উঁচু করে চলতে পারে নি।কোন কিছু বলার বা প্রকাশ করার অধিকার তাদের ছিল না।"

ইদলিব শহরে একটি বিক্ষোভ

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, ইদলিব শহরে একটি বিক্ষোভ

"কিন্তু এর শেষটাও এসেছিল খুব দ্রুত। সরকার চরম শক্তি প্রয়োগ করে পাল্টা ব্যবস্থা নিল। দশ মিনিটের মধ্যে মসজিদের বাইরে থাকা লোকেরা পাল্টা আক্রমণ করলো। তাদের সংখ্যা ছিল বিক্ষোভকারীদের চাইতেও অনেক বেশি । তারা লোকজনকে গ্রেফতার করা শুরু করলো, এবং তাদের টেনে নিয়ে গিয়ে বাসে তুলতে শুরু করলো। পুরো এলাকাটায় একটা রক্তাক্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো।"

"আমরা মসজিদের বাইরে এসে আহমদিয়া মার্কেট নামে একটি বাজারের মধ্যে দিয়ে নতুন শহরের দিকে দৌড়তে শুরু করলাম। রাস্তার ঠিক উল্টো দিকেই ছিল আমার এক সম্পর্কীয় ভাইয়ের একটি দোকান। আমি তার দোকানে ঢুকতেই সে আমাকে বললো, তুমি কি জানো আরো কি হয়েছে? দেরা শহরের লোকেরাও জেগে উঠেছে - তারার বিক্ষোভ করছে।"

দেরা শহরের ওই সংঘর্ষে নিহত হয় তিন জন, আহত হয় অনেকে।

"তখনই আমরা জানতে পারলাম অন্য শহরের লোকেরাও বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছে। এই ভেবে স্বস্তি বোধ করলাম যে আমাদের সাথে আরো লোক আছে - যারা তাদের অধিকারের জন্য রুখে দাঁড়িয়েছে।"

"আমাকে ২৫শে মার্চ গ্রেফতার করা হলো। আমার ওপর অত্যাচার চালানো হলো, লাঠি দিয়ে পেটানো হলো। তিন দিন ঘুমাতে দেয়া হলো না। আমাকে বসতে দেয়া হয় নি , সারাক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখা হতো। আমার এক বন্ধুও বন্দী ছিল, তাকে ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়। ওখানকার পরিস্তিতি ছিল নারকীয়। আমি শুনতে পাচ্ছিলাম লোকের চিৎকার। এক এক সময় আমি নিজেও চিৎকার করছিলাম।"

রামি শেষ পর্যন্ত ছাড়া পেয়েছিলেন । তবে তার আগে তাকে একটা মিথ্যা দলিলে স্বাক্ষর করানো হয় । যাতে বলা ছিল - তিনি একজন বিদেশী গুপ্তচর। কিন্তু এর পরও রামি থেমে যান নি।

হামা শহরে বিক্ষোভে সহিংসতা

ছবির উৎস, AP

ছবির ক্যাপশান, হামা শহরে বিক্ষোভে সহিংসতা

সিরিয়ায়ে এর পরের মাসগুলোতে অসংখ্য শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সহিংস পন্থায় দমন করে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সরকার।

হাজার হাজার লোককে গ্রেফতার করা হয় নির্যাতন করা হয়। অনেকে নিখোঁজ হয়।

এর কিছকাল পর সেনাবাহিনীর কিচু নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তা সামরিক বাহিনী ছেড়ে দিয়ে এক সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন। এর পর থেকেই দেশটিতে যুদ্ধ চলছে। এই বিশৃঙখলার মধ্যে ইসলামি চরমপন্থীরা বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয়, এক স্বৈরতন্ত্র এবং সহিংসতার রাজত্ব কায়েম করে।

এখানে বিদেশী শক্তিগুলোও হস্তক্ষেপ করেছে, তবে বাশার আসাদ এখনো ক্ষমতায়।

রামি বলছেন সিরিয়া এখন এক গভীর সংকটের মধ্যে পড়েছে। সিরিয়ার জনগণের যে বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে তা এতই গভীর যে তা বলার নয়। কিন্তু আপনাকে তো আশাবাদী হতেই হবে।"

"এখনও যদি অনেক লোক মিলে এ কথা বলতে পারে যে আমরা ধর্মীয় উগ্রপন্থা বা একনায়কতন্ত্র - এর কোনটাই মেনে নেবো না - তাহলেই এমন একটা জায়গা তৈরি হবে যে - সিরিয়ার লোকেরা তাদের নিজ দেশের মাটিতে বেঁচে থাকতে পারবে।"